ঢাকা: গোটা জুলাই অন্দোলনটাই ভুয়া, ষড়যন্ত্র, ডিপ স্টেটের খেলা। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রকাশ।‌যা দেখেছি তা তো বলতেই হবে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এর আগেও বহু মিথ্যা হত্যা মামলা তুলে নেয়া হয়েছে। এবারো আরেক মিথ্যা ধরা পড়লো!

জুলাই আন্দোলনের সময় শরীরে নয়টি গুলি লেগে আহত হওয়ার অভিযোগ এনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন নূর হোসেন নামের এক যুবক।

তবে পুলিশি তদন্তে‌ কী দেখা গেছে জানেন? তিনি আহতই হননি। পুরো সুস্থ ব্যক্তি।

মামলায় দেওয়া তাঁর চিকিৎসার কাগজপত্রও ‘ভুয়া’ বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

এই মামলার আসামিদের মধ্যে আটজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়, যারা আগেই অন্য মামলায় গ্রেপ্তার ছিলেন। তবে তদন্ত শেষে শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

ঘটনা এটাই নতুন নয়, এরকম আগেও হয়েছে। অনেকে নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে মামলা তুলে নিয়েছেন।

একটি উদাহরণ দেই: ৫ অগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন ছাত্র-জনতার বিজয় মিছিল চলাকালীন আওয়ামী লীগের দুষ্কৃতীদের গুলিতে স্বামী নিহত হয়েছেন উল্লেখ করে এক মহিলা শেখ হাসিনা-সহ ১৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিলেন।

তিন মাস পরে তাঁর স্বামী খোদ থানায় এসে হাজির হয়ে জানান, তাঁর অজান্তে স্ত্রী তাঁকে ‘মৃত’ দেখিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে অভিযোগ দায়ের করেছেন!

নূর হোসেনের ঘটনাটিতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুর থানার এসআই উক্যমং রাখাইন আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন।

বাদী নাকি ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট দিয়ে মামলা করেছিলেন।

মোহাম্মদপুর থানার এসআই সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, “বাদী ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট দিয়ে মামলা করেছেন। আসামিদের মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।”

আসামিদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওইভাবে কাউকে মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়নি। অন্য মামলায় তারা কারাগারে ছিলেন।

“পরে তাদের এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।”

বাদীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, এ বিষয়ে বলেন, “আমাদের তরফ থেকে এমন কিছু করা হয়নি। আদালত চাইলে ব্যবস্থা নিতে পারেন।”

উল্লেখযোগ্য যে, এই মামলায় গত বুধবার শুনানির দিন ধার্য ছিল। সেদিন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে তদন্ত প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়।

প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মিজানুর রহমান বলেন, “আদালত চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি দেখেছেন। বাদীর প্রতি নোটিস ইস্যু করার আদেশ দিয়েছেন। আগামী ১ ডিসেম্বর শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।”

মামলায় অব্যাহতির সুপারিশ করা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, সাবেক সহসভাপতি সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, মিলন হোসেন, মহিলা লীগ নেত্রী ইসরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকার।

বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ‘চিকিৎসা নেওয়ার’ কাগজ জমা দিয়েছিলেন নূর। কিন্তু সেটা ছিলো ভুয়া।

তদন্তে দেখা যায়, তিনি ওই হাসপাতালে কোনো চিকিৎসকের কাছেই চিকিৎসা নেননি। সব সাজানো।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মামলায় যুক্ত করা হাসপাতালের কাগজপত্রগুলো ওই প্রতিষ্ঠানের নয়। এর পক্ষে দুটি অসংগতির কথা জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

এছাড়াও নূর হোসেনের ব্যবহৃত ক্যাশ মেমো নম্বর দিয়ে ওই হাসপাতালে ৫৪ বছর বয়সি আব্দুস সাত্তার নামে একজন চিকিৎসা নিয়েছেন।

অন্যদিকে তিনি যে আইডি নম্বর ব্যবহার করেছেন, সেটিতে ৩২ বছর বয়সি জুয়েল নামে আরেকজন রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে।

এবং জুলাই অভ্যুত্থান-২০২৪-এ আহতদের গেজেটেও নূরের নাম নেই।

শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পুরোটাই যে ষড়যন্ত্র, তা তো প্রকাশ পেলোই।

এ মামলার আসামি মিলন হোসেনের আইনজীবী এ এইচ এম হাসিবুজ্জামান হাসিব বলেন, “শুধু এ মামলার ক্ষেত্রে না, বিভিন্ন সময়ে এমন মামলা দেখা গেছে। বিষয়টি আমরা আদালতে উপস্থাপন করব।
“রাজনৈতিক চাপ, ফায়দা নেওয়ার জন্য মামলায় আসামি করা হয়। একজন না, শত শতজন এমনভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন, এমনটা আমরা পত্র-পত্রিকায় দেখেছি।”

আরো যেমন, চট্টগ্রাম মহানগরীর কোতোয়ালি থানায় শেখ হাসিনাকে প্রধান আসামি করে দায়ের করা হত্যাচেষ্টা ও সহিংসতার মামলাও প্রত্যাহার করা হয়েছে এর আগে। এরকম উদাহরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না।

মামলার নথি ও আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম রাশেদ চৌধুরীর মন্তব্য সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের উত্তাল পরিস্থিতিতে কফিল উদ্দিন বাদী হয়ে শেখ হাসিনাসহ ১৮৭ জনের নাম উল্লেখ এবং আরও ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে কোতোয়ালি থানায় এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন।

পরে পুলিশ ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত চালিয়ে মামলায় আরও প্রায় শতাধিক আসামির নাম যুক্ত করে।

কিন্তু পরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে বাদী কফিল উদ্দিন নিজেই আদালতে উপস্থিত হয়ে মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে জবানবন্দি দেন।

​আসামিপক্ষের আইনজীবী এস এম রাশেদ চৌধুরী বলেন, “বাদী মোঃ কফিল উদ্দিন সাহেব তার আবেগী ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের ভুল বুঝতে পেরে আইনগতভাবে মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। উত্তপ্ত পরিস্থিতির অবসান ঘটায় আগামী দিনগুলোতে অনেকেই হয়তো তাদের ভুল বুঝতে পেরে এমন পথ অনুসরণ করবেন”!

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *