ঢাকা: দুর্গাপুজো মানেই শুধু প্যান্ডেলের আলো বা নতুন জামার আনন্দ নয়, এই পুজোর সাথে প্রচুর নিয়ম জড়িয়ে আছে। সনাতনীদের ১২ মাসে ১৩ পার্বণ যেমন আছে, তেমনি আচার নিয়মও আছে প্রচুর।
উৎসবের সমস্ত আচার-আচারের আড়ালেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর ও গভীরতম শাস্ত্রীয় তাৎপর্য। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রহস্যময় হলো সপ্তমীর সকালে ‘নবপত্রিকা পূজা’।
অনেকে একে কলাবউ বলেন, গণেশের পাশে এই কলাবউকে রাখা হয় লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরিহিত ঘোমটা দেয়া।
সাধারণ চোখে যাকে আমরা লালপাড় শাড়িতে মোড়া ‘কলাবউ’ বলে চিনি, বাস্তবে কিন্তু তিনি শুধু একটি কলাগাছ নন। তিনি হলেন দেবী দুর্গার নয়-নয়টি রূপের এক অলৌকিক মেলবন্ধন, যা আজও বহু মানুষের কাছে পরম বিস্ময়ের।
আজকে মহাসপ্তমীর দিন সেই নবপত্রিকার পুজো হয়।
নবপত্রিকা প্রবেশ ও স্থাপনের মধ্য দিয়ে মহাসপ্তমীর পূজায় অংশ নিয়েছেন দেশের ভক্তরা।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শনিবার সকালে মহাসপ্তমীর রীতি অনুযায়ী কলাবউয়ের মহাস্নান ও স্থাপনের পর কল্পারম্ভ ও বিহিত পূজার মাধ্যমে পূজার আনুষ্ঠানিকতা চলে। সকাল ৭টা ৩৯ মিনিটে নবপত্রিকা স্থাপন সম্পন্ন হয়।
ভোর হতে না হতেই ঢাকে পড়ে কাঠি, ধূপের সুবাসিত ধোঁয়ায় চারদিক আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে দেখা যায়, ভোর থেকেই ভক্তরা মন্দিরে আসছেন।
ঢাকেশ্বরীর পুরোহিত এবং ভক্তদের দল লালপাড় সাদা শাড়িতে মোড়ানো ‘নবপত্রিকা’ মাথায় নিয়ে মন্দিরের পাশের জলাশয়ের দিকে রওনা হন।
সেখানে মন্ত্রোচ্চারণ ও ভক্তদের জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে কলাবউয়ের মহাস্নান সম্পন্ন করা হয়। স্নান শেষে মহাসমারোহে কলাবউকে ফিরিয়ে এনে প্রতিমার ডান পাশে স্থাপন করার পর মূল বিহিত পূজা ও কল্পারম্ভ শুরু হয়।
শাস্ত্রের গভীরে নজর দিলে জানা যায়, নবপত্রিকা আসলে মহাশক্তি দেবী দুর্গারই নয়টি উদ্ভিদের রূপ।
মহাসপ্তমীর সকালে গঙ্গাস্নান করিয়ে অপরাজিতা লতা দিয়ে বাঁধা নয়টি গাছকে শাড়ি পরিয়ে যখন গণেশের পাশে স্থাপন করা হয়, তখন তা আসলে দেবীর জীবনীশক্তিকেই আবাহন করার প্রতীক। প্রকৃতির রূপ ধরে স্বয়ং মা দুর্গাই এসে উপস্থিত হন মণ্ডপে।
এই নবপত্রিকা নয়টি বিশেষ উদ্ভিদের অপূর্ব সমাহার। আর প্রতিটির আড়ালে বিরাজ করেন দেবীর একেকটি মহাশক্তি রূপ!
কলাগাছে দেবী ব্রহ্মাণী,
হলুদ গাছে মহামায়া দুর্গা,
অশোক গাছে শোকরহিতা,
বেলগাছে শিবা,
জয়ন্তী গাছে দেবী কার্তিকী,
মানকচুতে চামুণ্ডা,
ধান গাছে মা লক্ষ্মী,
ডালিম গাছে রক্তদন্তিকা আর
সাধারণ কচু গাছে মা কালিকা।
শাস্ত্রীয় শ্লোকেও লেখা রয়েছে কীভাবে এই ৯টি উদ্ভিদের প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে থাকেন মহাদেবী।
নবপত্রিকা পুজো মূলত, বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক শক্তির আরাধনা।
