ইসলাম ধর্মের নানাবিধ ব্যবহার-অপব্যবহার ও বণিজ্যিকীকরণ চলেছে বাংলাদেশে অনেকদিন থেকেই। তো সেই ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধ্বজাধারী আওয়ামীলীগ থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম এমনকি কথিত মধ্যপন্থার দল বিএনপিও এই ইসলামের বানিজ্য করেছে ও করছে।
আর এরা সবাই বলে থাকেন যে, তারা মহানবী মহানবী (সা.) ‘র মদিনা সনদের বাইরে কিছু করবেন না। তো সেই মদিনা সনদ বাস্তবায়নের নানাদিক রয়েছে। মূলত ইসলামী শাসন ও শরীয় আইন চালুর আধিক্যই বেশি তাতে।
তো সেই মদিনা সনদের অনেকটাইতো বাস্তবায়ন করে ফেলেছে বাংলাদেশ। ইসলামী শরিয়া আইনের অনেকটাই চলছে অলিখিতভাবে।
এর সাথে অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে যুক্ত হতে যাচ্ছে মুসলমানদের কাছে আরেক পবিত্র নগরী সৌদি আরবের ‘মক্কা চুক্তি’।

এটি হয়তো খুব শীঘ্রই “মক্কা সনদ” হিসেবে প্রকাশিত হবে। যার মধ্যে বাংলাদেশ নামক দেশটিও যুক্ত হবে। ইসলামী জোশকে সামনে রেখে নিরাপত্তার অজুহাতে এই মক্কা চুক্তি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে এখনও ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ এবং নামে একটি কথিত অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কাঠামো বজায় রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ‘মক্কা চুক্তি’ (Mecca Joint Defence Agreement)-কে কেন্দ্র করে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে নানামুখী বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সেটি এখন বাংলাদেশকেই ঠিক করতে হবে যে, দেশটি নিজের পায়ে কুড়োল মারবে না মারবেনা ।
এই যে ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ও মক্কা চুক্তি এর কারণে নিশ্চয়ই বাংলাদেশ তার কথিত অসাম্প্রদায়িক সত্তাকে প্রবল সংকটে ফেলতে যাচ্ছে। যদিও মক্কা চুক্তি করেনি এখনো বাংলাদেশ, তবে মনমানসিকতায় ও ‘ইসলামী-প্রতিরক্ষা ও অস্ত্র জোশ ‘বলীয়ান হয়ে উঠছে ইতিমধ্যেই। হয়তো চুক্তি করা এখন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী চেতনা নিয়ে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
বাহাত্তরের সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম মূল রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করা হলেও, পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে ১৯৮৮ সালে অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘ইসলাম’-কে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা হয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পটভূমিতে বিএনপি-জামায়াতসহ ডানপন্থী দলগুলোর প্রভাব বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য-কেন্দ্রিক জোটে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেশের অসাম্প্রদায়িক পরিচয়কে এক বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ বা মক্কা চুক্তি-তে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরবের মক্কা নগরীতে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্যে তুরস্ক, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান—এই তিনটি প্রধান মুসলিম প্রধান দেশ একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে।
ন্যাটোর (NATO) ‘আর্টিকেল ৫’ বা যৌথ নিরাপত্তা নীতির আদলে এই চুক্তিটি গঠিত, যেখানে বলা হয়েছে: কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের ওপর সশস্ত্র আক্রমণ হলে তা বাকি সব রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই চুক্তিকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবেও অভিহিত করছেন।
অতি সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই চুক্তিতে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণকে ইতিবাচকভাবে দেখার ইঙ্গিত দেওয়ায় দেশের ভেতরে ও বাইরে তীব্র কৌতূহল ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
বাংলাদেশ যদি এই মক্কা চুক্তিতে ঢোকে তাহলে এটি হবে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার বীর শহীদদের প্রতি চরম অপমান। আর এটি পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রথম সামরিক জোট হবে।
এমন কখনো কেউ ভাবতে পেরেছেন বা ভেবেছেন স্বপ্নেও? যে পাকিস্তান আমাদের মুক্তিযোদ্ধাসহ ৩০ লাখ বাঙ্গালীকে হত্যা করেছে, দুই লাখ মা-বোন এই স্বাধীনতার জন্য সম্ভ্রম হারালো সেই পাকিস্তানের সঙ্গেই সামরিক জোট !? ধরণী দ্বিধা হও।

গত ২৭ আগস্ট সংসদে স্বতন্ত্র সাংসদ রুমিন ফারহানা পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করেছেন, মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশ যোগ দিলে লাভ কী। জবাবে খলিলুর রহমান বলেছেন , সদস্য দেশগুলি বাংলাদেশকে নিতে চাইলে সরকার অবশ্যই ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে।
চুক্তিটাকে তিনি বললেন -মুসলিম বিশ্বের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা। তারপর বললেন, এটা আমাদের পরিবার।– আমার যদি জানার ভুল না হয়ে থাকে তাহলে এমনটিই ঘটেছে সংসদে।
আবার একই দিন সকালে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমীর ওরফে ‘সাদা শকুন’মানে শফিকুর রহমান নিজের ফেসবুকে লিখলেন, মক্কা চুক্তিতে যোগদান বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব বিষয়। দেশ ও জাতির স্বার্থে বাংলাদেশ কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তাতে অন্য কারও শ্বাসকষ্টে ভোগার প্রয়োজন নাই।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমান বীর প্রতীক এর পুত্র তারেক রহমানের এখনকার বিএনপি সরকারের সময়ে গত এপ্রিলেই সংসদ মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন সংশোধন করেছে।
সেখানে একাত্তরে যাদের বিরুদ্ধে লড়াই হয়েছিল, সেই তালিকায় মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলামের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নাম আছে। বিলটি পাশ করেছে বিএনপির সংসদরা।
চার মাস পর সেই সংসদেই বিএনপির মন্ত্রী পাকিস্তানের সঙ্গে সামরিক জোটকে পরিবার হিসাবে ব্যাখ্যা করলেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এই জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের পক্ষে থেকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে কি কি অপরাধ করেছে তা আর নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।
তো জামায়াতে ইসলামী সবসময়েই পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক।
১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু অনেক বিরোধীতা সত্ত্বেও ওআইসিতে (OIC) যোগ দিয়েছিলেন।
মূলত তখন থেকেই বাংলাদেশ পাক ও ইসলামপন্থী হওয়ার দিকে পা বাড়িয়েছে এটি বললে কি অত্যুক্তি হবে? বর্তমানে মক্কা চুক্তির মতো সম্পূর্ণ মুসলিম-কেন্দ্রিক সামরিক জোটে পা বাড়ানো বাংলাদেশকে কার্যত একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দিকে ধাবিত হয়েছে।
মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলেই ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’ নাম পরিবর্তিত হয়ে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ’ হয়ে যাবে না – এমন যুক্তিও দেখান কেউ কেউ।
তাদের যুক্তি, তুরস্ক নিজে একটি কথিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র এবং ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও এই চুক্তির মূল উদ্যোক্তা। সুতরাং, একটি সামরিক বা ভূ-রাজনৈতিক জোটে যোগ দেওয়া মানেই দেশের নাম বা আভ্যন্তরীণ সংবিধান বদলে যাওয়া নয়।
তাদেরকে বলি , আপনারা একটু ভেবে দেখুনতো এখনকার তুরস্ক কি সেই কামাল আতাতুর্কের নীতি-আদর্শের তুরস্ক আছে ? তুরস্ক ভৌগলিকভাবে কিছুটা এশিয়া আর কিছুটা ইউরোপ মহাদেশের মধ্যে অবস্থিত।
কিন্তু তাদের জীবনযাত্রা অনেকটা ইউরোপীয় ধাঁচের হলেও এরদোগানের নেতৃত্বাধীন তুরস্কতো এখন একটি ইসলামী জঙ্গী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে বলতে গেলে।
দেশের অন্যতম প্রধান দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী ঐতিহাসিকভাবেই মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে গভীর সম্পর্কের পক্ষপাতী।

তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডায় কথিত ইসলামী ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রাধান্য রয়েছে। বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, বহুমাত্রিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য (যার সিংহভাগ পশ্চিমা অমুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে) রাষ্ট্রকে পুরোপুরি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তর হতে দেবেনা বলছেন কেউ কেউ। তবে এই বাংলাদেশ কি সত্যিই আর অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ আছে?
বিশেষ করে গত চব্বিশের ৫ আগষ্টের ‘ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু’ এর পর থেকে দেশটির শুধু নাম বদলানোই বাকী রেখেছে। নাহলে সবইতো পাকিস্তানী কায়দায় ও ইসলামী জোশে পরিচালিত হচ্ছে।
সেনাবাহিনী যেখানে ইসলামী রিসার্চ সেন্টার খোলে সেদেশে আর কি আশা করা যায়?
রাষ্ট্র যদি ক্রমাগত ধর্মীয় মেরুকরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে সেই দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের মনে অবধারিতভাবেই এক ধরনের বিচ্ছিন্নতাবোধ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
ইতিমধ্যেই অধিকার হরণ ও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে তৈরী হয়েছে এদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।
পাকিস্তান আমলের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে সংখ্যালঘুদের মনে ভয় রয়েছে যে, রাষ্ট্র যদি সম্পূর্ণ ধর্মীয় ব্লক বা জোটে প্রবেশ করে, তবে আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মৌলবাদী শক্তির প্রচন্ড আধিপত্য ও আস্কারা বাড়বে। অবশ্য ইতিমধ্যে বেড়ে গেছে।
এর ফলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের নাগরিকরা রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
বর্তমান সংবিধানে ২(ক) অনুচ্ছেদে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম রাখার পাশাপাশি হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্য সব ধর্মের সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
কিন্তু ১৯৮৮ সালে সাবেক সামরিক প্রেসিডেন্ট লেজেহোমো এরশাদ ( লে: জে: হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ) ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেদিনই বোঝা হয়ে গিয়েছিল যে, বাংলাদেশ এখন থেকে একটি ধর্মের নাগরিকদের জন্য।
যদিও অনেক পরে আওয়ামীলীগ সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে আবারো প্রতিস্থাপন করেছিল। তবে সংবিধানে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঢুকানো ‘ বিসমিল্লাহির রাহমানির রহিম ‘ ও যেমন রয়েছে তেমনি ইসলামও রাষ্ট্রধর্ম রয়েছে। এই হলো ধর্মনিরপেক্ষতার নমুনা এই দেশের। তারমানে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে ‘ইসলামী ধর্মনিরপেক্ষ’ রাষ্ট্র!!
তো সেই রাষ্ট্র যখন আন্তর্জাতিকভাবে কেবল ধর্মীয় পরিচিতির ভিত্তিতে তৈরি কোনো সামরিক জোটে অংশ নেয়, তখন দেশের ভেতরে অসাম্প্রদায়িক চেতনা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়। অলরেডি তা হয়েছেও।
মক্কা চুক্তির পক্ষে সাফাই গাওয়া বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের আগ্রহ প্রকাশের পেছনে অর্থনৈতিক সাহায্য ও প্রবাসী শ্রমিকদের স্বার্থ জড়িত রয়েছ। কিন্তু এর কৌশলগত ঝুঁকি অত্যন্ত গভীর সেটি বোধহয় তারা বিবেচনায় আনছেনা।
ভূ-রাজনৈতিক যে ঝুঁকি রয়েছে তাহলো- বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ পররাষ্ট্রনীতি লঙ্ঘিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। সামরিক বাধ্যবাধকতার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্য বা পাকিস্তানের যেকোনো যুদ্ধে বাংলাদেশি সৈন্যদের জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
আঞ্চলিক সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরী হবে। জোটে পাকিস্তানের উপস্থিতির কারণে প্রতিবেশী ভারত এই উদ্যোগকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করছে।
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য ঝুঁকির ক্ষেত্রেও বেশ ভাবতে হবে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার পশ্চিমা বিশ্ব। সেক্ষেত্রে এই সৌদি চুক্তিতে বা সামরিক জোটে মেরুকরণ বাণিজ্য খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অবশ্য বাংলাদেশের এখনকার বিএনপি সরকার বোধ হয় এসব বিষয়কে কোন পাত্তদাই দিতে চাইছেনা। তাদের কাছে ভারত বিরোধীতা ও হিন্দু বিরোধীতাই মূখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারণ ইসলাম ইসলাম ভাই ভাই। এসলামী জোশে আর সামরিক শক্তির আস্ফালনে এতটাই বুঁদ হয়ে আছে যে, তাদের কাছে সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কথা আর মনে নেই। তারা বোধ হয় তা মনেও করতে চায়না।
যেহেতু এটি একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি, তাই মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব বা তুরস্ক কিংবা দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান কোনো যুদ্ধে জড়ালে বাংলাদেশকে নীতিগতভাবে সেই যুদ্ধে অংশ নিতে হবে। এর পাশাপাশি সামরিক সহায়তা দিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের জটিল শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব বা অন্য কোনো ভূ-রাজনৈতিক প্রক্সি যুদ্ধে বাংলাদেশি সৈন্যদের সম্পৃক্ত করা দেশের নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক আত্মঘাতী হতে পারে।
শুধু তাই নয়, প্রতিবেশি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রচন্ড টানাপোড়েন শুরু হবে। কারণ মক্কা চুক্তিতে পাকিস্তানের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে ভারতের একদম দোরগোড়ায় থাকা বাংলাদেশ যদি এই জোটে শামিল হয়, তবে নয়াদিল্লি এটিকে নিজের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করবে। সেটাই স্বাভাবিক।
ইতিমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে তীব্র নজরদারি রাখছে বলে জানিয়েছে। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় না রাখলে ট্রানজিট, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তি চরম অনিশ্চয়তায় পড়বে।
মক্কা ধর্মের দিক থেকে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে এক আবেগের স্থান, কিন্তু আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা আবেগের টানে পরিচালিত হতে পারে না।
ওআইসিতে অবদান রাখা বা মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ভালো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখা এক বিষয়, আর কোনো সুনির্দিষ্ট সামরিক জোটে স্বাক্ষর করে নিজেদের সার্বভৌমত্বকে অন্যের যুদ্ধের সমীকরণে সঁপে দেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সুতরাং এমন একটি ‘ইসলামী প্রতিরক্ষা জোট’-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ করা নেহাতই নিজের পায়ে নিজে কুড়োল মারার সামিল হবে। সেই কুড়োলটিই মারতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।
# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।
