এই ভাষার মাসে মানে ফেব্রুয়ারি মাস এলেই বাঙ্গালির প্রেম-ভালোবাসা উথলে ওঠে বাংলা ভাষার জন্য। অপরদিকে এই মাসটিতেই বাংলা ভাষার বিরোধীতাকারি সেই পাকিস্তানী প্রেতাত্মারাও মুখিয়ে থাকে নানা কায়দায় এই বাংলা ভাষাকেই আক্রমণ করবে সেজন্য।

বাঙ্গালির প্রেম-ভালোবাসা বললাম বলে অনেকেই হয়তো রাগ করবেন। কিন্তু এটিতো অস্বীকার করবার জো নেই যে, আমরা সারা বছর এই বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য নিজের মাতৃভাষার চর্চা করার ওপর গুরুত্ব দেই না।

কেউ কেউ বাংলার সাথে ইংরেজি বলতে পারলেই গর্ব অনুভব করি। আবার বেশ কিছুদিন ধরে যেসব শব্দ অনায়াসে বাংলায় বলতে পারি বা বললে শ্রুতিমধুর লাগে সেগুলোর পরিবর্তে আরবি-উর্দু-ফার্সি শব্দ ব্যবহার করে নিজেদেরকে যেনো আরো বেশি মুসলমান হলাম সেটাই জাহির করতে চাই।

আবার এই ভাষার মাসেই ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া বায়ান্নোর ভাষা সৈনিক অলি আহাদের কন্যা ও সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানাকে শহীদ মিনারে যেতে বাধা দিয়েছে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা।

শুধু তাই নয় , শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্য রুমিন ফারহানা যে পুষ্পস্তবকটি নিয়ে গিয়েছিলেন সেটিই ছিঁড়ে ফেলেছে বিএনপির লোকজন। এসব করে কি শহীদদের অসম্মান করলো না বিএনপি’র সেসব বীর পুঙ্গবরা?

এই যে মব সন্ত্রাস চালানো হলো এর জবাব আছে কোন বিএনপির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কাছে?

শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনে বাধা ও কর্মীদের মারপিটের অভিযোগে ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আসামিদের অধিকাংশই বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী।

গত ২২ ফেব্রুয়ারি আহাদ নামে রুমিন ফারহানার এক কর্মী সরাইল উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেনকে প্রধান আসামি করে মামলাটি দায়ের করেন।

অপরদিকে জাতীয় পার্টির ব্যানারও ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। তো এসব কি নব্য ফ্যাসিবাদের জন্ম দিচ্ছেনা বা নব্য ফ্যাসিবাদকে উস্কে দিচ্ছেনা? আবার আমরা নতুন এক বিষয় খেয়াল করলাম। তা হলো একাত্তরের খুনী, যুদ্ধাপরাধীর দল ও ইসলামের একমাত্র সোল এজেন্ট হিসেবে দাবিদার জামায়াতে ইসলামী এই প্রথমবারের মতো শহীদ মিনারে গেছে।

অথচ তারা এতদিন বলতো-শহীদ মিনারে যাওয়া হারাম। এসব মূর্তি পুজা ও শিরক.. ইত্যাদি।

তো এই যখন অবস্থা তো সেদিন মানে এবারের একুশের ফেব্রুয়ারি জামায়াতের পালের গোদা সেই সাদা শকুন হিসেবে কুখ্যাত ডা. শফিকুর রহমানকে যখন সাংবাদিকেরা জিজ্ঞেস করলেন- তারা তাদের সেই অবস্থান থেকে কি সরে এসেছেন? তখন তিনি তার কোন জবাব না দিয়ে বললেন- আজকে এই পবিত্র দিনে এমন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন কেন? এই বলে তিনি দ্রুত অন্যদিকে চলে গেলেন।

পাশাপাশি আরেকটি বিষয় এবার যুক্ত হয়েছে- শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি নতুন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার মন্ত্রীপরিষদের সদস্য, তিনবাহিনীর প্রধান ও বিএনপি নেতা ও জামায়াত নেতারা মোনাজাত করেছেন। যা কখনো দেখা যায়নি এর আগে।

হ্যাঁ ভাষা সৈনিকদের আত্মার শান্তির জন্য কেউ মোনাজাত করতেই পারেন। তবে তা তাদের কবরস্থানে করলেই বরং বেশি শোভন হতো।

এই যে শহীদ মিনারে মোনাজাতের নতুন রেওয়াজ চালু হলো তাকে কেউ কেউ নতুন সংস্কৃতি বলবেন। কিন্তু আমি ব্যক্তিগতভাবে এটিকে একটি ঘৃণ্য রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপসংস্কৃতিই বলবো।

শহীদ মিনার হলো একটি ধর্মনিরপেক্ষ-অসাম্প্রদায়িক স্থান। যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণী পেশার বাংলাদেশী নাগরিকই শুধু শহীদদের স্মৃতির প্রতি, ভাষার জন্য আত্মত্যাগকারি বীর শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে যান না, সেখানে বিদেশী কূটনীতিক ও বিদেশী নাগরিকরাও যান।

সারা বিশ্বে বোধ হয় আর কোন দেশ পাওয়া যাবেনা যে জাতির বা দেশে শুধুমাত্র মায়ের ভাষাকে নিজের ভাষা হিসেবে সম্মান ও আত্মপরিচয় হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া-মর্যাদা দেয়ার দাবিতে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে।

সুতরাং সেই শহীদ মিনার ও শহীদ মিনার প্রাঙ্গনকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণী পেশার নাগরিক সর্বজনীন ও ধর্মনিরপেক্ষ রাখাই মঙ্গল।

কারণ কোন হিন্দু বা সনাতন ধর্মাবলম্বী যদি বলেন- তারা শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় সেখানে ২১ ফেব্রুয়ারিতে পূজা করবেন তাহলে তা কি মেনে নেবেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী নাগরিকগণ? নাকি এ দাবি করলে হিন্দুদেরকে শহীদ মিনারে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দেবে সরকার?

নতুন করে কিছু শব্দকে বাংলা ভাষায় ঢুকিয়ে দিয়ে যে চর্চার কথা বলছিলাম সে প্রসঙ্গে ফিরে যাই। মূলত এই চর্চাটি বেশি বেড়েছে গত ২০২৪ এর জুলাই-আগষ্ট মাসে কথিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ে।

আর সেটি এখন সামাজিক মাধ্যম, সংবাদ মাধ্যমসহ সাংস্কৃতিক- রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেই ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে বাংলা ভাষা দিন দিন হারাচ্ছে তার স্বকীয়তা ও সৌন্দর্য।

সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু শব্দ খুব বেশি আলোচনা হচ্ছে নতুন করে। ব্যবহারও হচ্ছে। আর এসবের ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত সচেতনভাবে। এতদিনকার যে চলতি ভাষায় বাংলার যে স্বাভাবিক প্রচলনটি ছিল তার পরিবর্তে নতুন কিছু শব্দ জুড়ে দিয়ে আবারো সেই পাকিস্তান আমলের মত ভাষাকে ইসলামীকরণ করার একটি অপপ্রয়াস চলছে।

তবে এটি শুধু ভাষাকে বদলে ফেলার জন্য নয় কিন্তু। এটি মূলত বাঙ্গালির নিজস্ব যে ঐতিহ্য-সংস্কৃতি রয়েছে সেগুলোকে সুকৌশলে পাল্টানোর একটি অপপ্রয়াস মাত্র।

এই যে পাকিস্তানী ভাবধারায় এবং সেটিকে ইসলামী ভাবধারা হিসেবে প্রচলনের জন্য নানা অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে বেশ কয়েকবছর ধরেই।

বিভিন্ন আরবী শব্দ যেগুলো খুব বেশি ব্যবহার করতোনা সাধারণ জনগণ সেগুলোকে অত্যন্ত কৌশলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মধ্য দিয়ে। আর তা সংবাদমাধ্যমেও প্রবেশ করেছে। বেশ ব্যবহার করা হচ্ছে জেনেবুঝে অথবা বা না জেনেবুঝে।

কিন্তু এতে করে আমরা বাঙ্গালিরাই যে নিজেদের ভাষার অপমান করছি। অমর্যাদা করছি। এ বোধটিও বোধ হয় হারিয়ে ফেলতে বসেছি। আর আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গত চব্বিশের জুলাই-আগষ্ট থেকে এসব অপপ্রয়াসের মাত্র অত্যন্ত তীব্রহারে বেড়ে গেছে।

ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা মাঝে মধ্যে ইনশাল্লাহ্, মাশাল্লাহ্, আলহামদুলিল্লাহ্, খোদা হাফেজ সহ নানা আরবী শব্দ ব্যবহার করতেন। তবে তাও ছিল পরিমিত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসবের ব্যবহার এত বেশি বেড়েছে যে মনে হচ্ছে বাংলা ভাষাকে ‘মুসলমানি’ করিয়েই ছাড়বে।

ভাষাকে রীতিমতো ইসলামীকরণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে সেই আমেরিকান ডিপষ্টেট ও ড. ইউনুসের মেটিকুলাস ডিজাইনের যৌথ প্রযোজনা ও পরিচালনায় নির্মিত “জুলাই অভ্যুত্থান” এর নাটকে।

আমরা একটু খেয়াল করলেই দেখবো যে- স্বাধীনতার জায়গায় আজাদী, বিপ্লব এর জায়গায় ইনকিলাব, সুবিচারের জায়গায় ইনসাফ, নিপীড়িত শব্দের বদলে মজলুম, নিপীড়ক শব্দের বদলে জালিম, দেশ এর পরিবর্তে মুলুক, জাতি’র বদলে কওম, নতুন ব্যবস্থার বদলে নয়া বন্দোবস্ত ।

এ ধরনের আরো বেশ কিছু শব্দের অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে। এর সবই করা হচ্ছে মূলত একটি ইসলামিক রাজনৈতিক আবহ সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে, বাঙ্গালি সংস্কৃতিকে ইসলামীকরণের জন্য।

কারণ সেই পাকিপন্থী গোষ্ঠী আবারো সেই পাকিস্তানী আমলে যেভাবে সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালিয়েছিল ঠিক তেমন করেই আবার এই ইসলামি সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে বাঙ্গালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-ভাষাকে বদলে দিতে। বাংলাদেশের মানুষের মননে এসব ঢুকিয়ে দিতে চাইছে সেই পাকিস্তান আমলের মতো করে।

জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র শিবির, এনসিপিসহ বেশ কিছু ইসলামি রাজনৈতিক দল ও তাদের বশংবদ কিছু সংবাদ মাধ্যম ইতিমধ্যে এ জাতীয় শব্দ গুলো ব্যবহার করছে বেশ জোরেশোরেই।

বেশকিছু রাজনৈতিক নেতা তাদের বক্তব্যে বা অন্য সময়ের কথায় এসব শব্দ বেশ জোর দিয়ে প্রয়োগ করছেন। তবে কেউ কেউ দাবি করছেন বাংলার প্রচলিত শব্দগুলো ব্যবহার না করে এসব শব্দ এখন ইচ্ছে করে ব্যবহার করা হচ্ছে।

একটু খেয়াল করলেই দেখবো- বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য , বিদ্যুৎ ও জ্বালানী সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সিরাজগঞ্জে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা শহীদ দিবসের এক আলোচনা সভায় বলেছেন, “বাংলাকে যদি ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি মায়ের ভাষা বলতে হয়, তাহলে “ইনকিলাব জিন্দাবাদ” চলবে না। ইনকিলাব, ইনকিলাব মঞ্চ ও আজাদির মতো এখন নতুন নতুন শব্দ শুনছি”।

তিনি বলেন, “ইনকিলাব জিন্দাবাদ, ইনকিলাব মঞ্চ- এগুলোর বাংলার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যারা আমাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, এগুলো তাদের ভাষা”।

তো আমাদের নতুন বিএনপি সরকারের জ্বালানী মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুক ‘র কাছে সবিনয়ে একটি বিষয় জানার বড় ইচ্ছে- আচ্ছা আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়তো ‘ জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’ ছিল রণহুংকার।

এতেই তখনকার মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী বাঙ্গালিরা প্রচন্ড উজ্জ্বীবিত হতেন। তো বাঙ্গালির বা বাংলাদেশের সেই ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানকে আপনারা ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্টের পরে একপ্রকার নিষিদ্ধ করেছিলেন কেন?

আবার ২০২৪ এর ৫ আগষ্টের পরেও তা করলেন আপনারা সবাই মিলে। কেন? সেই যে জয় বাংলা নিষিদ্ধ করে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কায়দায় বা অনুকরণে ‘ বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ চালু করেছিলেন আপনাদের নেতা জিয়াউর রহমান সাহেব তখন কি আপনার বাঙ্গালি চেতনায় আপনার বাংলা ভাষায় আঘাত লাগেনি?

জানি এর কোন জবাব আপনারা দিকে পারবেন না। কারণ আপনারা রাজনীতিবিদেরা শুধু নিজেদের গদি রক্ষা ও গদি থেকে হঠাতে সব সময়েই সাধারণ জনগণেট্রর সঙ্গে প্রতারণাই করেন।

কিন্তু তার পরদিনই সকাল হতে না হতে রবিবার সকাল ৬টা ৮ মিনিটে আমিরে জামায়াত ‘ সেই সাদা শকুন’ শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় প্রচারিত পোস্টে বলা হয়েছে, “ইনশাআল্লাহ, আগামীর বাংলাদেশ ইনসাফের বাংলাদেশ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।”

সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম তার ভেরিফায়েড পাতায় ‘আযাদীর সিনেমা’ লেখা ব্যানারের সামনে নিজের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, “লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনামলেও ‘আযাদী’র সিনেমা নামে সিনেমা প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম, যেখানে ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং একটিভিস্টরা বক্তব্যও দিয়েছিলেন। ভাষা নিশ্চল না।

বদ্ধ কুঠুরিও না। যখন যে শব্দ দিয়ে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা সহজ স্বাভাবিক হবে, সেটাই চলবে। ভাষার দুয়ার খুলে দাও”।

এনসিপির মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসন থেকে ইলেকশনের সামে সিলেকশনে সংসদ সদস্য হওয়া হাসনাত আব্দুল্লাহ লাল ব্যানারে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ ‘ লিখে পোস্ট করেন ২১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায়।

এসব শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে পাল্টে দেয়ার প্রচন্ড অপচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র চলছে- এটি আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা।

সেই যে পাকিস্তান আমলে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন শুরু হলে পাকি সামরিক শাষকরা যে ধরনের ঘৃণ্য আচরণ করেছিলো বাঙ্গালির সাথে তা মনে রেখেছে নিশ্চয়ই বাঙ্গালিরা।

আর যদি মনে না রাখেন তাহলে আবারো কপালে যে খারাপি আছে সে দেখাই যাচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের কোন কোন ভাষাবিষারদ ও বাংলা সাহিত্যের শিক্ষকদের কেউ কেউ এসব শব্দ ব্যবহারকে বাংলা ভাষার জন্য কোন বিপদ হিসেবে দেখছেন না।

তারা হয়তো বিষয়টিকে অতটা গুরুত্ব দিচ্ছেননা বা তাদের যুক্তি হলো- বাংলা ভাষায় অনেক বিদেশী শব্দ রয়েছে, তাতে ভাষার কোন ক্ষতি হয়নি।

কিন্তু তারা কিছু বিষয় কেন বার বার ভুলে যাচ্ছেন বা এড়িয়ে যাচ্ছেন বুঝলাম না। তারা যা এড়াতে চাইছেন তা হলো- বাংলা ভাষাকে আবারো সেই পাকিস্তান আমলের মতো ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। বাংলার প্রচলিত শব্দ ভান্ডারের পরিবর্তে এই অপশক্তি তাদের কথিত ইসলামী শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে তার মাধ্যমে রাজনৈতিক-সামাজিক ধস নামাতে চাইছে।

বাঙ্গালির মেধা-মনন-নীতি-নৈতিকতায় এর মধ্য দিয়ে বদলে ফেলতে চাইছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ কাহালি বলেন, “বাংলা ভাষার ইতিহাস লক্ষ্য করলে দেখা যায় ভাষা নিয়ে অনেক বারই রাজনীতি হয়েছে। কিন্তু ভাষা থাকে মানুষের প্রাণে মনে মুখে আবেগে। ফলে চাইলেই তার খোলনলচে পাল্টানো যায় না। আর বাংলা ভাষার সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা অস্তিত্বের”।

বাংলা ভাষায় অনেক বিদেশী শব্দ মিশে আছে যেগুলোকে বাংলা ভাষা দীর্ঘকাল ধরে গ্রহণ করে নিয়েছে। এটাই ভাষার বিবর্তন।

কিন্তু ইচ্ছা করে বা জোর করে বাংলা ভাষাকে, বাংলাদেশকে, দেশের পরিচয়কে বদলে দেবার জন্য বা মুছে দেবার জন্য অপরাজনীতির নামে যারা উর্দু-আরবি শব্দ চাপিয়ে দিয়ে বাংলাকে কলুষিত করতে চায়, সেই জিন্নাহ বা তার অনুসারীরা ১৯৪৮ সাল থেকেই বাংলাদেশের এবং বাংলা ভাষার চিহ্নিত শত্রু। তাদের ব্যাপারে তাই সচেতন থাকতে হবে, সতর্ক থাকতে হবে।

এ প্রসঙ্গে একটি কালজয়ী-প্রতিবাদী- গণসঙ্গীত মনে পড়ে গেলো।

ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়
ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে-পায়ে
ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমাদেরই হাতে-পায়ে..।

যে গানটির গীতিকার ও সুরকার হলেন শ্রদ্ধেয় আবদুল লতিফ। মাতৃভাষার অধিকার ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নিয়ে রচিত গানটির কয়েকটি চরণেই যেন রয়েছে ভাষার অধিকার, মুক্তি অধিকার ও শোষনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দৃঢ় প্রত্যয়।

বাঙ্গালি কখনোই অন্যায়-শোষণ মেনে নেয়নি।মুক্তির তীব্র আকাঙ্ক্ষায় সে আবার গর্জে উঠবেই। অপসংস্কৃতি ধুয়ে যাবে নিশ্চয়ই।

# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *