২০২৪ এর ৮ আগষ্ট থেকে শুরু করে ২০২৬ এর ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৫৯ দিন যে ইউনুসীয় দানব এই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটিকেই গ্রাস করে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে সেই দানবের বিচারের দাবিতে বাংলার মানুষ সোচ্চার হতে শুরু করেছে।

সাধারণ মানুষ যেন আপাতত কিছুটা হলেও নিঃশ্বাস নিতে পারছে। ইউনুসীয় দুঃশাসনের যে জগদ্দল পাথর চেপে বসেছিল তা কিছুটা হলেও যেন সরেছে। কিন্তু যে সীমাহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গেছে এই ইউনুস দানব তা থেকে সত্যিকারভাবে কি উত্তরণ ঘটবে এই দেশের?

এখন বিচার চাইছে মানুষ ইউনুসীয় সন্ত্রাসের-অপশাসনের। আদৌ কোন বিচার কি হবে এসব সীমাহীন দুষ্কর্মের? বিচারের দাবিতো উঠেছে অনেক আগেই নানা মহল থেকে। কিন্তু কে করবে এর বিচার? সে প্রশ্নই দেখা দিয়েছে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে যে সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ক্ষমতা নিয়েছে তারা কি আদৌ সেই বিচারের উদ্যোগ নেবেন? নাকি তাদের পক্ষে নানা সীমাবদ্ধতায় তাদের পক্ষে সেদিকে এগোনোটিই দায় হয়ে পড়বে?

কারণ নানাভাবেই ইউনুস তার বিশ্বস্ত এজেন্ট রেখে দিয়েছেন সরকার থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন জায়গায়। যেসব এজেন্ট ইউনুসের এতদিনকার নানা নীলনকশা বাস্তবায়নে সহায়তা করেছে তারা কি স্বস্তিতে থাকতে দেবে তারেক রহমানের সরকারকে?

ইউনুসের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ছিলেন আমেরিকান নাগরিক রজার রহমান বা খলিলুর রহমান। যিনি সবসময়েই বাংলাদেশের স্বার্থ নয় , আমেরিকার স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। নানামুখী আলোচনা-সমালোচনা রয়েছে তাকে নিয়ে।

সেই বিদেশী নাগরিক খলিলুর রহমানকেই আবার এখনকার বিএনপি সরকার তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে বসিয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার তুলনায় অত্যন্ত তরুণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কি বুঝে মহা ধুরন্ধর খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করলেন তা একমাত্র তিনিই জানেন।

তো এই আমেরিকান বশংবদ বা আমেরিকান এজেন্ট খলিলুর কি বাংলাদেশের স্বার্থ দেখবে না আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করবে তা আর নতুন করে বোঝানোর দরকার নেই বাঙ্গালিকে।

ইউনুসতো তার পক্ষের অত্যন্ত প্রভাবশালী লোক বসিয়েই রেখেছে বিএনপি’র সরকারের মধ্যে। তো ইউনুসের নানা দুষ্কর্মের বিচার কি হতে পারবে? নাকি কেউ করার সাহস করবে?

যে মার্কিন ‘ডিপস্টেট- জামায়াত- সেনা- জঙ্গী নীলনকশা’র মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দল আওয়ামীলীগ ও শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশছাড়া করা হলো চব্বিশের ৫ আগষ্ট সে অপশক্তিতো এখনো বিদ্যমান। তাহলে কে কার বিচার করবে ?

এক ভয়ংকর ভন্ড-প্রতারক- অর্থলোভী এক নরপিশাচ ইউনুস যে শান্তিতে নোবেল পেয়েছিল সেটি ভাবতেই গা রি রি করে ওঠে এখনো। একসময়ে ছোট বাচ্চাদেরকে ভয় দেখিয়ে ঘুম পাড়ানোর জন্য একটি ছড়া বেশ প্রচলিত ছিল- “বর্গি এল দেশে” ছড়াটি। কি ছিল সেই লোক ছড়াটিতে একটু দেখে নেই আমরা–

খোকা ঘুমালো, পাড়া জুড়ালো
বর্গি এল দেশে
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দেব কিসে।।
ধান ফুরল, পান ফুরল
খাজনার উপায় কি?
আর ক’টা দিন সবুর কর
রসুন বুনেছি।।
ধনিয়া পিয়াজ গেছে পচে
সর্ষে ক্ষেতে জল
খরা-বন্যায় শেষ করিল
বর্ষ এর ফসল।
ধানের গোলা, চালের ঝুড়ি
সব শুধু খালি
ছিন্ন কাপড় জড়িয়ে গায়ে
শত শত তালি
ধানের গাছ, বিলের মাছ
যাই কিছু ছিল
নদীর টানে বাঁধটি ভেঙ্গে
সবই ভেসে গেল।
এ বারেতে পাঁচ গাঁয়েতে
দিয়েছি আলুর সার
আর কটা দিন সবুর করো
মশাই জমিদার।

তবে সেই বর্গি’রাও নিশ্চয়ই আমাদের ইউনুসের মত খারাপ দানব ছিলনা।

তার মতো এমন ভন্ড- প্রতারক- জোচ্চোর- জালিয়াত মাষ্টার বোধ হয় বাঙ্গালী আর পায়নি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে অদ্যাবধি বাঙ্গালি জাতির জন্য এমন দুঃশাসন আর দুঃখও এ দেশের মানুষের জন্য আসেনি। এটি অত্যস্ত নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

কি সুন্দর সুন্দর সরল কমেডিয়ানের মত বুলি তার ! হাত নেড়ে নেড়ে নানা অঙ্গভঙ্গিতে জাতিকে স্বপ্ন দেখানোর নামে চরম জোচ্চুরি করেছে। আর এর মধ্য দিয়েই নিজের আখের গুছিয়ে নিয়েছে। সামনে আরো গুছানোর ধান্ধায় আছে। সেজন্য নানা পথ করে রেখেছেন তিনি ইতিমধ্যেই।

গত চব্বিশের আট আগষ্ট কথিত গালভরা শব্দ ‘ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট বা অন্তবর্তী সরকার’ এর সময় পুরো সরকারটিকেই ‘ইসলামী জঙ্গী-সেনা ও এনজিও সরকার’ বানিয়ে ফেলেছিল।

তার এই ইন্টেরিম গভর্নমেন্টই ছিল অর্ধেকটাই এনজিও কর্মকর্তায় ভরা। এরমধ্যে তার তার নিজের গ্রামীন ব্রান্ডেরই আধিক্য ছিল এনজিও কর্মকর্তায় মধ্যে, ছিল নিজের ফাইপো। দেশের তরুণ-যুবাদেরকে কথিত কোটাবিরোধী আন্দোলন করিয়ে নিজেই কোটা লালন-পালন করেছেন ইচ্ছেমতো। একটু দেখে নেয়া যাক এই ভন্ড প্রতারকের কিছু দুস্কর্মের খতিয়ান।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে যে নাটকীয় এবং অস্বচ্ছ পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে তা নিঃসন্দেহে ইতিহাসের এক চরম অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়। গণতান্ত্রিক শাসন, জবাবদিহিতা, ও স্বচ্ছতার যে স্বপ্ন জাতি দেখেছিল, বাস্তবে তা রূপ নিয়েছে একটি সুপরিকল্পিত ‘দখল প্রক্রিয়ায়’।

পর্দার আড়ালে কেউ কেউ রাষ্ট্রযন্ত্রের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন যার অন্যতম রূপকার ড. মুহাম্মদ ইউনুস।

সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক মহলে একাধিক নাম উচ্চারিত হচ্ছে আসিফ, মাহফুজ, নাহিদ, সারজিস, হাসনাত—যেন সকল অনিয়ম ও অশুভ পরিকল্পনার দায়ভার তাদের কাঁধেই বর্তায়।

কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, এরা কেবল পুতুল মাত্র। আসল চালক, মূল দিকনির্দেশক আর সুবিধাভোগী ব্যক্তিটি হলেন ড. ইউনুস স্বয়ং।

তিনি রাষ্ট্রের ভিতরে ভিতরে এমন কিছু সুবিধা গ্রহণ করেছেন, যা একাধারে নজিরবিহীন এবং গভীরভাবে দুর্নীতিপূর্ণ। এই ঘটনাপ্রবাহ দেখলে প্রশ্ন উঠে এটি কি কেবল দক্ষতা, নাকি একটি সুগভীর দুর্নীতির নীলনকশা?

নিজের মামলাগুলো ‘অদৃশ্য হাতে’র ক্ষমতাবলে খারিজ করিয়ে ফেলেছেন এই অঘটন ঘটানোতে পটিয়সী ইউনুস। তার কিবরুদ্ধে অর্থপাচার, শ্রম আইন লঙ্ঘনসহ একাধিক মামলায় অভিযুক্ত থাকা সত্ত্বেও, ড. ইউনুস অল্প সময়ের ব্যবধানে সব মামলা খারিজ করিয়েছেন। যেখানে সাধারণ নাগরিকদের বছরের পর বছর কোর্টে ঘুরতে হয়, সেখানে তার মামলাগুলো মুহূর্তেই উধাও!

৬৬৬ কোটি টাকার কর ‘মওকুফ’! কত টাকার মালিক হলে তার কর হতে পারেন ৬৬৬ কোটি টাকা? একবার ভাবুনতো! গ্রামীণ ব্যাংকের বিপুল অংকের বকেয়া কর মওকুফ করে তিনি প্রমাণ করেছেন, ক্ষমতার অপব্যবহারে তার জুড়ি নেই।

শুধু কি তাই? আগামী ৫ বছরের কর মওকুফ নিশ্চিত করেছেন। রাষ্ট্রীয় কোষাগারে আঘাত করে ভবিষ্যতের আয়ও করমুক্ত করে নেওয়া হয়েছে, যা পূর্ববর্তী কোনো সরকারের আমলে সম্ভব হয়নি।

গ্রামীণ ব্যাংকে সরকারের মালিকানা কমিয়ে ২৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে সরকারের অংশীদারিত্ব। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ গিয়েছে ‘নামহীন’ প্রাইভেট শক্তির হাতে।

নিজের প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ এর নামে গ্রামীণ ইউনিভার্সিটির অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন এরই মধ্যে।

মূলত ষ্ট্রীয় চ্যানেল ব্যবহার করে ব্যক্তি-ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ যার মূল উদ্দেশ্য জাতি নয়, একক প্রচার।

এসব করেও তার পেট ভরেনি। আদম বেপারিতেও নাম লিখিয়েছেন ইতিমধ্যে। জনশক্তি রপ্তানিতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ করার পথ তৈরী করেছেন। গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিসেসের মাধ্যমে শ্রমবাজার দখলের পথ প্রশস্ত হয়েছে, যেখানে নিয়ন্ত্রণ যাবে ইউনুস-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর হাতে।

ডিজিটাল ওয়ালেট অনুমোদনের মাধ্যমে ডিজিটাল লুট করার ব্যবস্থাও করে রেখেছেন ইতিমধ্যে। গ্রামীণ টেলিকম পেয়েছে ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি, যা দেশের আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় একচেটিয়া আধিপত্য নিশ্চিত করবে।

কোনো টেন্ডার বা প্রতিযোগিতা ছাড়াই সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৭০০ কোটি টাকার সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলের অর্থ ট্রান্সফার করা হয়েছে গ্রামীণ ট্রাস্টে। মানে সরাসরি রাষ্ট্রীয় টাকা চুরি।

এসব ঘটনা এখন আর গুজব নয় সরকারি গেজেট, বোর্ড সভার কার্যবিবরণী, আদালতের রায় এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই এসবের সত্যতা মেলে। অতএব, কিছু জুনিয়র কর্মকর্তা কিংবা অল্পবয়সী উপদেষ্টাদের দোষ দিয়ে মূল অপরাধীকে আড়াল করা মানে জাতিকে ধোঁকা দেওয়া।

সময় এসেছে সরাসরি প্রশ্ন করার রাষ্ট্রযন্ত্র কি এখন ‘গ্রামীণ যন্ত্রে’ পরিণত হয়েছে?

এই আগ্রাসন কি নিছক সুযোগ নেওয়া? নাকি এর পেছনে রয়েছে আন্তর্জাতিক এজেন্ডা ও বহুজাতিক দাতাদের চাপ? সবচেয়ে বড় কথা বাংলাদেশ কি এক ব্যক্তির উচ্চাশা, আন্তর্জাতিক লবি আর এনজিওতন্ত্রের পাঁকে তলিয়ে যাবে?

একটু পেছনের দিকে তাকালে দেখতে পাবো- ১৯৭১ সালে বিদেশে ছিলেন তিনি,দেশের জনগণ যখন মহান মুক্তিযুদ্ধের মহাসংগ্রামে লিপ্ত,তখন উনি ব্যস্ত বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রী নিতে।

জীবনে কোনোদিন অন্যায় অত্যাচার অবিচারের বিরুদ্ধে উনি সোচ্চার হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছেন? প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ – রাজনীতিবিদ ডঃ শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যাকাণ্ডের পরে ড: ইউনূসের ন্যক্কারজনক নীরবতা জনমানসে প্রশ্ন তোলে। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরে নীরব ছিলেন,স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সময় নীরব ছিলেন,কানসাট হত্যাকান্ড, উদীচী হত্যাকান্ড, ২০০৪ এর ২৪ আগষ্ট আওয়ামীলীগের সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা সহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সময় ইউনূস সাহেবের নীরব অবস্থান এটাই প্রমাণিত করে যে,উনি নিজের ব্যক্তিগত লোভ-লালসা পরেন ছাড়া জীবনে আর কোনকিছু দেখার প্রয়োজন বোধ করেননি।

গ্রামীন ব্যাংকে নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখার জন্য এই ক্ষমতালোভী ইউনূস শিক্ষিত পুরুষ কর্মচারীদের ডিরেক্টর বানানোর বদলে ডিরেক্টর বানিয়েছেন তারই ব্যাঙ্কের ঋণ-প্রাপ্ত অল্পশিক্ষিত ও অশিক্ষিত নারী ঋণগ্রহীতাদের। এতে একসাথে অনেক উদ্দেশ্যই সাধন করা যায়। নিজের এমডি পদটি আজীবনের জন্য অক্ষুণ্ণ থাকে।

কোন প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হতে হয়না আবার,বহির্বিশ্বে এটাও প্রচার করা যায় যে –দেখো, আমি কত জনদরদী – নারীদরদী- দরিদ্র-হিতৈষী, পাশাপাশি আমি সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ।

# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী সংগঠক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *