ঢাকা: দোষী যারা তারা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, বরং আরো খুন করছে, মব করছে। আর একজন সাধুগুরু? তিনি বিনাদোষে কারাগারে।

একজন সন্ন্যাসীর প্রতি কি সরকারের একটু মায়া নাই? কত খুনিরা ছাড়া পেয়ে যায় আর নির্দোষী জেলে! এমন বিচার দেশে হলে হিন্দু যাবে কোথায়?

আবার এক একজন রাজাকার, জামাতির কথার ধারেই মনে হয় হিন্দুদের গলা কেটে যায়! ছিঃ!

চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন নামঞ্জুরের ঘটনায় তীব্রভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন লেখক তসলিমা নাসরিন।

আইনের চোখে হিন্দু মুসলমান সমান নয়- সেটা এই ঘটনায় আইন আবার প্রমাণ করে দিলো! বললেন তসলিমা নাসরিন।

ফেসবুকে তিনি লিখেছেন:

“বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ আবার প্রমাণ করল—এই দেশে আইনের চোখে সব নাগরিক সমান নয়। একজন মুসলিম মৌলবাদী বা জিহাদি বা সন্ত্রাসী প্রকাশ্যে ঘৃণা ছড়িয়েও জামিন পেয়ে যায়, কিন্তু একজন হিন্দু সাধুকে মাসের পর মাস জেলে পচতে হয়, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণই ভিত্তিহীন”।

চিন্ময় প্রভুর সাথে হওয়া ষড়যন্ত্রের কথা তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরো বলেন, “চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে আজও জামিন দেওয়া হলো না। অথচ আইনজীবী আলিফ হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি পুলিশের হেফাজতে ছিলেন। অর্থাৎ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার প্রশ্নই ওঠে না। হত্যার সরাসরি নির্দেশ দেওয়া, পরিকল্পনা করা, বা উস্কানি দেওয়ার কোনও সুস্পষ্ট প্রমাণও রাষ্ট্র দেখাতে পারেনি।

তথাকথিত “পতাকা অবমাননা” অভিযোগও দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেশের পতাকার ওপর গৈরিক পতাকা উত্তোলনের যে প্রচার চালানো হয়েছিল, তার পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সামনে আনা যায়নি। তবু তাঁকে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে না। কেন”?

“কারণ চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আসল “অপরাধ” তিনি বাংলাদেশের হিন্দুদের মনোবল বাড়াচ্ছিলেন। হিন্দুদের বলেছিলেন মাথা তুলে দাঁড়াতে, ভয়ে চুপ করে না থাকতে।

বাড়িঘরে হামলা, মন্দির ভাঙচুর, জমি দখল, নারী নির্যাতন, দেশ ত্যাগের চাপের মধ্যেও নিজেদের মানুষ বলে ভাবতে। এই আত্মমর্যাদাবোধই রাষ্ট্র ও সাম্প্রদায়িক মুসলিমদের কাছে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশে হিন্দুরা বহুদিন ধরেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো বেঁচে আছে। নির্বাচন এলেই হামলা, গুজব ছড়ালেই মন্দির পোড়ানো। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো মাঝে মাঝে রিপোর্ট লেখে, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সবসময়ই নীরবতা পালন করে। কারণ হিন্দুদের পক্ষে দাঁড়ানো এখানে ভোটের রাজনীতি নয়।

মুহাম্মদ ইউনুস ক্ষমতায় আসার পর অনেকেই ভেবেছিল অন্তত একটি মানবিক, উদার, অসাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈরি হবে।

কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে, অমানবিক, অনুদার, সাম্প্রদায়িক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তার ওপর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের ঘটনায় রাষ্ট্র এমন বার্তা দিচ্ছে যেন হিন্দুরা সংগঠিত হতে পারবে না, প্রতিবাদ করতে পারবে না, নিজেদের অধিকার নিয়েও উচ্চকণ্ঠ হতে পারবে না। অথচ সংখ্যালঘুদের সংগঠিত হওয়ার অধিকারও গণতান্ত্রিক অধিকার।

সবচেয়ে ভয়ংকর হলো—প্রমাণের অভাব সত্ত্বেও তাকে জেলে আটকে রাখার মধ্যে প্রতিশোধপরায়ণতার গন্ধ স্পষ্ট। আইনের শাসনে জামিন একটি অধিকার, শাস্তি নয়। কিন্তু বাংলাদেশে এখন জামিনকেও রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো হচ্ছে। আগে মামলা, তারপর দীর্ঘ কারাবাস—প্রমাণ থাক বা না থাক।

তারেক জিয়ার রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিএনপি অতীতে নিজেদের গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু আজ যদি একজন নিরীহ হিন্দু সাধুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অন্যায় যে হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে তাঁর সরকার নীরব থাকে, তাহলে মানুষ প্রশ্ন করবেই—ক্ষমতায় এসে তারাও একই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতি শুরু করেছে কেন? এ তো নিশ্চিতই গণতন্ত্রের বিপক্ষের নোংরা রাজনীতি ছাড়া কিছু নয়।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিক। এই দেশে একজন মুসলমান ধর্মীয় নেতা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে বিষ ছড়ালে তাকে “আলেম” বলা হয়, কিন্তু একজন হিন্দু ধর্মীয় নেতা নিজের সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কথা বললেই তাকে “উস্কানিদাতা” বানানো হয়।

চিন্ময় কৃষ্ণ দাস আজ শুধু একজন ব্যক্তি নন। তিনি বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের প্রতিরোধেরও প্রতীক। তাকে জেলে রেখে রাষ্ট্র হয়তো একজন মানুষকে আটকে রাখতে পারবে, কিন্তু যে প্রশ্ন তিনি তুলেছেন —বাংলাদেশে কি সব নাগরিকের অধিকার সমান? —সেই প্রশ্ন কিন্তু রয়েই যাচ্ছে?

আমরা অবশ্য এর উত্তর জানি। উত্তরটি হলো, বাংলাদেশে সব নাগরিকের অধিকার সমান নয়। অমুসলিম, মুক্তচিন্তক, সমকামী, নাস্তিক, এবং নারীরা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত”।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *