চাইলেই কি আপনারা সব বদলে ফেলতে পারেন না পারবেন? বাংলাদেশ নামক দেশটির যিনি স্থপতি, যিনি একটি দেশের জন্ম দিয়েছেন তাঁকে মুছে ফেলার জন্যতো এ পর্যন্ত কম চেষ্টা করেন নাই আপনারা ! কিন্তু পেরেছেন কি? একটু ভেবে দেখুনতো সুস্থ মস্তিষ্কে।

অবশ্য মস্তিষ্ক সুস্থ থাকলেই না আপনারা সেই ভাবনা ভাবতে পারবেন। সুস্থ মস্তিষ্কের যে বড় অভাব। বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত এক মহনায়ক- জননেতা-রাষ্ট্রনায়ককে যে জাতি মর্যাদা দিতে জানেনা সে জাতির কপালে যে চরম দুঃখ আছে তাতো দেখতেই পাচ্ছে দেশবাসী।

যে মহান নেতার কথা বলছিলাম সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আপনারা যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ভয় পান তারাতো সব ধরনের অপচেষ্টা করবেনই। এটাই স্বাভাবিক।

মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত-শিবির ও একাত্তরে পরাজিত অপশক্তির যারা দোসর তারা বঙ্গবন্ধুকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছেন। এখনো নানাভাবেই অপচেষ্টা করে যাচ্ছেন। করুন সেই অপচেষ্টা। আপনাদের কাজই তো তাই।

পঁচাত্তরের ১৫ ই আগষ্টে বাঙ্গালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্মম-নৃশংস হত্যাকান্ডের পর একাত্তরের হায়েনার দল মনে করেছিল বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানাই মুছে ফেলা যাবে এ বাংলাদেশের মাটি থেকে। বাংলার জনগণের মন থেকে। কিন্তু পেরেছে কি সেই তস্কররা? পারেনি। কারণ তা সম্ভব নয়।

যিনি পরাধীন একটি জাতিকে সব শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার প্রয়াসে একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে একটি নতুন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছেন, একটি লাল সবুজের পতাকার জন্ম দিয়েছেন, পৃথিবীর গণতান্ত্রিক সমাজে একটি নতুন দেশের জন্ম দিয়েছেন- সেই জাতি ও মহানায়ককে মুছে ফেলা কি এতই সহজ?

হ্যাঁ কিছু তষ্কর দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ব্যক্তি মুজিবকে হত্যা করতে পরেছে মাত্র। কিন্তু আদর্শ আর দেশপ্রেম কি এতই ঠুনকো জিনিস যে বন্দুকের বারুদে বুক ঝাঁঝরা করলেই সব শেষ হয়ে যাবে?

সেই পঁচাত্তর থেকে এখন পর্যন্ত নানাভাবে, নানা অপকৌশলে চেষ্টা করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নাম-নিশানা মুছে ফেলার জন্য।

পঁচাত্তর থেকে নয় এটি চলছিল সেই ১৯৭১ সাল থেকেই। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানে। কিন্তু সেই মহান নেতার নির্দেশে ও তাঁর নামেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলছিল।

কারাগারের প্রকোষ্ঠে সেখানেই তিনিও হয়তো তাঁর শেষ বিদায়ের আশংকা করতেন। কিন্তু বাংলার মুক্তিকামী দামাল মুক্তিযোদ্ধারা অকৃত্রিম বন্ধুরাষ্ট্র ভারত ও রাশিয়ার সহযোগিতায় পাকিস্তানী বাহিনীকে পরাজিত করে বাংলার স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলেন। পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সেই বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে, সাম্রাজ্যবাদী কোন শক্তির কাছে মাথা নত করবেনা তা আর মেনে নিতে পারেনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি পাকিস্তান।

সেই সাথে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। তারা চায়ওনি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম হোক। ফলে বঙ্গবন্ধুকে বাংলাদেশ সৃষ্টির পর থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ও বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র চলতে থাকে।

বঙ্গবন্ধু নিজেও বুঝতে পেরেছিলেন বিশ্ব রাজনীতিতে তাঁকে ও বাংলাদেশকে দমানোর জন্য নানা ষড়যন্ত্র হচ্ছিল। কিন্তু তিনি তাঁর সংগ্রামী চেতনাকে স্ফুরিত করে শুধু বাংলাদেশের বা বাঙ্গালির নেতা নন, একপর্যায়ে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বনেতা।

তখনকার বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসী পূঁজিবাদী নেতৃত্ব ও এর বাইরে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নভুক্ত সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব এই দুই বলয়ের বাইরে তিনি অন্য বিশ্বনেতাদের সমন্বয়ে গড়ে তুলেছিলেন জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন। যাতে আরো ক্ষেপে যায় মার্কিনীরা।

ফলে মার্কিনীরা বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দিতে নানা ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে প্রাণ দিতে হলো ’৭৫ এর ১৫ আগষ্ট।

পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার যাতে করতে না পারে সেজন্য জারি করা হয় কুখ্যাত ‘ ইনডেমনিটি আইন’।

সেই ইনডেমনিটি আইন বাতিলের জন্য পরবর্তীতে আওয়ামীলীগকে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করে সংসদের মাধ্যমেই গণতান্ত্রিকভাবে আইন পাশ করে ইতিহাসের সেই নির্মম হত্যাকান্ডের বিচার সম্পন্ন হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীরীগ সরকারের আমলে।

শেখ হাসিনা চাইলে কিন্তু স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই হত্যাকান্ডের বিচার করতে পারতেন। কিন্তু তিনি দেশের স্বাভাবিক নিয়মের মধ্য থেকেই জাতির পিতার হত্যার বিচার হোক সেটিই চেয়েছিলেন। যদিও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত সব খুনীদের শাস্তি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর নাম, জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু বলা নিষিদ্ধ ছিল। যা গত ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট সামরিক-জঙ্গী ক্যু এর পর থেকে এখনো অব্যাহত আছে।

অবশ্য অনেকে মনে করেছিলেন গত ১২ ফেব্রুয়ারি ইলেকশনের নামে সিলেকশনের মাধ্যমে যে সরকার গঠিত হয়েছে তাতে দেশে আবার গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসবে।

দেশে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির রাজনীতি করার সুযোগ আসবে। কিন্তু অবৈধ ইউনুস সরকার মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারি দল আওয়ামীলীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোকে সেই যে নিষিদ্ধ করেছে সেই নিষেধাজ্ঞা এখনো অব্যাহত রয়েছে। সহসা তা প্রত্যাহার হবে বলেও কোন আলামত দেখা যাচ্ছেনা।

এমনকি বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রচার ও সেদিন বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনও করতে দেয়া হয়নি। উল্টো ভাষণ প্রচারের দায়ে কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা ও তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পাশাপাশি বিএনপি সেদিন তাদের নেতা তারেক রহমানের কারাবন্দী দিবস হিসেবে পালন করেছে ৭ ই মার্চকে ম্লান করার জন্য।
যেমনটি বিএনপি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রয়াত মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পালন করতেন ‘দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার জন্মদিন’ বলে। এই যে প্রতিহিংসার রাজনীতি রয়ে গেছে ও তাকে লালন করা হচ্ছে তা কোনভাবেই সুখকর নয় গনতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য।

এবারও আমরা দেখলাম জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ১৭ মার্চে কোন অনুষ্ঠান করতে দেয়নি বর্তমান বিএনপি সরকার। এতে অবশ্য অবাক হওয়ার কিছু নেই। যদিও গত ১২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামীলীগ সমর্থিত ভোটাররা জামায়াতকে ঠেকাতে বিএনপি’র ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন বলেই জানি।

কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির নবীন চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান কিন্তু তার নীতিবোধ ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। অবশ্য নির্বাচনের আগে তিনি আওয়ামীলীগের ভোটে ও মুক্তিযুদ্ধেল পক্ষের শক্তির ভোট পেতে একাত্তর যুদ্ধাপরাধী-রাজাকার জামায়াতে ইসলামী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে বেশ কড়া কড়া বক্তব্য দিয়েছেন।

এটি মূলত একটি রাজনৈতিক প্রহসন ছিল।
কারন জামায়াতে ইসলামী তার কথিত ইসলামী দোসরদের নিয়ে তাদের পেয়ারে পাকিস্তানের নির্দেশেই সবকিছু করেছে ও করছে।

এমনকি বিগত ইউনুস সরকারের সব দোসররা তখন ভারতকে তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু চিহ্নিত করে ভারতের বিরুদ্ধে-হিন্দুদের বিরুদ্ধে যা যা করা দরকার তার সবই করেছে। আর এই জামায়াতে ইসলামীকে কিন্তু স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলে সেই বিএনপিরই প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান।

তার স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং তাদের গুনধর পুত্র জনাব তারেক রহমানও কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ও তাদের আব্বাহুজুর পেয়ারে পাকিস্তানের অনেক পরামর্শই নিয়ে চলছেন।

যদিও অনেকে মনে করছেন তারেক রহমান ভারতের বেসিংসে চলছেন, কিন্তু তা মূলত একটি আই ওয়াশ।

বিএনপি-জামায়াত ও ইসলামী দলগুলোর যে পুরনো পীরিত তা কিন্তু মুছে যায়নি। কারণ এ প্রেমতো দীর্ঘদিনের। অনেকেই বলে থাকেন বিএনপি আর জামায়াত ‘একই মায়ের পেটের খালাতো ভাই’। একই মায়ের পেটের খালাতো ভাই কি করে হয় সে সম্পর্কটি আপনারাই বুঝে নেবেন দয়া করে।

গত চব্বিশের ৫ আগষ্টের পর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগী। সেইসাথে আওয়ামী পরিবারের অনেকেই দেশত্যাগী। হিন্দুদের অনেকেই অত্যাচারিত-নির্যাতিত ও দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। যদিও বিএনপি বলছে তারা সব ধর্মের লোকদের সমন্বয়ে সবার সমান অধিকার দিয়ে দেশ চালাতে চান।

কিন্তু কাজেকর্মে তার প্রমাণ এখনো দেখতে পাচ্ছিনা আমরা আমজনতা। জামায়াত ও তাদের দোসররা সংসদে প্রায় ৮০ টির মতো সীট দখল করে আছে।এরা ঈদের পরেই কথিত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য, সংস্কারের জন্য আন্দোলন গড়ে তুলবে বলে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। সেদিন ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে তারা যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে তা দেখেছেন দেশবাসী।

পাশাপাশি তারা যে জাতীয় সঙ্গীত ও বাংলাদেশকেই অস্বীকার করে এখনো তার প্রমাণও দেখেছে। জাতীয় সঙ্গীত বাজার সময় তারা সম্মান দেখিয়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত অস্বীকার করেছে। যদিও পরে নানাজনের চপাচাপিতে কিছুটা সময় দাঁড়িয়েছিল।

পাকি প্রেতাত্মারা এখনো জাতীয় সঙ্গীত, জাতীয় সংসদ , জাতীয় পতাকা অবমাননা করছে।

ওই যে পাকি-ভুত ও পাকিদের জারজ সন্তান হিসেবে পরিচিত কিছু অপশক্তির আস্ফালন আমরা দেখেছি সেই ২০২৪ এর জুলাই-আগষ্টে তাতো আরো জেঁকে বসেছে। তো সেখানে জাতীয় সঙ্গীত ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানতো সম্মান পাবেননা এটিই স্বাভাবিক।

বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের সেই ঐতিহাসিক বাড়িটি যে কতবার আক্রমণের শিকার হলো। কতবার আগুনে পুড়লো তার কোন হিসেব নেই। সারা দেশে বঙ্গবন্ধু ভাস্কর্য, ম্যুরাল-চিত্রকর্ম ধ্বংস করা হয়েছে বার বার। কিন্তু বাংলার মানুষের হৃদয়ে যার ঠাঁই তাকে কি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করা যাবে?

ব্যক্তি মুজিবের মৃত্যু হয়তো হয়েছে। কিন্তু আদর্শের মুজিবের , আদর্শের পিতার যে মৃত্যু নেই তা কি ওই তষ্করেরা বুঝবে? বরং জীবিত মুজিবের চেয়ে মৃত মুজিব অনেক বেশি শক্তিশালী।

কারণ আদর্শের মৃত্যু নেই। যে আদর্শ একটি জাতির, একটি দেশের, একটি মানচিত্রের জন্ম দিয়েছে সে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু হতে পারেনা কখনো। এ যে অবিনাশী।

আজ খ্যাতিমান করি অন্নদাশংকর রায়ের কথা মনে পড়ে। অন্নদাশংকর রায়ের জন্মদিন ছিল গত ১৫ মার্চ। বাংলা ও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অসংখ্য কবিতা, অসংখ্য ছড়া, অনেক প্রবন্ধ , অনেক গবেষনা হয়েছে ও হবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অন্নদাশংকর রায়ের সেই বিখ্যাত কবিতাটি আজীবন অমর হয়ে থাকবে।

যতো কাল রবে পদ্মা যমুনা
গৌরী মেঘনা বহমান
ততকাল রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবুর রহমান।

কালজয়ী এই কবিতার স্রষ্টা অন্নদাশংকর রায়।

১৭ ই মার্চ। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০৭তম জন্মদিন। ১৯২০ সালের এই দিনে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ পরিবারে তাঁর জন্ম।

এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দিনটি এসেছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত ইন্টেরিম সরকার বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের ‘রাষ্ট্রীয় মর্যাদা’ ও সরকারি ছুটি বাতিল করে।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার বিগত ইউনুস সরকারের সেই সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। তাই গত বছরের মতো এবারও দিবসটি সরকারিভাবে উদযাপন হচ্ছে না। সেই সঙ্গে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দিনটি ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবে পালিত হলেও সেই আয়োজন হচ্ছে না।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনসহ পাকিস্তানি সামরিক শাসনবিরোধী সব আন্দোলন-সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এসব কারণে বারবার কারাগারেও যেতে হয় তাঁকে।

মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি স্বায়ত্তশাসন তথা বাঙালির মুক্তির সনদ ঐতিহাসিক ছয় দফা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক জেনারেল আইয়ুব খান তাঁকেসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করে কারাগারে পাঠান। ৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবকে কারামুক্ত করে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

১৯৭১ সালের মার্চে নজিরবিহীন অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন বঙ্গবন্ধু। ওই বছর ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে ঐতিহাসিক ভাষণে তিনি বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন– ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম; এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’।

এ ভাষণে সেদিন স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়ে ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতিকে দিকনির্দেশনা দেন তিনি।

একাত্তরের ২৫ শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাসভবন থেকে ওয়্যারলেসে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এরপর বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে নেওয়া হয়। ৯ মাসের যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির পর বীর বাঙালি একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশে ফেরেন বঙ্গবন্ধু। সদ্য স্বাধীন দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে নিজ বাসভবনে ঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হন।

স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, সাম্য ও বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় অবিস্মরণীয় ভূমিকার জন্য বঙ্গবন্ধু ‘জুলিও কুরি’ পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া বিবিসির এক জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি নির্বাচিত হন তিনি। গত বছরের মতো এবারও বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ঘিরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মসূচি পালনের সুযোগ পাচ্ছে না। তবে আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ এবং ই-মেইলে দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করেছে।

কিন্তু হে পিতা তোমার সৃষ্ট বাংলাদেশে আবারো একাত্তরের সেই শকুন-হায়েনাদের থাবা। পাকিস্তানী প্রেতাত্মারা এখন আরো বেশি নখর বিস্তার করেছে। মুক্তি চায় তোমার গড়া বাংলাদেশ।

একটি পাকি-রাজাকার ও নব্য রাজাকার মুক্ত স্বদেশ মাতৃভূমির অপেক্ষায় বাংলাদেশ। জন্মদিনে অভিবাদন হে জনক।

# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *