ঢাকা: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে যে, বাংলাদেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে খেয়ালখুশিমতো শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে যে, তাঁরা সাবেক শাসক শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

শান্তিপূর্ণ মতাদর্শের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া—অথবা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া—আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সুরক্ষিত ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’ ও ‘সমাবেশের স্বাধীনতা’র অধিকারকে লঙ্ঘন করে।

এ ধরনের কর্মকাণ্ড অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে রাজনৈতিক মতামত ও অভিব্যক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করার সেই নিপীড়নমূলক প্রচেষ্টারই পুনরাবৃত্তি ঘটায়।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া বিষয়ক উপ-পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, “বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কেবল স্বৈরাচারীরাই এ ধরনের আলোচনাকে ভয় পায়; শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মাধ্যমে গঠিত কোনো সরকারের তা ভয় পাওয়ার কথা নয়।” তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের উচিত অতীতের নিপীড়নের অধ্যায়টি পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া—ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের অবস্থানের অদলবদল ঘটলেই যেন সেই নিপীড়নের পুনরাবৃত্তি না ঘটে।”

এইচআরডব্লিউর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চাকরিচ্যুতি, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতি, পাঠদানে নিষেধাজ্ঞা এবং একাডেমিক দায়িত্ব সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আর এমন ঘটনা যে সত্যিই ঘটছে তা তো আমরা দেশবাসীরা দেখেছি। শিক্ষককদের ওপর অমানিশা নেমে এসেছিলো। এমনকি বেছে বেছে হিন্দু শিক্ষককদের পদত্যাগ করানো হয়েছে। এবং অন্যান্য শিক্ষকদের ওপরেও মিথ্যা জুলুম হয়। জোর করিয়ে সাইন নেয়া থেকে শুরু করে মামলা, হামলা।

এসব ব্যবস্থার পেছনে যেসব অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সহিংস কর্মকাণ্ডে শিক্ষকদের সহযোগিতা, দলীয় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং ইসলামি পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ।

পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সদস্য বা সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত শত শত শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে, যার ফলে তারা উচ্চশিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এসব ঘটনার বিষয়ে শাস্তির মুখে পড়া এক ডজনের বেশি শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে এইচআরডব্লিউ।

পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন চিঠিপত্র, টেলিভিশন আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও পর্যালোচনা করেছে সংস্থাটি।

সাক্ষাৎকার ও নথিপত্রে শিক্ষার্থীদের বহিষ্কার, পরীক্ষার সনদ আটকে রাখা এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।

২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে এইচআরডব্লিউ জানিয়েছে, আওয়ামী লীগপন্থী একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্য হওয়ার অভিযোগে দেশের ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক সংস্থাটিকে জানান, ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান না নেওয়া আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষকদের মিথ্যা অভিযোগে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের ক্লাস নেওয়া এবং গবেষণার কাজ থেকেও বিরত রাখা হয়েছে।

এইচআরডব্লিউর তথ্যমতে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কর্তৃপক্ষ ৪৪ জন শিক্ষককে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়। আরও ২৫ জনের পাঠদানের দায়িত্ব সীমিত করা হয়।

তবে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য বিভাগীয় তদন্ত করা হয়নি।

পরবর্তী সময়ে একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ওই শিক্ষকদের মধ্যে ছয়জনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই ধরনের অভিযোগে আরও ১৪ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়েছে।

রাজধানীর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্তের পর ১২ জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং আরও ১০ জনকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দাবি, তদন্তের সময় আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।

এইচআরডব্লিউর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের ২০টিরও বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধেও এই ধরনের অন্যায় পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, আগের সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে সমর্থন করার কারণে কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা প্রমাণ করবে যে বাংলাদেশে মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা যথাযথভাবে সুরক্ষিত নয়।

তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত এমন একটি মুক্ত পরিসর, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নির্ভয়ে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে পারবেন। কোনো সময়ের ক্ষমতাসীন সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতে কাউকে বাধ্য করা বা ভিন্নমতের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া উচিত নয়।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *