অন্য কোন বিষয় নিয়ে লিখবো ভাবছিলাম। কিন্তু গত ২ দিনে দুটি ঘটনা চোখে পড়ার পর আর স্থির থাকতে পারিনি। একটি হলো ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন সিনিয়র চিকিৎসক ডা. ধনদেব বর্মনের ঘটনা।

তাঁকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জামায়াতি মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবু জাফরের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়ানোর অভিযোগে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

অপরটি রংপুরে। বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় (৭৫) রহিমাপুর বীর মুক্তিযোদ্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক প্রধান শিক্ষক তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায় (৬০) কে তাঁদের ঘরেই নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে।

তারাগঞ্জ উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের উত্তর রহিমাপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে গত ৬ নভেম্বর শনিবার রাতে তাঁদেরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এই দুটি ঘটনারই শিকার হন হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনজন।

ময়মনসিংহে সিনিয়র চিকিৎসক সহকারি অধ্যাপক ধনদেব বর্মণকে যে প্রক্রিয়ায় চরম হেনস্থা-চাকরিচ্যুত ও রংপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক যোগেশ চন্দ্র রায়কে সস্ত্রীক খুন করার পরও সরকার ও কথিত সুশীলরা হয়তো বলবেন- এগুলোতো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। বাংলাদেশে যে আর কোনভাবেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বসবাস করতে দেয়া হবেনা তারই নমুনা দেখানো হচ্ছে মাত্র।

কেউ কেউ এরই মধ্যে স্বাস্থ্যের ডিজি’র পক্ষে ওকালতি করতে মাঠে নেমে পড়েছেন। আর রংপুরে প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর স্ত্রীকে খুন করার ঘটনাটিকে জায়গা-জমি সংক্রান্ত বিরোধ বলে চালিয়ে দেয়ার একধরনের ‘গল্প” তৈরী করা হয়েছে ইতিমধ্যেই।

এরই মধ্যে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজি) মো. আবু জাফরের সঙ্গে বাগবিতণ্ডার পর হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটি অপারেশন থিয়েটারের (ওটি) ইনচার্জ ডা. ধনদেব বর্মণকে সাসপেন্ড করা হয়ে গেছে।

এখন হয়তো তাঁর বিরুদ্ধে আরো কাল্পনিক কিছু অভিযোগ তুলে মামলা দায়ের এমনকি গ্রেপ্তারও করা হতে পারে। কেউ কেউ হয়তো বলবেন- ডা. ধনদেব বর্মণকে তো উপরস্থ অফিসারের সঙ্গে বাক-বিতন্ডায় জড়ানোতে লঘু শাস্তি দেওয়া হয়েছে মাত্র।

এ দুটি অতি সংবেদনশীল ঘটনাকে কি হিন্দু নিপীড়ন নীতি বলা যাবেনা ? অনেকেই বলছেন, উদ্ভট উটের পীঠে চলা এই (অসাম্প্রদায়িক !) বাংলাদেশে একজন প্রতিবাদী ডা. ধনদেব বর্মণ।
ফটোসেশন করার জন্য একঝাঁক বহিরাগত, ক্যামেরাম্যান নিয়ে হাসপাতালের ক্যাজুয়ালটির অপারেশন থিয়েটারে অবাধে ঢুকে পড়েন মহামান্য (!) ডিজি ।

রোগীদের স্বাস্থ্য সংরক্ষণের বিষয়টিকে কোনটিকে পাত্তাই দিলেননা। সঙ্গে করে (লাইট-ক্যামেরা.. এ্যকশন শুরু করে দিলেন। ওই অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে গেছেন কিছু টিভি ক্যামেরাপারসন এই জামায়াতি ডিজি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) তাঁর ক্ষমতা দেখালেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেই প্রতিবাদী চিকিৎসক ডা. ধনদেব বর্মণকে সাসপেন্ড করেছেন।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফুটেজ ও নিউজ থেকে যতদূর জানা গেছে, অপারেশন থিয়েটার রুমে একটি টেবিল রাখাকে কেন্দ্র করে- চিকিৎসক ধনদেব বর্মনকে ভৎর্সনা করতে থাকেন স্বাস্থ্যের ডিজি মো. জাফর।

হুট করে কোন ধরনের স্বাস্থ্য বিধি না মেনেই একদল সাংবাদিক ও প্রশাসনের অন্য লোকজন নিয়ে ওটিতে ঢুকে পড়েন এই করিৎকর্মা ডিজি।

সেখানেই বাকবিতন্ডার সময়ে উপস্থিত সাংবাদিক ক্যামেরাম্যানদেরকে ভিডিও করার নির্দেশও দেন ডিজি। কিন্তু চিকিৎসক ধনদেব বর্মণ তাঁকে বারবার বুঝানোর চেষ্টা করেন- টেবিল লেখালেখির কাজের জন্য রাখা হয়েছে।

কিন্তু জামায়াতি ডিজি তো নাছোড়বান্দা। তিনি এমন একটা সেনসেটিভ অপারেশন থিয়েটারে কোন প্রকার স্বাস্থ্য সুরক্ষা ছাড়াই বহিরাগত, ক্যামেরাপারসন সাংবাদিকদের নিয়ে প্রবেশ করেছেন শুধুমাত্র নিজেকে জাহির করার জন্য।

তিনি নিজেও একজন বিশেষজ্ঞ শল্য চিকিৎসক ও অধ্যাপক। কিন্তু ওই যে তাঁর মাথায় রয়েছে এই হিন্দু ডাক্তারকে কি করে শায়েস্তা করতে হবে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবেই তিনি সেখানে হুটহাট করে গিয়ে নিজেই সিন ক্রিয়েট করেছেন।

হাজার হলেওতো তিনি স্বাস্থ্যের ডিজি! তাই না! এখানে রোগীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা গোল্লায় গেলেও ডিজির কি আসে যায়!!

আর তর্কের এক পর্যায়ে তিনিতো ডা. ধনদেব বর্মনের মত একজন সিনিয়র চিকিৎসককে ‘তুমি’ সম্বোধন করে হুংকার দিয়ে আঙ্গুল উঁচিয়ে মারমুখী আচরণে বলেই ফেললেন- “জানো তুমি আমি কে? কার সাথে কথা বলছো…” ইত্যাদি ইত্যাদি।

তার মানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি নয় তিনি সত্যিকার অর্থে সেখানে গিয়েছিলেন তাঁর ক্ষমতা দেখানোর জন্য। ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। সেই প্রতিবাদী চিকিৎসক ডা. ধনদেব বর্মনকে সাসপেন্ড করেছেন।

তবে যে চিকিৎসক এ ঘটনার প্রতিবাদ করেছেন তিনিও সাহসী মানুষ। ডিজির অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখের উপরে বলে দিলেন- ‘আমাকে সাসপেন্ড করেন, নো প্রবলেম।’ ডা. ধনদেব বর্মনকে সাসপেন্ড করলেও তিনি চিকিৎসক সমাজের কাছেই শুধু নন সারা দেশের সচেতন মানুষদের কাছে একটি প্রতিবাদের স্বাক্ষী হয়ে গেলেন।

হাসপাতালে চিকিৎসারত রোগীদের স্বাস্থ্য সেবা যখন খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি ব্যাঘাত ঘটান- তিনি তখন প্রতিবাদ করলেন। নিজের চাকরির পরোয়া করলেন না, বললেন— ‘আমাকে সাসপেন্ড করেন, নো প্রবলেম।’

আমাদের চিকিৎসা খাতে এমন আরও অনেক ডা. ধনদেব বর্মনকে প্রয়োজন। যারা রোগীদের জীবন বাঁচাতে কোন রক্তচক্ষুকে পরোয়া করে না।

এই প্রতিবাদী চিকিৎসকের চাকরি আছে বছর খানেক। যদি স্থায়ীভাবে চাকরি চলে যায় তাহলে রিটায়ারমেন্ট বেনিফিটও পাবেন না। ধনদেব নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন বাস্তবতার বিবেচনায়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা আপনি-আমি সবাই জানি। ধনদেবকে কোনো শাস্তির সম্মুখীন করলে সে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে, এ পাপ সইবে না। কেউ কেউ হয়তো শৃঙ্খলার অজুহাত দেবেন। তখনই বুঝবেন তিনি আসলে খুনের রক্ত সাফ করছেন। ধনদেবের মত ডাক্তার প্রতি সরকারি হাসপাতালে দুটো থাকলে স্বাস্থ্যের এমন বৈকল্য দেখতে হতো না।

তবে হ্যাঁ এ বিষয়টি নিশ্চিত যে, “ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ” নামক দেশটিতে হিন্দুরা চাকরি-বাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্যতে আর সুবিধে করতে পারবেননা। সরকারি চাকরিতো দূরের কথা বেসরকারি চাকরিতেও তাদের আর আশা নাই।

চাকরি পেলেও তাদের প্রতি বঞ্চনা বর্মন বাবুর চাকরির ইতিহাসকেও ছাড়িয়ে যাবে। আজকেই জানতে পারলাম, একজন হিন্দু নারী চাকরি করতেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে, কিন্তু গত চব্বিশের ৫ আগষ্টের পর তাঁর চাকরিটি চলে গেছে। কারণ কি? কোন কারণ দর্শানো নেই, ব্যাংক শুধু জানিয়ে দিয়েছে তাঁর আর চাকরি নেই।

সেই ব্যাংকটি জামায়াতে ইসলামীর করায়ত্ব। তো ভাবুন এখনো যারা স্বপ্ন দেখেন এই বাংলাদেশকে নিয়ে।

মুক্তিযোদ্ধারা আর কোনভাবেই নিরাপদ নন। হিন্দু মুক্তিযোদ্ধা হলেতো আর কথাই নেই। অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের চিনি যারা এখন আর বলতে সাহস পাননা মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিতে।

কারণ গত ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট “জঙ্গী-সামরিক ক্যু” এর পর থেকে যেভাবে সারাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের চরম অপমান, মারধর, খুন ও নানাভাবে জেল-জুলুম-হয়রানী-অপদস্ত করা হচ্ছে তাতে স্বাভাবিকভাবেই আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা যারা জীবিত আছেন এখনো তারা ভীতসন্ত্রস্ত হবেন-এটাই স্বাভাবিক।

রংপুরের তারাগঞ্জে নিজ বাড়িতে স্ত্রীসহ বীর মুক্তিযোদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত ৬ নভেম্বর শনিবার রাতে উপজেলার কুর্শা ইউনিয়নের উত্তর রহিমাপুর গ্রামে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

প্রতিবেশী দিলীপ রায় বলেন, ‘বৃদ্ধ এই দম্পতিকে এভাবে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় আমরা হতবাক হয়েছি। তাদের কোনো শত্রু আছে বলে জানা নেই। বুঝে উঠতে পারছিনা কেন এমন হলো! আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।’

খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান দাবি করেছেন তাঁরা। এমন ঘটনায় হতবাক হয়েছেন গ্রামবাসী। বৃদ্ধ বয়সে তাদেরকে হত্যার হিসাব মেলাতে পারছেন না তারা।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় (৭৫) রহিমাপুর বীর মুক্তিযোদ্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তার স্ত্রী সুবর্না রায় (৬০) গৃহিণী। তাদের দুই ছেলে পুলিশে চাকরি করেন। বড় ছেলে সুভেন চন্দ্র রায় পুলিশের এএসআই, পদে জয়পুরহাটে রয়েছেন। আর ছোট ছেলে রাজেশ খান্না রায় ঢাকায় রয়েছেন।

হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় হতবাক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আলী হোসেন বলেন, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। না হলে কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।’

এই নৃশংস হত্যার ঘটনায় রোববার রাতে এই দম্পতির ছেলে শোভেন চন্দ্র রায় বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। এতে অজ্ঞাতনাম আসামি করা হয়েছে।পুলিশ বলছে, চায়নিজ কুড়াল দিয়ে যোগেশের মাথার পেছনে ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায়ের কপালে আঘাত করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

এ সম্পর্কে তারাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন বলেন, মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় ও তাঁর স্ত্রীকে হত্যার ঘটনায় তাঁর বড় ছেলে অজ্ঞাতনামা আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেছেন। তদন্তের স্বার্থে বেশি কিছু বলা যাচ্ছে না।

মামলার বাদী শোভেন চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমার মা–বাবা শেষ বয়সে ছিলেন, তবু তাঁদের এভাবে নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হলো। এলাকার সবাই জানেন, কারা করেছে। এক বছর আগে গ্রামের শ্মশানকে ৮ শতক জমি দান করেন বাবা। ওই দান কিছু লোক মেনে নিতে পারেনি। এটাই কাল হয়েছে।’

এ দুটি ঘটনাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে- এই “ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ” কোনভাবেই হিন্দুদের জন্য নয়। কারো চাকরি থাকবেনা নানা অজুহাতে। আবার কারো চাকরি যাবে কোন অজুহাত ছাড়া।

বীর মুক্তিযোদ্ধা-শিক্ষাব্রতী যোগেশ চন্দ্রদের মত আরো অনেকের জীবনই চরম সংকটে। কেউ স্বীকার করেন, কেউ করেন না, এই যা তফাৎ।

# ইশরাত জাহান, লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী সংগঠক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *