পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অত্যন্ত কলঙ্কজনক ও ভয়াবহতম দিন ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট।

রাজধানী ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভেনিউতে আয়োজিত সংসদে তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি সমাবেশে সুপরিকল্পিতভাবে উপর্যুপরি শক্তিশালী আর্জেস গ্রেনেড হামলা হয়।

এটি কেবল দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকেই ক্ষতবিক্ষত করেনি, বরং পরবর্তী দুই দশকের রাজনীতিকে এক চরম বৈরিতা ও প্রতিহিংসার আবর্তে ঠেলে দিয়েছে।

এ নৃশংস ও চরম প্রতিহিংসামূলক হামলা শুধু শেখ হাসিনাকে হত্যা নয়, আওয়ামীলীগকে নেতৃত্বশূন্য করা নয়, এটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি সবচেয়ে বড় দলটিকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার একটি নীলনকশা।

এই হামলার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়ার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্র ছিল দেশি-বিদেশী কায়েমী স্বার্থবাদী চক্রের।

যে চক্রটি ’৭৫ এর ১৫ আগষ্ট বাঙ্গালীর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংস হত্যার মধ্য দিয়ে তাদের আশা পূরণ করতে পারেনি সেই ২১ আগষ্টের হামলার মধ্য দিয়ে তা পূরণ করতে চেয়েছিল।

একাত্তরের পরাজিত অপশক্তি যারা সবসময়েই সুযোগের সন্ধানে ছিল মুক্তিযুদ্ধের দল ও চেতনাকে ধ্বংস করতে সেই ইসলামী ফ্যাসিস্ট অপশক্তিই সেদিন উপর্যুপরি গেনেড হামলা ও এরপর শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মত গুলি ছুড়েছিল।

কিন্তু বাংলার সোদা মাটি থেকে আওয়ামীলীগের একনিষ্ঠ ত্যাগী নেতাকর্মী সেদিন জাতির পিতার কন্যা শেখ হাসিনাকে মানবঢাল হয়ে নিজেদের প্রাণ দিয়ে সেদিন রক্ষা করেছিলেন।

কারণ তারা বিশ্বাস করতো মুজিবের রক্তে ভেজা বাংলার মাটি-স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই। শত সীমাবদ্ধতা-সমালোচনা সত্ত্বেও এটিই আওয়ামীলীগ।

মহিলা আওয়ামীলীগের সভানেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি এবং শত শত মানুষের চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ এ দেশের ইতিহাসে এক স্থায়ী ক্ষত। যে ক্ষত কোনদিন মুছে যাবেনা ইতিহাস ও সেই ক্ষত নিয়ে বেঁচে থাকা নেতাকর্মীর শরীর থেকে।

গত ২২ বছর ধরে এই নারকীয় হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়া, তদন্তের গতিপ্রকৃতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব যেভাবে আবর্তিত হয়েছে, তা রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক জটিল চিত্রকে ফুটিয়ে তোলে।

নিহতদের মধ্যে আইভি রহমান ছাড়াও ছিলেন ল্যান্স কর্পোরাল (অব.) মাহবুবুর রশীদ (শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী), রফিকুল ইসলাম (আওয়ামী লীগ নেতা), সুফিয়া বেগম, হাসিনা মমতাজ, মোশতাক আহমেদ সেন্টু এবং আরও অনেক তৃণমূল নেতাকর্মী।

আহতদের মধ্যে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা ঢাকার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ হানিফ (যিনি শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে মানবঢাল তৈরি করেছিলেন এবং পরবর্তীতে স্প্লিন্টারের আঘাতে মারা যান)।

ওবায়দুল কাদের, সাহারা খাতুন এবং আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ অনেকেই আজীবন শরীরে স্প্লিন্টারের যন্ত্রণা বহন করেছেন। শেখ হাসিনা নিজে অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও তার শ্রবণশক্তি স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সেই ভয়াবহ হামলার অব্যবহিত পর বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের ভূমিকা তীব্র সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।

হামলার পরদিন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই বর্বরোচিত হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি দেওয়া হয় এবং দোষীদের চিহ্নিত করতে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গভীর শোক ও সহানুভূতির বাণী প্রকাশ করেছিলেন।

তবে এই আনুষ্ঠানিক শোকের সমান্তরালে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছিল অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। হামলার পরদিনই দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে। এমনকি আহতদের উদ্ধার করতে আসা সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের ওপরও পুলিশি বাধার অভিযোগ ওঠে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জোট সরকার প্রথম থেকেই ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে এবং বিরোধী দলের আন্দোলনের গতি দমাতে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছিল, যা তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির আন্তরিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।

২১ আগস্টের হামলা নিয়ে তৎকালীন রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়ির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত একটি বয়ান ছিল—”শেখ হাসিনা নিজেই ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে গিয়েছিলেন।”

আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে দাবি করা হয়েছে যে, হামলার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সংসদে বা বিভিন্ন দলীয় জনসভায় এই মন্তব্য করেছিলেন।

মূলত, হামলার পর বিএনপি-জামায়াত জোটের কিছু কট্টরপন্থী নেতাকর্মী ও কলামিস্ট প্রচার করেছিলেন যে, আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য এবং সরকারকে বিপদে ফেলতে নিজেরাই এই হামলা ঘটিয়েছে।

এই রাজনৈতিক অপপ্রচারকেই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বক্তৃতায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতারা খালেদা জিয়ার প্রত্যক্ষ মন্তব্য হিসেবে রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করেন।

২১ আগস্ট হামলার তদন্ত প্রক্রিয়াকে সবচেয়ে বেশি কলঙ্কিত করেছিল সিআইডি-র সাজানো ‘জজ মিয়া’ নাটক।

২০০৫ সালের জুন মাসে নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে জজ মিয়া নামের এক সাধারণ ভবঘুরে মানুষকে গ্রেফতার করে সিআইডি। তাকে ভয়ভীতি ও তার পরিবারকে মোটা অংকের মাসোহারা দেওয়ার লোভ দেখিয়ে আদালতে একটি ভুয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ানো হয়, যেখানে বলা হয় যে স্থানীয় কিছু অপরাধী চক্র এই হামলা চালিয়েছে।

পরবর্তী সময়ে ২০০৭ সালে “ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিন” তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিআইডির নতুন তদন্তে উন্মোচিত হয় যে, হামলাটি আসলে কোনো জজ মিয়া বা বিচ্ছিন্ন অপরাধী চক্রের কাজ ছিল না।

এটি ছিল নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামী জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামী (হুজি-বি)-এর একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত অপারেশন। হুজি প্রধান মুফতি আবদুল হান্নানসহ শীর্ষ জঙ্গি নেতারা এই হামলার মূল বাস্তবায়নকারী ছিলেন।

এর বাইরে লস্কর-ই-তৈয়বা বা জইশ-ই-মুহাম্মদের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের একাংশের পরোক্ষ লজিস্টিক সহযোগিতার কথাও তদন্তে উঠে আসে।

নানা সময়ে এখনকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে নানা সন্দেহ ও তথ্যপ্রমাণ মেলে।

২১ আগস্ট মামলায় ক্ষমতা ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুই ধরনের সম্পূর্ণ ভিন্ন ও পরস্পরবিরোধী বয়ান তৈরি হয়েছে, তাহলো-
আওয়ামী লীগ আমলের অধিকতর তদন্ত ও নিম্ন আদালতের রায় (২০১৮):

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলার সম্পূরক তদন্ত শুরু হয় এবং তৎকালীন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শীর্ষ ব্যক্তিদের এতে আসামি করা হয়।

২০১৮ সালের ১০ অক্টোবরের নিম্ন আদালতের রায়ে বলা হয়, বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের রাজনৈতিক কার্যালয় ‘হাওয়া ভবন’-এ বসেই জঙ্গি নেতাদের সাথে এই হামলার মূল ষড়যন্ত্র ও সবুজ সংকেত দেওয়া হয়েছিল। আদালত তাকে ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা মূল ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরকে জঙ্গিদের প্রশাসনিক ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান এবং হামলার পর অপরাধীদের নিরাপদে পালিয়ে যেতে সাহায্য করার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

এর পাশাপাশি তৎকালীন এনএসআই প্রধান রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী এবং ডিজিএফআই এর তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তা এটিএম আমিনসহ বেশ কয়েকজন গোয়েন্দা কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা পায় আদালত।

তাদের বিরুদ্ধে আলামত ধ্বংস করা, মামলার মূল অপরাধী মাওলানা তাজউদ্দিনকে ভুয়া পাসপোর্টে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া এবং জজ মিয়া নাটক সাজানোর অভিযোগ প্রমাণিত হয়।

কিন্তু বিগত ২০২৪ এর কথিত গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর অবৈধ-অসাংবিধানিক ইউনুসের শাসনামলে এই মামলার আইনি ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মোড় আসে।

২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর হাইকোর্ট নিম্ন আদালতের পূর্বের রায়কে ‘আইনবহির্ভূত ও অবৈধ’ বলে বাতিল ঘোষণা করেন এবং তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ সকল ৪৯ জন আসামিকে সম্পূর্ণ খালাস দেন।

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ লোকদেখানো লিভ টু আপিল করলে, ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর দেশের সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগও হাইকোর্টের খালাসের রায় বহাল রাখেন।

আসলে এসব রায়তো আদালতের বিচারকরা লেখেননি, অন্য জায়গা থেকে লিখে দেয়া হয়েছিল যা আদালতের বিচারক শুধু তোতা পাখির মত পাঠ করে তাতে সই করেছেন।

ইউনুস আমলে উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয় যে, নিম্ন আদালতের পূর্বের রায়টি প্রধানত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, অনুমানের ওপর ভিত্তি করে এবং রিমান্ডে নির্যাতন করে নেওয়া ত্রুটিপূর্ণ ও জোরপূর্বক জবানবন্দির (বিশেষ করে মুফতি হান্নানের প্রত্যাহারকৃত জবানবন্দি) ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল, যার কোনো আইনগত ভিত্তি ছিল না।

২১ আগস্ট হামলার পেছনে কোনো বিদেশী অপশক্তি বা দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ইন্ধন ছিল কিনা, তা দীর্ঘ দুই দশক ধরে একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের বয়ান ও বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত অনুযায়ী, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং বাংলাদেশের তৎকালীন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার একটি শক্তিশালী অংশের যোগসাজশে শেখ হাসিনাকে সপরিবারে নির্মূল করার অংশ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছিল।

তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের গঠিত ‘বিচারপতি জয়নুল আবেদীন কমিশন’ আবার উল্টো দাবি করেছিল যে, তৎকালীন সরকারকে আন্তর্জাতিকভাবে কোণঠাসা করতে একটি ‘প্রতিবেশী দেশের’ (ভারত) গোয়েন্দা সংস্থা এই হামলা করিয়েছে। তবে উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিকতম রায়ে এসব রাজনৈতিক অনুমিতিকে বাতিল করে দেওয়া হয়েছে এবং যথাযথ তথ্যপ্রমাণের অভাবে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায়নি।

আওয়ামীলীগ আমলে নিম্ন আদালতের রায়ে মোট ৪৯ জন আসামিকে সাজা দেওয়া হয়েছিল, যাদের মধ্যে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড এবং ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল। তবে ২০২৪-২০২৫ সালের উচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ের পর তাদের আইনি অবস্থার আমূল পরিবর্তন করা হয়।

যেটি বিশেষ বাহিনী ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আদেশ অনুযায়ী করা হয়েছে বলেই বলছেন আদালতের আইনজীবী ও বিশ্লেষকগণ।

বিগত দেড় দশক ধরে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ে অবস্থান করেছেন বিএনপির এখনকার কান্ডারি তারেক রহমান।

এই মামলায় উচ্চ আদালত থেকে খালাস পাওয়ার পর তার ওপর থেকে এই মামলার সকল আইনি বাধ্যবাধকতা উঠে গেছে।

তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপি নেতা ও হরকাতুল জেহাদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক আবদুস সালাম পিন্টুও এই মামলায় সম্পূর্ণ খালাস পেয়েছেন।

অন্যান্য সরকারি ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা মামলা থেকে খালাস পাওয়ার ফলে তাদের সাজা বাতিল হয়ে গেছে।

বাংলাদেশে সেসময়কার হুজির প্রধান মুফতি হান্নান এবং শরীফ শাহেদুল আলম বিপুলের অন্য একটি মামলায় (ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা) ২০১৭ সালেই ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। তাই এই মামলার খালাসের রায় তাদের ক্ষেত্রে কেবল খাতাকলমেই সীমাবদ্ধ।

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি এবং একই সাথে রাষ্ট্রীয় তদন্ত ও বিচারিক রাজনীতিকরণের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ। ২০ বছরের ব্যবধানে এই মামলার দুই ধরনের সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী রায় প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগীয় সত্য অন্বেষণ কতটা রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল।

কোনো গণতান্ত্রিক ও সভ্য রাষ্ট্রে প্রকাশ্য দিবালোকে তৎকালীন প্রধান বিরোধীদলীয় নেতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড হামলা চালানো কোনোভাবেই সাধারণ অপরাধ হতে পারে না।

কিন্তু এই নৃশংসতম ঘটনার সুষ্ঠু, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত প্রথম থেকেই ব্যাহত হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজিয়ে এবং আলামত ধ্বংস করে সত্যকে কবর দিতে চেয়েছিল।

অপরদিকে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে অধিকতর তদন্তের নামে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে মামলাটিকে ঝুলিয়ে রেখেছিল এমন অভিযোগও রয়েছে।

এক সরকারের আমলে যা ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সুপরিকল্পিত অপরাধ’ হিসেবে প্রমাণিত হয়, অন্য সরকারের পতনের পর দেশের সর্বোচ্চ আদালতের চোখে তা ‘ত্রুটিপূর্ণ, জোরপূর্বক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার’ হিসেবে খারিজ হয়ে যায়। এই বিচারিক গোলকধাঁধা বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিকদের মনে এক গভীর হতাশার জন্ম দেয়।

চূড়ান্ত বিশ্লেষণে বলা যায়, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার প্রকৃত সত্য ও নেপথ্যের কারিগররা রাজনৈতিক মেরুকরণের ঘন কুয়াশায় চিরতরে হারিয়ে গেছে। দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রযন্ত্র, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করার যে সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে, ২১ আগস্টের ঘটনা তার সবচেয়ে ভয়াবহ কুফল।

এর মধ্য দিয়ে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি পরস্পরকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে একে অপরের চরম শত্রু হয়ে উঠেছে। যার ফলে হয়তো কোনদিনই আর রাজনৈতিক সৌহার্দ্য ফিরে আসবেনা।

কেউ কেউ নানা বয়ান সৃষ্টি করার চেষ্টা করে ২১ আগষ্টের গেনেড হামলাকে ভিন্নখাতে ঘুরাতে চান। তারা বিএনপি-আওয়ামীলীগের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা করার নানা প্রস্তাব দিয়েছেন।

তবে সেসব প্রস্তাব সবই ছিল আওয়ামীলীগকে ছাড় দিতে হবে রাজনীতিতে, তাহলো বিএনপি নেতৃত্বকে এই গ্রেনেড হামলা অভিযুক্তি মামলা থেকে বাদ দিয়ে রাজনীতি করা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো- যে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় শেখ হাসিনাকে খুন করার জন্য প্রকাশ্যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা ও ব্রাশফায়ার করেছে সন্ত্রাসীরা স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে, সেখানে কার সাথে সমঝোতা? কিসের সমঝোতা?

খুনী ও খুনীর লালন-পালনকারি-ইন্ধনদাতাদের সঙ্গে খোশগল্পের আলাপ করতে হবে আওয়ামীলীগকে বা শেখ হাসিনাকে?

আর ২০০৪ এর ২১ আগষ্টই যে শেখ হাসিনাকে খুন করার প্রচেষ্টা হয়েছিল তা নয় কিন্তু। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য তাঁর রাজনৈতিক জীবনে কমপক্ষে ১৯ থেকে ২২ বার সশস্ত্র হামলা ও প্রাণনাশের চেষ্টা চালানো হয়েছে।

২০০৪ এর ২১ আগষ্ট ছাড়াও ২০০০ সালে বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায়। সেখানে শেখ হাসিনার জনসভাস্থল এবং হেলিপ্যাডের অদূরে ৭৬ কেজি ও ৪০ কেজি ওজনের দুটি শক্তিশালী দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল।

২০০১ সালের ৩০ মে খুলনার রূপসা সেতু উদ্বোধনের সময় শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে জঙ্গিরা সেখানে বোমা পুঁতে রেখেছিল।

এছাড়া চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের কাছে আদালত পাহাড়ের পাদদেশে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি তাঁর গাড়ি বহরে পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এই ঘটনায় প্রায় ২৪ জন আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হন।

ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবনে ১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট ইসলামী জঙ্গী দল ফ্রিডম পার্টির সন্ত্রাসীরা শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি ও গ্রেনেড হামলা চালায়।

ঢাকার গ্রিন রোডে ১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর একটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে তাঁর ওপর ২০-২৫ রাউন্ড গুলি ও বোমাবর্ষণ করা হয়।

১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পাবনা ও ঈশ্বরদীতে রেলযোগে সাংগঠনিক সফরে বেরোলে তাঁর ট্রেন লক্ষ্য করে গুলি ও বোমা হামলা করা হয়।

১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর ঢাকার রাসেল স্কয়ারের কাছে তাঁর ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। ২০০৭-২০০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় সাব-জেলে বন্দি থাকাকালে তাঁর খাবারে বিষ প্রয়োগের মাধ্যমে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

২০১১ ও ২০১৪ সালেও শ্রীলঙ্কার আত্মঘাতী একটি চরমপন্থী দল এবং দেশের বাইরের কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে বিপুল পরিমাণ টাকা দিয়ে শেখ হাসিনাকে হত্যার আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল বলে জানা যায়।

তো রাজনৈতিক সমঝোতা কার সঙ্গে? খুনীর সঙ্গে? খুনীর দোসরদের সঙ্গে? খুনের ষড়যন্ত্রকারি ও প্রেট্রোনাইজারদের সাথে? শেখ হাসিনা ও আওয়ামীলীগের এতটা উদার বোধ হয় না হলেও চলবে।

আচ্ছা ধরুন, খালেদা জিয়া বা তারেক জিয়াকে কেউ এমনভাবে হত্যার চেষ্টা যদি কেউ করতো তাহলে তাদের সঙ্গে কি খালেদা জিয়া বা তারেক জিয়া/রহমান খোশগল্পে বা সমঝোতায় বসতেন?

বাংলাদেশের কিছু দালাল সু-শীল বার বারই শেখ হাসিনা ও আওয়ামীলীগকে বার বার খুনীদের সঙ্গে সমঝোতার প্রস্তাবে রাজী করাতে নানাভাবে চেষ্টা করেছিল।

# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *