ঢাকা: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি না এটা হয়েছে দাসত্ব চুক্তি। বাংলাদেশ ধ্বংসের চুক্তি।
এই চুক্তিকে খুব ভালো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান।
মঙ্গলবার (৫ মে) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এই অতি আশ্চর্যজনক কথাটি বলেন।
ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
বৈঠক শেষে চুক্তি নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি খুব ভালো হয়েছে।
যারা এ নিয়ে সমালোচনা করছেন, তারা অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনামূলক চিত্র দেখলে বিষয়টি বুঝতে পারবেন।
অন্যে নিজের ঘরে আগুন দিয়েছে বলে আমাকেও দিতে হবে? মন্ত্রীসাহেবের কথা তো তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।
যারা আগুন দিয়েছে তাদের হয়তো লাভ আছে, তাই দিয়েছে! তাই বলে আমাদেরকেও দিতে হবে? এটাই তো বোঝাতে চেয়েছেন মন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ১৩১টিতে শ্যাল বলেছে। আমরা তো একা এই চুক্তি করিনি, বিশ্বের অন্যান্য দেশও করেছে। ইন্দোনেশিয়া ২৩১টিতে শ্যাল বলেছে।’
‘সুতরাং বাংলাদেশের চুক্তিটি যখন পাঠ করবেন, তখন ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, অন্যান্য যারা চুক্তি করেছে তাদেরটা পাশে নিয়ে পাঠ করলে আপনি জিনিসটা ভালো বুঝবেন,’ যোগ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
অথচ এই চুক্তি বাংলাদেশের সর্বনাশের আরেকটি ধাপ।
এই বিষয়ে সাংবাদিক আনিস আলমগীর লিখেছেন:
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে পত্রিকাগুলোর কোনো পর্যালোচনা নেই বললেই চলে।
বলেন, এমন একটা চুক্তি কোনো স্বাধীন দেশ করতে পারে!
আলমগীর সাহেব বলেন, এই চুক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে দ্বিপাক্ষিক মনে হলেও, এর ভেতরে এমন কিছু শর্ত আছে যা বাংলাদেশের সার্বভৌম অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং বাণিজ্যিক স্বার্থকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে কী হতে পারে:
১. নীতি নির্ধারণে সার্বভৌমত্ব হারানো (ধারা ৪.১ ও ৪.২)। চুক্তির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে কোনো দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ আরোপ করে, তবে বাংলাদেশকে বাধ্যতামুলকভাবে একই পদক্ষেপ নিতে হবে। অর্থাৎ, অন্য কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হবে, তা এখন থেকে হোয়াইট হাউস ঠিক করে দেবে। এটি বাংলাদেশের নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি ও সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী।
২. তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কে বাধা (ধারা ৩.২ ও ৪.৩)। চুক্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি এমন কোনো দেশের (যেমন- চীন বা রাশিয়া) সাথে বাণিজ্য চুক্তি করে যা যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দ নয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করে পুনরায় উচ্চ শুল্ক আরোপ করতে পারবে।
এখানে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় রয়েছে আমাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে। ধারা ৪.৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের অপছন্দের কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি বা জ্বালানি কিনতে পারবে না। এটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো প্রকল্পের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তায় ফেলতে পারে।
৩. শুল্ক ও রাজস্ব ক্ষতি (সেকশন ১ এবং অ্যানেক্স ১)। চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর শুল্ক (Customs Duty), সম্পূরক শুল্ক (SD) এবং রেগুলেটরি ডিউটি (RD) কমানোর কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর দেশ হওয়ায় শুল্ক থেকে বড় রাজস্ব পায়। মার্কিন পণ্যকে এই সুবিধা দিলে দেশীয় শিল্প যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধস নামবে।
৪. কৃষিখাতে অসম প্রতিযোগিতা (ধারা ২.৩ ও ২.৫)। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি পণ্যকে ‘নন-ডিসক্রিমিনেটরি’ বা অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের কৃষকদের বিশাল ভর্তুকি দেয়। তাদের কম দামি কৃষিপণ্য (যেমন- ভুট্টা, সয়াবিন, দুগ্ধজাত পণ্য) বিনা বাধায় বাংলাদেশে ঢুকলে আমাদের প্রান্তিক কৃষকরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না এবং বাজার হারাবে।
৫. প্রযুক্তির গোপনীয়তা হারানো (ধারা ৩.৪)। বাংলাদেশ কোনো মার্কিন কোম্পানিকে তাদের সোর্স কোড বা প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত দিতে পারবে না। এর ফলে বাংলাদেশের নিজস্ব প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি বা ডেটা সিকিউরিটি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনকি কোম্পানিগুলো চাইলে বাংলাদেশের ব্যবহারকারীদের ডেটা অবাধে দেশের বাইরে নিয়ে যেতে পারবে (ধারা ৩.২)।
৬. ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি ও ওষুধের দাম (ধারা ২.৬)। মেধাস্বত্ব আইনের কঠোর প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে আমাদের ওষুধ শিল্প (Pharmaceuticals) বড় ধাক্কা খাবে।
বর্তমানে আমরা জেনেরিক ওষুধ তৈরি করি বলে কম দামে মানুষ ওষুধ পায়। পেটেন্ট আইন কঠোর হলে ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
৭. শ্রম ও পরিবেশগত অজুহাতে নিষেধাজ্ঞা (ধারা ২.৯ ও ২.১০)।
শ্রম অধিকার এবং পরিবেশ রক্ষার নামে যুক্তরাষ্ট্র যখন-তখন বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর বিধিনিষেধ দিতে পারবে। বিশেষ করে ‘ফোর্সড লেবার’ বা শ্রম আইনের অজুহাতে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির একটি স্থায়ী আইনি হাতিয়ার পাবে যুক্তরাষ্ট্র।
৮. ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স বাতিলের চাপ (ধারা ৩.১)। বাংলাদেশ গুগল, ফেইসবুক বা অ্যামাজনের মতো টেক জায়ান্টদের ওপর কোনো ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স’ বসাতে পারবে না। এর ফলে এই কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করে নিয়ে যাবে, কিন্তু বাংলাদেশ সেখান থেকে কোনো ট্যাক্স পাবে না।
এই চুক্তি ধারা গুলো পড়ে অবুঝ মানুষ বুঝবে চুক্তিটি ‘একতরফা’। এখানে বাংলাদেশ শুল্ক সুবিধার বদলে নিজের নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা, বাজার সুরক্ষা এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বকীয়তা বন্ধক রাখছে। স্বল্পমেয়াদে কিছু সুবিধা মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
ইউনূসসহ দেশ বিরোধী এই চুক্তির সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের মুখোমুখি করতে হবে।
