সুনামগঞ্জ: কট্টরপন্থী, মৌলবাদীরা গান বাজনা, মেয়েদের খেলাধুলা, পড়াশোনা, চাকরি এসবের বিরুদ্ধে। এর নমুনা আমরা আগেও দেখেছি।
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে ওলামাদের আপত্তিতে মেয়েদের ফুটবল খেলা স্থগিত করা হয়েছে। মেয়েরা বোরখা পরে ঘরে রান্না করুক, স্বামী সেবা করুক, এটাই মেয়েদের কাজ- ওরা তাই মনে করে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) দিরাই স্টেডিয়ামে সিলেট ও স্থানীয় দুটি দলের মধ্যে প্রীতি ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।
স্থানীয় ওলামারা এটিকে ‘ইসলামবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে আয়োজকদের ম্যাচ বন্ধ করতে চাপ দেন। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌখিক অনুমতি দিলেও পরে আয়োজকরা খেলাটি বাতিল করে দেন।
ঘটনায় তীব্র সমালোচনা করেছেন তসলিমা নাসরিন।
তিনি ফেসবুকে লিখেছেন:
“মেয়েরা ফুটবল খেলতে চেয়েছিল। ধর্মের পাহারাদারেরা ধর্ম বাঁচাতে নেমে পড়লেন। মেয়েদের পায়ে একটা বল দেখেই যদি ধর্ম বিপন্ন হয়ে পড়ে, তবে সেই ধর্মের শক্তি নিয়ে এত বড় বড় বক্তৃতা দেওয়ার কী আছে?
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে মেয়েদের প্রীতি ফুটবল ম্যাচ স্থগিত হয়েছে স্থানীয় ওলামাদের আপত্তির মুখে। মেয়েদের খেলা নাকি ‘ইসলামবিরোধী’। মাওলানা শরিফ উদ্দিন নিজেকে ‘দিরাইয়ে ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি’র সভাপতি দাবি করেছেন ।
বাহ্, নিজেই কমিটি বানাবেন, নিজেই সভাপতি হবেন, নিজেই ঠিক করবেন এলাকার মেয়েরা কী করতে পারবে ! মেয়েদের জীবনের ওপর কর্তৃত্ব করার এমন সহজ ব্যবস্থা আর কোথায় পাওয়া যাবে?
একজন মেয়ে মাঠে দৌড়চ্ছে। তার গতি আছে, দক্ষতা আছে, জেতার ইচ্ছে আছে। এসবের কিছুই চোখে পড়ছে না এই ধর্মরক্ষকদের। তাঁদের চোখে পড়ছে অশ্লীলতা। মেয়েটির পরিশ্রম অদৃশ্য, প্রতিভা অদৃশ্য, দৃশ্যমান শুধু তার নারীশরীর। তারপর নিজের দৃষ্টিভঙ্গির দায়টিও তাঁরা চাপিয়ে দিচ্ছেন মেয়েটির ওপর।
চমৎকার বিচার! আপনি একজন খেলোয়াড়কে খেলোয়াড় হিসেবে দেখতে পারেন না বলে খেলোয়াড়টিকেই মাঠ ছেড়ে চলে যেতে হবে!
আর প্রশাসন? আয়োজকের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউএনও বলেছেন, আপত্তিকারীদের সঙ্গে সমঝোতা করে খেলতে হবে, নইলে খেলা স্থগিত করতে হবে। ইউএনও নিজেও দুই পক্ষকে সমঝোতা করতে বলার কথা স্বীকার করেছেন।
সমঝোতাটা কী নিয়ে হবে? মেয়েরা কতটা দৌড়তে পারবে? বল কত জোরে মারতে পারবে? মাঠের কতখানি তাদের জন্য বরাদ্দ হবে? নাকি মেয়েরা ক্ষমা চেয়ে বলবে, জন্মে ভুল হয়ে গেছে হুজুর, পরের বার ছেলে হয়ে জন্মালে খেলতে আসব?
একপক্ষ খেলতে চায়। অন্যপক্ষ তাদের খেলতে দিতে চায় না। প্রশাসন দুটো দাবিকে পাশাপাশি বসিয়ে বলছে, মিটমাট করে নাও। এভাবে বাধা দেওয়ার ক্ষমতাকেই সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
মেয়েদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তোমাদের ইচ্ছের চেয়ে তোমাদের বিরুদ্ধে ওঠা আপত্তির দাম বেশি।
মেয়েদের খেলতে হলে মেয়েদের খেলার বিরোধীদের অনুমতি নিতে হবে —এই ব্যবস্থায় প্রশাসন রাখার প্রয়োজন কী? মাঠের চাবিটা সরাসরি তাঁদের হাতে তুলে দিলেই তো হয়। সরকারি দপ্তরের বাইরে লিখে দিলেই হয়, ‘নারীর স্বাধীনতার আবেদন এখানে জমা দিয়ে লাভ নেই । স্থানীয় ধর্মীয় নেতাদের অনাপত্তিপত্র নিয়ে আসুন।’
এই পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধে, নিজের হুকুমের নিচে ধর্মের সিল মেরে দিতে পারে। তখন নারী আপত্তি করলেই সে ধর্মের বিরুদ্ধে। স্বাধীনতা চাইলেই বেয়াদব। মাঠে নামলেই অশ্লীল। একজন নারীকে নিয়ন্ত্রণ করার ইচ্ছেটুকুকে পবিত্র কর্তব্য বানিয়ে ফেলতে পারলে আর যুক্তি দেওয়ার দরকার হয় না।
ধর্মের নামে মেয়েদের আটকে রাখা কত সহজ, দেখুন। একটা আপত্তি তুলুন। কয়েকজন মিলে দপ্তরে যান। তারপর মেয়েদেরই বলা হবে সমঝোতা করতে। প্রতিবার এভাবে পিছিয়ে যেতে বাধ্য করা হলে মেয়েরা শিখবে, তাদের প্রতিভারও একটি সীমানা আছে। সেই সীমানা টেনে দেবেন এমন কিছু পুরুষ, যাঁদের জীবনের একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও এই মেয়েদের নেই।
কারও মেয়েদের ফুটবল খেলা দেখতে আপত্তি থাকলে তিনি দেখবেন না। নিজের চোখ সরিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতা তাঁর আছে। গোটা মাঠ থেকে মেয়েদের সরিয়ে দেওয়ার অধিকার কে দিয়েছে তাঁকে?
দিরাইয়ের ম্যাচটি নিরাপত্তা দিয়ে আয়োজন করা হোক। মেয়েরা মাঠে নামুক, খেলুক। প্রশাসন তাদের পাশে দাঁড়াক। নারীকে ঘরে ফেরত পাঠিয়ে এলাকায় শান্তি আছে ঘোষণা করার অভ্যাস বন্ধ হোক।
মেয়েদের অধিকার কেড়ে নেওয়ার পর যে নীরবতা নামে, সেটিকে শান্তি বলতে সুবিধে হয় শুধু তাদেরই, যাদের কোনও অধিকার খোয়া যায়নি”।
