সাতক্ষীরা: এই দেশে যৌক্তিক কথা বললেও আজ অনেক দোষের হয়ে যায়। হাতকড়া লাগিয়ে দেয়া হয় খুব সহজেই।
এবার সম্মানিত এক শিক্ষককে পুলিশের হাতে তুলে দিলো সম্মানিত জনতা।
বলা হয়, তিনি নাকি ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছেন।
শ্রেণিকক্ষে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে শিক্ষককে আটক করে পুলিশে সোপার্দ করেছে স্থানীয় জনতা ।
মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুরে সাতক্ষীরার সদর উপজেলার বল্লী মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এই ঘটনাটি ঘটে। গ্রেপ্তার শিক্ষকের নাম গৌরাঙ্গ সরকার। তিনি ওই বিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।

মঙ্গলবার দুপুরে ক্লাস চলাকালীন সময়ে ফজরের আযান ও মহানবীকে নিয়ে নাকি আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন ঐ শিক্ষক। পুলিশ শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে সদর থানায় নিয়ে আসে।
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন লেখক তসলিমা নাসরিন।
তিনি ফেসবুকে লিখেছেন:
“বাংলাদেশ আজ এমন এক সমাজে পরিণত হয়েছে, যেখানে যৌক্তিক কথা উচ্চারণ করাও বিপজ্জনক।
সাতক্ষীরার বল্লী মুজিবর রহমান মাধ্যমিক স্কুলের গণিতের শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার শ্রেণীকক্ষে তাঁর একটি মত প্রকাশ করেছিলেন—ফজরের আজান মাইকে না দিলেই ভালো, কারণ ভোরবেলায় উচ্চস্বরে মাইক ব্যবহার অন্য ধর্মের মানুষের ঘুম ও স্বাভাবিক জীবনে অসুবিধা সৃষ্টি করে।
পৃথিবীর বহু দেশেই শব্দদূষণ নিয়ে আলোচনা হয়, আদালতের রায় হয়, নিয়মকানুন তৈরি হয়। পশ্চিমবঙ্গেও মাইকের ব্যবহার নিয়ে বিধিনিষেধ আরোপ হয়েছে।
অর্থাৎ তিনি কোনও বিদ্বেষমূলক কথা বলেননি; বলেছেন যৌক্তিক কথা।
কিন্তু বাংলাদেশে যুক্তির চেয়ে ধর্মীয় উন্মাদনা বেশি শক্তিশালী।
নবম শ্রেণির কিছু ছাত্র সেই মন্তব্য “অপরাধ” হিসেবে ছড়িয়ে দিল, তারপর নেমে এলো তথাকথিত তৌহিদী জনতার হুমকি, উন্মত্ততা, প্রতিশোধস্পৃহা।
শেষ পর্যন্ত পুলিশ হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেল শিক্ষককে—অপরাধীর মতো। যেন একজন গণিত শিক্ষক নন, তিনি ভয়ংকর এক সন্ত্রাসী”।
তিনি আরো বলেন, “এই দৃশ্য শুধু একজন গৌরাঙ্গ সরকারের অপমানের দৃশ্য নয়,এটি বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক পতনের প্রতীক। এখানে ধর্মান্ধদের অনুভূতি রাষ্ট্রের কাছে মানুষের মৌলিক অধিকারের চেয়েও বেশি মূল্যবান।
এখানে স্বাধীনভাবে চিন্তা করা বিপজ্জনক, প্রশ্ন করা বিপজ্জনক, ভিন্নমত প্রকাশ করা বিপজ্জনক। ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের মনঃপূত না হলে একজন শিক্ষক, লেখক, শিল্পী, সংখ্যালঘু—কেউ নিরাপদ নয়।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, সমাজের বড় একটি অংশ এখন যুক্তি দিয়ে নয়, প্রতিক্রিয়া দিয়ে বাঁচে। তথ্য নয়, উত্তেজনা তাদের চালিত করে।
তারা মনে করে ধর্মের নামে চিৎকার করার অধিকার আছে, ভয় দেখানোর অধিকার আছে, জীবন দুর্বিষহ করে দেওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু একজন আধুনিক, মানবিক, প্রগতিশীল মুক্তচিন্তক মানুষের নিজের মত প্রকাশের অধিকার নেই। মত প্রকাশ করলে “অপরাধ”।
যে দেশে একজন শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে শব্দদূষণ নিয়ে মত প্রকাশ করতে পারেন না, যে দেশে পুলিশ ধর্মান্ধ জনতার চাপের সামনে মাথা নত করে, যে দেশে বাকস্বাধীনতা কাগজে থাকে কিন্তু বাস্তবে থাকে না—সেই দেশকে গণতান্ত্রিক বলা কঠিন।
গণতন্ত্র শুধু নির্বাচন নয়; গণতন্ত্র মানে মানুষের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকার, ভিন্নমত প্রকাশের নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা, সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের মানুষের সুরক্ষা।
আজকের বাংলাদেশে সেই মূল্যবোধগুলো ক্রমশ বিলীন হচ্ছে। ধর্মের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন এক উন্মত্ততা সমাজকে গ্রাস করছে”।
