খাগড়াছড়ি: আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে নারীদের যৌন শোষণের দায়ে সন্তু লারমাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম (সিএইচটি) আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারণের দাবিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার কাছে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছে হিল উইমেন ফেডারেশন (এইচডাব্লিউএফ)।

খাগড়াছড়ি জেলার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে এই স্মারকলিপিটি প্রদান করা হয়।

এতে সন্তু লারমার স্ত্রী মিসেস শিপ্রা দেওয়ান কর্তৃক ১১ অক্টোবর ২০০৫ তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) তৎকালীন সহ-সভাপতির কাছে লেখা একটি চিঠি সংযুক্ত করা হয়েছে, যেখানে সন্তু লারমার বিরুদ্ধে নারীদের যৌন শোষণের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

 

সন্তু লারমার স্ত্রী মিসেস শিপ্রা দেওয়ানের সেই চিঠি অনুযায়ী, লারমা ১৯ জানুয়ারি ২০০৪ তারিখে কল্যাণপুরের সরকারি বাসভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে তাঁর অফিসের এক পিয়নের স্ত্রীকে যৌন হেনস্থা করেন।

এছাড়া তিনি ১১ জুন ২০০৫ তারিখে ঢাকার বনানীস্থ আঞ্চলিক পরিষদের রেস্ট হাউসে ওয়াচিংপু মারমাকে, ২৯ জুন ২০০৫ তারিখে একই গেস্ট হাউসে ইনু চাকমাকে এবং কুশি আক্তার নামের একজনকে বারবার বনানী রেস্ট হাউসে নিয়ে গিয়ে যৌন শোষণ করেন।

 

মিসেস শিপ্রা দেওয়ান সন্তু লারমার বিরুদ্ধে যৌন শোষণের বিনিময়ে কাজের চুক্তি (কন্ট্রাক্ট) প্রদানসহ দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগও উত্থাপন করেছিলেন।

এইচডাব্লিউএফ বিবৃতিতে জানায়, “গত ২৭ বছর ধরে সন্তু লারমা আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাঁর পদ ও ক্ষমতা ব্যবহার করে—যেমন চাকরির প্রলোভন, কাজের চুক্তি প্রদান, সম্পদ ও অলঙ্কার ক্রয় এবং বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে—তিনি ডজন ডজন আদিবাসী নারীকে কখনো সম্মতিতে আবার কখনো জোরপূর্বক বা প্রলোভন দেখিয়ে যৌন শোষণ করেছেন।

সন্তু লারমা তাঁর স্ত্রীকে চিরতরে মুখ বন্ধ রাখতে জোরপূর্বক ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

লারমা একজন ধারাবাহিক যৌন অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও কেউ তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না।”

এইচডাব্লিউএফ আদিবাসী নারীদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সহিংসতার বিষয়টিও তুলে ধরেছে।

এর মধ্যে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার সিঙ্গিনালা এলাকায় টিউশন থেকে ফেরার পথে ১২ বছর বয়সী এক আদিবাসী শিশুকে তিন সেটলার কর্তৃক গণধর্ষণের ঘটনা উল্লেখ করা হয়।

পুলিশ সব আসামিকে গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং বিচার দাবিতে আন্দোলনরতদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়ে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে গুইমারায় তিন বিক্ষোভকারীকে হত্যা করা হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন যৌন শিকারিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ তারিখে এক আদিবাসী ছাত্রীকে যৌন হয়রানির মামলায় আবুল হাসনাত মোহাম্মদ সোহেল রানা জেল খাটেন।

মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবার স্কুলে যোগ দিলে বিক্ষোভ শুরু হয়। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে আরেক আদিবাসী ছাত্রীকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টার পর পালানোর সময় রানার মৃত্যু হয়, যা জাতিগত দাঙ্গার এক ভয়াবহ রূপ নেয়।

এইচডাব্লিউএফ বলেছে, “আদিবাসী মেয়ে ও নারীরা আজ রাস্তায়, স্কুল প্রাঙ্গণে এমনকি আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার অফিস বা বাসভবনেও নিরাপদ নয়।”

নারী অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর কন্যা জাইমা রহমানের বক্তব্যের দ্বারা উৎসাহিত হয়ে হিল উইমেন ফেডারেশন আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করে নারী নির্যাতনের দায়ে সন্তু লারমাকে অপসারণ করা; মিসেস শিপরা দেওয়ানের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ২৭ বছরে আঞ্চলিক পরিষদের বিভিন্ন কাজের চুক্তি প্রদান, জনবল নিয়োগ এবং তহবিলের অপব্যবহার নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেয়া; পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসী নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেয়া; আর বাংলাদেশে নারী নির্যাতনের সকল মামলার দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *