ঢাকা: বাংলাদেশের নদীতে এখন মাছ পাওয়া যায় না, লাশ পাওয়া যায়। দেশটা ২০২৪ এর পর রক্তাক্ত হয়ে গেছে। মানুষের বাসযোগ্য অবস্থায় নেই।

গত ২০ মাসে দেশের বিভিন্ন নদী থেকে ৯২০টি মরদেহ উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৫৪১টি এবং চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৩৭৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

এছাড়াও আরো কত যে আছে, তার তো কোনো হিসেবই নেই।

পরিচয়বিহীন মৃত্যু এবং জলাশয়ে মৃতদেহ ফেলে দেওয়ার ঘটনা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেই ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ২০ মাসে বাংলাদেশের বিভিন্ন নদী থেকে অন্তত ৯২০টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

রিভার পুলিশের নথিতে দেখা গেছে যে ২০২৫ সালে সারা দেশের নদীগুলো থেকে ৫৪১টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল এবং চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে আরও ৩৭৯টি মৃতদেহ পাওয়া গেছে।

৯২০টি এসব মরদেহের অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অপরাধের পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অপরাধবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মীরা।

এসব মৃত্যু কীভাবে ঘটেছে এবং মরদেহগুলো কোথা থেকে নদীতে ফেলা হয়েছে, তা নিয়ে তদন্তের জটিলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে।

অপরাধবিজ্ঞানী ও মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কা, কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্য স্থানে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হতে পারে। নদীর স্রোতে মরদেহ মূল ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে চলে যাওয়ায় হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত স্থান ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা শনাক্ত করা তদন্তকারীদের জন্য কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হলে তদন্তে বেশ কিছু জটিলতা তৈরি হয়। স্রোতের কারণে মরদেহ ভেসে গিয়ে মূল ঘটনাস্থল থেকে দূরে চলে যেতে পারে। এতে মরদেহ উদ্ধারের স্থান এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত স্থানের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।
ফলে ভুক্তভোগী কোথায় মারা গেছেন, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে এবং কারা এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন, সেসব বিষয় নিশ্চিত করতে তদন্তকারীদের অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়।

শুধু নদী থেকেই নয়, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্যও সামনে এসেছে।

মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) জানিয়েছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও অন্তত ৪২টি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে।

এসব মরদেহ নদীর তীর, সড়ক, রেললাইন ও মাঠসহ বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ধামরাইয়ের বংশী নদী থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও রয়েছে।

পুলিশ মরদেহটির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে। পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মরদেহটি অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয় বলে জানা যায়।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান বলেন, সংগঠনটির পর্যালোচনায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অন্য কোথাও হত্যার পর নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।

তাঁর মতে, এসব ঘটনার পেছনে বিভিন্ন ধরনের বিরোধ জড়িত থাকতে পারে। এর মধ্যে জমি, পারিবারিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে।

সাইদুর রহমান আরও বলেন, কোনো মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাটি অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করলেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। ব্যক্তিটির কীভাবে মৃত্যু হয়েছে এবং তার মৃত্যুর পেছনে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রয়েছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *