১৯৭১ থেকে ২০২৬। মাঝখানে দীর্ঘ ৫৫টি বছর পার হয়ে গেলো। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ, ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রম গেল। পাশাপাশি এক কোটি মানুষ দেশান্তরী হওয়াসহ নানা আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত এ বাংলাদেশে এখনো নানা বিতর্ক তৈরী করা হচ্ছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে এখনো অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হচ্ছে রাজনৈতিক বিতর্ক। এসব অনাকাঙ্ক্ষিক বিষয় কখনোই যে ভালো ফলাফল বয়ে আনেনা তা আমাদের দেশের রাজনৈতিক দল ও দলগুলোর নেতারা বুঝতে চান না। আসলে চান না বললে ভুল হবে।
কারণ তারা জেনে বুঝেই এ বিতর্ক জিইয়ে রাখতে চান। আর বিএনপি বার বার এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে বরং তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকেই খাটো করছে।
এসব বিষয় নিয়ে লেখার বা আলোচনার একদমই ইচ্ছে ছিলনা। কিন্তু এরই মধ্যে ছোট্ট একটি খবর দেখলাম পত্রিকায়। তা হলো- ঝিনাইদহের মহেশপুরে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার ঘোষক ও বীর উত্তম শহীদ জিয়াউর রহমানের নাম না নেওয়ায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনুষ্ঠান বর্জন করে বিএনপি।
গত ২৬মার্চ বৃহস্পতিবার সকালে মহেশপুর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আয়োজিত স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে।

প্রথম আলো পত্রিকার খবর অনুযায়ী বিএনপির স্থানীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন, গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে ইউএনও খাদিজা আক্তার তাঁর বক্তব্যে স্বাধীনতার ঘোষক ও বীর উত্তম শহীদ জিয়াউর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নাম কখনো উল্লেখ করেননি।
এর প্রতিবাদে তাঁরা অনুষ্ঠান বর্জন করে প্রতিবাদ করেন এবং বিএনপি নেতারা এ ঘটনার প্রতিবাদে ঝাড়ুমিছিল কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
পরে ইউএনওকে বদলির খবর পেয়ে (কারণ গত ২৫ শে মার্চ তাঁকে ওই উপজেলা থেকে বদলির আদেশ জারী হয়েছিল) ঝাড়ুুমিছিল বাদ দেন। তবে প্রতিবাদ সমাবেশ করে উপজেলা ও পৌর বিএনপি।
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার সদ্য বদলী হওয়া ইউএনও খাদিজা আক্তার তাঁর প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেছেন, স্বাধীনতার ঘোষক হিসাবে সংবিধানে অন্য একজনের নাম রয়েছে, সেটা আগে পরিবর্তন করতে হবে।
স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে তিনি জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলতে রাজি হননি। এই তরুণ নারী সরকারি অফিসারকে স্যালুট জানাতেই হয়।
আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার বীরউত্তম জিয়াউর রহমানকে জোর করে স্বাধীনতার ঘোষক বানাতে গিয়ে বিএনপি মরণ ডেকে আনবে।
বিএনপির কোন নেতা,পাতি নেতা কোথাও কোন বইপুস্তকে দেখাতে পারবেন কি জিয়াউর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় নিজেকে কখনও স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেছেন?
আপনারা তাঁকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে ধুলায় লুটিয়ে দিচ্ছেন কেন? তাঁর যতটুকু অবদান আছে সেটাকে কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু বিএনপি তাঁর মর্যাদাহানি করতে উঠে পড়ে লেগেছে।

কথায় বলেনা- গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল। বিএনপি’র হয়েছে সেই দশা।
প্রশ্ন উঠেছে বিএনপি কি এবার তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সংবিধান সংশোধন করে সংবিধানে তা প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেবে?
কারণ সংসদে তাদের দুই তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। এক্ষেত্রে তারা বিরোধী দল জামায়াতেরও সহযোগিতা নিতে পারে। এত অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা।
কারণ জামায়াতও চাইবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নিশানা মুছে ফেলতে। তাই বিএনপিকে এ বিষয়ে তারা সহযোগিতা করবে নিঃসন্দেহে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে শুধু বাংলাদেশেই নয় বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক, ইতিহাসবিদ ও গবেষকগণ নানা গবেষণা করেছেন।
প্রচুর বই-গবেষণাপত্র বের হয়েছে। যা বিভিন্ন বড় বড় লাইব্রেরীতে তা সযতনে সংরক্ষিত আছে। বিদেশে না গেলেও চলবে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন লাইব্রেরীতেই রয়েছে- “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র” নামে বিশাল বইয়ের ১৫ টি খন্ড।
তবে কিছু অকালকুষ্মান্ড মুক্তিযুদ্ধের এই ঐতিহাসিক গবেষণাগ্রন্থকে ‘আওয়ামী বয়ান’ বলে প্রত্যাখান করতে চায় । প্রতি বছর মার্চ ও ডিসেম্বর এলে খোদ বিএনপিও কী বলবে, কী করবে তা বুঝতে না পেরে ইতিহাস নিয়ে বলতে গিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা করে ফেলে। এরা যে বিভ্রান্ত নয় তা বেশ বুঝতে পারি। কারণ তারাও সত্যিটা জানে। কিন্তু জিয়াকে বড় করতে তাদের আপ্রাণ চেষ্টা।
সে ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ানো নেতা ও বিএনপি পন্থী বুদ্ধিজীবীদের জন্য বলি- এই ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ প্রণীত হয়েছিল প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলে। চূড়ান্ত হয়েছিল জিয়ার সময়ে, তবে প্রকাশ হয়েছিল এরশাদের শাসনামলে। কাজেই সেখানে আওয়ামী লীগের কিছুই করণীয় ছিল না।
আপনারা ‘আওয়ামী বয়ান’ নয়, আপনাদের আমলে করা ইতিহাসের সে দলিলটিকে অন্তত অনুসরণ করুন। নাহলে নিজেরাই লজ্জা পাবেন।
কবি- সাংবাদিক- গবেষক হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র” বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস চর্চায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭৭ সালে, যখন জিয়াউর রহমান দেশের রাষ্ট্রপতি, বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে “মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখন ও মুদ্রণ প্রকল্প” গঠিত হয়।

কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজুর রহমানকে এই প্রকল্পের পরিচালক নিযুক্ত করা হয়েছিল।
তাঁরই নেতৃত্বে একটি নয় সদস্যের বিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি এবং একটি দক্ষ গবেষণা দল দীর্ঘ পরিশ্রমের মাধ্যমে এই দলিলপত্রগুলো সংগ্রহ ও বিন্যাস করেন। পুরো সংকলনটি মোট ১৫টি খণ্ডে বিভক্ত।
প্রতিটি খণ্ডে মুক্তিযুদ্ধের ভিন্ন ভিন্ন দিক ও সময়কাল নিয়ে নথিপত্র সাজানো হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাসের নানা দিক নিয়ে গবেষণা করেই এই বই রচিত হয়েছে। ১ম – ৩য় খণ্ড: পটভূমি (১৯০৫-১৯৭১) এবং অসহযোগ আন্দোলন।
৪র্থ – ৬ষ্ঠ খণ্ড: প্রবাসী সরকার, মুজিবনগর সরকারের কর্মকাণ্ড এবং বিদেশের গণমাধ্যম ও জনমত। ৭ম খণ্ড: পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর নৃশংসতা ও নির্যাতন। ৮ম খণ্ড: গণহত্যা, শরণার্থী এবং নারী নির্যাতনের চিত্র।
৯ম – ১১শ খণ্ড: সশস্ত্র সংগ্রাম, সেক্টরভিত্তিক যুদ্ধের বিবরণ এবং মুক্তিবাহিনীর বীরত্বগাথা। ১২শ – ১৫শ খণ্ড: আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া, ভারতের ভূমিকা, পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র এবং যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়।
যারা ইতিহাসকে বিকৃত করতে চান তাদের উদ্দেশ্যে বলি- এটি কোনো একক ব্যক্তির লেখা ইতিহাস নয়, বরং তৎকালীন সরকারি গেজেট, চিঠিপত্র, সংবাদপত্রের কাটিং, সাক্ষাৎকার এবং দাপ্তরিক নথির সংকলন।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক এড়াতে এবং তথ্যের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে এই দলিলপত্রগুলো প্রধান রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এখানে প্রায় ৩,৫০০ জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষাৎকার এবং কয়েক হাজার দুর্লভ আলোকচিত্র ও মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯৮২ সাল থেকে এই খণ্ডগুলো প্রকাশিত হতে শুরু করে।
পরবর্তীতে হাক্কানী পাবলিশার্সসহ বিভিন্ন প্রকাশনী এবং সরকারিভাবেও এটি নতুন করে মুদ্রণ করা হয়েছে।
এই সংকলনের ৩য় খণ্ডে (অসহযোগ আন্দোলন ও স্বাধীনতার ঘোষণা) ২৬ মার্চের ঘটনাবলী এবং স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত দলিলগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দলিলে উল্লেখ আছে যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে (অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে) পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণের মুখে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন।

পরবর্তীতে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমানসহ অন্যান্যদের দেওয়া ঘোষণার অনুলিপিও এই সংকলনে স্থান পেয়েছে।
তবে দলিলে এটি স্পষ্ট যে, মূল ঘোষণাটি বঙ্গবন্ধুর নামেই প্রচারিত হয়েছিল এবং অন্যান্যরা তাঁর পক্ষে ঘোষণা পাঠ করেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে এই সংকলনের বিভিন্ন খণ্ডে (বিশেষ করে ৮ম ও ১৫শ খণ্ডে) তথ্য রয়েছে। সরকারি নথিপত্র এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের বরাতে “৩০ লক্ষ শহীদ” হওয়ার বিষয়টি এই দলিলের বিভিন্ন স্থানে গুরুত্বের সাথে উল্লিখিত হয়েছে।
বিশেষ করে দখলদার বাহিনীর নৃশংসতা এবং গণহত্যার খণ্ডগুলোতে এই ব্যাপক প্রাণহানির চিত্র ফুটে উঠেছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে এই সংকলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
২য় খণ্ডে এই ভাষণের পূর্ণাঙ্গ পাঠ বা টেক্সট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দলিলের বর্ণনা অনুযায়ী, ৭ মার্চের ভাষণ ছিল অসহযোগ আন্দোলনের চূড়ান্ত দিকনির্দেশনা এবং কার্যত স্বাধীনতার কৌশলগত ঘোষণা।
তৎকালীন গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং সংবাদপত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ভাষণের পরই বাঙালি জাতি সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে শুরু করে—এই ঐতিহাসিক সত্যটি এই সংকলনের নথিপত্র দ্বারা সমর্থিত।
সাংবাদিক-লেখক হাসান নাসির এ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন- স্বাধীনতার ঘোষণা চাট্টিখানি কথা না। স্বাধীনতার ঘোষণা মানে একটি দেশের জন্মের ঘোষণা। সেই ঘোষণাকে দিতে পারেন?
স্বাধীনতার ঘোষণা তিনিই দেবেন, যাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা হিসেবে সারা দুনিয়া চেনে। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র তাঁরই, যিনি নেতা।
নেতা ছাড়া অন্য কেউ এই ঘোষণা দিলেও তা স্বীকৃত হবে না। পলিটিক্যাল সায়েন্স বলে একটা সাবজেক্ট আছে না নাই ?
পৃথিবীর দেশে দেশে প্রতিটি সংগ্রামের একজন নেতা ছিলেন, থাকতেই হবে। কারণ, নেতা ছাড়া সংগ্রাম হয় না। সারাবিশ্ব ওই নেতাকে ছাড়া অন্য কাউকে চেনে না। তিনি যা বলবেন, সেটিই চূড়ান্ত কথা।
আন্দোলনে আরও অনেকেই থাকবেন কিন্তু নেতা একজনই। মুকুট থাকে একজনের মাথায়। সংগ্রাম ও যুদ্ধের শীর্ষ থেকে নানা পর্যায়ে অনেক নেতা, সেনাপতি থাকবেন।
তবে ঘোষণা দেবেন তিনিই, যিনি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা। এখানে বাইরে থেকে এসে গোল করার সুযোগ নেই।
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন ইয়াসির আরাফাত। যতদিন তিনি ছিলেন ততদিন পর্যন্ত আর কারও নাম পৃথিবীর ক’জন জানত?
সংগ্রামে আরও নেতা বা সেনাপতি নিশ্চয়ই ছিলেন। কিন্তু দুনিয়া তো তাঁদের চেনে না। তাই তাঁদের কোনো বক্তৃতা বা ঘোষণা থাকলেও তা সেভাবে স্বীকৃত হবে না। সবখানে, সবদেশেই একই হিসেব।
প্রধান নেতার অবর্তমানে নিশ্চয়ই দ্বিতীয়জন আসবেন। কিন্তু তাঁকেও সেই সংগ্রামের নেতা হতে হবে। কারণ, পৃথিবীর দেশে দেশে স্বাধীনতার সংগ্রাম মানেই রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং স্বাধীনতার যুদ্ধ মানেও রাজনৈতিক যুদ্ধ।
যুদ্ধ ও সংগ্রামে অনেকের অবদান অবশ্যই থাকবে। কারণ, একা একা আন্দোলন সংগ্রাম হয় না। কারো কারো অবদান অনেক বড়। যাঁর যা অবদান তা স্বীকার করতে হবে। কিন্তু প্রধান নেতাকে উপেক্ষা করে কিছু হয় না বরঞ্চ নেতার নামেই সব করতে হয়।
তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু, গ্রেট লিডার ও সুপ্রিম কমান্ডার” উল্লেখ করে তাঁরই পক্ষে ঘোষণা পাঠ করেছিলেন , এবং এটাই সঙ্গত।
এরমধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, জিয়াউর রহমান প্রথমে নিজের নামেই ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে সংশোধন করে শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ঘোষণা দেন।
তাহলে প্রশ্ন- এই সংশোধনের প্রয়োজন পড়ল কেন? করতে হয়েছে। আর সংশোধন করা মানে প্রথম ঘোষণা মূল্যহীন এবং বাতিল।
জিয়ার বেতার ভাষণকে “অখ্যাত মেজরের বাঁশির সুর” বা একেবারে গুরুত্বহীন বলে যে প্রচার আওয়ামী লীগ নেতারা করে থাকেন। আমি সবসময় এর বিরোধিতা করেছি। জিয়া অখ্যাত ছিলেন, এটা ঠিক। একজন মেজর তো অপরিচিতই থাকবেন, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু তাঁর ‘ঘোষণা’ তো গুরুত্বহীন নয়।
পাকিস্তান আর্মির একজন অফিসার হয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বেতারে কণ্ঠস্বর, এটি কি দুঃসাহসিক কাজ নয়? যুদ্ধে বিজয় না হলে জিয়ার কী হতো? হ্যাঁ, যুদ্ধের পরের ভূমিকা বা অবস্থান নিয়ে আলোচনা হতেই পারে।
নিরস্ত্র বাঙালির মধ্যে সাহস জোগানোর জন্য একজন আর্মি অফিসারের কণ্ঠস্বর দরকার ভেবেই মুজিবের পক্ষে জিয়াকে দিয়ে একটি ঘোষণা দেওয়ানোর প্রয়োজন ছিল। আর্মির সেই অফিসার অন্য কেউও হতে পারতেন।
এখানে “ঘোষণা দেওয়ানো” বলায় বিএনপির ভাইরা আপত্তি করতে পারেন। কিন্তু সত্য এটিই। জিয়াউর রহমান স্ব উদ্যোগে বেতারে গেছেন, এটি তো বলা যাবে না। এর কারণ, বেলাল মোহাম্মদ এবং ক’জন বেতারকর্মী যে বিশেষ ব্যবস্থায় বেতার সম্প্রচারের একটি ব্যবস্থা করেছেন, তা জিয়ার জানার কথা নয়।
২৭ মার্চ মেজর জিয়ার ঘোষণা জনগণকে সাহস দিয়েছে। যুদ্ধ বেগবান করতে এই ঘোষণার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনেক। তথাপি এটি স্বাধীনতার ঘোষণা না।
কারণ, স্বাধীনতার জন্য যে সংগ্রাম ও যুদ্ধ, তার কেন্দ্রীয় চরিত্র শেখ মুজিব। সেজন্যই বেতারে জিয়ার কণ্ঠ শোনা গেলেও পরদিনের দেশি-বিদেশি পত্রিকায় তা গুরুত্ব পায়নি, খবর আকারে আসেনি।

বরঞ্চ ২৬ তারিখের ঘোষণা নিয়ে ২৭ মার্চ বিদেশি প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলোর প্রথম পৃষ্ঠায় সংবাদ শিরোনাম ছিল- মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন, পূর্ব পাকিস্তানে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু।
জিয়াউর রহমান তো পরে রাষ্ট্রপ্রধান হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেও তো স্বাধীনতার ঘোষক দাবি করেননি। কারণ, তিনি এ বিষয়টি জানতেন। শুধু তা-ই নয়, মুজিবের প্রতি অশ্রদ্ধা হয়, এমন কথা জিয়ার মুখ থেকে শোনা যায়নি।
রাজনীতিতে নানা মত, পথ থাকবে। কিন্তু ইতিহাস নিয়ে যখন আলোচনা হয়, তখন দলীয় চশমাটা কিছুক্ষণের জন্য খুলে একপাশে রাখলেই ভালো। যাঁর যেখানে উপস্থিতি ও অবস্থান তাঁকে সেখানে রাখতে হবে। যথাযথ সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েও রাজনীতি করা যায়।
যারা ইতিহাসকে অস্বীকার করতে চান বা বিকৃত ইতিহাস তৈরী করে গোয়েবলসীয় কায়দায় নিজেদের নেতাকেই বাংলাদেশের স্রষ্টা করে ফেলতে চান তাদের জন্য করুণা হয়। দয়া করে ইতিহাসকে একটু একটু করে জানার চেষ্টা করুন। নাকি সেই যে দুষ্ট লোকেরা বলে থাকেন- ‘জানার কোন শেষ নাই, জানার চেষ্টা বৃথা তাই’ এমন নীতি অবলম্বন করছেন। দেখুন আপনারা যা ভালো বোঝেন।
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
