ঢাকা: একজন বাঙালি লেখক, যিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোসহীন যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন তাঁর কলমের মাধ্যমে, তিনি তসলিমা নাসরিন।
চিকিৎসক, নারীবাদী, ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদী তসলিমা নাসরিন।
তাঁর কলাম ও গ্রন্থে নারীদের নিপীড়ন ও ধর্মের সমালোচনা নিয়ে লেখার জন্য পরিচিত।
কিন্তু বাঙালি হলেও বাংলাদেশে তথা নিজের দেশে তাঁর ঠাঁই নেই। কারণ মৌলবাদীদের গালে সপাটে চড়টা তিনি মেরেছিলেন।
এই লেখিকা প্রায় তিন দশক ধরে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।
নিজের দেশ, বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। তারপর থেকে আর নিজের দেশে ফিরতে পারেননি তিনি।
১৯৯৩ সালে তসলিমা লেখেন ‘লজ্জা’ নামের একটি উপন্যাস। তারপরেই তাঁকে নিয়ে আরও বিতর্ক শুরু হয়। তাই অন্য কোনও পথ না পেয়ে তসলিমা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। পরে দেশে ফেরার জন্য চেষ্টাও করেন তিনি। কিন্তু নিজের জন্মভূমিতে ফেরার জন্য অনুমতি পাননি।
তবে দেশে ফেরার ইচ্ছের কথা তিনি বারবার বলেন।
ফেসবুকে লিখেছেন, “বাংলা কেন্দ্রের আয়োজনে ডিসি বইমেলা। ওয়াশিংটন ডিসির কাছেই মেরিল্যান্ডে হচ্ছে এই বাংলা বইয়ের মেলা”।
তিনি লেখেন, “ফিতে কেটে আর প্রদীপ জ্বালিয়ে উদ্বোধন হলো। বইয়ের মেলা বসলো ।কথা হলো। নাচ গান হলো। ডিনার হলো। আনন্দে কাটলো সন্ধ্যে। আজ আবার সারাদিন চলবে বইয়ের মেলা। চলবে গান কবিতার উৎসব।
গোপাল সান্যাল তাঁর বীণাপাণি বুক স্টলে রেখেছেন আমার বেশ কিছু বই। অনেকেই কিনলেন বই। অটোগ্রাফ নিলেন”।
উদ্বোধনী ভাষণে যা বলছেন, সে কথাগুলো তুলে ধরেন পাঠকদের জন্য তসলিমা নাসরিন।
“প্রিয় বইপ্রেমী বন্ধুরা,
প্রবাসের বাঙালিরা,
লেখক, পাঠক, প্রকাশক, আয়োজক, এবং বাংলা ভাষাকে যারা ভালোবাসেন—
আপনাদের সবাইকে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।
আজ এই ডিসি বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে আমি সত্যিই আনন্দিত, কৃতজ্ঞ, এবং কিছুটা আবেগাপ্লুত। আমাকে এই বইমেলার উদ্বোধন করতে বলেছেন—এ আমার জন্য শুধু সম্মানের নয়, গভীর ভালোবাসার ব্যাপার।
কারণ যে ভাষায় এই মেলা, সেই ভাষাতেই আমি লিখি। এই ভাষাতেই আমি ভাবি, স্বপ্ন দেখি, প্রতিবাদ করি, ভালোবাসি। অন্য কোনও ভাষায় লেখার কথা আমি ভাবতেও পারি না।
বাংলা ভাষা শুধু আমার লেখার ভাষা নয়—বাংলা ভাষাই আমার আশ্রয়। বাংলা ভাষাই আমার দেশ।
আমার জীবনে রাষ্ট্র বদলেছে, ভূগোল বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে। আমার নির্বাসনজীবন শুরু হয়েছিল ইউরোপে। ইউরোপে এক দশক বাস করার পর আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। দেশে ফেরার শত চেষ্টা করেও বিফল হয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতবর্ষে, পশ্চিমবঙ্গে, ভাষার টানে ছুটে গিয়েছিলাম।
ভেবেছিলাম, বাংলা ভাষার মধ্যে, বাংলার মানুষের মধ্যে, বাংলা বইয়ের মধ্যে, বাংলা আড্ডার মধ্যে হয়তো একটু ঘর খুঁজে পাবো।
পশ্চিমবঙ্গ আমার কাছে ছিল ভাষার আশ্রয়, সাহিত্যের আশ্রয়, সংস্কৃতির আশ্রয়—অনেকটা দেশের মতোই দেশ। কিন্তু সেখানেও আমাকে থাকতে দেওয়া হলো না”।
তিনি পরিষ্কার বলেন, “তবু আমি যেখানেই থাকি, আমার সংগ্রাম থেমে থাকে না। ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে, অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সমাজের জন্য, সুস্থ সভ্য ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য, নারীর সমান অধিকারের জন্য, মানুষের স্বাধীনতার জন্য, বাকস্বাধীনতার জন্য আমি লিখে চলেছি। কারণ লেখাই আমার শ্বাস নেওয়া। লেখাই আমার বেঁচে থাকা।
আজ এই প্রবাসে দাঁড়িয়ে, এই বইমেলার দিকে তাকিয়ে, আমার মনে হচ্ছে—রাষ্ট্র মানুষকে নির্বাসিত করতে পারে, কিন্তু ভাষা থেকে নির্বাসিত করতে পারে না।
পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া যায়, ভিসা বন্ধ করা যায়, দরজা বন্ধ করা যায়, কিন্তু মাতৃভাষার দরজা কেউ বন্ধ করতে পারে না।
প্রবাসে বসে যারা বাংলা বইমেলার আয়োজন করেন, তারা শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করছেন না। তারা এক ধরনের প্রতিরোধ করছেন। ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। শিকড় হারানোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। ভাষাহীন হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ।
আজকের পৃথিবীতে মানুষ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রযুক্তি আমাদের জীবন বদলে দিচ্ছে। মোবাইলের স্ক্রিন বইয়ের পাতা কেড়ে নিচ্ছে। মানুষ খবর পড়ছে, পোস্ট পড়ছে, কমেন্ট পড়ছে, কিন্তু বই পড়ছে কম। গভীর পাঠ, মনোযোগী পাঠ, চিন্তার পাঠ—এগুলো ক্রমশ কমে যাচ্ছে।
এই সময়েও আপনারা বইমেলা করছেন। প্রবাসী বাঙালিদের ডাকছেন বইয়ের কাছে। শিশুদের, তরুণদের, নতুন প্রজন্মকে বলছেন—বাংলা ভাষা শুধু বাড়ির ভাষা নয়, সাহিত্যের ভাষা; চিন্তার ভাষা; বিদ্রোহের ভাষা; ভালোবাসার ভাষা।
এর তুলনা হয় না।
বাংলা বইমেলা মানে শুধু বই কেনা-বেচা নয়। বইমেলা মানে স্মৃতি। বইমেলা মানে ভাষার উৎসব। বইমেলা মানে লেখক-পাঠকের মিলন। বইমেলা মানে প্রশ্ন করার সাহস। বইমেলা মানে অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর আয়োজন।
যে সমাজ বই পড়ে না, সে সমাজ সহজেই গুজবে বিশ্বাস করে। যে সমাজ প্রশ্ন করতে শেখে না, সে সমাজ ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার, ঘৃণা আর স্বৈরাচারের হাতে বন্দি হয়ে যায়। বই মানুষকে সন্দেহ করতে শেখায়, যুক্তি করতে শেখায়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। বই মানুষকে মানুষ করে।
তাই বইমেলা আসলে সভ্যতার মেলা।
আমি বিশেষ করে আয়োজকদের অভিনন্দন জানাই। প্রবাসের জীবনে সময় কম, ব্যস্ততা বেশি, ক্লান্তি বেশি। তবু আপনারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য এই শ্রম দিয়েছেন। বাংলা বইকে মানুষের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই আয়োজন করেছেন। এই কাজ শুধু সাংস্কৃতিক কাজ নয়, এটি ঐতিহাসিক কাজ।
আমাদের সন্তানরা যদি বাংলা পড়তে না শেখে, তারা শুধু একটি ভাষা হারাবে না; তারা হারাবে একটি বিশাল স্মৃতি, একটি সাহিত্যসভ্যতা, একটি মানবিক উত্তরাধিকার। তারা হারাবে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ, শরৎচন্দ্র,শামসুর রাহমান—আরও কত কত কণ্ঠস্বর। তারা হারাবে সেই ভাষা, যে ভাষায় মানুষ প্রেম করেছে, বিদ্রোহ করেছে, স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছে।
ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়। ভাষা মানুষকে গড়ে। ভাষা চিন্তা তৈরি করে। ভাষা আত্মপরিচয় তৈরি করে।
আমি চাই, প্রতি বছর এই বইমেলা হোক। আরও বড় হোক। আরও বেশি বই আসুক। আরও বেশি পাঠক আসুক। শিশুদের জন্য বই থাকুক, তরুণদের জন্য বই থাকুক, নারীর মুক্তি নিয়ে বই থাকুক, বিজ্ঞান নিয়ে বই থাকুক, ইতিহাস নিয়ে বই থাকুক, মুক্তচিন্তা নিয়ে বই থাকুক। ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, অজ্ঞতার বিরুদ্ধে, ঘৃণার বিরুদ্ধে বই হোক আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র।
আজ এই মেলার উদ্বোধন করতে এসে আমি বলতে চাই—যারা বই ভালোবাসেন, তারা কখনও পুরোপুরি পরাজিত হন না। কারণ বই মানুষের ভিতরে আগুন জ্বালায়। আর সেই আগুন নিভিয়ে দেওয়া সহজ নয়।
আমার দেশ নেই—এ কথা আমি বহুবার বলেছি।
কিন্তু আজ মনে হচ্ছে, যেখানে বাংলা বইয়ের মেলা হয়, যেখানে মানুষ বাংলা ভাষাকে ভালোবেসে জড়ো হয়, যেখানে কেউ একটি বাংলা বই হাতে তুলে নেয়—সেখানেই আমার দেশ তৈরি হয়।
এই প্রবাসেও বাংলা বেঁচে আছে।
আপনাদের ভালোবাসায় বেঁচে আছে। আপনাদের সন্তানের কণ্ঠে বেঁচে থাকুক। আপনাদের ঘরের বুকশেলফে বেঁচে থাকুক। আপনাদের উচ্চারণে, স্মৃতিতে, প্রতিবাদে, কবিতায়, গল্পে বেঁচে থাকুক।
আমি ডিসি বইমেলা ২০২৬-এর শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করছি।
বাংলা বইয়ের জয় হোক।
বাংলা ভাষার জয় হোক।
মানুষের স্বাধীন চিন্তার জয় হোক”।
তিনি বলেন, “আপনাদের ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। বই কিনুন, বই পড়ুন, সন্তানদের বই দিন। বাংলা ভাষাকে শুধু স্মৃতিতে নয়, জীবনে বাঁচিয়ে রাখুন। প্রতি বছর বইমেলা হোক, আরও বড় হোক, আরও সুন্দর হোক।
ধন্যবাদ”।
