ঢাকা: গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, জ্বালানি নেই। দেশের ছোট, বড় ও মাঝারি কারখানাগুলো প্রায় বন্ধের পথে। শ্রমজীবী মানুষ কাজ হারাচ্ছে।
অথচ দেশে চলছে রাজনীতি নামের ব্যবসা।এই দেশের অনেক মানুষের কাছে রাজনীতি যেন বিনা পুঁজিতে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা।
সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস সরবরাহের অন্যতম ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
হাজার হাজার শ্রমিক তাদের কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন। পোশাক প্রস্তুতকারকরা উৎপাদন স্থগিত করে দিচ্ছেন, অর্ডার বাতিল করতে বাধ্য হচ্ছেন; কারণ গ্যাস সংকটের কারণে তাঁরা তাঁদের যন্ত্রপাতি সচল রাখতে পারছেন না।
সারা দেশে আড়াই হাজারেরও বেশি কারখানা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলো কি সাধারণ কথা? দেশটা অচল হয়ে পড়ছে।
শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটিতে পৌঁছেছে। অনেক উপজেলাতেই ১৮ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বা লোডশেডিংয়ের ঘটনা ঘটছে।
সরকারি মালিকানাধীন ছয়টি সার কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের সারের চাহিদার ৮০ শতাংশই এখন আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব পড়তে পারে।
এর ফলে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বিপর্যয়কর প্রভাব পড়তে পারে। অপর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশের ছয়টি রাষ্ট্রীয় ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিই বন্ধ রয়েছে।
পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আসন্ন কৃষি মৌসুমে কৃষকরা মারাত্মক সার সংকটের মুখে পড়তে পারেন, যা সারা দেশে খাদ্য উৎপাদনকে হুমকির মুখে ফেলবে।
এই সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে এবং লোডশেডিংয়ের মাত্রা আরো বেড়েছে। অসুস্থতা বাড়ছে দেশে।
একটার সাথে তো আরেকটার সংযোগ আছে। কোনোকিছুই তো একা নয়।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে পাঁচটি ইউরিয়া কারখানা আছে। এগুলো হলো ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার, শাহজালাল ফার্টিলাইজার, চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার, যমুনা ফার্টিলাইজার ও আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি।
এগুলোর মধ্যে শুধু শাহজালাল ফার্টিলাইজার কারখানার উৎপাদন চালু আছে।
চলমান গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে। চলমান গ্যাস সংকটে উৎপাদন ধরে রাখতে অস্বাভাবিকভাবে খরচ বাড়ছে।
বাড়তি ওভারটাইম দেওয়া ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে টেক্সটাইল-পোশাক খাত মিলিয়ে প্রতিদিন আনুমানিক ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকার উৎপাদন ব্যাহত ও ক্ষতি হচ্ছে। এমন তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ টেক্সটাইলস মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)।
একজন ভুক্তভোগী লিখেছেন, “মোহাম্মদপুর এরিয়াতে আজ ২০-২৫ দিন ধরে গ্যাস নেই।কি যে যন্ত্রণা কেউ কিচ্ছু বলছে না। প্রশাসন চুপ।এরকম চুপ হয়ে বসে থাকাকে দেশের উন্নয়ন বলে না”।
তাঁরা বলছেন, “বিএনপি সরকারকে বলব—যেহেতু গ্যাস, ডিজেল আর বিদ্যুতের সংকট একসাথেই চলছে, তাহলে সবাইকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিন। অন্তত রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীর আর সংকট হবে না”।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। কোথাও সারাদিন গ্যাস নেই, কোথাও আবার কয়েক ঘণ্টা পরপর সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ঢাকায় বসবাস করা আরেক ভুক্তভোগী বলছেন, “গত ৩২ বছর ধরে ঢাকায় বসবাস করছি, কিন্তু এমন দীর্ঘস্থায়ী ও অনিশ্চিত পরিস্থিতি আগে খুব কমই দেখেছি।
গ্যাসের সংকট হতেই পারে। কিন্তু সংকটের চেয়েও বড় সমস্যা হলো—জনগণকে কোনো স্পষ্ট তথ্য না দেওয়া।
যদি গ্যাসের উৎপাদন কমে থাকে, এলএনজি আমদানিতে সমস্যা থাকে, পাইপলাইনের রক্ষণাবেক্ষণ চলে বা অন্য কোনো কারিগরি জটিলতা থাকে, তাহলে সেটি খোলাখুলিভাবে জনগণকে জানানো উচিত। সত্য জানালে মানুষ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে পারে, কিন্তু অনিশ্চয়তা মানুষের আস্থা নষ্ট করে।
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী এই সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক। মানুষ একটি জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও দক্ষ প্রশাসন দেখতে চায়।
তাই জনদুর্ভোগের বিষয়ে দ্রুত তথ্য দেওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সমাধানের রোডম্যাপ প্রকাশ করা এখন সময়ের দাবি।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানেরও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন, যাতে জনগণের কষ্ট দ্রুত লাঘবের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
জনগণ সমালোচনা করতে চায় না, সমাধান দেখতে চায়। তাই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান—গ্যাস সংকটের প্রকৃত কারণ, সম্ভাব্য সমাধান এবং স্বাভাবিক সরবরাহ কবে ফিরবে, সে বিষয়ে দ্রুত আনুষ্ঠানিকভাবে জনগণকে অবহিত করুন। স্বচ্ছতা আস্থা সৃষ্টি করে, আর আস্থাই একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি”।
তিতাস গ্যাসের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে প্রতিদিন প্রায় ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৩০ কোটি ঘনফুট।
চাহিদা ও সরবরাহের এই বড় ব্যবধানের কারণে ছোট-বড় শতাধিক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি শ্রমিকরাও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
