রংপুর: আশা হয়তো ছিলো প্রদীপের টিমটিম আলোর মতো, দেশটায় থাকতে পারবেন। কিন্তু গণপতি চক্রবর্তী এবং তাঁর পরিবার কখনো কী ভেবেছিলেন একদিন গোটা পরিবারটাকেই মেরে ফেলা হবে, একদিনে!? ভাবেননি! ভাবেওনা কেউ। তারপরেও ভাবতে হয়।

রংপুর জেলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাঁদের দুই সন্তান আগামী চক্রবর্তী ও আয়ুশ চক্রবর্তীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।

স্বজনদের সূত্রে জানা যায়, গতকাল রবিবার (২৩ আগস্ট) রাতে আনুষ্ঠানিকতা শেষে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চারটি মরদেহ স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। পরে মরদেহগুলো নগরীর দখীগঞ্জ মহাশ্মশানে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে যথাযথ আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরপর চারটি চিতায় চারজনের মরদেহ তোলা হয় এবং স্বজনরাই মুখাগ্নি করেন।

দাহকাজ শেষ করে চিতায় পানি দিয়ে চারজনের ‘অস্থি’ সংগ্রহ করে নিয়ে যান স্বজনরা।

আহারে! একটি পরিবারের সলিল সমাপ্তি! ভাবলে গা শিউরে ওঠে।

এবং এখন অপরাধী ধরার নামে যে নাটক সাজিয়েছে রাষ্ট্র তা দেখে হিন্দুরা আরো আতঙ্কিত হয়েছেন।

একটা পরিবার তো শেষই, অপরাধী ধরার নামে আরো দুটো পরিবারকেও শেষ করতে চলেছে রাষ্ট্র।

এখন তো অনেক প্রশ্ন বেরোচ্ছে, যে দুজনকে ধরেছে পুলিশ তারা কি আদৌ অপরাধী?

পুলিশের শার্ট অপরাধীর গায়ে কী করে এলো?

এটা যে একটা সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা, এবং সাথে হয়তো আছে চাঁদাবাজি, সেটা গোপন করছে খুব সম্ভবত রাষ্ট্র। এবং আসল অপরাধীকে সরিয়েই করছে।

শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের গণ নৃশংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়—এটি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করার গভীর রাজনৈতিক চক্রান্তেরই বহির্প্রকাশ।

আওয়ামী লীগ লিখেছে, ইতিহাস সাক্ষী, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের ভয়াল শাসনামলে বিএনপি-জামায়াত জোট যেভাবে সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর হত্যা, ঘরবাড়ি দখল এবং নির্যাতন চালিয়েছিল, আজকের চিত্র তার থেকে বিন্দুমাত্র আলাদা নয়।

এই পুরো ঘটনাটি নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করছে জনগণ। কারণ তাদের যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সন্দেহ আছে গোটা বিষয়টাই হয়তো সাজানো। অপরাধীকে সেফগার্ড দিচ্ছে কে?

একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন,
“রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী এবং দুই সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় পুলিশ যে গল্প হাজির করেছে, সেটি শুনলে মনে হয় তদন্তের চেয়ে চিত্রনাট্য লেখার কাজটাই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

পুলিশের দাবি, পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে দুই তরুণ গণপতির বাড়িতে ঢুকে ইয়াবা সেবন করছিল। গণপতি বাধা দেওয়ায় তাঁকে হত্যা করা হয়।

এরপর পরিচয় ফাঁস হওয়ার আশঙ্কায় তার স্ত্রী, মেয়ে এবং ঘুমন্ত ছেলেকেও একে একে হত্যা করা হয়। চারটি হত্যাকাণ্ড শেষ করে তারা নাকি গোসল করেছে, খেজুর ও শসা খেয়েছে, আবার ইয়াবা সেবন করেছে, স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করেছে, মোবাইল ফোন পানিতে ডুবিয়েছে এবং পরদিন জুমার নামাজের সময় নিশ্চিন্তে বেরিয়ে গেছে।

প্রশ্ন হলো, এটি কি সত্যিই ঘটনাস্থলের আলামতনির্ভর তদন্তের ফল, নাকি একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের গভীরতর কারণকে চাপা দেওয়ার জন্য অতিদ্রুত তৈরি করা সুবিধাজনক ব্যাখ্যা”?

প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।

“আরেকটি প্রশ্ন, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করল কে, কখন এবং কেন? দুই তরুণ যদি হঠাৎ ইয়াবা সেবনের সময় ধরা পড়ে আকস্মিক উত্তেজনায় চারজনকে হত্যা করে থাকে, তাহলে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার প্রয়োজন হলো কেন? এটি কি আগে থেকে নেওয়া কোনো প্রস্তুতি”?

মোবাইল ফোন নিয়েও প্রশ্ন আছে।

নিহত পরিবারের আত্মীয়রা বলেছেন, চারজনের চারটি ফোনেই যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছিল এবং প্রতিটি ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে বলছে, দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মেশানো পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল। তাহলে বাকি দুটি ফোন কোথায়?

আর ফোনে কেন হাত দেবে ওরা? কারণ যেভাবে ঘটনা বর্ণনা হয়েছে তাতে তো চক্রবর্তী পরিবারের কারো ভিডিও বা ছবি তোলার সময় পাওয়ার কথা না!? তাহলে? মোবাইলে কী কোনো রেকর্ড ছিলো?

মৃত্যু কি অন্যভাবে হয়েছে? গণপতি বাবুরা সময় পেয়েছিলো ছবি তোলা, প্রমাণ রাখার জন্য?

এরকম আরো আরো প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে! রাষ্ট্র কী বলবে?

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *