চট্টগ্রাম: কাঁদো বাংলাদেশ কাঁদো! মা জননীর জন্য শোকে কাতরাতে কাতরাতে ছোট হয়ে গেছেন চিন্ময় প্রভু!
আজ চিন্ময় প্রভুর কান্নায় ভেঙে পড়েছে সারা বাংলাদেশ। এত অন্যায় সরকার করতে পারে? মৃত্যুপথযাত্রী এক মা তাঁর সন্তানকে চোখের দেখা দেখতে পারলেন না, দেখতে দেয়া হলো না- তাঁদের নাকি বিধান নেই! সেই মা আর নেই পৃথিবীতে! হায়রে জীবন রে!
ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন লেখক তসলিমা নাসরিন।
তিনি যা লিখেছেন ফেসবুকে তা হুবহু তুলে ধরলাম:
“একজন মা মৃত্যুর আগে তাঁর ছেলেকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।
একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের এর চেয়ে স্বাভাবিক মানবিক আবেদন আর কী হতে পারে? তিনি তাঁর সন্তানকে দেখতে চেয়েছিলেন—মাত্র একবার, শেষবার।
সন্ধ্যা রাণী ধর আর নেই। মৃত্যুর আগে তাঁর ইচ্ছা ছিল কারাগারে বন্দি ছেলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে একবার দেখবেন। ছেলে এসে পাশে দাঁড়াবে, হয়তো তাঁর হাতটি ধরবে, হয়তো তিনি শেষবারের মতো ছেলের মুখের দিকে তাকাবেন। এতটুকুই।
রাষ্ট্রের কাছে তিনি ক্ষমতা চাননি। সম্পত্তি চাননি। পদ চাননি। বিচার বন্ধ করতে বলেননি। তিনি শুধু তাঁর সন্তানকে চেয়েছিলেন।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সেই সামান্য চাওয়াটুকুও পূরণ হতে দিল না।
৯ সেপ্টেম্বর চিন্ময়ের বড় ভাই প্যারোলের আবেদন করলেন। একই দিনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চিন্ময়ের মুক্তি এবং তাঁর প্রতি মানবিক ও আইনগত সহযোগিতা চেয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হলো। তাঁর মা যে সংকটাপন্ন, তিনি যে ছেলেকে শেষবার দেখতে চান—সেই কথাও সরকারের অজানা ছিল না।
প্রশাসন জানিয়ে দিল, অসুস্থ মাকে দেখতে প্যারোল দেওয়ার বিধান নেই। মা মারা গেলে তখন নাকি শেষকৃত্যের জন্য কয়েক ঘণ্টার প্যারোল পাওয়া যেতে পারে।
কী অসাধারণ রাষ্ট্রীয় যুক্তি!
মা যতক্ষণ বেঁচে আছেন, ছেলে তাঁকে দেখতে পারবে না। মা মারা গেলে মৃতদেহ দেখতে যেতে পারবে।
আইনের উদ্দেশ্য কি মানুষের মর্যাদা রক্ষা
করা, নাকি মানুষকে অপমান করার জন্য আইনের অক্ষরকে ঢাল বানানো?পরদিন সকালেই সন্ধ্যা রাণী ধর মারা গেলেন।
যে ছেলেকে তিনি শেষবারের মতো দেখতে চেয়েছিলেন, তাকে আর দেখতে পেলেন না।
এই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমার কয়েকটি প্রশ্ন আছে।
আপনি কয়েক দিন আগেও জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠানে বলেছেন, সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু নয়, সবাই বাংলাদেশি। বলেছেন, ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা সবার। এর আগেও বলেছেন, আপনার সরকার ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকারে বিশ্বাস করে।
চমৎকার কথা।
কিন্তু একজন হিন্দু ধর্মীয় নেতার মা যখন মৃত্যুশয্যায় তাঁর ছেলেকে একবার দেখতে চান, তখন আপনার সেই সমান অধিকার কোথায় যায়?
বক্তৃতামঞ্চে দাঁড়িয়ে সম্প্রীতির কথা বলা সহজ। জন্মাষ্টমীতে শুভেচ্ছা দেওয়া সহজ। “আমরা সবাই বাংলাদেশি” বলা আরও সহজ। কথার সত্যতা বোঝা যায় তখনই, যখন সেই কথার মূল্য দেওয়ার সময় আসে।
সন্ধ্যা রাণী ধরের মৃত্যুশয্যা ছিল আপনার সরকারের সেই পরীক্ষা।
আপনার সরকার সেই পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
আমি জানি, প্রধানমন্ত্রী আদালত নন। তারেক রহমান কোনো বিচারককে ফোন করে বলতে পারেন না—চিন্ময়কে ছেড়ে দিন। তাঁকে তা করতেও বলা হচ্ছে না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকতে হবে।
কিন্তু বিচার বিভাগের স্বাধীনতার আড়ালে সরকারের রাজনৈতিক এবং নৈতিক দায়িত্ব লুকিয়ে ফেলা যাবে না।
চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে কারাগারে। তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে—সেগুলোর বিচার হোক। অপরাধ প্রমাণিত হলে আদালত তাঁকে শাস্তি দিক। কিন্তু অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণ এক জিনিস নয়। একজন অভিযুক্ত মানুষকে দীর্ঘদিন বন্দি রেখে এমন আচরণ করা যায় না, যেন অভিযোগ ওঠাই অপরাধ প্রমাণের সমান।
বিশেষ করে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাটি নিয়ে প্রশ্ন আরও গুরুতর। জামিনের রায়ে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছিল, বর্তমান পর্যায়ে অভিযোগে বর্ণিত ঘটনা দণ্ডবিধির ১২৪এ ধারার রাষ্ট্রদ্রোহের মধ্যে পড়ে না। আদালত তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল এবং চিন্ময়কে জামিন দিয়েছিল। পরে রাষ্ট্রপক্ষ সেই জামিনের বিরুদ্ধে যায় এবং জামিন স্থগিত হয়।
এই মামলাগুলোর শুরু তারেক রহমানের সরকারের সময় নয়—এ কথাও সত্য।
কিন্তু ক্ষমতায় এসে অন্যায় উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা নেই; বরং তা সংশোধন করার দায়িত্ব আছে।
তারেক সরকার ফেব্রুয়ারি থেকে ক্ষমতায়। এপ্রিলেই সরকারের একজন মন্ত্রী প্রকাশ্যে চিন্ময়ের মুক্তির পথ সুগম করার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
সেই আশ্বাস গেল কোথায়?
সরকার অন্তত দেখতে পারত রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান ন্যায়সংগত কি না। মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কি না, তার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা হতে পারত। একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের সঙ্গে বন্দি সন্তানের দেখা করানোর কোনো আইনসম্মত উপায় আছে কি না, সর্বোচ্চ পর্যায়ে তা খুঁজে দেখা যেত।
কিন্তু মায়ের জীবদ্দশায় অন্তত একবার ছেলেকে তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা হলো না।
বরং রাষ্ট্রের উত্তর দাঁড়াল—
মরে গেলে দেখা যাবে, বেঁচে থাকতে নয়।
এ শুধু আমলাতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা নয়। এ এমন এক রাষ্ট্রীয় মানসিকতা, যেখানে বিধির অক্ষর মানুষের জীবন, ভালোবাসা, শোক এবং শেষ ইচ্ছার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে।
আর এই ঘটনার ধর্মীয় দিকটিও এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
আমি প্রমাণ ছাড়া বলব না যে তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে হিন্দুবিদ্বেষী। কিন্তু আমি অবশ্যই প্রশ্ন করব—বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু ধর্মীয় নেতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি এমন আচরণ করে, তাহলে দেশের সাধারণ হিন্দু নাগরিক কী বার্তা পায়?
তারা কি সত্যিই বিশ্বাস করবে, রাষ্ট্র তাদেরও সমানভাবে নিজের নাগরিক মনে করে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ বলে, সব নাগরিক আইনের চোখে সমান। ২৮ অনুচ্ছেদ ধর্মের কারণে বৈষম্য নিষিদ্ধ করে। ১২ অনুচ্ছেদ সাম্প্রদায়িকতা এবং কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীর বিরুদ্ধে বৈষম্য ও নিপীড়ন দূর করার কথা বলে।
সংবিধানের এই কথাগুলো শুধু বইয়ের পাতায় সাজিয়ে রাখার জন্য নয়।
তারেক রহমান, আপনি “বৈষম্যহীন বাংলাদেশ”-এর কথা বলেন। তাহলে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের আচরণের ব্যাখ্যা দিন।
কেন আপনার সরকারের একজন মন্ত্রী তাঁর মুক্তির পথ সুগম করার আশ্বাস দিয়েও তা করতে পারলেন না?
কেন একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের আবেদন রাষ্ট্রের হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছাল না?
কেন ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপি পৌঁছানোর পরও এমন কোনো জরুরি উদ্যোগ নেওয়া হলো না, যাতে মা অন্তত জীবিত অবস্থায় তাঁর সন্তানকে একবার দেখতে পারেন?
আজ আর সন্ধ্যা রাণী ধরের জন্য কিছু
করার নেই।
রাষ্ট্র এখন নিয়মের খাতা খুলে বলতে পারে—মা মারা গেছেন, এবার ছেলেকে কয়েক ঘণ্টার জন্য যেতে দেওয়া যেতে পারে।
কী ভয়ংকর পরিহাস!
বেঁচে থাকা মাকে দেখতে দেওয়া যাবে না, মৃত মাকে দেখতে দেওয়া যাবে।কিন্তু জীবিত মায়ের চোখ আর খুলবে না।তিনি আর ছেলেকে দেখবেন না।
ছেলেও আর মাকে বলতে পারবে না—
মা, আমি এসেছি।
এই একটি না-বলা বাক্যই তারেক সরকারের সমস্ত সম্প্রীতির বক্তৃতার চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
জন্মাষ্টমীর মঞ্চে দাঁড়িয়ে আপনি যতবারই বলুন, “সবাই বাংলাদেশি”, সেই কথার পাশে সন্ধ্যা রাণী ধরের মৃত্যুশয্যা দাঁড়িয়ে থাকবে এবং প্রশ্ন করবে—
তাহলে আমার ছেলে কোথায় ছিল?
কোনো সরকারি ফাইলের নিচে এই প্রশ্ন চাপা দেওয়া যাবে না। আদালতের স্বাধীনতার কথা বলে, প্যারোলের বিধির কথা বলে, প্রশাসনিক নিয়মের কথা বলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই দায় থেকে মুক্তি পাবে না।
একটি সরকার কতটা সভ্য, তার পরীক্ষা শুধু নির্বাচন, জিডিপি কিংবা বক্তৃতায় হয় না। পরীক্ষা হয় রাষ্ট্র ক্ষমতাহীন, অসহায় মানুষের সঙ্গে কী আচরণ করে।
সন্ধ্যা রাণী ধর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে ক্ষমতা চাননি।
তিনি তাঁর সন্তানকে চেয়েছিলেন।
আপনার সরকার তাঁকে সেই সন্তানটিকেও শেষবারের মতো দেখতে দিল না।
যে প্রশাসন বিধির এমন নিষ্ঠুর ব্যাখ্যাকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে পারে, তাকে শুধু অমানবিক বললে কম বলা হয়। এ এক ঠান্ডা মাথার রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা। এ এক বিবেকহীন, হৃদয়হীন রাষ্ট্রযন্ত্র—যার কাছে একজন মায়ের শেষ ইচ্ছার চেয়েও বড় আমলাতন্ত্রের কাগজ, রাজনৈতিক হিসাব এবং ক্ষমতার সুবিধা।
এই রাষ্ট্র কি এতটাই নিষ্ঠুর হয়ে গেছে যে একজন মা মৃত্যুর আগে ছেলের মুখ দেখতে চাইলে সেই চাওয়াটুকুও রাষ্ট্রের কাছে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে? এতটাই ভীত? এতটাই প্রতিহিংসাপরায়ণ? এতটাই বিবেকশূন্য?
ছি, বাংলাদেশ রাষ্ট্র।
ছি, এই নিষ্ঠুর প্রশাসন।
ছি, সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের, যে একজন মৃত্যুপথযাত্রী মায়ের শেষ আকুতির সামনেও নির্বিকার থাকতে পারে।
একজন জীবিত মায়ের কাছে তাঁর সন্তানকে পৌঁছে দিতে পারেননি আপনারা। এখন আর কোনো ব্যাখ্যা, কোনো বিধি, কোনো সরকারি বিবৃতি এই দায় ধুয়ে দিতে পারবে না।
সন্ধ্যা রাণী ধর মারা গেছেন। তাঁর শেষ ইচ্ছাটিও তাঁর সঙ্গে মারা গেছে। কিন্তু ছেলেকে শেষবার দেখতে না-পাওয়ার এই নিষ্ঠুরতা তারেক রহমান সরকারের গায়ে রাজনৈতিক ও নৈতিক কলঙ্ক হয়ে থেকে যাবে”।
