ঢাকা: আপনিও জানেন আমিও জানি, জানে এই গোটা দেশটা যে- একজন নিষ্পাপ সন্ন্যাসীর চোখের পানি কোনোদিন বিফলে যায় না। একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের হৃদয়ের আকুতি অভিশাপ হয়ে আসবে।

দেশটা তো অভিশাপগ্রস্ত হয়েই গেছে। এই মানুষগুলোর চোখের পানি বৃথা যাবে? প্রকৃতির প্রতিশোধ ভয়ঙ্কর হয়।

গতকাল চিন্ময় প্রভুর কান্নায় দেখে কোনো মানুষ চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। কাঁদতে কাঁদতে ছোট হয়ে গেছেন চিন্ময় প্রভু।

মৃত্যুর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ্য করে এক ভিডিও বার্তায় নিজের  সন্তানের মুক্তির আকুতি জানিয়েছিলেন চিন্ময় কৃষ্ণদাসের মা সন্ধ্যা রাণী ধর।

সন্তানকে একটু বুকে জড়িয়ে ধরে শান্তি পেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই নিষ্ঠুর রাষ্ট্র তা দেয়নি। তারেকের সরকার পারলো এই কাজটা করতে!

ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছিলেন, “তারেক বাবা, আপনার কাছে আমার একটা অনুরোধ রয়েছে। আজ ছয় মাস হয়ে গেছে। তুমি সরকারে বসার পর আমরা সবাই আশা করেছিলাম, চিন্ময়কে বের করে দেবে। একটু চিন্তা-ভাবনা করে আমার ছেলেকে আমি থাকা অবস্থায় যদি বের করে দিতে পারো, তাহলে নিজের চোখে দেখে যেতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে বাবা।”

ছেলেকে একবার মুক্ত অবস্থায় দেখার সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই কারাগারে থাকা চিন্ময় কৃষ্ণদাসকে দেখতে প্যারোলে মুক্তির আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু মায়ের সেই শেষ ইচ্ছা আর পূরণ হলো না।

কারণ প্রশাসন জানায়, অসুস্থ আত্মীয়
দেখার জন্য প্যারোলের বিধান নেই—শুধু মৃত্যুর পর শেষকৃত্যে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকতে পারে। ফলে আবেদন মঞ্জুর হয়নি।

আর বৃহস্পতিবার সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন চিন্ময় কৃষ্ণদাসের মা সন্ধ্যা রাণী ধর।

মৃত মাকে দেখতে দেয়া এই রাষ্ট্র, মৃত্যুপথযাত্রী মাকে নয়।

বিকেল ৪টার দিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে মুক্তি দেওয়া হয়। বিশেষ নিরাপত্তায় তাঁকে পুণ্ডরীক ধামে নিয়ে যাওয়া হয়।

মায়ের মরদেহ দেখে চিন্ময় অঝোরে কেঁদে ওঠেন। যে মা মৃত্যুর আগে ছেলেকে একবার মুক্ত অবস্থায় নিজের চোখে দেখে যেতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই মা ছেলেকে দেখতে পারলেন না। আর কখনো দেখবেন না নিজের চোখে।

মায়ের শেষকৃত্য শেষে প্যারোলের মেয়াদ শেষ করে রাত ৮টার দিকে তিনি কারাগারে ফিরে যান।

এই ঘটনায় সরকারকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন তসলিমা নাসরিন।

তিনি বলেন, “এই রাষ্ট্র কি এতটাই নিষ্ঠুর হয়ে গেছে যে একজন মা মৃত্যুর আগে ছেলের মুখ দেখতে চাইলে সেই চাওয়াটুকুও রাষ্ট্রের কাছে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে?
এতটাই ভীত?

এতটাই প্রতিহিংসাপরায়ণ?
এতটাই বিবেকশূন্য?
ছিঃ, বাংলাদেশ রাষ্ট্র।
ছিঃ, এই নিষ্ঠুর প্রশাসন।
ছিঃ, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের, যে একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের শেষ আকুতির সামনেও নির্বিকার থাকতে পারে।

একজন জীবিত মায়ের কাছে তাঁর সন্তানকে পৌঁছে দিতে পারেননি আপনারা। এখন আর কোনো ব্যাখ্যা, কোনো বিধি, কোনো সরকারি বিবৃতি এই দায় ধুয়ে দিতে পারবে না।

সন্ধ্যা রাণী ধর মারা গেছেন। তাঁর শেষ ইচ্ছাটিও তাঁর সঙ্গে মারা গেছে। কিন্তু ছেলেকে শেষবার দেখতে না-পাওয়ার এই নিষ্ঠুরতা তারেক রহমান সরকারের গায়ে রাজনৈতিক ও নৈতিক কলঙ্ক হয়ে থেকে যাবে।

(জীবিত মাকে দেখতে প্যারোল দেওয়া হয়নি। মা মারা যাওয়ার পর তাঁর শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার জন্য চিন্ময়কে পাঁচ ঘণ্টার প্যারোল দেওয়া হলো। এর চেয়ে নির্মম রাষ্ট্রীয় ব্যঙ্গ আর কী হতে পারে?”)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *