ঢাকা: বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের হঠাৎ দাম বৃদ্ধি এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় যে প্রভাব পড়েছে, তা বাস্তবেই মারাত্মক।

হঠাৎ করে তেলের দাম এই পরিমাণে বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে স্থবিরতা ও হাহাকার শুরু হয়েছে।

পরিবহন খরচ বৃদ্ধি: ডিজেলের দাম বাড়ার ফলে বাস, ট্রাক, লঞ্চ এবং অন্যান্য গণপরিবহনের ভাড়া বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আশঙ্কা নয়, বেড়েছেই ইতিমধ্যে।

এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে, যেখানে জিনিসপত্রের দাম আরও নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সংসার চালানো অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।সর্বোপরি, জ্বালানি তেলের এই রেকর্ড দাম বৃদ্ধির ফলে পুরো অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

জ্বালানি তেল-এর অযৌক্তিক মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বিবৃতি দিয়েছে:

ফেসবুকে আওয়ামী লীগের পেইজে দেয়া হয়েছে সেই বিবৃতি: হুবহু তুলে ধরলাম:

“পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন সংসদীয় স্বৈরাচারই সরকার আজ থেকে আবারও আবার জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি করেছে। এতে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনে মূল্য লিটার প্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত তিন বার তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। যার ফলে প্রতি লিটার ডিজেল ১১৫ টাকা থেকে ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা থেকে ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা থেকে ১৫৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এহেন দুরভিসন্ধিমূলক প্রক্রিয়ায় জনগণকে শোষণ ও লুটপাটের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

দেশে ইতোমধ্যে নির্বিচারে খুন-ধর্ষণ-লুটপাট-চাঁদাবাজি-মামলাবাজি-গ্রেফতারবাণিজ্য, আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যে ঊর্ধ্বগতি, তেল-গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ-সার সরবরাহে ব্যর্থতা, শিল্প-কারখানা বন্ধ করে লাখ লাখ শ্রমিককে কর্মহীন করে দেয়ার ফলে নৈরাজ্যতা বিরাজ করছে।

এরমধ্যে আজকে তেলের মূল্য বৃদ্ধি করে অত্যাচার ও লুটপাটের আরেকটি অধ্যায় যুক্ত করা হলো। যা সরকারের অদূরদর্শিতা, অক্ষমতা ও ভোটারবিহীন নির্বাচনে ক্ষমতাসীন হবারই বহিঃপ্রকাশ।

এমনিতেই মানুষের নাভিশ্বাস চূড়ান্ত পর্যায়ে তন্মধ্যে নতুন করে তেলের দাম বৃদ্ধি করে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা বানিয়ে দেয়া হলো। গত দুই বছর ধরে দেশবাসী নিভু নিভু করে জীবন চালাতে পারলেও এবার অন্ধকারে নিমজ্জিত করার চূড়ান্ত করা হলো, যা একটি আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত বৈ কিছু নয়।

কারণ গ্যাস ও বিদ্যুতের অপর্যাপ্ততায় মানুষ বিকল্প হিসেবে তেল দিয়ে উৎপাদন ব্যবস্থা বহাল রাখার চেষ্টায় ছিল। কিন্তু এখন তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে পণ্য উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে, পণ্য ও যাত্রী পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পাবে।

যার ফলে চালু থাকা বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা এবং কৃষিপণ্য উৎপাদন কমে যাবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে। মূল্যস্ফীতি লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাবে।

তাছাড়া কর্মহীন অনেক মানুষ উবার ও পাঠাও চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছিল, এবার তারা বেকার হয়ে যাবে। দেশে অপরাধের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনে করে, দেশকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করতেই সরকার এহেন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রাষ্ট্র যদি কৃষি ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় জিনিসের ক্ষেত্রে ভর্তুকি না দেয়, তাহলে উৎপাদন বন্ধ হতে বাধ্য। উৎপাদন না হলে রাষ্ট্রের আয় চলে যাবে শূন্যের কোটায়।

জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকার এ পর্যন্ত যে সকল নীতি গ্রহণ করেছে তার কোনটিই ভাল ফল দেয়নি। উল্টো শপিং সেন্টারগুলোকে রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করে দিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের বিক্রি ৩০ শতাংশ কমে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আবারও জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে সারাদেশের কয়েক কোটি দোকান মালিককে সর্বশান্ত করবে।

দেশের সেচ ব্যবস্থার ৭০ শতাংশ ডিজেল নির্ভর। কৃষি পণ্যের উৎপাদন খরচের ২০-২৫ শতাংশ নির্ভর করে ডিজেলের দামের উপর। অন্যদিকে সার নিয়ে চলছে লুটপাট। কয়েক গুণ বেশি দামে কালোবাজার থেকে সার ক্রয়ে বাধ্য হচ্ছে কৃষক।

এখন ডিজেলের দাম চলতি বছরেই ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধিতে সেচের খরচও সমান হারে বৃদ্ধি পাবে। উচ্চ খরচের কৃষি পণ্যের ন্যায্য বাজার দাম কৃষক পাবে না। অপরদিকে কৃষি পণ্যের দাম বাড়লে না খেয়ে থাকতে হবে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোকে।

বিরূপ প্রভাব ফেলবে তৈরি পোশাক শিল্পেও। বিকেএমইএ-এর তথ্যমতে, ইতোমধ্যে চলমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে দেশের প্রায় ৫৫ শতাংশ নিট পোশাক কারখানায় বিদেশিদের ক্রয়াদেশ বাতিল হয়েছে বা কমেছে।

সংকটের কারণে প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানা ক্রেতাদেরকে ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে। প্রায় ৭৮ শতাংশ কারখানায় আংশিক উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। প্রায় ৮৭ শতাংশ কারখানা থেকে উৎপাদিত পণ্য ডেলিভারিতে দেরি হয়েছে।

প্রায় ৯২ শতাংশ কারখানাকে বিকল্প জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত খরচ করতে হয়েছে। একই হারে কারখানায় শ্রম ও কর্মঘণ্টা অপচয় হয়েছে। প্রায় ৮৯ শতাংশ কারখানা ক্রেতাদের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৫৯ শতাংশ কারখানা ঋণখেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

প্রায় ৭ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ। এখন জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে এই ব্যবসায়ীদের অবশিষ্ট ব্যবসাকেও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং বন্ধ হয়ে যাবে অনেক কারখানা।

এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে চলতি বছরের মোট রফতানি কমে যাবে অনেকখানি। গত বছর রফতানি তার আগের বছরের তুলনায় ২৮০ মিলিয়ন ডলার কম হয়েছে। এ বছর আরও কমে গেলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবতেও ভয় লাগে। এতে নিকট ভবিষ্যতে দারিদ্র্যের কবলে পড়বে আরও কয়েক কোটি মানুষ।

নাৎসি ইউনুসের আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারও দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিটি খাতকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। এবার তেলের মূল্য বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় অচিরেই বাড়বে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম।

সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকা দ্রব্যমূল্য আরও বাড়বে। চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যেই আরও বাড়বে সার্বিক মূল্যস্ফীতি। জাতীয় মোট চাহিদা ইতোমধ্যে কমে গেছে। ইতোমধ্যে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষের চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা ও অপুষ্টির উচ্চ ঝুঁকির আশংকা করেছে জাতিসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), যা চলতি বছরের মে-আগস্ট সময়ের চেয়ে ১৮ শতাংশ বেশি।

এই প্রাক্কলনের মধ্যে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার মানুষ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যারা আইপিসি কাঠামোর আওতায় জরুরি পর্যায়ের তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন হতে পারে। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে এই ঝুকি আরও অনেক বেড়ে যাবে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বিনোদন সহ অনেককিছু বাদ দিয়ে ব্যয় কমিয়ে, আধ-পেট খেয়ে জীবন ধারণ করে আসছিল। এবার না খেয়ে থাকার পরিস্থিতি তৈরি করা হলো। যার শেষ পরিণতি অনিবার্যভাবে মহামারী দুর্ভিক্ষ।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্পষ্ট ভাষায় বলছে, আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার সময় দেশে বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কার্যকর ছিল, কিন্তু বর্তমানের মতো কার্ড বাণিজ্য ছিল না। ফলে সরকারের কোন যুক্তিই জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির অযৌক্তিকতাকে গ্রহণযোগ্যতা দিবে না।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকারের এহেন গণবিরোধী সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাচ্ছে। একইসাথে দেশ বাঁচাতে, মানুষ বাঁচাতে জনগণের যেকোন প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের সাথে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করছে”।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *