ঢাকা: মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান বরাবর স্পষ্টবাদী, স্পষ্টভাষী। তিনি কোনোদিন কথা বলতে ভয় পান না।

এবারো কঠিনভাবে মুখ খুললেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা নিয়ে আগেও বলেছেন তিনি। এবারো বললেন।

‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কীসের লেখাপড়া? এখানে তো কারও ভর্তি হওয়া উচিত না। এটাতো মাদ্রাসা একটা, সিনিয়র মাদ্রাসা। অমানুষদের একটা জায়গা হয়েছে এটা। কী দরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার?’

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এসব মন্তব্য করেছেন বিএনপির সংসদ সদস্য মো. ফজলুর রহমান।

বিশ্ববিদ্যালয়টির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যে প্রতিষ্ঠান একসময় বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে, সেখানে এখন স্বাধীনতাবিরোধীদের ছবি টাঙিয়ে তাদের জাতির নেতা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে পাকিস্তান। আজকে যাই হোক সেই দিনের আন্দোলনের কথাই আমি বলছি।

তিনি বলেন, ‘যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে শিক্ষায় মুক্তি, সেই ১৯২৭ সন, ১৯২৮ সন, ১৯২৯ সন, ১৯৩০ সন, আব্দুল ওহাব, আবুল হোসেনসহ সমস্ত কবি-সাহিত্যিক যারা ছিল। তাদের জন্ম দিয়েছে এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের জন্ম দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে সেই মুজাফর আহমদ চৌধুরীদের মতো লোক। নীলিমা ইব্রাহিমদের মতো লোক, ড. নাজমা চৌধুরীর মতো লোক। যত আছে সেই আহমদ শরীফদের মতো লোক হুমায়ন আজাদদের মতো লোক, হুমায়ন আহমদদের মতো লোক।’

স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন স্বাধীনতাবিরোধী অমানুষদের একটা কারখানা। কী দরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসারি করার? যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গোলাম আজম, নিজামীর ছবি টাঙানো হয়, এরাই নাকি জাতির নেতা। সেই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তো চিন্তাই করি না আমি।’

দেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভুলে যাওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, ‘চিন্তা করতে পারতাম, যদি সেই বাঙালি জাতি একদিন মনে করত, আমাদের নেতার নাম ছিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। আমাদের নেতার নাম ছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। আমাদের নেতার নাম ছিল নেতাজি সুভাষ বোস। আমাদের শহীদের নাম ছিল ক্ষুদিরাম, আমাদের শহীদের নাম ছিল সূর্য সেন।’

ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণ করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘যদি একবার মনে করতে পারতাম, আমাদের ভাষা আন্দোলনের শহীদ, মা বলার স্বীকৃতি যারা দিয়ে গেলেন, তাদের নাম ছিল বরকত, সালাম, রফিক, জব্বার। যদি আজও মনে করতে পারেন, এই যে বাঙালির ছেলেরা, যাদের ভীরু বাঙালি বলা হয়, ’৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধের ডাক এলো, সেদিন যারা বাবাকে-মাকে কাঁদিয়ে, বাবার বাহুবন্ধন উপেক্ষা করে কেউ গিয়েছিলাম ত্রিপুরার পাহাড়ে, কেউ গিয়েছিলাম মেঘালয়ের পাহাড়ে, কেউ গিয়েছিলাম কলকাতা, জলপাইগুড়ি, কোচবিহারে।’

আরো বলেন, ‘আমরা যারা দেরাদুনে ট্রেনিং নিয়েছিলাম, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টিতে যারা যুদ্ধ করেছিলাম, সেই সন্তান যদি আবার বাংলায় আসে, তাহলে এটার নাম হবে বাংলাদেশ। না হলে এখানে অমানুষরা জিতে যাবে। আমরা সব ইতিহাসের জঞ্জাল এবং কঙ্কালে পরিণত হবো।’

ভীষণ হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, ‘আমি আপনাদের আশীর্বাদে আর পাঁচটা বছর বাঁচতে চাই। আমি বাংলাদেশটাকে দেখে যেতে চাই, এটা কি বাঙালির বাংলাদেশ থাকবে, নাকি রাজাকারদের পাকিস্তান? এটা আমি দেখে যেতে চাই এবং এটার জন্য শেষ যুদ্ধটা করে যেতে চাই।’

মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অসম্মানের বিষয়ে অভিযোগ তুলে ফজলুর রহমান বলেন, ‘স্বাধীনতাবিরোধীরা যারা এখন সাহসী হয়ে উঠছে বা তাদের সংখ্যা বেড়ে গেছে, তারা এখন আমাদের হয়তো গুলি করে মেরে ফেলবে। প্রথম ফার্স্ট টার্গেট ফজলুর রহমান টু কিল হিম উইথ অ্যা শট অব অ্যা বুলেট। কিন্তু অসহায় মুক্তিযোদ্ধা মরলে এ দেশে কবরও পাবে না, যেটা প্রমাণ হচ্ছে এ দেশে। আমার নিমদা তো অন্তত তার দাহটা পেয়েছেন শ্মশানে গিয়ে। আমি নাও পেতে পারি কবর। দেশটা এই জায়গায় চলে গেছে।’

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *