ঢাকা: শুরু হয়ে গিয়েছে সনাতনীদের সবচাইতে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা‌। আগামিকাল মহাষষ্ঠী। সাজ সাজ রব চারপাশে।

শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা শুভেচ্ছা জানিয়েছেন সনাতনীদের।

তিনি যা বলেন:

“শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীকে আমি আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। সকলের জীবনে শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।

দুর্গাপূজা কেবলমাত্র সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসবই নয়, এটি আবহমান বাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন। অশুভ শক্তির বিনাশ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্যের বিজয় এবং কল্যাণ ও সুন্দরের আরাধনাই শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল শিক্ষা।

মা দুর্গা শক্তি ও সাহসের প্রতীক। এই উৎসব তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্যায় যত প্রবলই হোক, শেষ পর্যন্ত সত্য ও শুভ শক্তিরই জয় হয়।

বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে বসবাস করবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা সেই আদর্শের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা, সমতা, মানবিক মর্যাদা এবং প্রত্যেক নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের অধিকার স্বীকৃত রয়েছে।

আমি সবসময় বলেছি, ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। এই দেশ আমাদের সকলের।
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার সঙ্গে বলতে হচ্ছে, এবারের দুর্গোৎসব এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে”।

তিনি বলেন, “৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর থেকে এখন পর্যন্ত দেশব্যাপী সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হত্যা, নির্যাতন, প্রতিমা ভাঙচুর, মন্দির ও বাড়িঘরে হামলা, সম্পত্তি দখল, চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের একের পর এক ঘটনা ঘটে চলেছে।

এই পরিস্থিতি শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর এই ভয়ের সংস্কৃতির সূত্রপাত হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগকে নিধনের মাধ্যমে।

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়গুলো ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে।

নেতাকর্মীদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, জমি, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগির খামার, মাছের খামার ও ফলের বাগানকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষের ওপর হত্যা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, হয়রানি ও সহিংসতা আজও অব্যাহত রয়েছে।

একদিকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নির্বিচার ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার খুনি, হামলাকারী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির জন্য দায়মুক্তির পরিবেশ তৈরি করেছে।

ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না করে অপরাধীদের রক্ষা করার ফলে আইনের শাসন দুর্বল হয়েছে, সহিংসতাকারীরা উৎসাহিত হয়েছে। এর ফলে সংখ্যালঘু, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, এমনকি সাধারণ নাগরিকেরাও ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

পরবর্তীতে অংশগ্রহণহীন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় এলেও এই বিপজ্জনক ধারার কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং একই দায়মুক্তি, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও ভয়ের সংস্কৃতি একই ধারায় অব্যাহত রয়েছে।

রংপুরের সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীকে পরিবারসহ নির্মমভাবে হত্যার ঘটনার কোনো বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু তদন্ত হয়নি, বরং দ্রুত ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য একটি জজ মিয়া নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে।

ভালুকার দীপু চন্দ্র দাসকে প্রকাশ্য দিবালোকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ও আত্মস্বীকৃত আসামিরা জামিন পেয়েছে।

অন্যদিকে, মিথ্যা মামলায় প্রায় দুই বছর ধরে আটক চিন্ময় প্রভু বারবার আবেদন করেও তাঁর অসুস্থ মাকে শেষবারের মতো দেখতে পারেননি। ছেলেকে শেষবার দেখার আকুতি নিয়েই তাঁর মা মৃত্যুবরণ করেছেন। শেষকৃত্যের জন্য তাঁকে মাত্র পাঁচ ঘণ্টার প্যারোলে দেওয়া হয়েছে।

মায়ের শেষকৃত্যে চিন্ময় প্রভুর কান্নাভেজা মুখ আজ বাংলাদেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অসহায়ত্ব ও বেদনার প্রতীক।
এ কেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে হত্যার অভিযুক্তরা মুক্তি পায়, অথচ নিজের সম্প্রদায়ের অধিকার ও নিরাপত্তার কথা বলার কারণে একজন ধর্মীয় নেতা বছরের পর বছর কারাগারে থাকেন?

এ ধরনের বিচারহীনতা সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সাহসী করে, নির্যাতনকারীদের উৎসাহিত করে এবং রাষ্ট্রের ওপর ভুক্তভোগীদের আস্থা নষ্ট করে। ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো নাগরিককে ভয় নিয়ে বাঁচতে হবে, এমন পরিস্থিতি দেখার জন্য আমরা দেশ স্বাধীন করিনি।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকেই অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমরা নিশ্চিত করেছি, সকল ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ যেন সমান মর্যাদায় রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে অংশ নিতে পারেন। আমাদের ২০২৪ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের জীবন, সম্পদ, উপাসনালয় ও মর্যাদা রক্ষার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ছিল। সেই অঙ্গীকার আজও অটুট।

আওয়ামী লীগের সকল নেতাকর্মী, সমর্থক এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী সকল নাগরিকের প্রতি আমার আহ্বান, সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের পাশে দাঁড়ান। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করুন। কোনো উসকানিতে পা দেবেন না।

সনাতন ধর্মাবলম্বী আমার ভাই-বোনদের আমি বলতে চাই, আপনারা একা নন। এই দেশ আপনাদেরও। শত প্রতিকূলতার মধ্যেও বাংলাদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে একে অপরের উৎসবে পাশে দাঁড়িয়েছে।

কোনো সাম্প্রদায়িক শক্তি সেই হাজার বছরের বন্ধনকে ছিন্ন করতে পারবে না, আপনাদের এই মাটির অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না।

অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের যে বার্তা দুর্গোৎসব বহন করে, আজ বাংলাদেশের জন্য সেই বার্তা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আসুন, আমরা এমন একটি বাংলাদেশ পুনর্গঠন করি, যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য কাউকে বঞ্চিত হতে হবে না, যেখানে মন্দির পাহারা দিয়ে পূজা করতে হবে না, যেখানে একজন মা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাঁর সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না এবং যেখানে রাষ্ট্র প্রত্যেক নাগরিককে সমান মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শ ধারণ করে আমরা আবারও শান্তি, সম্প্রীতি, মানবিক মর্যাদা ও সমঅধিকারের বাংলাদেশ গড়ে তুলব। শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বীসহ দেশের সকল নাগরিকের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করছি।
শুভ শারদীয়া”।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *