ময়মনসিংহ: বাউলগানও করা যাবে না এই দেশে। হাছন রাজার দেশে বাউল গান নিষিদ্ধ। ধর্ষণ সিদ্ধ। বুঝলেন তো?

বাউল গান অশ্লীল! বাউল শিল্পী অশ্লীল। কাঠমোল্লারা দেশটায় তাণ্ডব করছে ইচ্ছেমতো। বাউল শিল্পীদের পুড়িয়ে ফেলা যায় ইচ্ছে হলেই।

নেত্রকোনার মদনে ইমাম ও উলামাদের দাবির প্রেক্ষিতে বাউল গান পণ্ড করে দিয়েছেন উপজেলা পুলিশ প্রশানস, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ।

এই হচ্ছে সোনার বাংলাদেশ। এখানে বাঙালি সংস্কৃতি চলে না এখন। চলে কাওয়ালি, পাকিস্তানি রীতিনীতি।

শুনেছেন কখনো ইমাম উলামাদের মাদ্রাসায় ধর্ষণের বিরুদ্ধে একটা আওয়াজ দিতে? শুনবেন না। কারণ ওটা জায়েজ।

শুক্রবার রাতে উপজেলার হাসনপুর বাজারে স্থানীয় বেশ কয়েকজন যুবক বাউল গানের আয়োজন করে।

এলাকাবাসী ও আয়োজক কমিটি সূত্রে জানা যায়, ২১ মে ইমাম ও উলামা পরিষদ এর পক্ষে গান বন্ধের জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগ দায়ের করেন।

বিষয়টি নিয়ে ইমাম উলামা পরিষদ ও আয়োজক কমিটির সাথে দফায় দফায় বৈঠক বসে। শুক্রবার জুম্মার নামাজ পর বিষয়টি নিয়ে হাসনপুর জামে মসজিদে ইমাম, উলামা পরিষদ ও ফতেপুের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সদস্যবৃন্দ ও এলাকাবাসীর বৈঠক বসে৷

বৈঠকে ইউপি চেয়ারম্যান সামিউল হায়দার সফি তাদের দাবির কথা শোনেন।

পরবর্তীতে সকলের সিন্ধান্ত মোতাবেক বাউল গানের আসর একদম বন্ধ করে দেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আয়োজন কমিটির কয়েকজন জানান, আমরা কয়েকদিন আগে থেকেই বাউল গান আয়োজন করার প্রস্তুতি নেই। প্রস্তুতির শুরুতে কোন বাধা ছিল না। গত দুদিন থেকে তারা বাধা দিচ্ছে।

তবে এ আয়োজন করতে আমাদের প্রায় ২ লাখ টাকারমতো খরচ হয়েছে এই টাকা এখন কোথায় পাব? কে দিবে এই টাকা। এ নিয়ে তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে।

ফতেপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সামিউল হায়দার সফি জানান, ইমাম ও আলেমদের সুপারিশের প্রেক্ষিতে গান বন্ধ করা হয়েছে। তবে গানের চেয়ে আরও গুরুতর হল জুয়া,মাদক। আমরা চাই উনারাও যেন এ বিষয়েও প্রতিবাদ করেন।

ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানান লেখক তসলিমা নাসরিন।

তিনি ফেসবুকে লিখেছেন:

“বাংলার মাটি, বাংলার ঐতিহ্য, বাংলার বহু শতকের মানবতাবাদী সংস্কৃতির ওপর আবারও নেমে এসেছে নিষেধাজ্ঞার খড়্গ।
ইমাম উলেমা নামক সমাজবিরোধী উপদ্রপগুলো হঠাৎ জন্মায়নি।

এরা ল্যাবে তৈরি মারণভাইরাস কোভিডের মতো। চাষ করা বিষধর সাপের মতো, ডিমে তা দিয়ে ফোটানো টিরেক্সের মতো—এদের জন্ম দিয়েছে রাষ্ট্রের উদাসীনতা, রাজনৈতিক আপস, ভোটের হিসেব, এবং ধর্মীয় গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দেওয়ার নষ্ট সংস্কৃতি।

আজ তারা বাউল গান বন্ধ করছে। কারণ লালন, হাছন রাজা, শাহ আবদুল করিমের ধারার বাউল গান প্রশ্ন করতে শেখায়, মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়, স্বাধীনভাবে ভাবতে শেখায়, ধর্মের দেয়াল, জাতের দেয়াল, সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে মানবতার কথা বলে।

যারা সমাজের ভয়াবহ বাস্তবতা নিয়ে নীরব—শিশুনির্যাতন, শিশুধর্ষণ শিশুহত্যা নিয়ে নীরব, নারী নির্যাতন নিয়ে নীরব, দুর্নীতি, মাদক, অসাম্য, সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে নীরব—তারা আজ সংস্কৃতির প্রহরী সেজেছে।

বাংলার বাউল গানের বিরুদ্ধে তাদের এত তৎপরতা! যেন সমাজের সবচেয়ে বড় বড় হুমকি আজ বাউল, গান, শিল্প, সাহিত্য, উদারতা আর মানবতা।

সরকারগুলো বছরের পর বছর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের মতো নিজেদের হাতে ধর্মান্ধতার দানব সৃষ্টি করেছে। ধর্মান্ধতাকে প্রশ্রয় দিয়েছে, যুক্তিবোধকে দুর্বল করেছে, মুক্তচিন্তাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে।

এখন সেই দানবই, সেই ইসলামী দৈত্যই স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়ে সমাজকে গ্রাস করতে উদ্যত। সরকার মাথা নত করে দৈত্য দানবের সব দাবি মেনে নিচ্ছে।
আজ বাউল গান বন্ধ হয়েছে। কাল রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ হবে, পরশু দেশাত্মবোধক গান নিষিদ্ধ হবে।

তারপর সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র, ভাস্কর্য, নারীস্বাধীনতা, মতপ্রকাশ—সবকিছুর বিরুদ্ধে ফতোয়া নামবে। ইতিহাস বারবার এই শিক্ষা দিয়েছে—যখন সমাজ নীরব থাকে, তখন অসহিষ্ণুতা মাইলের পর মাইল দখল করে নেয়”।

তিনি বলেন, “দেশ কি তবে এমন জায়গায় পৌঁছচ্ছে, যেখানে লালনের গান নিরাপদ নয়, কিন্তু ঘৃণার ভাষণ নিরাপদ ? যেখানে মানবতার গান বন্ধ হবে, কিন্তু অসহিষ্ণুতার মাইক অবাধে বাজবে? যে সমাজ বাউলকে ভয় পায়, সে সমাজ আসলে গানকে নয়—প্রশ্নকে ভয় পায়, মুক্তচিন্তাকে ভয় পায়, স্বাধীনতাকে ভয় পায়”।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *