রাঙামাটি: সাজেকে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক।
পাঁচটি দাবির একটি সমাধান না হওয়ায় অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। অর্থাৎ অবরোধ চলবে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে সশস্ত্র সন্তু লারমা গ্রুপের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়াসহ ৫ দফা দাবিতে চলমান আন্দোলন নিরসনে সরকারি প্রতিনিধিদল সাজেকের উজোবাজার যান।
সেখানে সরকারের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের মোটামুটি আড়াই ঘন্টা বৈঠক চলে। এতে আন্দোলনকারীদের ৫ দফার মধ্যে ৪ দফায় সমঝোতা হয় সরকারের প্রতিনিধিদলের।
সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি বৈঠকের পর একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। সেখানের বিষয়টা একটু দেখে নেয়া যাক:
সরকারি প্রতিনিধি দল কর্তৃক সশস্ত্র সন্তু গ্রুপকে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে না পারায় সমঝোতা হয়নি এবং অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলে তারা জানায়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলাধীন সাজেক ইউনিয়নের উজো বাজারে অনুষ্ঠিত সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশনের সঙ্গে সরকারি প্রতিনিধি দলের বৈঠক সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে।
সরকারি প্রতিনিধি দল সশস্ত্র সন্তু গ্রুপকে সরিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় বৈঠকে কোনো সমঝোতা হয়নি । ফলে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সাজেক পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।

২৬ অক্টোবর বিকেল ৩টার দিকে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উক্ত দুই সংগঠনের পক্ষ থেকে সাজেকবাসীর পাঁচ দফা দাবি লিখিতভাবে উত্থাপন করা হয়।

টানা প্রায় আড়াই ঘণ্টা আলোচনা শেষে দাবিগুলো নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারায় বৈঠকে চূড়ান্ত কোন সমঝোতা হয়নি। তবে পুনরায় বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
দুই সংগঠনের উত্থাপিত পাঁচ দফা দাবি:
১। ক) গত ২২ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে শান্তিপূর্ণ অবরোধকারীদের ওপর বিনা উসকানিতে হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে হবে।
খ) হামলায় নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে বাঘাইহাট জোনের উপ-অধিনায়ক মেজর মো. সালমান সিদ্দিক এবং মাচালং ক্যাম্পের কমান্ডার ক্যাপ্টেন খন্দকার মেহেদী হাসানকে শাস্তি প্রদানসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে বদলি করতে হবে।
গ) গোলাগুলির মিথ্যা নাটক সাজিয়ে ৩০ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১,০০০ জনকে আসামি করে দায়ের করা মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করতে হবে।
ঘ) ঘটনার নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত করতে হবে।
২। উজো বাজারের স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাটের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। একই সঙ্গে উজো বাজার থেকে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যদের প্রত্যাহার করতে হবে।
৩। সেনাবাহিনীর মারধরে আহত নারী-পুরুষের সম্পূর্ণ চিকিৎসার ব্যয়ভার গ্রহণ করতে হবে।
৪। সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় সাজেকে নিয়ে আসা হয়েছে বলে অভিযোগ করা জেএসএস সন্তু লারমা গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের অবিলম্বে সাজেক থেকে সরিয়ে নিতে হবে। তাদের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও জুলুম বন্ধ করতে হবে।
৫। আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা যাবে না। একই সঙ্গে তাঁদের বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে তল্লাশি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
বৈঠকে সাজেকবাসীর প্রতিনিধিদলের পক্ষে নেতৃত্ব দেন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা।
প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম পরিষদের উষাতন চাকমা, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির জিকো চাকমা এবং সাজেক নারী সমাজের সদস্য সাধনা দেবী চাকমা।
অপরদিকে সরকারি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া।
প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ান, খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত, রাঙামাটির জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফি, খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোর্তজা আলী খান এবং রাঙামাটির পুলিশ সুপার মো. আব্দুর রকিব।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, ২৬ তারিখের আলোচনায় সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র দলের সদস্যদেরকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার দাবি বিষয়ে সরকারী পক্ষ তাদেরকে সরিয়ে নিতে তিন সপ্তাহ সময় চায়।
তবে দুই সংগঠনের নেতারা তাতে রাজী হননি, তারা সর্বোচ্চ পাঁচ দিনের মধ্যে ফিরিয়ে নেয়ার দাবি জানান।
অবশ্য উক্ত সময়ে তাদেরকে ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হলে প্রয়োজন সময় বাড়ানো যাবে বলে তারা জানিয়ে দেন।
বৈঠকে দাবিগুলোর বিষয়ে কোনো সমঝোতা না হওয়ায় দুই সংগঠন অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ কর্মসূচি অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।
লিখিত দাবি উত্থাপনের সময় দুই সংগঠনের নেতারা সাজেকের চলমান সংকটের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
তারা বলেন, ৩১ আগস্ট ২০২৬ সাজেকের রুইলুই পর্যটন কেন্দ্রের পাশের গ্রাম দাড়িআদাম থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সন্তু লারমা গ্রুপের একটি সশস্ত্র দল গাড়ি যোগে পর্যটন সড়ক হয়ে এসে মাচালং আর্মি ক্যাম্পের পাশে নামে। এরপর থেকে তারা বিভিন্ন গ্রামে গিয়ে সশস্ত্র সন্ত্রাস শুরু করে।
তারা বিভিন্ন জনকে মৃত্যুর হুমকি দেয় ও বেপরোয় গুলি বর্ষণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। তাদের ছোঁড়া গুলিতে কস্মিতা ত্রিপুরা নামে ৯ বছরের এক শিশু আহত হয়। তারা হতদরিদ্র জুম চাষীদের কাছ থেকেও চাঁদা দাবি করে। প্রতি আড়ি জুম থেকে (অর্থাৎ দশ কেজি পরিমাণ ধানের বীজ দিয়ে যে পরিমাণ জমি চাষ করা যায়) এক হাজার টাকা চাঁদা ধার্য করে দিয়েছে।
এছাড়া ধানের মেশিন, হলুদ গুঁড়ো করার মেশিন ও ইঞ্জিন চালিত বোট থেকেও চাঁদা আদায় করছে।
সন্তু গ্রুপের সদস্যরা অনেক গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে সকল মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়েছে। গ্রামবাসীদের চলাফেরার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। বর্তমানে তারা ভূয়োছড়ি গ্রামের দশবল বৌদ্ধ বিহারের মাঠে বাংকার খুঁড়ে অবস্থান করছে। এতে ধর্ম পালনে ভিক্ষু ও উপাসক উপাসিকাদের অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছে।
সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে প্রকাশ্যে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পের পাশে অবস্থান করতে দেখা যায়। যেমন গত ১০ অক্টোবর তারা মাচালং আর্মি ক্যাম্পের একেবারে কাছে মাচলং সরকারী প্রাইমারী স্কুলে অবস্থান নেয় ও মাচলং বাজারের একটি হোটেলে দুপুরের খানা খায়।
এই পরিস্থিতিতে আমরা সাজেকবাসী চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকি। তাই আমরা আমাদের জানমালের নিরাপত্তার জন্য সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্থানীয় সামরিক প্রশাসনের কাছে বার বার দাবি জানিয়েছি।
কিন্তু তারা তাদেরকে সরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। এ অবস্থায় অনন্যোপায় হয়ে আমরা গত ১১ অক্টোবর থেকে পর্যটন সড়কে অনির্দিষ্টকালের জন্য শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিতে বাধ্য হই। তবে ঐদিন স্থানীয় সেনা কর্তৃপক্ষ সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদেরকে এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য আরও দুই দিন সময় চাইলে আমরা তাতে রাজী হই এবং সড়ক অবরোধী কর্মসূচি ঐ সময়ের জন্য স্থগিত ঘোষণা করি।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেনা প্রশাসন জেএসএস সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার কোন উদ্যোগ না নেওয়ায় আমরা ১৫ অক্টোবর থেকে আবার অনির্দিষ্টকালের জন্য অবেরোধ কর্মসূচি শুরু করি। তবে হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দূর্গা পূজার কথা বিবেচনা করে আমরা ২১ অক্টোবর পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করে পরদিন অর্থাৎ ২২ অক্টোবর থেকে আবার অবরোধ কর্মসূচি শুরু করি।
আগের মতো আমাদের এদিনের অবরোধ কর্মসূচিও ছিল শান্তিপূর্ণ। আগেও অবরোধের কারণে কোন যানবাহনের ক্ষতি হয়নি। আমরা আটকে পড়া পর্যটকদের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে তাদেরকে অবরোধ পয়েন্ট অতিক্রম করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে দিই। ২২ অক্টোবরও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
এদিন যখন পর্যটকদের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল, তখন বিনা উস্কানিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত আগ্রাসী হয়ে আমাদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। এসময় লোকজন বিভিন্ন দিকে দৌঁড়াতে থাকে। তখন সেনাবাহিনীর সদস্যরা গুলি করতে থাকে। ফলে সেখানে এক ভয়াবহ আতঙ্কজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
এরপর সেনারা উজোবাজারে আমাদের দোকানে ও বাড়িতে লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়। অনেকে এই বর্বরোচিত হামলায় গুরুতর আহত হয়। হামলার তিন দিন পর সড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কারণে সেনাবাহিনী ও পুলিশ ঝরণা চাকমা নামে একজন এসএসসি পরীক্ষার্থীকে তার বাসায় গিয়ে গ্রেফতারের চেষ্টা চালায়।
আমাদের প্রশ্ন হলো, জনগণের নিরাপত্তার জন্য হুমকি একটি সশস্ত্র দলের সদস্যদেরকে সরিয়ে নেওয়ার বা তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা কী অপরাধ? প্রায় দেড় মাস পরও তাদের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নেওয়ায় আমরা গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন শুরু করি। গণতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলন করা কোন অপরাধ হতে পারে না।
কিন্তু তারপরও সশস্ত্র সন্ত্রাসী দলটির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা না নিয়ে কেন উল্টো আমাদের ওপর হামলা করা হলো? এটা কোন ধরনের ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন”?
