ঢাকা: দেশটা তো পাকিস্তানের ভাবধারা নিয়েই নিয়েছে, এখন পুরোদস্তুর পাকিস্তান করতে উঠেপড়ে লেগেছে সংবিধান সংস্কার করে।

পাকিস্তান কায়েম করাই সরকারের মূল উদ্দেশ্য। ভাবার মতো নয়।

ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অ্যালার্জি দেখা দিয়েছে। অবশ্য এটা কিছু নতুন নয়। হিন্দুদের তো এমনিই এই দেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখা হয়েছে, ধর্মাচরণ করতে তারা একেবারেই পারেন না। এখন সংবিধান দিয়ে দেশ থেকে পুরোপুরি নিঃশেষ করার পাঁয়তারা চলছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে ধর্মহীনতা বোঝাননি; বরং তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে বোঝাতেন সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার, মর্যাদা এবং ধর্মপালনের স্বাধীনতা।

১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হওয়ার প্রাক্কালে দেওয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতা ব্যাখ্যা করে বলেন:

“ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমানরা তাদের ধর্ম পালন করবে, হিন্দুরা তাদের ধর্ম পালন করবে, বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টানরা তাদের ধর্ম পালন করবে। কেউ কাউকে বাধা দিতে পারবে না। কিন্তু ধর্মের নামে কোনো রাজনৈতিক ব্যবসা বাংলাদেশে চলতে দেওয়া হবে না।”

বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় ধর্মনিরপেক্ষতার মূল ভিত্তিগুলো ছিল:

ধর্মীয় স্বাধীনতা: প্রত্যেক নাগরিক নিজের ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন, প্রচার ও রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার পাবে।

রাজনীতিতে ধর্মের অপব্যবহার রোধ: রাষ্ট্র পরিচালনায় বা রাজনীতির সুযোগ নিয়ে অন্য কোনো ধর্মের ওপর নির্যাতন বা বৈষম্য সৃষ্টি করা যাবে না।

রাষ্ট্রীয় সমতা: রাষ্ট্র নির্দিষ্ট কোনো ধর্মকে বিশেষ সুবিধা দেবে না বা কোনো ধর্মের মানুষের প্রতি বৈষম্য করবে না। জাত-পাত ও ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে।

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও শান্তি বজায় রাখা।
সংক্ষেপে, বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার দর্শন ছিল—রাষ্ট্র হবে সকলের, ধর্ম যার যার, কিন্তু রাষ্ট্রীয় অধিকার সবার সমান।

কিন্তু সব উল্টে গেছে।

এখন হুটহাট আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। এই যেমন বাংলাদেশের সংবিধান থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

নোটিশে আগামি ৯০ দিনের মধ্যে (অর্থাৎ তিন মাসের সময়) সংবিধান সংশোধন এবং জাতীয় গণভোটের মাধ্যমে এই দুটি বিষয় অপসারণে প্রয়োজনীয় আইনগত ও সাংবিধানিক পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে।

কী সুন্দর দাবি!?

আজ, বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন এই নোটিশটি পাঠান।

রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব (জন বিভাগ), জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে নোটিশের প্রাপক করা হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে সরকার জাতীয় সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিতে পারে। পরে জনগণের অনুমোদনের জন্য তা জাতীয় গণভোটে দেওয়া হতে পারে।

এমন প্রেক্ষাপটে সংবিধানের প্রস্তাবনা ও মৌলিক নীতিতে থাকা ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে বলে নোটিশে দাবি করা হয়েছে।

‘সমাজতন্ত্র’ প্রসঙ্গে নোটিশে দাবি করা হয়, এ নীতি ব্যক্তিমালিকানা ও বেসরকারি বিনিয়োগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। মুক্তবাজার অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় সংবিধানের প্রস্তাবনা এবং ৮ ও ১০ অনুচ্ছেদে ‘সমাজতন্ত্র’ বহাল থাকায় বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ব্যক্তিমালিকানা ও বিদেশি বিনিয়োগের সুরক্ষার স্বার্থে সংবিধান থেকে ‘সমাজতন্ত্র’ বাদ দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রসঙ্গে নোটিশে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।

এতে দাবি করা হয়, এ ভূখণ্ডের দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক ইতিহাসে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ নামের মতবাদের চর্চা ছিল না। এ বিষয়ে ভি. ডি. কুলশ্রেষ্ঠের ‘Landmarks in Indian Legal and Constitutional History’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে এ অঞ্চলের আইন ও শাসনব্যবস্থার বিভিন্ন ঐতিহাসিক পর্যায়ের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নোটিশে আরও দাবি করা হয়, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল দাবির মধ্যেও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধ মূলত তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বৈষম্য, লুণ্ঠন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে সংঘটিত হয়েছিল বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও জনগণের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার দাবিতে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন করা হবে বলে নোটিশে হুমকি দেয়া হয়েছে।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *