ঢাকা: একাত্তর বড়ই রক্তাক্ত। বাংলার আনাচকানাচে শুধুই গণহত্যার সাক্ষী বহনকারী এক ইতিহাস। একটি স্বাধীন দেশের জন্মের আগে এবং পরেও যে কত রক্ত বয়েছিল, তার হিসেব নেই।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দোসররা (রাজাকার-আলবদর) পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি হিন্দুদের ওপর পরিকল্পিত গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও মন্দির ধ্বংসের মতো চরম নির্যাতন চালায়।

যুদ্ধের সময় ভারতে পালিয়ে যাওয়া প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর মধ্যে ৮০ শতাংশই ছিল হিন্দু।

এই সময় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়কে যুদ্ধের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। এবং হিন্দুরা এখনো ভয়াবহভাবে নির্যাতিত।

পাকিস্তানি বাহিনী হিন্দুদের “ভারতীয় এজেন্ট” হিসেবে গণ্য করত এবং তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঘরবাড়ি লক্ষ্য করে আক্রমণ চালায়।

বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের গণহত্যা করা হয় এবং নারীদের অপহরণ ও ধর্ষণের মতো অকথ্য নির্যাতন করা হয়। সারা দেশ রক্তাক্ত হয়ে ওঠে।

এবার ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে।

একজন মার্কিন আইনপ্রণেতা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন।

হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, বাস্তুচ্যুতির মতো নৃশংসতার কথা উল্লেখ করে অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার আহ্বান জানানো হয়েছে।

পিটিআই-এর তথ্যমতে, গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন, যেখানে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং এর সহযোগী সংগঠন জামাতে ইসলামীর দ্বারা বাঙালি হিন্দুদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতাকে ‘যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

উক্ত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সরকার শেখ মুজিবুর রহমানকে কারারুদ্ধ করে এবং এর সামরিক বাহিনী জামাতে ইসলামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত উগ্রপন্থী ইসলামী গোষ্ঠীগুলোর সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক একটি অভিযান শুরু করে, যার ফলে ব্যাপক হারে অসামরিক নাগরিকদের গণহত্যা সংঘটিত হয়।

প্রস্তাবে স্বীকার করা হয়েছে যে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের ইসলামপন্থী মিত্ররা ধর্ম বা লিঙ্গ নির্বিশেষে বাঙালি বংশোদ্ভূত মানুষের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়েছে, তাদের রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও শিক্ষার্থীদের হত্যা করেছে এবং হাজার হাজার নারীকে যৌন দাসত্বে বাধ্য করেছে।

প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে যে, তারা গণহত্যা, গণধর্ষণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তর এবং জোরপূর্বক বিতাড়নের মাধ্যমে নির্মূল করার জন্য বিশেষভাবে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দুদের লক্ষ্যবস্তু করেছিল।

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানায়।

এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর অভিযান শুরু করে।

এতে তৎকালীন ঢাকাস্থ মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাডের পাঠানো ঐতিহাসিক বার্তার উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে তিনি এই রক্তক্ষয়ী সহিংসতাকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

প্রস্তাবটির উদ্যোক্তারা মনে করেন, ঐতিহাসিক সত্য সংরক্ষণ ও ভবিষ্যতে যেকোনো স্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ রোধে এই স্বীকৃতি অবশ্যই অত্যন্ত জরুরি।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *