ঢাকা: মৃত্যু উপত্যকা হয়েছে বাংলাদেশ! এইযে অবলা শিশুগুলো প্রতিদিন মারা যাচ্ছে, এখন আর কারো আসমান জমিন কাঁপছে না।

এখন কারো কোনো শব্দ নাই! দেশে বিরোধী দল নাই! সুশীল সমাজ নাই।

এমনকি ইউনূস আর তাঁর জঙ্গী গং এর বিরুদ্ধে মামলার আবেদন পর্যন্ত খারিজ করে দিয়েছে আদালত। এই আদালত কার নির্দেশে চলছে?

হামে শিশুগুলোর মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে মুখ খুলেছেন লেখক তসলিমা নাসরিন।

তিনি ফেসবুকে বলেছেন, “বাংলাদেশে হামে শত শত শিশুর মৃত্যু শুধু একটি স্বাস্থ্য বিপর্যয় নয়, এটি রাষ্ট্রের নৈতিক পতনেরও প্রতীক। যে রোগ পৃথিবীর বহু দেশে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, সেই হামে আজ বাংলাদেশে ৪০০-র বেশি শিশু মারা গেছে।

আক্রান্ত পঞ্চাশ হাজারেরও বেশি। এই মৃত্যুগুলোকে ঠেকানো যেত। সত্যি বলতে, শিশুরা প্রকৃতির হাতে নয়, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার হাতে মারা গেছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সংস্থা UNICEF আগেই সরকারকে সতর্ক করেছিল। তারা জানিয়েছিল, ভ্যাকসিন সংগ্রহের পদ্ধতি বদলালে বড় সংকট তৈরি হতে পারে। UNICEF-এর প্রতিনিধিরা অনুরোধ করেছিলেন—এ সিদ্ধান্ত না নিতে।

কিন্তু সরকার শুনল না। ফল কী হলো? টিকার ঘাটতি, টিকাদান কর্মসূচির ভেঙে পড়া, তারপর মহামারির মতো হাম ছড়িয়ে পড়া।

এই মৃত্যুগুলো কি তাহলে শুধুই “দুর্ভাগ্য”? নাকি প্রশাসনিক অবহেলার ফল?যে বাবা-মা এগারো বছর অপেক্ষা করার পর যমজ সন্তানের মুখ দেখলেন, তারপর হাম কেড়ে নিল একটি শিশুকে, আরেকটি হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে—তাঁদের কি প্রশ্ন করার অধিকার নেই? তাঁদের কি আদালতে যাওয়ার অধিকার নেই?

তাঁরা যদি বলেন, “আমাদের সন্তানের মৃত্যু রাষ্ট্রের ব্যর্থতায়”—তাহলে কি সেটি অন্যায় হবে”?

তসলিমা বলেন, বাংলাদেশে আজ এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে।

জনমনে ক্রমশ এই ধারণা জন্মাচ্ছে যে কিছু মানুষ আইনের ঊর্ধ্বে। রাষ্ট্র যেন নাগরিকের নয়, ক্ষমতাবানদের সুরক্ষার জন্য কাজ করছে। ফলে মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে, কিন্তু বিচার মিলছে না।

এদিকে সমাজের আরেক ভয়াবহ চিত্রও সামনে আসছে। একদিকে শিশু মৃত্যুর মিছিল, অন্যদিকে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের অসংখ্য খবর। মাদ্রাসা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিশুদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ বারবার উঠছে। কিন্তু কঠোর প্রতিরোধ নেই। শিশুদের নিরাপত্তার দিকে নজরই নেই রাষ্ট্রের।

বাংলাদেশে আজ ধর্মীয় প্রদর্শন বাড়ছে ভয়াবহভাবে। মসজিদ-মাদ্রাসা বাড়ছে, ধর্মীয় পোশাক ও আচার বাড়ছে, কিন্তু মানবিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা, নৈতিক শিক্ষা—এসব ধ্বসে পড়ছে।

মানুষ চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ঝাড়ফুঁক, পড়া পানি, কুসংস্কারের দিকে ছুটছে। হাসপাতালে জায়গা নেই, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভঙ্গুর, কিন্তু ধর্মব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠছে। ধর্মের নামে ভয় দেখিয়ে, দোজখের আতঙ্ক দেখিয়ে, হুরের লোভ দেখিয়ে মানুষের স্বাধীন চিন্তাশক্তি দুর্বল করে দেওয়া হচ্ছে।

যে-সমাজে বিজ্ঞান শিক্ষার চেয়ে ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তার বেশি গুরুত্ব পায়, সে-সমাজে যুক্তিবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হবেই। সমাজে তখন সত্যের চেয়ে মিথ্যেই বড় হয়ে ওঠে।ধর্ম বাড়লেই মানুষ নীতিবোধ বাড়বে —এই ধারণা বারবার মিথ্যে প্রমাণিত হয়েছে।

বরং ধর্মীয় উন্মাদনা যখন রাষ্ট্র ও সমাজকে গ্রাস করে, তখন নারীবিদ্বেষ, ঘৃণা, বিভাজন, প্রতারণা, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, সহিংসতা প্রচণ্ড বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র মৃত শিশুদের লাশ দেখেও দেখছে না। উপেক্ষা করছে মসজিদ মাদ্রাসায় নির্যাতিত আর ধর্ষিত শিশুদের ক্রন্দনকে। এতে প্রকাশিত হচ্ছে রাষ্ট্রের ভয়াবহ চরিত্র।

যে রাষ্ট্র তার শিশুদের ধর্ষণ, নির্যাতন এবং মৃত্যু থেকে রক্ষা করে না, সে রাষ্ট্র সভ্য তো নয়ই, বরং অদূরদর্শী, অমানবিক এবং বর্বর”।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *