২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পরবর্তী সময়কালে তখনকার সরকার দাবি করে আসছিল দেশে কোন জঙ্গী নেই। ওসব নাকি মিডিয়ার সৃষ্টি।
আবার ২০২৬ সালে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি বিশাল জয়ের ব্যবধানে জিতে ক্ষমতা নেয়ার পরও তাদের সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দেশে ইসলামী জঙ্গী নেই। কিন্তু দেশে ইসলামী সাম্প্রদায়িক জঙ্গী গোষ্ঠী আছে কি নেই তার প্রতিনিয়ত প্রমাণ দিচ্ছে স্বয়ং জঙ্গীরাই।
আর সেই জানান দেয়াটা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে, বোমা রেখে। বোমার নতুন সংষ্করণও হয়েছে – “প্রেসার কুকার বোমা, ছাতা বা পাইপ বোমা”।

জামায়াত-বিএনপি জোট ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গীবাদের ব্যাপক ফলন হয়েছিল। জঙ্গীবাদের চাষাবাদ ও ফলন প্রায় ২০০৮ সাল অব্দি বেশ ভালোই ছিল।
এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামীলীগ ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গীবাদের প্রভাব অনেকটাই কমে আসে। কিন্তু আমেরিকা-পাকিস্তান-তুরস্কসহ কয়েকটি মুসলিম দেশের ইন্ধনে নানা কৌশলে এর চাষাবাদ চলছিল। তবে সেই বিএনপি-জামায়াত আমলের মত রমরমা অবস্থায় নয়। অনেকটা দমন করতে সক্ষম হয়েছিল আওয়ামীলীগ সরকার।
কিন্তু ২০২৪ এর জুলাই-আগষ্টে “ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু” এর মধ্য দিয়ে অবৈধ ইউনুস সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে এই জঙ্গীবাদের আবার বাড়-বাড়ন্ত শুরু হয়।
যা আবার বিএনপি সরকারের সময় আবার এই জঙ্গীদের নানা নাশকতা প্রচন্ডভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অবশ্য ২০২৪ এর ৫ আগষ্টের পর থেকে সরকারিভাবেই তাদেরকে নানাভাবে প্রেট্রোনাইজ করা হয়েছে ও হচ্ছে।
আওয়ামীলীগ সরকারের সময় এই জঙ্গীরা কি একেবারে উধাও হয়ে গিয়েছিল? না তা হয়নি। তাদের সময়কালেও দেশের বিভিণ্ন স্থানে জঙ্গী হামলা হয়েছে, মানুষ মরেছে। কিন্তু জঙ্গীদের এত বাড় বাড়ন্ত ছিলনা।
আর আওয়ামীলীগতো কখনো দাবি করেনি যে, দেশে জঙ্গী নেই। তবে তারা তা দমাতে সচেষ্ট ছিল এবং এ ব্যাপারে তাদের সফলতাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। চরম সাম্প্রদায়িক ইসলামী মৌলবাদী জঙ্গী গোষ্ঠীর প্রকাশ্য কর্মকান্ড অনেকটা স্তিমিত ছিল।
পুলিশসহ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব জঙ্গীদের দমাতে যথেষ্ট তৎপর ছিল. এবং তাতে অনেক সফলও হয়েছে।
আসলে এজন্য যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন তা তাদের ছিল। সেজন্যই তারা পেরেছিল। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত ও ২০২৪ এর “ ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু” এর পর নো-বেল লরিয়েট ড. ইউনুসের অবৈধ ইন্টারিম সরকার আবার সেই জঙ্গীদেরকে আস্কারা দিয়ে মাথায় তুলেছে।
খোদ সশস্ত্র বাহিনীকে চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন করে তোলা হয়েছে। পুরো দেশ আবার যেন জঙ্গীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে।
২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নামে যে কথিত ছাত্র-গনআন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল তা ছিল মূলত এই জঙ্গীবাদের চরম উত্থানের একটি অধ্যায়। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযোদ্ধা, বাঙ্গালীর চিরন্তন যেসব ঐতিহ্য তার চরম অপমান করেছে এই কথিত আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
এরা চেয়েছিল বাঙ্গালীর শ্রেষ্ঠতম অর্জন মুক্তিযুদ্ধকে ভুলিয়ে দিতে। হ্যাঁ তারা এর মধ্যে বেশকিছু বিতর্ক সৃষ্টিতে সক্ষমও হয়েছে। অনেক মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে, বিপথগামী করেছে।
তবে এরই মধ্যে অনেক মানুষ আবার নিজেদের সেই ভুলও বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু ইতিহাস –ঐতিহ্য অনেক দলিল-দস্তাবেজ বাংলাদেশবিরোধী এই ষড়যন্ত্রকারিরা নষ্ট করে দিয়েছে। যতই ধ্বংস করুকনা কেন মানুষের হৃদয় থেকেতো আর মুক্তিযুদ্ধের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ভুলিয়ে দিতে পারবেনা এরা।
এই যে বাংলাদেশের মানুষ আবার মননে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে-গৌরবকে ফিরিয়ে আনার জন্য সচেতন হতে শিখছে এত কিন্তু সেই মৌলবাদী-উগ্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গী গোষ্ঠীর মাথা খারাপ হওয়ার দশা হয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষ যাতে আবার সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সেই অবিনাশী চেতনা সেখানে ফেরত যেতে না পারে সেজন্য সেই একাত্তরের দেশি-বিদেশী পরাজিত অপশক্তি আবারো নতুন করে ষড়যন্ত্রের নীলনকশার খেলায় মেতে উঠেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের রূপান্তর ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে (বিশেষ করে ২০২৬ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে) ঢাকার সাভার, আশুলিয়া, মতিঝিল, বরিশাল, কুমিল্লা ও কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেশার কুকার বোমা ও শক্তিশালী আইইডি (IED) উদ্ধার ও বিস্ফোরণের ঘটনা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

একটি সময়ে মানে আওয়ামীলগের সময়ে বাংলাদেশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) এর সুদক্ষ-মেধাবী ও দেশপ্রেমিক অফিসারদের নেতৃত্বাধীন টীম সারাদেশে এই জঙ্গীবাদ দমনে অত্যন্ত সফলতার পরিচয় দিয়েছিল।
তারা দেশী-বিদেশী ও আন্তর্জাতিক এসব সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদের মূল উৎপাটনে তাদের ভূমিকাও ছিল অত্যন্ত সক্রিয়। যতদূর মনে পড়ে এই সিটিটিস ‘র নেতৃত্বে চৌকশ-মেধাবী পুলিশ অফিসার মো: মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি দেশপ্রেমিক টীম কাজ করেছিল।
তারা তখন সেনাবাহিনীসহ সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে থাকা বেশকিছু ইসলামী জঙ্গী প্রশিক্ষক ও মদতদাতাদেরকে চিহ্নিত করেছিলেন।
অতি সম্প্রতি মেজর জাহিদুল ইসলাম নামে একজন সামরিক অফিসারকে মরণোত্তর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি এবং তার পরিবারকে রাষ্ট্র জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিচ্ছে।
এই মেজর জাহিদ ছিল জঙ্গী সংগঠন আইএসএর মদদপুষ্ট একজন কুখ্যাত প্রশিক্ষক যে সশস্ত্র বাহিনীর ভেতরে ও বাইরে জঙ্গীবাদের পক্ষে নানাভাবে বিভ্রান্তি ছড়াতো।
মনিরুল ইসলামের জবানীতেই জানা যায়, মেজর জাহিদ কানাডাতে কয়েক মাসের প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলো, সেখানেই সে সন্ত্রাসবাদের ‘আলোতে আলোকিত’ হয়। দেশে ফিরে তার বেশভূষা থেকে শুরু করে লাইফ স্টাইলে আমূল পরিবর্তন আসে।
সেনাবাহিনীতে চাকরি করে নিয়মিত ধর্মপালন ও ধর্মমতে জীবনধারণ সম্ভব নয় বলে সে নিকটজনদের কাছে অপপ্রচার করতে থাকে। তার সবচেয়ে বেশি আপত্তি ছিল ‘শিখা অনির্বাণ’ কে স্যালুট করা নিয়ে যা তার কাছে গুণাহের কাজ বলে বিবেচিত ছিল। অবশেষে সে চাকরি ছেড়ে দেয় এবং বেসরকারি চাকরি নেয়।
২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রূপনগরে এক বাড়িতে সে পুলিশকে ছুরিকাঘাত করে পালানোর সময় পুলিশের গুলিতে সে নিহত হয়।
ঢাকার হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলার ঘটনার তদন্ত চালাতে গিয়ে কতিপয় আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদ ও কয়েকটি জায়গা থেকে উদ্ধারকৃত আলামত বিশ্লেষনে জানা যায় যে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়া একজন আইএসপন্থী গ্রূপের (যারা নব্য জেএমবি হিসেবে পরিচিত) সদস্যদের প্রশিক্ষন দেওয়ার ‘মহান দায়িত্ব’ পালন করছে।
পাঠকদের নিশ্চয় স্মরণে আছে ঢাকার গুলশানে সেই হলি আর্টিসান বেকারীর ভয়াবহ জঙ্গী হামলা ও হতাহতের ঘটনার কথা। প্রায় ১২ ঘণ্টার এই জিম্মি সংকটে ১৭ জন বিদেশী (৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয়) এবং ৩ জন বাংলাদেশিসহ মোট ২২ জন সাধারণ মানুষ ও দুই পুলিশ অফিসার নিহত হন।
পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’-এর মাধ্যমে ৫ জন জঙ্গি নিহত হয় এবং জিম্মি দশার অবসান ঘটে।
তো এই সেই মেজর জাহিদ যাকে এখনকার বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আমলে চরমভাবে সম্মানিত করা হলো। তার মানে কি দাঁড়ালো? এই সরকার সেই জঙ্গীবাদেরই পৃষ্ঠপোষক।
এখন যদি কেউ বলেন – এখনকার তারেক রহমানের সরকার সেই ২০০১ এর বিএনপি-জামায়াত সরকারেরই প্রতিচ্ছবি মাত্র- তা কি অমুলক হবে? শুধু এই জঙ্গী মেজর জাহিদই নয় এমন আরো বাংলাদেশ বিরোধী বেশ কয়েকজন সশস্ত্রবাহিনীর অফিসারদেরকে রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করে তাদেরকে পুরষ্কৃত করা হয়েছে। তাদের ব্যাপারে নাহয় আরেকদিন লেখা যাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া অত্যাধুনিক প্রেশার কুকার বোমা এবং পাইপ বোমার ধরণ বিশ্লেষণ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন যে আবারো নীল দংশনে দেশকে বিষাক্ত করছে তারই প্রমান মেলে।
সিটিটিসি অফিসারদের তথ্য অনুযায়ী সাভারের দক্ষিণ শ্যামপুর এবং হেমায়েতপুরের জঙ্গি আস্তানা থেকে বিপুল পরিমাণ গানপাউডার, সায়ানাইড ও ১৪টি পাইপ বোমা উদ্ধারের ঘটনায় “নব্য জেএমবি” সরাসরি জড়িত।
সিটিটিসি-এর তথ্যমতে, সাভার ও কেরানীগঞ্জের পুরো বোমা তৈরি কারখানার মূল হোতা ও তদারককারী হলেন নাজমুল হাসান ওরফে বোমারু মামুন।

তিনি ২০১৭ সালে প্যান প্যাসিফিক হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে হামলার পরিকল্পনাকারী এবং নব্য জেএমবির শীর্ষ শুরা সদস্য ছিলেন। ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তিনি পুনরায় দল গোছানো শুরু করেন।
সাভারের আস্তানা থেকে গ্রেফতার হওয়া আরিফ হোসেন (২৮) এবং কেরানীগঞ্জ থেকে পালিয়ে যাওয়া শেখ আল আমিন সরাসরি বোমারু মামুনের আন্ডারগ্রাউন্ড সেলের হয়ে কাজ করছিলেন। তারা মাদ্রাসার আড়ালে বোমা তৈরির মিনি কারখানা গড়ে তুলেছিলেন।
আল-কায়েদা ও আইএস (ISIS) মতাদর্শ নিয়েই চলছে এসব জঙ্গী কারবার। সরাসরি কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের সশরীরে উপস্থিতির প্রমাণ না মিললেও, সাভার ও মতিঝিলে উদ্ধার হওয়া “আম্ব্রেলা আইইডি” (ছাতার ভেতর বোমা) এবং প্রেশার কুকার বোমার প্রযুক্তিগত কৌশল বৈশ্বিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএস (ISIS) এবং আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)-এর অনলাইন ম্যানুয়াল ও প্রোপাগান্ডা থেকে অনুপ্রাণিত।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশজুড়ে কারাগার ভাঙচুর, লুটপাট এবং আদালত থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন ও খালাস পাওয়ার মাধ্যমে ব্যাপক সংখ্যক শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গি কারাগার থেকে বেরিয়ে আসে।
সেই ৫ আগস্টের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে দেশের অন্তত ১৭টি কারাগারে হামলা ও ভাঙচুর হয়। এর ফলে ২,২০০ জনেরও বেশি বন্দিকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করা হয়েছে ।
এই পালিয়ে যাওয়া বন্দিদের মধ্যে অন্তত ৭০ জনেরও বেশি তালিকাভুক্ত ও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জঙ্গি বা শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিল (যেমন শেরপুর ও সাতক্ষীরা কারাগার থেকে সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের পলায়ন)।
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৪-এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন আদালত থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন বা খালাস পেয়ে বের হয়ে আসে অন্তত ৪৩ জন হাই-প্রোফাইল কুখ্যাত অপরাধী ও জঙ্গি।
জেল থেকে মুক্ত ও খালাস পাওয়া আলোচিত শীর্ষ জঙ্গিবাদীরা সেই ৫ আগস্ট এর পর আইনি প্রক্রিয়ায় (জামিন বা খালাস) এবং জেল ভেঙে বেরিয়ে আসা প্রধান প্রধান জঙ্গি নেতাদের মধ্যে রয়েছে- মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানী (আনসারুল্লাহ বাংলা টিম)।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আল-কায়েদার অনুসারী নিষিদ্ধ সংগঠন ‘আনসারুল্লাহ বাংলা টিম’ (ABT)-এর প্রধান মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানী ২০২৪ সালের আগস্টের শেষভাগে জামিনে মুক্তি পান। তার মুক্তিকে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নব্য জেএমবি’র নাজমুল হাসান ওরফে বোমারু মামুন । আইনি ফাঁকফোকর বা জামিনে বের হয়ে আসা এই কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও আইইডি বিশেষজ্ঞ বর্তমানে সাভার ও ঢাকার উপকণ্ঠে বোমা বিস্ফোরণ চেষ্টার মূল সমন্বয়ক।
সালাউদ্দিন সালেহীন ও জাহিদুল ইসলাম (জেএমবি/নব্য জেএমবি গ্রুপ)। বেশ কয়েকজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত জঙ্গি নেতাকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ডামাডোলে আদালত থেকে জামিন দেওয়া হয় অথবা তারা কাশিমপুর হাই-সিকিউরিটি কারাগার ও অন্যান্য আঞ্চলিক কারাগার ভাঙচুরের সুযোগে পালিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী ২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর মুক্তি পাওয়া বা পালিয়ে যাওয়া জঙ্গিরা বড় কোনো কেন্দ্রীয় সমাবেশ না করে, ৩-৪ জনের ছোট ছোট “স্লিপার সেল” গঠন করে সাভার, আশুলিয়া ও কেরানীগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিক বা সাধারণ চালকের ছদ্মবেশে অবস্থান নিচ্ছে।
এরা ৫ আগস্টের পর থানাগুলো থেকে যে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ (১,৩০০-এর বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং অঅড়াই লাখেরও বেশি গোলাবারুদ অ্যামুনিশন এখনও উদ্ধার হয়নি) লুট হয়েছিল, তার একটি অংশ এই অপরাধী ও উগ্রপন্থীদের হাতে পৌঁছেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এরা নতুন করে সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়নের উৎস তৈরি এবং বিস্ফোরক তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে। তবে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও সিটিটিসি তাদের কঠোর নজরদারিতে রেখেছে এবং সাভারের মতো অভিযানগুলোর মাধ্যমে এই নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে জানালেও আসলে কি তাই হচ্ছে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এরই মধ্যে গত ১২ আগষ্ট সকাল সাড়ে ১০ টার দিকে বরিশালে আদালত চত্বরে বোমা ফাটিয়েছে জঙ্গীরা । যদিও তাতে কেউ হতাহত হয়নি। কিন্তু এসব আলামত কিসের ইঙ্গিত দেয়?

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলা হলো। শায়খ আবদুর রহমান এবং সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জামায়াতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (JMB) মাত্র ৩০ মিনিটের ব্যবধানে দেশের ৬৩টি জেলার প্রায় ৫০০টি স্থানে একযোগে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাদের শক্তির জানান দেয়।
একই বছর মানে ২০০৫ সালের নভেম্বরে ঝালকাঠিতে দুই সহকারী জজকে আত্মঘাতী বোমা হামলায় হত্যা করা হয়, যা ছিল দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।
সেই ২০০৫ সালে কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় ছিল। এখন এককভাবে বিএনপি ক্ষমতায়। কিন্তু একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী জোটের চরম উত্থান ঘটেছে এটি ভুলে গেলে চলবেনা। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে একধরনের বিরোধ চলছে তা ঠিক।
কিন্তু এরাতো খালাতো ভাই সম্পর্কে । বিরোধটিও তেমনি। আবার এরা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি দল আওয়ামীলীগকে ঠেকাতে শতভাগ এক। ওই যে বলেনা রসুনের কোয়াগুলো সব এক জায়গায় । মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি শতধা বিভক্ত। কিন্তু বোমাবাজ-ইসলামী জঙ্গীরা চরমভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
বলা চলে বাংলাদেশ এখন বোমাময়। যে কোন সময় সারাদেশেই আবার বিষ্ফোরণ ঘটতে পারে- এ আশংকা কোনভাবেই উড়িয়ে দেয়া যায় না।
#রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
