বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্যামোফ্লেজ নতুন কিছু নয়। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ছক কষে দেশের মানুষকে বিশেষ করে তরুণদের বিভ্রান্ত করতে নানা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী রাজনীতিতে এই ক্যামোফ্লেজ তৈরী করে বিভ্রান্ত করছে। ফায়দা লুটছে।

কিন্তু দেশপ্রেমিক তারুণ্য বারবারই প্রতারণার শিকার হচ্ছে এই ক্যামোফ্লেজের রাজনীতিতে। অন্ধকারের চোরাবালিতে পা রেখে তাতে ডুবে যাচ্ছে এই তরুণ সমাজ। তবে যা করা হচ্ছে তা কিন্তু এই তরুণদেরকে সামনে রেখেই।

একটি দেশের ছাত্র-তরুণ-যুবকদেরকে যদি বিভ্রান্ত করা যায় তাহলে আখেরে লাভ কাদের ? সেটি কি কখনো ভেবে দেখেছে এই ছাত্র-যুবা গোষ্ঠী।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এই বাংলাদেশে সমাজ বিপ্লবের নামে যা হয়েছিল তাই আবার গত চব্বিশে করলো। তখন চরম ডান-বাম সব মিলে একটি ‘সামরিক-ইসলামী জঙ্গী ক্যু’ করে আওয়ামীলীগকে হটানো হলো। কিন্তু গত দেড় বছরে দেশবাসী কি পেয়েছে?

সে প্রশ্ন কিন্তু রাজনৈতিক সচেতন মহলসহ সাধারন মানুষ ইতিমধ্যেই করা শুরু করেছে। নির্বাচন-নির্বাচন খেলা, জুলাই সনদ, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত- এ ধরনের কত কিছু মুখরোচক শব্দের মধ্য দিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে।

কিন্তু যখন আমেরিকা আর ইসলামী জঙ্গী শিরোমণি জামায়াতে ইসলামী দেখলো যে তাদের সেই বটিকা এখন আর এদেশেরে মানুষ খুব বেশি খাচ্ছেনা তখন নতুন ফন্দি বের করলো। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে অর্থনৈতিক শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের যে আকাংক্ষা এ দেশের তরুণ সমাজের মধ্যে ছিল তাকে বিনষ্ট করতে নানা কৌশল নিলো মার্কিনীরা।

সমাজতান্ত্রিক অভিমুখীন যাত্রাকে ধ্বংস করতে প্রগতিশীলতাকে ঠেকাতে প্রগতিশীলতাকেই ব্যবহার করলো। অর্থাৎ ফেইক বাম দিয়ে প্রকৃত বামকে ঠেকানোর কৌশল নিলো আমেরিকা।

অবির্ভূত করা হলো- “কাপালিক সিরাজুল আলম খান” এর । শ্লোগান তোলা হলো বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের। আরে ভাই সমাজতান্ত্রিক দর্শনইতো একটি সমাজ বিজ্ঞান। সেখানে আবার নতুন করে “বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র” কেন ?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এর মূল কারণটি ছিল সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বলয়ের বাইরে গিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত বলয়ের অধীনে থাকা সমাজতান্ত্রিক বলয়ের দিকে ঝুঁকেছিল। সেটিরও কারণ ছিল।

কারণ বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর যে সাহায্য সহযোগিতা ছিল মুক্তিকামী বাঙ্গালীদের জন্য তা নিশ্চয়ই ভুলে যাবার নয়। অপরদিকে ভারত তার সব ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করতে।

তো স্বাভাবিকভাবেই সোভিয়েত ব্লক ও ভারত বাংলাদেশের প্রকৃত মিত্র হয়ে উঠলো। তারা তাই ছিল ও আছে।

কিন্তু পরাজিত পাকিস্তান মার্কিনীদের সহযোগিতা ও ষড়যন্ত্রে এই বাংলাদেশ ধ্বংসের নীলনকশায় নেমে পড়লো। সৃষ্টি হলো ছাত্রলীগের মধ্যে ভাঙ্গন। সেই ভাঙ্গনের নেতৃত্বে ও অন্তরালে ছিলেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা সিরাজুল আলম খান।

প্রচন্ড জ্ঞান-বুদ্ধি ও সম্মোহনী শক্তি সম্পন্ন এক ব্যাক্তিত্ব। যিনি তার সেই কূটচালে তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নতুন রাজনৈতিক দল সৃষ্টি হলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল বা জাসদের।

মূলত এই জাসদের মধ্য দিয়েই সমাজতন্ত্র অভিমুখীন যাত্রাকে ঠেকানো হলো, অরাজকতা তৈরী করা হলো সারা দেশে। ভারত বিরোধী প্রচারণা চালানো হলো অত্যন্ত কৌশলে। আধিপত্যবাদের বিরোধীতা করতে গিয়ে ভারত বিরোধীতার জিগির তোলা হলো। এর সাথে অত্যন্ত কৌশলে হিন্দু বিদ্বেষকে জাগিয়ে দেয়া হলো।

বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাষনামলকে প্রচন্ড রকমের অজনপ্রিয় করতে সেই জাসদই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল। এটি কেউ অস্বীকার করতে চাইলে সে বিষয়ে অনেক প্রমাণ রয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে।

এমনকি বঙ্গবন্ধুকে ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে হত্যার সঙ্গে পরোক্ষভাবে জাসদের হাত ছিল। জাসদ নামের এই সমাজতান্ত্রিক দলটির মাধ্যমেই ভারত বিরোধীতা-হিন্দু বিরোধীতা, হিন্দুরা এদেশের শত্রু- এধরনের প্রচারনা চালিয়েছে অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে। আমেরিকা-পাকিস্তানের সহযোগিতায় জামায়াতে ইসলামী এই জাসদের মধ্য দিয়ে এই বাংলাদেশে আবার নতুন করে রাজনীতি করার প্লট তৈরি করতে পেরেছিল।

এরই ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের কিছুদিনের মধ্যে জিয়াউর রহমান ক্ষমতা নিয়েই জামায়াতকে এদেশে রাজনীতি করার সুযোগ করে দেন।অথচ স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিল। আর সেই একাত্তরের পরাজিত কুখ্যাত গণহত্যার দল নিষিদ্ধ জামায়াতে ইসলামীই এখন এই স্বাধীন বাংলাদেশে ছড়ি ঘুরাচ্ছে! এর চেয়ে ন্যাক্কারজনক বিষয় আর কি হতে পারে ?

এতক্ষণ যেসব কথা বলেছি তা এদেশের মানুষ জানে নিশ্চয়ই। তারপরও এর অবতারণা করেছি এজন্য যে, অতি সম্প্রতি দেখলাম গত চব্বিশের কথিত জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু বাম ও মধ্যপন্থা রাজনীতির কিছু তরুণদের সমন্বয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম তৈরী হতে যাচ্ছে।

মূলত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরবর্তী রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি থেকে পদত্যাগী কিছু নেতা আপাতত ফ্রন্টলাইনে থাকছেন। পরে অবশ্য তাদের আরো কিছু মুরুব্বী রাজনৈতিক নেতা যোগ দেবেন অথবা তারা নেপথ্যে থেকে এই প্ল্যাটফরমটিকে চালাবেন।

একসময়ে এটি রাজনৈতিক দলে রুপান্তরিত হবে, এমনটিই জানা গেলো। আগামী শুক্রবার এই নতুন সংগঠনটির আত্মপ্রকাশ ঘটবে বলে জানিয়েছেন এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংগঠকরা। “জনযাত্রা” নামে এই সংগঠনটিতে এখন অবধি যা দেখা যাচ্ছে তাতে চরম ডান, বাম ও মধ্যপন্থী কিছু ব্যাক্তি রয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এনসিপি যেহেতেু জামায়াতে ইসলামীর পেটের মধ্যে ঢুকে পড়েছে তাই তাদেরকে আর বিশ্বাস করতে পারছেনা এদেশের মানুষ, অথচ কেই চব্বিশের জুলাই-আগষ্টে অনেকেই তাদেরকে সমর্থন-সহযোগিতা দিয়েছিল বুঝে বা না বুঝে। তখনও রাজনৈতিক ক্যামোফ্লেজ ছিল। যা বুঝতে দেরি হয়েছে দেশবাসীর। যা এখন হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছেন তারা।

ফলে শুধু সাধারন মানুষ না, রাজনৈতিক সচেতন মানুষজনও এমনকি টিভি টক শো’তে যারা আলোচনা করেন তাদের কথাবার্তার সুরও পাল্টে গেছে।

এনসিপি’র করুণ দশা। তাই এই রাজনৈতিক দলের ওপর তেমন কোন ভরসা রাখতে পারছে না “মার্কিন-পাক-তুরস্ক” বলয়। তাই নতুন ফ্রন্ট দরকার তাদের। তো কি করা যায়? বামপন্থী বলে পরিচিত এবং রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এতদিন গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে এমন লোকজনকে দিয়ে রাজনীতির “নতুন দোকান” খোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এই নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরীর সঙ্গে আপাতত প্রকাশ্যে আছেন এমন কয়েকজন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন, আনু মুহাম্মদের গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি ও সিপিবি নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চেষ্টা করা হচ্ছে একবছর থেকে।

এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে দৃকের শহিদুল আলম ও রেহনুমা আহমেদর সংশ্লিষ্টতা আছে। ২০২৪ এর “সামরিক-জঙ্গী ক্যু” এর পর থেকেই মার্কিন নীলনকশায় একটি “ধর্মনিরপেক্ষ” চেহারার দল গঠন করা হবে এমন ধারণা পাওয়া যাচ্ছিলো।

সম্প্রীতি যাত্রা”, “মৈত্রী যাত্রা ” এর নামে আগে এই প্ল্যাটফর্মের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। নতুন এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ হবে। নাম এখনো চূড়ান্ত হয়নি। উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে একে ‘নতুন রাজনৈতিক প্রয়াস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আপাতত “জনযাত্রা” নামটিই শোনা যাচ্ছে।

নতুন এই প্ল্যাটফর্মে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি বাকী বিল্লাহ, সাবেক ছাত্র ইউনিয়নের নেত্রী মীর হুযাইফা আল মামদূহ ও সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু, সাধারণ সম্পাদক মাঈন আহমেদ , মঈনুল ইসলাম তুহিন (তুহিন খান) ও অলিক মৃ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অনিক রায় প্রমূখ থাকছেন।

“বামধারা” দাবিদার এই প্ল্যাটফর্ম যে কোনো মার্ক্সবাদী ” বৈপ্লবিক ” কোনো রাজনৈতিক সংগঠন নয় বরং সাম্রাজ্যবাদী “পুঁজি”র পক্ষে কাজ করবে “গণতান্ত্রিক অর্থনীতি ” শব্দবন্ধেই নিশ্চিত হয়ে যায়। কোনো মতাদর্শ ছাড়াই “বাংলাদেশপন্থী ” বাম ধারা” ইত্যাদি শব্দে প্রাথমিক চমক দেয়ার চেস্টা চলবে ।

বেশ কিছু নারী অধিকার সংগঠক নামে যারা এতদিন লালবদর ছিলেন তারাসহ এনসিপি থেকে বের হওয়া নারী নেত্রীরাও যোগ দিতে পারেন এই নতুন ‌প্ল্যাটফরমে।

দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত এক ছাত্রনেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্ল্যাটফর্মটির মূল দায়িত্বে থাকবেন তরুণরাই। তবে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও সামাজিক আন্দোলনের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা নেপথ্যে থেকে পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা দেবেন।

এ ছাড়া বিদেশে অবস্থানরত প্রাক্তন ছাত্রনেতা, শিক্ষক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত আছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকে পরিচয় প্রকাশ না করেই কাজ করবেন, কেউ কেউ ছদ্মনামও ব্যবহার করবেন।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে কেন হে বাপু ছদ্মনাম কেন? এটি কি সেই “ছাত্রলীগের লুঙ্গির নীচে শিবির” জাতীয় কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে আমাদেরকে?

এই যে জামায়াত-শিবিরের ছদ্মবেশ ধারনের নানা কৌশল তা আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখেনা। তবে এই ছদ্মবেশ ধারন বেশিদিন টিকে থাকেনা। তার প্রমান গত চব্বিশের কথিত জুলাই অভ্যুত্থানের পরই প্রকাশ পেয়েছে।

বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে এনসিপি, তারপর এনসিপি থেকে বের হয়ে কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। আবার কেউ কেউ বের হয়ে এখনো কোন দলে যোগ না দিলেও অপেক্ষায় আছে। আবার কিছু অংশ মিলে এই নদুন রাজনৈতি প্ল্যাটফর্ম বা “ নতুন রাজনৈতিক দোকান” খোলার চেষ্টা করছে।

এই যে ক্যামোফ্লেজের রাজনৈতিক খেলা চলছে তা কি বুঝতে পারছেন বাংলাদেশের জনগণ? জামাত-হিযবুত তাহরীর এর ফাঁদে পা দিয়ে এই বাংলাদেশী বামেরা যে নিজেদের সবকিছু হারিয়েছে তা কি বুঝতে পালেও তারা সেই একাত্তর পরবর্তী কিছু নতুন “ কাপালিক” এর ফাঁদে পা দিচ্ছেন তা হয়তো বুঝতে বেশিদিন লাগবেনা।

তাই গত চব্বিশের জুলাই-আগষ্টের “জঙ্গী-সামরিক ক্যু” এর পর থেকে এসব বামেরা একাত্তরে জামায়াতের “আলবদরের” মত “লালবদর” হিসেবে আখ্যা পেয়েছে।

এখন তাই “আলবদর-লালবদর” এর মতো “জামাতী-বামাতি” গালি হিসেবেই বহুল প্রচলিত শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বাংলাদেশে। এই ক্যামোফ্লেজের রাজনৈতিক চোরাবালি থেকে কবে মুক্তি পাবে বাংলাদেশের জনগণ জানেনা কেউ।

# ইশরাত জাহানঃ লেখক, প্রাবন্ধিক ও নারী সংগঠক

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *