একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি ঘৃণিত জামায়াতে ইসলামী এই স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারো অন্যতম রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজের অবস্থা তৈরী করে নেবে তা ভেবেছিল কেউ? অথচ ঠিক তাই হলো ও হচ্ছে।
এমন খারাপ দৃষ্টান্ত এই স্বাধীন বাংলাদেশে দেখতে হবে সেটা হয়তো ভাবেননি অনেকে। আর কতকাল এ অবস্থা দেখতে হবে বা এমন দুরাবস্থার মধ্যে থাকতে হবে জাতিকে তা জানেন না কেউ।
জামায়াত ও তার সহযোগীরা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার ডিসাইডিং ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একাত্তরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সহযোগী জামায়াতে ইসলামী ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, ধর্ষণ, নারী-শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলো বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে কেউ মুছে ফেলতে পারবেনা শত চেষ্টা করেও।
ত্রিশ লাখ বাঙ্গালির আত্মত্যাগ, দু লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই বাংলাদেশ।
পাকিস্তানী কবল থেকে মুক্ত হয়ে দেশ স্বাধীন হয়েছে আজ ৫৫ বছর হয়ে গেলো। কিন্তু একাত্তরের সেই ঘৃণিত দল জামায়াতে ইসলামী তাদের ঘৃণ্য অপকর্মের জন্য কখনোই বাঙ্গালি জাতির কাছে ক্ষমাতো চায়ইনি উল্টো তারা এখন নতুন সুরে বলতে চাইছে তারাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ করেছে।
এজন্য তারা তাদের দলে কিছু লোভী মুক্তিযোদ্ধাকেও ঢুকিয়েছে সম্প্রতি। যাতে করে তারা বলতে পারে যে তাদের দলে মুক্তিযোদ্ধাও রয়েছে। অবশ্য এসব মুক্তিযোদ্ধাকে এদেশের সচেতন জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে।

তবে আমার কাছে যেটি মনে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারি দল আওয়ামীলীগসহ অন্য দলগুলিই এজন্য দায়ী।
আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক দল-নেতৃত্বের অপরিণামদর্শীতা ও অরাজনৈতিকসুলভ আচরণ, সিদ্ধান্ত ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে রাজনৈতিক অনৈক্যের কারণে এই অপশক্তিটি আবার তাদের নখর ও থাবা বিস্তার করার দুঃসাহস দেখিয়েছে।
পক্ষান্তরে আমরা যাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে চিনি তারা ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতা রক্ষার জন্য এই একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গোপনে ও প্রকাশ্যে তোষামোদ করে আসছে। রাজনৈতিক জোটও করেছে ও করছে। যা অত্যন্ত লজ্জার ও আত্মগ্লানির বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি জাতির জন্য। একটি দেশের রাজনীতির জন্য।
কারণ অতি সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের রাজনীতি এত বেশি আদর্শহীনতা ও নীতিহীনতার মধ্যে চলে গেছে বা আবর্তিত হচ্ছে যাতে করে কেউ আর দেশ ও জাতির চিন্তা করছেনা। তাদের চাই শুধু ক্ষমতা, তা যে কোন উপায়েই হোক।

এমন এই নীতি-আদর্শহীনতার সুযোগটিই নিয়েছে এই নরপশু জামায়াতে ইসলামীর দল। এরা সমাজের ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে তাদেরকে ফিল্টার করে বের করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
আর রাজনীতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে কোন রাজনৈতিক দলই আর সেই ফিল্টারেশনটি করতে চাইছেনা। কারণ তাদের ক্ষমতা দরকার। তাতে দেশ-সমাজ গোল্লায় গেলেও তাদের কিচ্ছু আসে যায়না !
তাহলে এমন একটি হতাশাজনক পরিস্থিতির মধ্যে সমসাময়িক রাজনীতি এমনকি তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও নতুন কোন ভিশন বা আদর্শ দেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক দল ও নেতারা। নীতি-নৈতিকতা যেন এখন শুধু বইপত্রে বা কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক অবক্ষয়ের এই যুগে অপরাজনীতি ও দেশি-বিদেশী অরাজনৈতিক অপশক্তি বাংলাদেশকে গ্রাস করে ফেলেছে। অথচ সরকার চালাবে রাজনৈতিক দল ও নেতারা।
কিন্তু সেখানেই চরম শূন্যতা সৃষ্টি করার নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। এই শূন্যতার সুযোগটি নিয়েছে মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক অপশক্তি জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সৃষ্ট বিভিন্ন ইসলামী দল ও সংগঠনগুলো।
এসব দল বা সংগঠনগুলো মূলত জাময়াতেরই বাই প্রোডাক্ট। কিন্তু সেটি আমাদের সমাজে অনেকেই বুঝতে পারেননা। তার ফলে এই বাই প্রোডাক্ট সংগঠনগুলো নানা ধরনের ক্যামোফ্লেজের মধ্য দিয়ে দেশের তরুণ সমাজকে চরমভাবে বিভ্রান্ত করতে পেরেছে ও এখনো সেই অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে পত্রিকান্তরে জানা গেছে- গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের নির্বাচন–পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকারকে চাপে রাখতে বিভিন্ন কৌশল নিয়েছে সংসদে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।

দলটির নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য ৩২টি আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি তুলে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আবেদন করেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৩টি আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে আদালতে গিয়েছেন ঐক্যভুক্ত দলগুলোর প্রার্থীরা।
একই সঙ্গে নির্বাচন ঘিরে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক দুই উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও খলিলুর রহমানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে জামায়াত।
তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও বিচারের দাবি জানিয়ে বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কে তুলে ধরার চেষ্টা করছে দলটি। পাশাপাশি এসব বিষয়ে সংসদেও সোচ্চার থাকার চিন্তা জামায়াতের। দৃশ্যত এর মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার কৌশল নিয়েছে দলটি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি।
দলটি এককভাবে ২০৯টি এবং জোটগতভাবে ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে জামায়াত এককভাবে ৬৮টি এবং জোটগতভাবে ৭৭টি আসনে জয়লাভ করেছে।
নির্বাচনের দুই দিন পর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ৩২টি আসনে ভোট পুনর্গণনার দাবি জানিয়ে ইসিতে আবেদন করে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য।
এসব আসনের মধ্যে ২৫টিতে জামায়াত, ৩টিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ২টি আসনে খেলাফত মজলিস এবং ১টি করে আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রার্থী ছিলেন। এসব আসনে ভোটের ব্যবধান ছিল ১ হাজার ২৬ থেকে ১৩ হাজার ৬৩২।
জামায়াতের অভিযোগ, এসব আসনে অল্প ব্যবধানে জামায়াত জোটের প্রার্থীদের হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে। অনিয়মের মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত দেরি, পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষর ছাড়া ফলাফল প্রকাশ, ভুয়া পোলিং এজেন্টের স্বাক্ষরে ফলাফল প্রকাশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পেনসিল দিয়ে ফলাফল লেখার মতো ঘটনা।
জামায়াতের প্রার্থীরা ইসিতে অভিযোগ জানানোর পরই নির্বাচনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়া শুরু করেন।জামায়াত নেতারা বলছেন, যেসব আসনে ভোটের তথ্য-উপাত্তে গরমিল পাওয়া যাচ্ছে, সেসব আসনের প্রার্থীরাই আদালতে যাচ্ছেন। ৩২টি আসনের বাইরেও যদি একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়, তবে সেসব আসনের প্রার্থীরাও আদালতে যেতে পারেন। এতে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা আসনের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
নির্বাচন–পরবর্তী জামায়াতের রাজনৈতিক কৌশল বিষয়ে দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের দুজন এবং সংসদ নির্বাচন পরিচালনা কমিটির একজন সদস্য জানান, নির্বাচনের ইস্যু সক্রিয় রাখতে তাঁরা আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে চান।
## জামাতের বিরুদ্ধে মার্কিন আইন সভায়ও প্রস্তাব উত্থাপিত হলো।
যখন এ লেখাটি লিখছিলাম তখনই নজরে এলো একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে সেই সুদুর মার্কিন মুল্লুকের আইন সভায় আলোচিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
তা হলো- একাত্তরে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সহযোগী সংগঠনের সহযোগিতায় পাকবাহিনী বাঙ্গালিদের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল সেটিকে গণহত্যা বলা হোক। এটি মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব আকারে উত্থাপিত হয়েছে।

গত ২০ মার্চ শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ— হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে প্রস্তাবটি তোলেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান।
“১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে অভিযান চালায়, তা জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা,” বলেন ল্যান্ডসম্যান।
ওহাইয়ো থেকে নির্বাচিত এ আইনপ্রণেতা তাঁর প্রস্তাবে বলেছেন, হত্যাযজ্ঞে সহায়তা করার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তিনি বাংলাদেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছেন।
প্রস্তাবে বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঘোষিত অপারেশন সার্চলাইটের সময় পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের ইসলামপন্থি সহযোগীরা নৃশংসতা চালায়। ওই সময় সব ধর্মের জাতিগত বাঙালিরা হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন। তখন হিন্দুদের নির্মূল করা হয়েছিল; তাদেরকে গণহত্যা করা হয়েছিল।

প্রস্তাব তুলে ধরার সময় ল্যান্ডসম্যান বলেন, “পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ১৯৭১ সালের অভিযান জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী গণহত্যা। “এ অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগেই গণহত্যার তকমা দেওয়া উচিত ছিল।”
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিষয়ে গত ৯ ফেব্রুয়ারি ক্যাপিটল হিলে একটি শুনানি হয়। সেখানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতিসহ একাত্তরের গণহত্যার কথা উঠে আসে। ওই অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিল ‘হিন্দু অ্যাকশন’ নামের একটি সংস্থা। সেই অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় মার্কিন পার্লামেন্টে নতুন প্রস্তাব উঠল বলে জানান নিউ ইয়র্কে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ডিস্ট্রিক্ট লিডার দিলীপ নাথ।
তিনি গত ২১ মার্চ শনিবার বাংলাদেশের সংবাদ সংস্থা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একাত্তরের গণহত্যার জন্য দায়ী জামায়াতে ইসলামের উত্থান ঘটেছে জুলাই আন্দোলনে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মুহম্মদ ইউনূসের আস্কারায় জামায়াত আবারো মানবতাবিরোধী জঘন্য তৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে।
“এমনকি একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিতদের ‘ভালো মানুষ’ সাজাতে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাবের নামে তামাশাও করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। আশা করছি কংগ্রেসে প্রস্তাবটি পাস হলে একাত্তরের ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত জামায়াতে ইসলামীকে যুক্তরাষ্ট্র আবারো নিষিদ্ধ করবে।”
এবার দেখা যাক বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দাবিদার দলগুলো কি পদক্ষেপ নেয়। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের অধিকাংশ প্রভাবশালী নেতা এখনো দেশান্তরী।
তারা আসলে ঠিক কবে দেশে ফিরতে পারবেন বা আদৌ ক্ষমতাসীন বিএনপি’র আমলে ফিরে দেশে রাজনীতি করার সুযোগ পাবেন –এমন আশা করাটাও অনেকটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কারণ সংসদে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের দোসর ইসলামী দলগুলোর সমন্বয়ে কমপক্ষে ৭৭ টি আসন রয়েছে। সুতরাং আওয়ামীলীগ আবার দেশে রাজনীতি করার সুযোগ পাক তা এই ইসলামী দলগুলোর জোট কখনোই চাইবেনা। তাই আওয়ামীলীগকে কৌশলেই রাজনীতিতে ফিরতে হবে।
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
