ঢাকা: “আমরা কত মর্মান্তিক খবর দেখি! মিরপুরের এক ফ্ল্যাটে এক সত্তরোর্ধ্ব মহিলা মরে পচে গলে পড়ে রইলেন। তাঁর সন্তানরা—কেউ সচিব, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ অধ্যাপক—কেউ তাঁর খোঁজ নেননি”। এই দুঃখপ্রকাশ তসলিমা নাসরিনের।
তিনি বলছেন মিরপুরের একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা।
মিরপুরে একটি ফ্ল্যাট থেকে নুরজাহান বেগম (৭৫) নামে এক বৃদ্ধার পচাগলা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মৃত্যুর অন্তত সাত থেকে আট দিন পর তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
রবিবার রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে মিরপুর-১১ এলাকার ৬ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ রাজধানীর মর্গে পাঠানো হয়।
পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান বাসির জানান, নুরজাহান বেগম তাঁর মেয়ের বাসায় বাস করতেন। তবে তিনি আলাদা একটি কক্ষে থাকতেন। কয়েকদিন ধরে কোনো সাড়া না পেয়ে তার মেয়ে একজন নার্সকে ডাকেন। নার্স কক্ষে প্রবেশ করে বৃদ্ধাকে মৃত অবস্থায় দেখতে পান।
পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়।
পুলিশ জানায়, দীর্ঘ সময় মরদেহ পড়ে থাকায় সেটিতে পচন ধরেছিল এবং পুরো কক্ষে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছিল।
আর যে ঘরে তিনি থাকতেন সেটি ছিল অত্যন্ত অপরিচ্ছন্ন ও অগোছালো। ঘরে আবর্জনা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। অর্থাৎ যে মা কষ্ট করে সন্তানকে লালন পালন করলেন, তাঁকে ফেলে রাখা হয়েছে ডাস্টবিনের মধ্যে। হায়রে কপাল!
নুরজাহান বেগমের তিন ছেলে সমাজে প্রতিষ্ঠিত অবস্থানে রয়েছেন। তাদের একজন সরকারের একজন যুগ্ম সচিব, একজন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষক এবং অন্যজন কানাডাপ্রবাসী। এছাড়া তার মেয়ের স্বামীও একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন।
লেখক তসলিমা ঘটনাটিতে অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। তিনি বলেন, “ফ্ল্যাটের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, তিনি বহু বছর ধরেই একা বাস করছিলেন। কোনও নার্স নেই, আয়া নেই, ঘরদোর পরিষ্কার করার লোক নেই, রান্না করে দেওয়ার কেউ নেই। একা, অসহায়, নিঃসঙ্গ—একজন মানুষ ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে হেঁটে গেছেন।
এই মহিলা যদি কোনও ভালো বয়স্ক-ভবনে থাকতেন, তাহলে হয়তো তাঁকে এভাবে মরতে হতো না। তাঁকে দেখাশোনা করার জন্য ছেলে-মেয়ে না থাকলেও ডাক্তার থাকতেন, নার্স থাকতেন, কেয়ারগিভার থাকতেন, সমবয়সী বন্ধু থাকতেন, শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষ থাকতেন”।
এই প্রসঙ্গ ধরেই নিজের কথা টানলেন নাসরিন। বলেন, “আমি মৃত্যুকে উদ্যাপন করতে চাই না; আমি চাই জীবনকে উদ্যাপন করতে। মানুষ অন্তত যতদিন বেঁচে আছে, ততদিন যেন তার বেঁচে থাকাটা দুর্বিষহ না হয়।অনেক আগেই আমাদের এমন একটি সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলা উচিত ছিল, যেখানে বয়স্ক মানুষ যত্নে, আদরে, সেবায় শুশ্রুষায়, নিজের শর্তে থাকতে পারেন।
“বৃদ্ধাশ্রম” শব্দটির সঙ্গে আমাদের সমাজে এক ধরনের অপরাধবোধ, করুণা, কিংবা পরিত্যক্ত হওয়ার যন্ত্রণা জড়িয়ে আছে। যেন বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া মানেই ছেলে-মেয়ের ভালোবাসা না পাওয়া, সংসার থেকে নির্বাসিত হওয়া।
কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে। পরিবার বদলেছে। বাস্তবতাও বদলেছে। তাই বার্ধক্য নিয়ে আমাদের ভাবনাও বদলানো দরকার।
সবাই কি বার্ধক্যে ছেলে-মেয়ের সংসারে সুখে থাকে? থাকে না। বয়স হলে শরীর দুর্বল হয়, অসুখ বাড়ে, নির্ভরতা বাড়ে। ছেলে-মেয়েদেরও নিজেদের জীবন, কাজ, সংসার, সন্তান, ব্যস্ততা, মানসিক চাপ থাকে।
এই বাস্তবতায় বহু প্রবীণ মানুষ একসময় অনুভব করেন—তিনি আর প্রয়োজনীয় নন। কেউ মুখে কিছু না বললেও, আচরণে বুঝিয়ে দেয়। এই অনুভূতি ভয়ংকর অপমানের।
উন্নত বিশ্বের বহু দেশে আধুনিক সিনিয়র লিভিং হোম বা কেয়ার হোম রয়েছে—যেখানে ২৪ ঘণ্টা ডাক্তার, নার্স, কেয়ারগিভার, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, ওষুধপত্রের ব্যবস্থা আছে।
শুধু চিকিৎসাই নয়—আছে বই পড়া, গান শোনা, সিনেমা দেখা, ব্যায়াম করা, বাগান করা, আড্ডা দেওয়া, খেলাধুলা করা আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করার আয়োজন।
মানুষ সেখানে শুধু বেঁচে থাকে না, জীবনযাপন করে। সমবয়সী বয়স্কদের সঙ্গে গল্প করে, আনন্দ করে, বন্ধুত্ব গড়ে।
আমাদের সমাজে এখনও ধারণা—ছেলে-মেয়ের জন্য নিজের সবকিছু উজাড় করে দিতে হবে; নিজের জন্য কিছু সঞ্চয় রাখা স্বার্থপরতা ছাড়া কিছু নয়। এই ধারণা বদলানো দরকার।
মানুষের নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের চিকিৎসা, নিজের স্বাধীনতা, নিজের মর্যাদার জন্যও সঞ্চয় করা উচিত।
আমি বলছি না যে সবাইকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে হবে। যাঁরা থাকতে চান না, থাকতে গিয়ে অবহেলা, অপমান কিংবা নিঃসঙ্গতার শিকার হন—তাঁদের জন্য উন্নত, মানবিক মর্যাদাপূর্ণ ওল্ড হোম থাকা জরুরি।
বৃদ্ধাশ্রমকে আমরা পরিত্যাগের প্রতীক বানাবো কেন? এটিকে বরং স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিকতা ও মর্যাদার জায়গা বানাবো।
বার্ধক্য অপরাধ নয়। নির্ভরতা লজ্জার নয়। লজ্জার হলো—সারাজীবন পরিবার আর সন্তানদের জন্য নিজের সবকিছু উজাড় করে দেওয়ার পর জীবন সায়াহ্নে অবজ্ঞা, অবহেলা আর অপমান পাওয়া।
আধুনিক, মানবিক, মানসম্মত ওল্ড হোম তৈরি হোক। বয়স্করা যেন মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেন, নিজের স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারেন। সন্তানরা দেখা করতে চাইলে এসে দেখা করবে। কিন্তু একজন বৃদ্ধ মানুষের বেঁচে থাকার জন্য সন্তানের দয়া নয়,—প্রয়োজন সম্মান, নিরাপত্তা, সঙ্গ, এবং একটি মানবিক সমাজ”।
