বাংলাদেশে জ্বালানী তেলের কোন সমস্যা নেই। ভোজ্য তেলের কোন সংকট নেই। শিশু চিকিৎসাসহ অন্য কোন চিকিৎসার সমস্যা নেই। অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্তান- গণতন্ত্র- মানুষের কথা বলার অবাধ স্বাধীনতা রয়েছে। নেই কোন মানবাধিকার লঙ্ঘন।
গণতন্ত্রের দুধের নহর বইছে কিন্তু এখন জামায়াত-এনসিপি-বিএনপি শাসনামলে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এ চরম শান্তি বইছে দেশে।
কেউ কেউ প্রশ্ন তুলবেন- এ কেমন কথা বলছি? আসলে একটু ব্যঙ্গাত্মক কথাই বললাম এক্ষেত্রে আমি।
‘জামায়াত-এনসিপি-বিএনপি শাসনামল’ কেন বলছি? ক্ষমতায় তো তারেক রহমানের নেতৃত্বে থাকা বিএনপি। জামায়াত-এনসিপি তো বিরোধী দল।
কিন্তু যতই সরকারি আর বিরোধী দল বলা হোক না কেন আসলে এরাতো সেই একে অপরের খালতো ভাই সব। ভেতরে ভেতরে নানা অংক চলছে বলেই মনে হচ্ছে।

দেশে যখন হামে শিশু মৃত্যুর মহামারি চলছে, জ্বালানী সংকটে নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত, সার ও সেচের অভাবে কৃষক দিশেহারা, মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির খড়্গে দেশী শিল্প ধ্বংসের মুখে তখন বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদ গ্রহণ করেছে এক বিরাট সিদ্ধান্ত।
দখলদার ইউনুস অবৈধ অধ্যাদেশে নিষিদ্ধ করেছিল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম। এবার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মোড়কে সেই অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হলো।
শুধুই কি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসা নাকি এই সিদ্ধান্তের পেছনের রয়েছে আরো গুঢ় কোন উদ্দেশ্য?
দেশের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নিউজ থেকে যতটুকু জানছি আমরা তা হলো- “গত ৯ এপ্রিল সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ।
গত ২০২৫ সালে অবৈধ ইউনুসীয় শাসনামলে ওই অধ্যাদেশের বলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
গত বুধবার ( ৯ এপ্রিল) দুপুরে জাতীয় সংসদে এ–সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
ফলে কোনো সত্তাকে নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ক্ষমতাও এই আইনে থাকছে। আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে নিষিদ্ধ করার বিধান থাকলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান ছিল না।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের ১১ মে অধ্যাদেশ জারি করে এই আইনে কোনো কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে।
এর ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচারকার্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অন্তর্বর্তী সরকার।
ওই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দিতে জাতীয় সংসদে বিল পাস হলো। ফলে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকল “এখন যারা দেশ চালাচ্ছেন তাদের কাছে জ্বালানী তেল-ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের হাহাকার, শিশুমৃত্যু, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, বিদ্যুতের হাহাকার, সার-ডিজেলের জন্য কৃষিতে অশনি সংকেত – এসবের চেয়ে আওয়ামীলীগকে নিষিদ্ধ করার আইন পাশ করানোটি অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে সরকারের কাছে।
কারণ এটি করতে না পারলে যেন বাংলাদেশে প্রবল ভূমিকম্পে বয়ে যাবে।
অথচ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাবেক প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট মরহুম জিয়াউর রহমান নাকি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন, এমনটিই দাবি করে থাকে দলটি। সেই দলটির আমলেই নিষিদ্ধ হলো আওয়ামীলীগ। এটিই হলো বহুদলীয় গণতন্ত্র!!?
## একটু দেখে আসি- কি বলেছিলেন বিএনপি নেতারা ?
গত ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগ ও শেখ হাসিনার পতনের পর বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ৭ অগাস্ট দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রথম ভার্চুয়াল ভাষণে বলেন, “ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়। আসুন ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।” (মানবজমিন, ৭ অগাস্ট ২০২৪)
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, নির্বাহী আদেশে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন।
তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আজ যদি একটি দল নিষিদ্ধ করা হয়, তবে কাল আমার দলও নিষিদ্ধ হবে না, তার নিশ্চয়তা কী?” (টাইম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬)
গত বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “আমি বলেছি যে, জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা এই বিষয়টা বারবার করে বলে আসছি যে, আমরা একটা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি… আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রের সব নর্মস অ্যান্ড কন্ডিশন যেগুলো আছে, সেগুলোর ওপর আমরা আস্থা রাখি এবং সেটা আমরা চর্চা করি… অতীতেও চর্চা করেছি।”
“আমরা এই কথা বলে আসছি যে, ইট ইজ নট আস হু উইল ডিসাইড যে, কোন পার্টি নিষিদ্ধ হবে, কোন পার্টি কাজ করবে, কোন পার্টি কাজ করবে না… পিপলস উইল ডিসাইড… মানুষ বা জনগণ নির্ধারণ করবে কোনো পার্টি থাকবে কি থাকবে না, কোনো পার্টি নির্বাচন করবে কি করবে না।” (দ্য ডেইলি স্টার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, “আমরা আগেও এই বিষয়ে আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার করেছি, নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বা কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা আমরা সমর্থন করি না।”
তিনি আরও বলেন, “যেকোনো প্রক্রিয়ায় নির্বাহী আদেশের মধ্য দিয়ে যদি আমরা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ চাই, তাহলে সেটা হবে একটা ভয়ঙ্কর চর্চা।” (দ্য ডেইলি স্টার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫)
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের এমন অবস্থানের পর ওই বিএনপিই কেন এখন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করল?
নির্বাচনের আগে তারা নিষিদ্ধের কথা বলেনি। বিজয়ের পর এই কাজ করার মাধ্যমে কি তারা প্রমাণ করল যে, সেটি ছিল তাদের কৌশল?
নাকি তারা ভাবছেন, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে মাঠ থেকে সরানো গেলে জামায়াতকে গোনায় ধরার কেউ থাকবে না?
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত; তাকে আইনে রূপান্তর করাটা বহুদলীয় রাজনীতির জন্য এক অশনিসংকেত।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সংকটময়, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এই অবস্থা সরকারের জন্য বহুমুখী সংকট তৈরি করছে।
এমন প্রেক্ষাপটে দেশের অন্যতম বৃহত্তম দলকে নিষিদ্ধ করা কি বিএনপির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ নয়?
আওয়ামী লীগের অভিযুক্ত নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন আছে। এছাড়া হাজার হাজার ভুয়া মামলা, গ্রেপ্তার ও পুলিশ হত্যার বিচার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেই ১/১১-এর ইস্যু, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক মন্দা। ক্ষমতার শুরুতেই কি এতগুলো বিষয় একসঙ্গে মোকাবিলা করা বিএনপির পক্ষে সম্ভব?
এসব দেখে তাই বলতে হয়–আহ বিএনপি ! আহ তারেক ! আহ বহুদলীয় গণতন্ত্র !
## আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক পথ কখনো কুসুমাস্তীর্ণ ছিলনা ।
আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৯ সালে “পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ” হিসেবে। পরে ১৯৫৫ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “আওয়ামী লীগ”।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও বিলুপ্তির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখা যায়- ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর পাকিস্তান সরকার আওয়ামী মুসলিম লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।
প্রতিষ্ঠার এক দশক পেরোনোর আগেই দলটির ওপর প্রথম বড় ধাক্কা আসে ১৯৫৮ সালে, যখন পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই ২৬ মার্চ দখলদার পাকিস্তান সরকার আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর আবারো নেমে আসে দলটির ওপর নিষ্পেষণ-নির্যাতন-নিপীড়ন-জেল-জুলুম-খুনসহ নানা অত্যাচার। তখনও অনেক নেতাকর্মীকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়।
২০২৪ এর ৫ আগষ্ট আবারো আওয়ামীলীগ দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে জঙ্গ-সামরিক ক্যু এর মাধ্যমে উৎখাতের পর চরম সংকটে পড়ে দলটি।
কোনভাবে শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোটবোন শেখ রেহানা প্রাণ নিয়ে বাঁচেন। বাংলাদেশের সামরিক উড়োযানেই সামরিক প্রহরায় তাদের দুই বোনকে ভারতে রেখে আসা হয়।

আওয়ামীলীগের কয়েক হাজার নেতাকর্মী কারাগারে বিনাবিচারে ভুগছেন। কাউকে মেরে ফেলা হয়েছে নানাভাবে। কয়েক হাজার দেশ থেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। এমন সংকট বোধ হয় আসেনি কখনো দলটির জন্য।
২০২৫ সালের ১০ মে আমেরিকা-ইউনুস-জামায়াত-সামরিক জঙ্গীদের নেতৃত্বে কথিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে ইউনুসীয় সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার না হওয়া পর্যন্ত দলটির সব ধরনের কার্যক্রম (সাইবার স্পেসসহ) নিষিদ্ধ করে।

এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে দলটির বিরুদ্ধে নানা ধরনের বিধি-নিষেধ বা সাংগঠনিক কার্যক্রম বন্ধের ঘটনা ঘটেছে।
দেশের রাজনীতি ও রাজনীতিবিদ ও সংসদ্য সদস্যদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে আওয়ামীলীগ নয় মূলত মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশকেই নিষিদ্ধ করছেন তারা।
এটি কি কেউ অস্বীকার করতে পারবেন যে এই আওয়ামীলীগই ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের নেতৃত্ব নিয়েছিল।
তাহলে সেই নেতৃত্বকে নিষিদ্ধ করার অর্থই হলো মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ করা। অবশ্য জামায়াত-এনসিপি-বিএনপি নেতৃত্বাধীন খালাতো ভাইদের দল এর চেয়ে আর কম কিই বা করতে পারে বলুন?
তারা সরকারি দল-বিরোধী দল মিলে মূলত একটিই দল। তা হলো একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি/অপশক্তি বা দল যাই
বলি।
# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।
