ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসারের দায়িত্ব পেয়েছেন।
জাইমা রহমানের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, তিনি বর্তমানে যে পদে দায়িত্ব পালন করতে চলেছেন, তার জন্য জাতিসংঘের কোনো প্রকাশ্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের (ওপিজিএ) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত কর্মকর্তাদের তালিকায় তার নাম ও পদবি উল্লেখ করা হয়েছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, জাতিসংঘের ‘ক্যারিয়ারস পোর্টাল’ এবং নিয়োগ সংক্রান্ত অফিসিয়াল ডেটাবেস বা তথ্যভাণ্ডারে ৮১তম অধিবেশনের জন্য সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে ‘লিগ্যাল অফিসার’ পদের কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
‘লিগ্যাল অফিসার’ পদের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের প্রচলিত নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে এই বিষয়টি সাংঘর্ষিক। সাধারণত এ ধরনের নিয়োগের ক্ষেত্রে সংস্থাটি চাকরির বিজ্ঞপ্তি নম্বর, গ্রেড, কর্মস্থল, দায়িত্বসমূহ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত অভিজ্ঞতা, ভাষা এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করে থাকে।
প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক বাসস’কে বলেন, ‘ব্যারিস্টার জায়মা রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ে লিগ্যাল অফিসার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের বিদ্যমান নিয়মাবলি ও নিয়োগপ্রক্রিয়া কঠোরভাবে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসরণ করা হয়েছে।’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বর্তমানে দায়িত্ব পালন করছেন। তার কার্যালয়ের বিভিন্ন পদে রয়েছেন মোট ৪০ জন। তাদের মধ্যে জাইমা রহমানসহ ছয়জন বাংলাদেশি।
জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে জাইমা রহমানকে ‘লিগ্যাল অফিসার-বাংলাদেশ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের এক্সিকিউটিভ অফিসের অধীনে কাজ করবেন।
সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না থাকার বিষয়টিই এককভাবে এটি প্রমাণ করে না যে, জাইমার নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের নিয়ম লঙ্ঘন করা হয়েছে বা স্বজনপ্রীতি বা পক্ষপাতিত্বের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।
তবে ঐতিহাসিকভাবেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আসছে; এর মধ্যে রয়েছে নিয়মিত জাতিসংঘ পদ, সেকেন্ডমেন্ট এবং অন্যান্য ব্যবস্থা।
তবে যা অস্পষ্ট তা হলো— জাইমা রহমানের নিয়োগের ক্ষেত্রে ঠিক কোন পদ্ধতিটি ব্যবহার করা হয়েছে, পদটি কোন গ্রেডের এবং তাঁকে কীভাবে নির্বাচন করা হয়েছে।
২০২৬ সালে জাতিসংঘের ‘ক্যারিয়ার্স পোর্টাল’-এ ‘লিগ্যাল অফিসার’ বা আইন কর্মকর্তা পদের জন্য বেশ কিছু নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল।
উদাহরণস্বরূপ, নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের ‘অফিস অফ লিগ্যাল অ্যাফেয়ার্স’-এ একটি ‘পি-৩’ (P-3) পর্যায়ের লিগ্যাল অফিসার পদের (জব ওপেনিং বা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নম্বর ২৮০৩৫৮) কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।
পদটির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই এবং আবেদনের শেষ সময়সীমা ছিল ২২ জুলাই। পদটি ‘জেনারেল লিগ্যাল ডিভিশন’-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং এর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জ্যেষ্ঠ আইন কর্মকর্তা ও বিভাগের পরিচালকের কাছে প্রতিবেদন পেশ করতে হতো।
নিউ ইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের আপিল ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রির জন্য ২০২৬ সালের জুলাই মাসে ‘পি-৩’ (P-3) পর্যায়ের আরও একটি আইনি কর্মকর্তার পদের (জব ওপেনিং ২৮০৩০৪) বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
এই কর্মকর্তা জাতিসংঘের বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মীদের দায়ের করা আপিল সংক্রান্ত আইনি কাজের দায়িত্বে ছিলেন।
এছাড়া, ২০২৬ সালের মে মাসে নাইরোবিতে মানবসম্পদ দপ্তরে ‘পি-৩’ পর্যায়ের আরেকটি পদের (জব ওপেনিং ২৭১৫৩৩) বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।
এই পদের দায়িত্বের মধ্যে ছিল অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থা ও শৃঙ্খলাজনিত বিষয় নিয়ে আইনি পরামর্শ প্রদান এবং জাতিসংঘের বিরোধ নিষ্পত্তি ট্রাইব্যুনালের (UN Dispute Tribunal) সামনে মহাসচিবের প্রতিনিধিত্ব করা।
ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্যমতে, জাইমা রহমান একজন ব্যারিস্টার এবং আইন ও নীতি বিষয়ক বিশেষজ্ঞ। তাঁর যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
তিনি কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে আইন ও রাজনীতি বিষয়ে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ব্যারিস্টারি করার যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ ‘দি অনারেবল সোসাইটি অব দ্য ইনার টেম্পল’ থেকে সনদ পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশে একজন তালিকাভুক্ত অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজ করছেন।
তবে ‘লিগ্যাল অফিসার’ বা আইন কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে এটিই কি শেষ কথা?
এছাড়া, এই বৃত্তান্তে জাতিসংঘের ব্যবস্থায় তাঁর পূর্ববর্তী কোনো চাকরির উল্লেখ বা আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ব্যাপক পেশাগত অভিজ্ঞতার কথাও বলা হয়নি। সম্ভবত এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অমীমাংসিত বিষয়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের (OPGA) দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে জাইমাকে কেবল ‘লিগ্যাল অফিসার’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; সেখানে দলের সদস্যদের যে তালিকাটি সবার জন্য উন্মুক্ত, তাতে এই পদটি পি-২ (P-2), পি-৩ (P-3), পি-৪ (P-4) নাকি অন্য কোনো ক্যাটাগরির—তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়নি।
এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জাতিসংঘের পেশাগত পদগুলোর ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও পারিশ্রমিকের মাত্রায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকে।
আইসিএসসির সুপারিশক্রমে সাধারণ পরিষদের নির্ধারিত বৈশ্বিক বেতন কাঠামো অনুযায়ী তাদের বেতন প্রদান করা হয়।
ফলে, জাইমার পদের গ্রেড এবং চুক্তির ধরন সম্পর্কে না জেনে তাঁর পদের ক্ষেত্রে কোন বেতন বা যোগ্যতার মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এছাড়াও জাইমার নাম সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ের তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে; অথচ তাঁকে এমন কোনো পৃষ্ঠায় তালিকাভুক্ত করা হয়নি যেখানে জাতিসংঘের সচিবালয়ের সাধারণ নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মীদের পরিচয় উল্লেখ থাকে।
