ঢাকা: বাংলাদেশে প্রেম ও রোমান্সনির্ভর নাটক-সিনেমা নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের দাবিতে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

অথচ একটাবার এই ওরাই বলে না ধর্ষণ, খুন বন্ধ হতে হবে। মাদ্রাসায় হুজুরদের বলাৎকার বন্ধ করতে হবে। এগুলো তো শুধু সমাজ ধ্বংস করছে না, সমাজের শিশু তথা আগামি প্রজন্মকে সরাসরি পঙ্গু করছে, মারছে! তাদের শকুনের নজর পড়ে শুধু বাংলা সংস্কৃতি, কৃষ্টি, নাটক, সিনেমা এইসবে।

এই ঘটনার তীব্র বিরোধিতা করেন নারীবাদী লেখক তসলিমা নাসরিন।

তিনি বলেন, প্রেমের নাটক সিনেমা বন্ধ করার জন্য মুক্তি দেখানো হয়েছে—”এগুলো নাকি যুবসমাজকে বিপথে নিচ্ছে, পারিবারিক মূল্যবোধ নষ্ট করছে, এমনকি পরকীয়া ও ধর্ষণ বাড়াচ্ছে।

প্রেমের সঙ্গে ধর্ষণের সম্পর্ক টানা শুধু অযৌক্তিক নয়, বিপজ্জনকও। প্রেমে সম্মতি আছে, ধর্ষণে নেই। ধর্ষণ কমাতে হলে প্রেমের গল্প নিষিদ্ধ করতে হয় না; শেখাতে হয় সম্মতি, নারী-পুরুষের সমান অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা।

দরকার কার্যকর আইন, দ্রুত বিচার, যৌনশিক্ষা এবং নারীর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। এসব কঠিন কাজ না করে সিনেমাকে দায়ী করা খুব সহজ”।

তসলিমা নাসরিন আরো বলেন, ” উদ্বেগের বিষয় হলো, কোন বিষয় নিয়ে নাটক-সিনেমা হবে সেটিও যেন এখন ঠিক করে দিতে হবে। বলা হচ্ছে প্রেম বাদ দিয়ে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ বা প্রতিরক্ষা নিয়ে ছবি বানাতে হবে।

অবশ্যই এসব নিয়ে ছবি হোক। কিন্তু বিজ্ঞান নিয়ে ছবি বানাতে প্রেমের ছবি বন্ধ করতে হবে কেন? শিল্পীকে রাষ্ট্র যদি বলে দেয়—আজ এই বিষয় নিয়ে সৃষ্টি করো, ওই বিষয় নিয়ে করো না—তাহলে সেটি আর স্বাধীন শিল্প থাকে না, প্রোপাগান্ডায় পরিণত হয়।

আজ বলা হবে প্রেমের নাটক বন্ধ করো। কাল বলা হবে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক দেখানো যাবে না। তারপর যৌনতা, ধর্ম, পরিবার, রাষ্ট্র—একটির পর একটি বিষয় নিষিদ্ধ হতে থাকবে। সেন্সরশিপের ইতিহাস সাধারণত এভাবেই এগোয়।

কোন নাটক ভালো, কোন সিনেমা বাজে, কোথায় অতিরিক্ত প্রেম—তার বিচার দর্শক করবে। ভালো না লাগলে দেখবে না। কিন্তু আমি দেখতে চাই না, তাই তোমাকেও দেখতে দেব না—এটি নৈতিকতা নয়; এটি কর্তৃত্ববাদ।

শিশুদের জন্য বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস থাকতে পারে, সতর্কতা থাকতে পারে। কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কী দেখবে, কী লিখবে, কী ছবি বানাবে—রাষ্ট্র তার অভিভাবক নয়।
প্রেম মানুষের সমস্যা নয়।

স্বাধীন মানুষের জীবন, শিল্প আর কল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করার বাসনাটিই সমস্যা”।

প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী উক্ত নোটিশ পাঠান। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের চেয়ারম্যানকে বিবাদী করা হয়েছে।

নোটিশে বলা হয়, সাম্প্রতিক নাটক ও চলচ্চিত্রে অতিরিক্ত প্রেম-রোমান্স এবং পরকীয়া বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ককে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা বেড়েছে।

এর ফলে পারিবারিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা থেকে মনোযোগ সরে যাচ্ছে। এছাড়া অনৈতিক সম্পর্কের অবাধ প্রদর্শনী সমাজে অপরাধ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখছে।

সংবিধানের ২১(১), ২৩ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের বরাত দিয়ে নোটিশে তরুণদের মেধা ও নৈতিক বিকাশের জন্য বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিরক্ষাভিত্তিক বিনোদন কনটেন্ট নির্মাণের তাগিদ দেওয়া হয়।

নোটিশ পাওয়ার ১০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট পিটিশন করা হবে বলে জানান নোটিশকারী আইনজীবী।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *