নামেই গণতান্ত্রিক সরকার। কিন্তু চরমপন্থী ইসলামী সংগঠনগুলোকে নিয়ন্ত্রণে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। আত্মসমর্পন করছে এদের কাছে। ভয়ে না স্বেচ্ছায় সেটা দেখতে হবে।
নির্বাচিত সরকার যদি এমন হয় তাহলে অনির্বাচিত সরকার যে কেমন ছিল তাও আমরা দেখেছি গত চব্বিশের আগষ্টের পরে। তো কোন পার্থক্য কি জনগণ খুঁজে পাচ্ছে?
যদি সেই ইউনুসীয় সরকারের এক্সটেনশন হয় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার তাহলে জনগণের কি হবে?
অতি সম্প্রতি কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তৌহিদী জনতার নামে কওমী মাদ্রাসাভিত্তিক উগ্রবাদী ইসলামী দল হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশের লেলিয়ে দেয়া হুজুরেরা খোদ পুলিশ লাইনেই হামলা করলো।
আর পুলিশ উল্টো হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কিছু না করে পুলিশের তিন সদস্যকে বরখাস্ত/ক্লোজ করলো! কি চমৎকার, কি চমৎকার! এই না হলে ইসলামী দেশ, মুসলিমদের দেশ! আর কিশোরগঞ্জে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানই বন্ধ করে দিতে হলো?
কারণ হেফাজতের ক্যাডাররা হুমকি দিয়েছে তারা এসব বেশরীয়তি কাজ একদম বরদাশত করবেনা।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের গৌরবোজ্জ্বল দিন শেষ হতে চলেছে এসব ইসলামী চরমপন্থীদের কারণে। এখন আমাদের কপালে জুটেছে বারো মাসে চার তেরো ৫২ নিষেধাজ্ঞা। ডজনখানেক ফতোয়া আর গণ্ডা গণ্ডা জেহাদি হামলার মুখোমুখি হওয়ার নির্মম নিয়তি।
যে দেশে একসময় নদীর কলতানে, বাউলের একতারায় আর মেঠো সুরের অসাম্প্রদায়িক আবহে মানুষের মুক্তচিন্তা ডানা মেলত, সেই দেশের সকাল এখন শুরু হয় ‘সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণ ব্যুরো’র মোল্লাদের হুংকারে।
পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান বন্ধ, মঙ্গল শোভাযাত্রায় তালা, বাউল সংগীতে নিষেধাজ্ঞা, কিশোরগঞ্জের কনসার্ট পণ্ড—সব মিলিয়ে দেশটা যেন এক বিশাল সাংস্কৃতিক কোয়ারেন্টাইনে চলে গেছে। যেন এক সার্কাস চলছে আরকি !

আর এই পুরো সার্কাসের পেছনে যিনি মূল রিংমাস্টার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, তিনি আর কেউ নন—আমাদের পরম আদরের, রাষ্ট্রযন্ত্রের কোলে-পিঠে বড় হওয়া তথাকথিত ইসলামী উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদী শক্তি।

এই শক্তি আজ এতটাই হৃষ্টপুষ্ট যে, তারা শুধু সংস্কৃতিকেই নয়, খোদ রাষ্ট্র নামক বিশাল হাতিটাকেই আস্ত গিলে খাওয়ার জন্য হা করে বসে আছে।
একটু পেছনের কিছু ঘটনার দিকে তাকালে আমরা এর উত্থান-আগ্রাসন দেখতে পাই। আর এরা শুধু শারীরিক রক্তক্ষরণই ঘটাচ্ছেনা হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরী করছে আমাদের ওপর।
উদীচী ও ছায়ানট যখন রক্তাক্ত হয়েছিল আজ যারা মাঠপর্যায়ে সংস্কৃতিকে ডিক্টেট করছে, তারা কিন্তু রাতারাতি আকাশ থেকে পড়েনি। এদের পূর্বসূরীরা বহু আগেই রক্তের হোলিখেলা খেলে এই উর্বর জমি তৈরি করে রেখেছিল।

আসুন একটু ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে নেওয়া যাক, কারণ বাঙালির স্মৃতিশক্তি বড়ই ক্ষণস্থায়ী। আমরা কি ভুলে গেছি ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চের কথা?
যশোর টাউন হল মাঠে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনে দুটি শক্তিশালী টাইম বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ১০ জন সংস্কৃতি কর্মীকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল এই ধর্মান্ধ জঙ্গিরা। আহত হয়েছিল শতাধিক মানুষ।
সেই রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল, অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের দিন রমনার বটমূলে ছায়ানটের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে চালানো হলো নারকীয় আত্মঘাতী বোমা হামলা।

নতুন বছরকে বরণ করতে যাওয়া ১০ জন নিরীহ মানুষ নিমিষেই লাশ হয়ে গেলেন, রক্তাক্ত হলো বাঙালির অহংকারের পহেলা বৈশাখ।
উদীচী ও ছায়ানটের ওপর সেই হামলাগুলো ছিল মুক্তবুদ্ধি, ধর্মনিরপেক্ষতা আর বাঙালি সংস্কৃতির হৃৎপিণ্ডে সরাসরি বিষাক্ত তীরের আঘাত। তখনকার শাসকেরা একে ‘সাধারণ অপরাধ’ বা ‘ষড়যন্ত্র’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু আজ এত বছর পর এসে আমরা কী দেখছি? তখন হামলা হতো গোপনে, বোমার স্প্লিন্টারে আর আরডিএক্স দিয়ে। আর এখন হামলা হয় প্রকাশ্য দিবালোকে, বুক ফুলিয়ে, প্রশাসনের নাকের ডগায় আইনি নোটিশ দিয়ে কিংবা ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’র খোঁড়া অজুহাতকে ঢাল বানিয়ে।
কৌশলের পরিবর্তন হয়েছে মাত্র, কিন্তু লক্ষ্য সেই একই—বাঙালির মগজ ধোলাই করে তাকে এক অন্ধকার মধ্যযুগীয় গুহায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া।
মঙ্গল শোভাযাত্রা বনাম অমঙ্গলের রাজত্বমঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে এই উগ্রবাদীদের চুলকানি আজীবনের।
ইউনেস্কো স্বীকৃত এই বিশ্ব ঐতিহ্য নাকি ‘ঈমান হরণের’ প্রধান হাতিয়ার! তাদের দাবি, মাটির তৈরি পাখি, কাগজের বাঘ আর কাঠের তৈরি হাতির মুখোশ নিয়ে মিছিল করলে নাকি ইসলাম ধর্ম রাতারাতি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। অদ্ভুত তাদের যুক্তি, আর সেলুকাস তাদের মগজ!
যে দেশের শিশুরা প্লাস্টিকের ডাইনোসর আর সিংহ নিয়ে খেলে, সেখানে পহেলা বৈশাখের সকালে একটা কাগজের পেঁচা হাতে নিয়ে হাঁটলে কার ঈমান কীভাবে কর্পূরের মতো হাওয়া হয়ে যায়, তা কোনো আধুনিক বিজ্ঞান বা যুক্তি দিয়ে বোঝা অসম্ভব।
আচ্ছা মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধ করে আমরা সমাজে কী অভূতপূর্ব মঙ্গল বয়ে এনেছি? ওহো! এই ‘মঙ্গল’ তো আবার হিন্দুয়ানী শব্দ। কি যে ব্যবহার করতে হবে সে যুৎসই শব্দ খুঁজে পাচ্ছিনা।
দেশ থেকে কি দুর্নীতি কর্পূরের মতো উড়ে গেছে? ঘুষখোর, ব্যাংক লুটেরা, অর্থ পাচারকারী আর নারী নির্যাতনকারী কি রাতারাতি সুফি-সাধু বনে গেছেন? তা তো হয়নি।
বরং উৎসবের রঙটুকু কেড়ে নিয়ে সমাজটাকে আরও বেশি উগ্র, ধূসর, হিংস্র ও ধর্মান্ধ করে তোলা হয়েছে।
বাঙালির উৎসবগুলো মূলত ছিল মনের সংকীর্ণতা দূর করার মহৌষধ। এখন উৎসবই যদি সংকীর্ণতার খাঁচায় বন্দি হয়ে যায়, তবে সমাজের এই সর্বগ্রাসী অমঙ্গল ঠেকাবে কে? বাউল গান বন্ধ করে দিয়েছে সেই ইউনুসীয় আমলে।
একতারা বনাম জেহাদি তলোয়ারের মহাযুদ্ধলালন শাহ, হাছন রাজা আর শাহ আবদুল করিমের এই বদ্বীপে আজ বাউল গান গাইতে গেলেও অনুমতি নিতে হয়! তাও আবার কার কাছ থেকে?
স্থানীয় কিছু নব্য ফতোয়াবাজ আর প্রভাবশালী ইসলামী তকমাধারী মোড়লদের কাছ থেকে। বাউলদের অপরাধ কী? তারা একতারা বাজিয়ে মানুষের মনের কথা বলেন, জাত-পাতের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতার জয়গান গান।
কিন্তু আমাদের এসলামী রক্ষক-ভক্ষকদের কাছে এই ‘একতারা’ যেন এক মারাত্মক পারমাণবিক অস্ত্র, যা তাদের তৈরি করা কৃত্রিম ধর্মের ঠুনকো দেয়ালকে এক ফুঁৎকারে উড়িয়ে দিতে পারে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাউল সাধকদের চুল-দাড়ি কেটে দেওয়া, তাদের আখড়ায় আগুন দেওয়া বা বাউল সঙ্গীতানুষ্ঠানে হামলা চালানো এখন যেন এক শ্রেণির ‘ধর্মীয় বীরত্ব’ প্রকাশের সহজ ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গান বন্ধ করলেই যদি মানুষের নৈতিকতা রকেটের গতিতে উন্নত হতো, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে নীরব এবং বিনোদনহীন দেশগুলো হতো সবচেয়ে নিরাপদ ও অপরাধমুক্ত। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
সুর যেখানে স্তব্ধ হয়, সেখানে সুড়ঙ্গ কেটে উগ্রবাদের অন্ধ পোকাদের প্রবেশ ঘটে। একতারা আর দোতারার সুরে যেখানে অহিংসা ও প্রেমের বাণী ছড়ায়, সেখানে লাঠিসোঁটা আর তলোয়ার নিয়ে হামলা চালানো ব্যক্তিরা নিজেদের কোন ধর্মের প্রতিনিধি ভাবেন, তা সত্যিই এক বিরাট কৌতুক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘তৌহিদী’ তাণ্ডব এবং ভাস্কর্য ভাঙার যেন মহোৎসব। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কথা মনে হলেই এখন আর তিতাস নদীর শান্ত রূপ বা ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর খঞ্জনির জাদুকরী শব্দ মনে পড়ে না। মনে পড়ে সেই অঅওয়ামীরীগ আমলেই ২০২১ সালের ২৬ থেকে ২৮ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সময়ে কথিত ‘তৌহিদী জনতা’র ব্যানারে হেফাজতে ইসলামীর সেই তাণ্ডব ও অগ্নিসংযোগের বীভৎস দৃশ্য।

সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর স্মৃতিবিজড়িত ম্যুরাল ভেঙে ফেলা হলো, তাঁর ব্যবহৃত দুষ্প্রাপ্য বাদ্যযন্ত্র পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হলো।
শুধু কি তাই? রেলস্টেশন থেকে শুরু করে সরকারি গণগ্রন্থাগার ও পুলিশ লাইন পর্যন্ত কোনো কিছুই বাদ গেল না।এদের হাত থেকে রেহাই পায়নি খোদ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলোও।
২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে কুষ্টিয়ায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মাণাধীন ভাস্কর্য ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এর আগে এবং পরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ভাঙার যে হিড়িক আমরা দেখেছি, তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের গৌরবময় ইতিহাসকে মুছে ফেলার এক সুদূরপ্রসারী নীল নকশা।
আর সেই সাথে হেফাজতি নেতাদের দম্ভোক্তি যেনো শরীয়া আইন হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসলে রাষ্ট্র যখন নতজানু হয় এই ধর্মান্ধ শক্তির ঔদ্ধত্যের আসল রূপ চেনা যায় তাদের নেতাদের প্রকাশ্য দম্ভোক্তিতে।
মনে করে দেখুন ২০২০ সালের নভেম্বর মাসের কথা। হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন শীর্ষ মানে কুখ্যাত নেতা মামুনুল হক এবং জুনায়েদ বাবুনগরী ঢাকার ধোলাইপাড়ে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করে প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে হুংকার দিয়েছিলেন, “ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেওয়া হবে।” যেই মামুনুল সোনারগাঁওয়ে ৫০১ এ ধরা খেলো অপরের স্ত্রীকে নিয়ে !! চোরের মার বড় গলা আর কি!!

বাবুনগরী তো আরও এক ধাপ এগিয়ে ঘোষণা করেছিলেন, “যেকোনো ভাস্কর্য, তা যাঁরই হোক না কেন, তা টেনে হিঁচড়ে ভেঙে ফেলা হবে।”কী অদ্ভুত এক সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা! রাষ্ট্রের আইন, আদালত ও সংবিধানকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই কথিত মওলানারা যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে এমন হুংকার ছাড়েন, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—এই দেশের প্রকৃত শাসক কে? নির্বাচিত সরকার নাকি ফতোয়াবাজ এই উগ্র গোষ্ঠী?
এই অন্ধকারের গোষ্ঠীটি শুধু হুমকি দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং তাদের অনুসারীদের এমনভাবে মগজ ধোলাই করেছে যে, শিল্প-সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের যেকোনো স্মারক দেখলেই তারা এখন লাঠিসোঁটা আর হাতুড়ি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর রাষ্ট্রযন্ত্র ‘শান্তি-শৃঙ্খলা’ রক্ষার নামে তাদের সব আবদার মুখ বুজে মেনে নেয়, যা আসলে এক প্রকার পরোক্ষ আত্মসমর্পণ।
জঙ্গিবাদী শক্তির এই আস্ফালন সমাজ আর রাষ্ট্রকে গিলে খাচ্ছে। একে যদি অজগরের সাথে তুলনা করি তা কি অত্যুক্তি হবে?
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক এবং নির্মম সত্যটি হলো—ইসলামী জঙ্গিবাদী শক্তির এই তীব্র আস্ফালন শুধু সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে না, বরং এটি ধীরে ধীরে খোদ রাষ্ট্র কাঠামোকেই গিলে খাচ্ছে। একটি অজগর সাপ যেমন প্রথমে শিকারকে পেঁচিয়ে ধরে তার হাড়গোড় গুঁড়ো করে, তারপর তাকে আস্ত গিলে ফেলে; আমাদের রাষ্ট্রের অবস্থাও আজ ঠিক সেই শিকারের মতো।
এই ইসলামী ধর্মান্ধগোষ্ঠী আজ রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা, বিচার ব্যবস্থা, আইন এবং সংস্কৃতির হাড়গোড় একে একে ভেঙে দিচ্ছে। আজ পাঠ্যপুস্তক থেকে প্রগতিশীল লেখকদের লেখা বাদ দিতে হয় উগ্রপন্থীদের প্রেসক্রিপশনে। নারীদের পোশাক কেমন হবে, তা নির্ধারণ করে দেয় ফেসবুকের কোনো এক স্বঘোষিত মওলানা।
শুধু নারীদের কেন? পুরুষদের পোষাক কি হবে সেটিও তারা ঠিক করে দিচ্ছে। অঅপনাদের নিশ্চয়ই ভুলে যাওয়ার কথা নয়- সেই যে টাকনুর উপরে প্যান্ট বা পাজামা পড়ার ফতোয়াটি।
ভাস্কর্য আর মূর্তির পার্থক্য না বুঝে এরা একের পর এক শিল্পকর্ম ভাঙার মহোৎসব করে চলেছে অনেকদিন ধরে। রাষ্ট্র যখন এই উগ্র শক্তির সাথে আপস করে, তাদের খুশি করতে একের পর এক ছাড় দেয়, তখন রাষ্ট্র আসলে নিজের কবর নিজেই খোঁড়ে।
ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সেই দানবের মতো, রাষ্ট্র আজ যে শক্তিকে রাজনৈতিক ডালপালা হিসেবে বা ভোটব্যাংক হিসেবে তোষামোদ করছে, সেই দানবই একদিন রাষ্ট্রকে টেনে হিঁচড়ে তার সিংহাসন থেকে নামিয়ে দেবে।
জঙ্গিবাদী শক্তির এই আস্ফালন কোনো সাধারণ আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়; এটি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব, তার সংবিধান এবং তার অস্তিত্বের ওপর এক চরম আঘাত।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ রক্ত দিয়েছিল, ২ লাখ মা-বোন সম্ভ্রম হারিয়েছিল একটি অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্য। কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্র বা খেলাফত কায়েমের জন্য বাঙালি অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি।
অথচ আজ স্বাধীনতার এত বছর পর এসে যখন দেখা যায়, একজন বাউলকে তার নিজের দেশে গান গাওয়ার জন্য পালিয়ে বেড়াতে হয়, পহেলা বৈশাখের মতো সর্বজনীন উৎসবকে অস্পৃশ্য ঘোষণা করা হয়, আর মুক্তচিন্তার লেখকদের কলম স্তব্ধ করে দেওয়া হয়—তখন শহীদের রক্তের প্রতি এর চেয়ে বড় উপহাস আর কী হতে পারে?
আমরা আজ এমন এক সমাজে বাস করছি যেখানে লাইব্রেরি বা থিয়েটার খোলার চেয়ে, সেগুলো বন্ধ করার দাবি তুললে মানুষ বেশি হাততালি পায়।
বিজ্ঞান মনস্কতা আজ অপরাধ, আর মধ্যযুগীয় কুসংস্কার আজ ভূষিত হয় ‘পবিত্রতা’র পোশাকে। মুক্তবুদ্ধি আর সংস্কৃতির এই পরাজয় আসলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বুকে একেকটা মরিচাপড়া পেরেক ঠোকার শামিল।
তাই বলতে হয় উটের পিঠে চড়ে মরুভূমির কালচার বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছে ও ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে রাজনৈতিক দলের লালন পালন ও তোষামোদকারি মানসিকতায়।
বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় অনেক গভীরে—এই সস্তা বুলি আওড়ে আমরা আর কতদিন আত্মতুষ্টির আফিম খেয়ে ঘুমিয়ে থাকব? বাস্তব সত্য হলো, প্রতিনিয়ত আঘাত করতে করতে সেই হাজার বছরের শেকড়টাকেও আজ ভেতর থেকে পঁচিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
রাষ্ট্র যদি আজ উগ্রবাদের এই অজগরকে দুধ-কলা দিয়ে পোষা বন্ধ না করে, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই দেশের মানচিত্র থাকবে ঠিকই, কিন্তু তার ভেতরে ‘বাংলাদেশ’ নামক কোনো প্রাণ থাকবে না।
তখন হয়তো পহেলা বৈশাখ পালন করতে হবে ঘরের কোণে দরজা-জানালা বন্ধ করে, হেডফোন কানে দিয়ে বাউল গান শুনতে হবে চোরের মতো লুকিয়ে, আর কনসার্টের বদলে মাঠে মাঠে চলবে উগ্রতার চাষবাস।
আসুন, সংস্কৃতির এই নব্য মোড়লদের এবং তাদের তোষামোদকারী রাষ্ট্রযন্ত্রকে স্পষ্ট জানিয়ে দিই—বাঙালি উটের পিঠে চড়ে মরুভূমির সংস্কৃতি আমদানি করতে শেখেনি।
নদী, কাদা, ধান আর গানের এই পলিমাটিতে একতারা বাজবেই, মঙ্গল শোভাযাত্রার রং ছড়াবেই, এবং মুক্তবুদ্ধির আলোয় একদিন ধুয়ে-মুছে যাবে সব উগ্রতার অন্ধকার দেয়াল। সংস্কৃতির মৃত্যু মানে একটি জাতির আত্মিক মৃত্যু, আর বাঙালি অন্তত আত্মিকভাবে মরতে রাজি নয়।
# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার কর্মী।
