ঢাকা: এই দেশে সুরের ওপর আঘাত বহুবার হয়েছে। এবং ২০২৪, ৫ আগস্টের পর দেশের শিল্পীদের অবস্থা আরো করুণ হয়ে যায়।
সুরের উপর অসুরদের প্রথম আঘাত এসেছিলো রাহুল আনন্দের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার মাধ্যমে। তাঁর নিজস্ব উদ্ভাবন সুরের সংগ্রহ জ্বালিয়ে দিয়েছিলো জুলাই জেহাদিরা।
সেই থেকে দেশ হয়ে গেল সুরহীন। তারপর একে একে আক্রান্ত হলো বাউল ফকির মাজার নাটক ছায়ানট উদীচী।
তবে আমরা দেখেছি কে লালবাজারের ভূমিকায় ছিলো, কে শেখ হাসিনার উৎখাতে তালে তাল মিলিয়েছিলো। অবশ্য অনেকে না বুঝেই তালে তাল মিলিয়েছিলো। এবং তারপর বুঝেছে আসল অবস্থা।
রাহুল আনন্দও বেশ উৎসাহ নিয়ে বাংলাদেশের জুলাই আন্দোলনে মোল্লাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে উৎখাত করার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
আন্দোলন যেদিন সফল হয় তাঁর সাথে সাথেই জামাতি এবং বিএনপি মোল্লারা এর ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়। তিনি বুঝতেই পারেননি, কী করছেন!
তাঁর ঘরের কোটি টাকার বাদ্যযন্ত্র নিমেষে পুড়ে ছাই হয়। তিনি প্রাণ ভয়ে পালান।
তাই দেখুন, দুধ দিয়েছেন সাপকে। সেই সাপ আপনাকে কামড়ে রক্ত বের করেছে! দেশের বহু মানুষ পরে বুঝতে পেরেছেন আসলে তারা কী ভুল করেছেন! ওটা কোনোদিনই কোটা আন্দোলন ছিলো না। জনগণের ব্রেন ওয়াশ করে, দেশভক্তি গান লাগিয়ে রক্ত গরম করে ওরা শুধু জমায়েত বাড়িয়েছে এবং নিরীহ মানুষদের মেরে ফেলেছে! জেহাদি জেহাদিই হয়!
জুলাই আন্দোলনের পরে আওয়ামী লিগের কর্মীদের থেকে অনেক বেশী আক্রমণ হয় হিন্দুদের উপর।
শেখ হাসিনা দেশত্যাগের পরই হামলা চালানো হয় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে। সেদিনই আগুনে পুড়ে ছাই হয় ‘জলের গান’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং সঙ্গীতশিল্পী রাহুল আনন্দের বাড়ি।
বঙ্গবন্ধু মিউজিয়ামের পাশেই থাকা সেই বাড়িতেও হামলা চালিয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়।
‘জলের গানে’র তরফে জানানো হয়েছিল, সেই আগুনে পুড়ে যায় রাহুলের নিজের হাতে বানানো তিন শতাধিক বাদ্যযন্ত্র। লুটপাট করা হয় এই শিল্পীর বাড়ির জিনিসপত্র। স্ত্রী-পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে এক কাপড়ে ঘর ছাড়তে হয় তাঁকে। এই ঘটনা নিয়ে তারপরে অনেকেই অনেক কথা বলেন।
যাই হোক- জুলাই আসতেই অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করলেন রাহুল আনন্দ। ফেসবুকে লিখেছেন:
“দ্বিতীয় বার আগুনের ভেতর থেকে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বের হয়েছি এই দিন,৭আগষ্ট,২০২৪। জ্বি, ঠিকই পড়েছেন ২য় বার। সে সময়টায় কোথাও আশ্রয় পাচ্ছিলাম না।
সবাই কেমন ভয়ে কিম্বা দ্বিধায় আমাদের নিতে চাইছিলো না। মানুষের উর্ধ্বে উঠে এক বন্ধু রাত ২.৩০ মিনিটে তার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলো, আশ্রয় দিয়েছিলো ৫ আগষ্ট!
দুই দিনও টিকেনি সেই আশ্রয়। বিল্ডিংয়ের নিচের কলাপ্সিবল গেট তালা আটকে আগুন দিয়েছিলো। আমরা ছিলাম তৃতীয় তলায়। গ্যারেজে দুইটা গাড়িতে ও ২য় তলায় আগুন দিয়েছিলো। বাঁচবো ভাবিনি। বন্ধুর কন্যা আর নিজের স্ত্রী-পুত্রের হাত ধরে মৃত্যুর জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম আমরা !
দাঁড়ানোও যাচ্ছিলো না ফ্লোর এতোটাই গরম হয়ে উঠছিলো। সেদিন জেনেছি – সবচেয়ে বড় আর ভয়ংকর দৈত্যের নাম “ধোঁয়া”!!!
কালো ভারী ধোঁয়ায় নীল হয়ে গিয়েছিলো আমার শিশুপুত্র। টের পাচ্ছিলাম দমের সাথে ধোঁয়া ঢুকে শ্বাসনালী পুড়িয়ে দিচ্ছিলো, ভেতরটা তীব্রভাবে জ্বলছিলো। বন্ধুকন্যার ভীষণ সাহসে ভর করে অলৌকিক ভাবে বেঁচে যাই সেদিন! এই মেয়ের কাছে আমার সারাজীবনের ঋণ। তাকে বন্ধুকন্যা না ভেবে এখন নিজের কন্যা ভাবি।
সেই ভয়ংকর কালো ধোঁয়ার ভেতর একটা সংলাপ শুধু কানে গাঁথছিলো। আমার স্ত্রী উর্মিলা ফ্যাঁস-ফ্যাঁসে, গোঁঙানোর মতো বলছিলো – “রাহুল, আমি আর পারছিনা!”
সেখান থেকে বন্ধুরা (যে কয়জন তখনও মানুষ ছিলো) এসে নিয়ে যায় অন্য আশ্রয়ে…
সেই থেকে এখন পর্যন্ত নবম আশ্রয়ে আছি।
ঘর বাঁধিনি এখনো… উড়ছি আর ঘুরছি। পৃথিবী দেখছি… বাউলের বেশে… মানুষ ভালোবেসে……………….. (চলবে)”!
তিনি আরো লেখেন, “এই প্রথম লিখতে শুরু করেছি, সব লিখবো। যা লিখবো সত্য লিখবো – এই ফেসবুক আদালতে। তাতে অনেকের অপ্রিয় হবো সন্দেহ নেই। তবুও সত্যটুকু না জানালে – দায়ী থাকবো আমার পূর্ব পুরুষ আর আগামী প্রজন্মের কাছে”।
