আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংবাদমাধ্যম- সাংবাদিকতার স্বাধীনতাসহ সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা ছিলনা এমন অভিযোগ রয়েছে। কারা এ নিয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন? জামায়াত-বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।
এর পাশাপাশি মতি-মাহফুজ-নুরুল কবিরসহ এই জাতীয় কথিত সুশীল সম্পাদক ও সাংবাদিকদের ফোরাম থেকে।
তো চব্বিশের জুলাই-আগষ্টের যে অত্যন্ত পরিকল্পিত “ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু”এর ঘটনা ঘটানো হলো তার পেছনেতো এসব সম্পাদক নেতৃবৃন্দের প্রচণ্ড রকমের ন্যাক্কারজনক ভূমিকা ছিল।
তো চব্বিশে তাদের বহুল কাঙ্ক্ষিত সরকার বদলের পর থেকে নিশ্চয়ই তারা বেশ মুক্তভাবে সাংবাদিকতা করতে পেরেছেন?
তো সত্যিকার অর্থে কি ঘটছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে তা একটু সাংবাদিক ও সাধারণ সচেতন নাগরিকদের জিজ্ঞেস করলেই পাওয়া যাবে আসল চিত্র।
আমি আসলে গণমাধ্যম শব্দটি ব্যবহার করতে চাইনা। কারণ বাংলাদেশে কি গণমাধ্যম আছে আদৌ? গণমানুষের কথা বলার জন্য যে মাধ্যম তাকেই তো আমরা গণমাধ্যম বলবো। তাই না?
তো সেই পরিস্থিতি কি বাংলাদেশ নামক পাকিপন্থী দেশটিতে বিরাজ করছে? সাংবাদিকগণ কি সমাজে যা ঘটছে ও প্রশাসনের অন্দরমহলে যা ঘটছে তা প্রকাশ করার অধিকার পাচ্ছেন? ওই যে উপরে কয়েকজন বিজ্ঞ (!) সম্পাদক মহোদয়দের নাম উল্লেখ করলাম তারা কি প্রকাশ করছেন দেশের প্রকৃত অবস্থান? নাকি তারা আসলে চাচ্ছেন না তা প্রকাশ করতে?
কথিত জুলাই বিপ্লবের একনিষ্ঠ মিডিয়া প্রেট্রোনাইজার প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, নি্উ এইজসহ আরো কয়েকটি সংবাদমাধ্যম যে ন্যাক্কারজনক ভূমিকা রেখেছিল তারা কি শান্তিতে আছেন?
সাধারণ মানুষ কি তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারছেন ঠিকভাবে? সরকারের সমালোচনা করতে পারছেন? এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনা করলেই তাদেরকে আওয়ামী দোসর/ফ্যাসিবাদের ট্যাগ লাগিয়ে নানাভাবে হয়রানি, গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। মামলা দেয়া হচ্ছে। আবার সেই মামলাগুলোর কোন সুরাহাও করা হচ্ছেনা। জামিন দেয়া হচ্ছেনা সাংবাদিকদেরকে।

চব্বিশের সরকার বদলের পর কয়েকশ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যে খুনের মামলা, দাঙ্গা হাঙ্গামা, চাঁদাবাজি, বিষ্ফোরক দ্রব্য আইনসহ নানা নিবর্তনমূলক আইনে মামলা দেয়া হয়েছে। অনেককে গ্রেপ্তার করে নির্দয়ভাবে নির্যাতনও করা হয়েছে ও হচ্ছে।
শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবে, আর্থিকভাবে ও সামাজিকভাবেও নানা কৌশলে এ নির্যাতন চালানো হচ্ছে। কিছু কিছু দেশি মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিকদের সংগঠন ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সাংবাদিকদের অধিকার সুরক্ষা করেন এমন বেশ কিছু সংগঠন নানা সময়ে সেই ইউনুস সরকারের সময় থেকে এমনকি বিএনপি সরকারের কাছেও এসব অত্যাচার, জেল জুলুম বন্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু কোন প্রতিক্রিয়া নেই তাতে সরকারের।
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় সংবাদ মাধ্যমকে। কিন্তু বাংলাদেশের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এই স্তম্ভটি বরাবরই শাসকশ্রেণি ও কাণ্ডজ্ঞানহীন স্বার্থান্বেষী মহলের নির্মম কুঠারাঘাতের শিকার হয়েছে।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কিংবা ক্ষমতার হাতবদল হলেও সাংবাদিক-সংবাদমাধ্যমের ভাগ্যের চাকা ঘুরেনি। আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যখন আমরা বিগত দুই দশকের সাংবাদিক নির্যাতন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করি, তখন এক চরম হতাশাজনক ও নির্মম চিত্র ফুটে ওঠে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বারবার গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, বাস্তব চিত্র ভিন্ন।
সাংবাদিক হত্যা, রহস্যজনক মৃত্যু, গণমামলা, হয়রানি, চাকুরিচ্যুতির আতঙ্ক এবং চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আজ এ দেশের সংবাদকর্মীদের নিত্যসঙ্গী।
এই সংকট কেবল সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত জীবনের বিপর্যয় নয়, বরং তা গোটা রাষ্ট্রের বাক্স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের অন্তিম শয্যারই ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশে বিগত দুই দশকে সংঘটিত প্রবীণ ও দুঃসাহসী সাংবাদিকদের হত্যাকাণ্ডগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, আইনের দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে অধিকাংশ মামলাই অন্ধকারের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে।
বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে খুলনার নির্ভীক সাংবাদিক মানিক সাহাকে বোমা মেরে হত্যা করা হয়। দীর্ঘ ১৩ বছর পর ২০১৬ সালে নিম্ন আদালত এই হত্যাকাণ্ডের রায় দিলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ রয়েছে যে, মূল পরিকল্পনাকারীরা রায়ের বাইরে থেকে গেছে।
একইভাবে, ২০০৪ সালের জুন মাসে দৈনিক জন্মভূমির সম্পাদক হুমায়ুন কবির বালুকে নিজ কার্যালয়ের সামনে বোমা হামলায় হত্যা করে চরমপন্থীরা। ২০০৮ সালে তড়িঘড়ি করে দেওয়া রায়ে সব আসামিকে খালাস দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় এক লজ্জাজনক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

সেই একই আমলে ২০০৫ সালে ফরিদপুরে স্থানীয় শাসকগোষ্ঠীর দুর্নীতি নিয়ে সাহসিকতার সাথে প্রতিবেদন করার অপরাধে সাংবাদিক গৌতম দাসকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
২০১৩ সালে নিম্ন আদালত ৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয় এবং ২০১৯ সালে হাইকোর্ট ৫ জনের সাজা বহাল রাখে। তবে, রাজনৈতিক প্রভাবে প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিকগণ। কিন্তু তার কোন সুরাহা হয়নি।
প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মতো ব্যক্তিত্বদের বিভিন্ন সময়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মানসিক নিপীড়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং দৈনিক সমকালের সাবেক ব্যুরোপ্রধান পুলক চ্যাটার্জির রহস্যজনক মৃত্যু সারা দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

বরিশালে সমকালের কার্যালয় থেকে তাঁর ঝুলন্ত লাশ ও সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হলেও এই ঘটনাটিকে ঘিরে গভীর রহস্যের দানা বেঁধেছে। পরিবারের ওপর আর্থিক ও পেশাগত চাপ সৃষ্টি করে তাঁকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা চলছে। তার সুইসাইড নোটে অভিযোগ ছিল সমকাল কর্তৃপক্ষ তাকে ২০২৪ এর সরকার বদলের পর চাকরিচ্যুত করেছে। বার বার তিনি সমকাল কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর প্রাপ্য ন্যায্য পাওনার জন্য আবেদন নিবেদন করেও তা পাননি।
পুলক চ্যাটার্জির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর নাকি সমকাল কর্তৃপক্ষ তাঁর পরিবারের কাছে কিছু টাকা হস্তান্তর করেছেন। কিন্তু এই সমকাল পত্রিকার মালিক হলেন এ কে আজাদ নামে একজন শিল্পপতি।

যিনি বাংলাদেশে ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ সংগঠন এফবিসিসিআই এর সভাপতিও ছিলেন যতদূর জানি। হামিম গ্রুপ নামে একটি ধর্ণাঢ্য ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি।
অথচ তিনি তার মালিকাধীন সমকালের বরিশাল ব্যুরো প্রধান পুলক চ্যাটার্জির দেনা পাওনা জীবিতকালে পরিশোধের কোন ব্যবস্থা নেননি। তো এই এ কে আজাদের বিরুদ্ধে কি এখন হত্যা মামলা হতে পারেনা?
এটিতো মৃত্যুকে প্ররোচিত করার মত একটি জঘন্য ঘটনা। আর তার মৃত্যুর পর ঘটনা কিছুটা প্রকাশ পেলেও তখন তড়িঘড়ি করে তার পরিবারের কাছে কিছু টাকা ধরিয়ে দিয়ে দায় সারতে চাইছেন !! কি বিচিত্র এসব মালিকদের? আর বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সংগঠনগুলোও অনেকটা মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে।
তারমানে বাংলাদেশে শুধু সরকার বা ক্ষমতাসীনরাই সাংবাদিকদের নির্যাতন করছেনা সংশ্লিষ্ট মালিকপক্ষও অনেকাংশে দায়ী এজন্য। কোন সংবাদ মাধ্যমের সাংবাদিক দীর্ঘদিন বা অল্প কয়েকবছরের জন্যও যদি চাকরি করেন তার মেধা-শ্রম দিয়ে তারতো দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী একটি পাওনা থাকে। কিন্তু দেশের কোন সংবাদ মাধ্যমই তা পরিশোধ করেনা।
আইন আছে, আদালত আছে। কিন্তু মালিকপক্ষের বিরুদ্ধে আইনী লড়াই করতে করতে অনেক সাংবাদিক জীবনক্ষয় করেছেন।
আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে কোন কোন প্রতিষ্ঠানের সিনিয়র সাংবাদিক যারা নির্বাহী ক্ষমতা ভোগ করেন তারাই তার অধস্তন সাংবাদিকদের দমিয়ে রাখেন- দেনা পাওনা-প্রমোশনের ব্যাপারে। এরা সবসময়েই মালিকপক্ষের পা চাটা সাংবাদিক-সম্পাদক হয়।
বিগত ১০ বছরে সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে ডজনখানেক সাংবাদিক হত্যার তদন্ত প্রতিবেদন যেভাবে শতবার পিছিয়েছে, তা থেকে প্রমাণিত হয় যে বাংলাদেশে সাংবাদিক হত্যা মানেই এক অলিখিত বিচারহীনতার স্থায়ী লাইসেন্স।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কেউ কেউ হয়তো অলীক স্বপ্ন দেখেছিলেন- সংবাদমাধ্যম মাধ্যম শ্বাস নেওয়ার মতো একটি মুক্ত পরিবেশ ফিরে পাবে।
তবে বাস্তবে বরং আরো বেশি ও এক চরম নৈরাজ্যের অধ্যায় শুরু হয়। বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-র তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর থেকে পরবর্তী ১৫ মাসে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ১০৭৩ জন সাংবাদিক এবং সাংবাদিক হামলা, মামলা ও ভয়াবহ হয়রানির শিকার হয়েছেন।
এদেরকে সরাসরি জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত হত্যা ও সহিংসতার মামলায় আসামি করা হয়েছে।
গত চব্বিশের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিককে নাটকীয়ভাবে গ্রেপ্তার করা হয়।
একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ময়মনসিংহের ধোবাউড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার আটক করা হয়।

পরবর্তীতে তাঁদের ঢাকার একাধিক হত্যা মামলায় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনাল তাঁদের জামিন না দিয়ে কারাগারেই রাখার নির্দেশ দিয়েছে।
এদের বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতা দমনে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলছে এবং বর্তমানে তারা কারাগারে বন্দি আছেন।
একাত্তর টিভির সাবেক বার্তা প্রধান শাকিল আহমেদকে তার স্ত্রী ফারজানা রূপাকে ঢাকা থেকেই আটক করা হয় এবং তিনি দীর্ঘ সময় ধরে কারাবন্দি জীবন কাটাচ্ছেন।
অভিজ্ঞ সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করার অপরাধে ঢাকার ধানমণ্ডি এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয় এবং রিমান্ড শেষে বর্তমানে তিনি নানা কাঠখড় পুড়িয়ে জামিনে আছেন।
সেই চব্বিশের আগষ্টের পর থেকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন যেমন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে যে, সাংবাদিকদের কেবল তাঁদের সম্পাদকীয় অবস্থান বা প্রেস কনফারেন্সে প্রশ্ন করার জন্য “মানবতাবিরোধী অপরাধ”-এর মতো গুরুতর ধারায় অভিযুক্ত করা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী।
জামিন না দিয়ে তাঁদের মাসের পর মাস কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে এবং অনেকেরই শারীরিক অবস্থার চরম অবক্ষয় ঘটেছে। এ ছাড়া আরো অনেক সাংবাদিকদের সংগঠনও বার বার সরকারের কাছে তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের নির্যাতন বন্ধের দাবি জানিয়েছ।
কিন্তু চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি অনবরত গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলে আসছে।
ড. ইউনূসের সরকার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সংবাদপত্রের অবাধ স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে সরকারের তথ্য উপদেষ্টা কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমের পক্ষপাতিত্বকে অপরাধের সমতুল্য করার চেষ্টা করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে এসব মামলা সাধারণ নাগরিকরা ব্যক্তিগতভাবে দায়ের করেছে, এতে রাষ্ট্রের হাত নেই।
কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যেভাবে তড়িঘড়ি করে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নিচ্ছে, তা থেকে রাষ্ট্র তার দায় এড়াতে পারে না।
অন্যদিকে, মাঠপর্যায়ে বিএনপি এবং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা নতুন শক্তির ক্যাডারদের মাধ্যমে বিভিন্ন গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা ও দখলের সংস্কৃতি শুরু হয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর মতে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স (RSF)-এ বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম স্থানে নেমে এসেছে, যা প্রমাণ করে যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। তথাকথিত এই স্বাধীনতা আসলে এক বড় ধরনের বিভ্রম।
আজকের বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ওপর শারীরিক নির্যাতন ও মৃত্যুর হুমকি এক চরম রূপ ধারণ করেছে। মাঠপর্যায়ে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত সাংবাদিকরা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী অথবা স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন।
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় ও আঞ্চলিক পর্যায়গুলোতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হত্যার হুমকি দেওয়ার ভূরি ভূরি নজির রয়েছে।
এর সাথে যোগ হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন। ৫ আগস্টের পর থেকে কর্পোরেট মিডিয়া হাউসগুলো রাতারাতি নিজেদের খোলস বদলাতে শুরু করেছে।
কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই শত শত প্রবীণ ও তরুণ সাংবাদিককে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ট্যাগ লাগিয়ে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। কোনো কোনো হাউসে নতুন ক্ষমতাকেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের নির্দেশে তালিকা তৈরি করে গণছাটাই চালানো হচ্ছে।
যারা চাকরি টিকিয়ে রেখেছেন, তাঁদেরও ২৪ ঘণ্টা তটস্থ থাকতে হচ্ছে কখন মাথার ওপর চাকুরিচ্যুতির খড়্গ নেমে আসে।
স্বাধীনতার গালভরা বুলির নিচে চাপা পড়ে গেছে সাংবাদিকদের পেটের ক্ষুধা।
বাংলাদেশের সিংহভাগ গণমাধ্যম আজ চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার সরাসরি ভুক্তভোগী সাধারণ সংবাদকর্মীরা। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে কর্মরত সাংবাদিকদের বড় একটি অংশ গত ৬ থেকে ৯ মাস ধরে কোনো নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। মাসের পর মাস বেতন বকেয়া রাখাটা এখন অনেক মিডিয়া মালিকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
নবম বা দশম ওয়েজ বোর্ডের বাস্তবায়ন কেবল খাতা-কলমেই সীমাবদ্ধ। মুদ্রাস্ফীতি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আকাশচুম্বী দামের এই বাজারে নামমাত্র যে বেতন দেওয়া হয়, তাও সময়মতো না পাওয়ায় সাংবাদিকদের পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে।
চাকরি হারানো সাংবাদিকরা নতুন কোনো সংস্থানে যোগ দিতে পারছেন না, কারণ সামগ্রিক মিডিয়া শিল্পে এক স্থবিরতা বিরাজ করছে। অনেক প্রবীণ সাংবাদিককে পরিবারের চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালাতে না পেরে ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে হয়েছে অথবা রিকশা চালানো বা ছোটখাটো মুদি দোকানের মতো পেশা বেছে নিতে হচ্ছে, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম লজ্জাজনক।
যে সংবাদ মাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয় নানা সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে ও রাষ্ট্রীয় নেতৃবৃন্দও বলেন মুখে (অন্তরে নয় কিন্তু) তা আজ প্রচন্ড হুমকির সন্মুখীন।
নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য সংবাদ মাধ্যমই কাজ করে থাকে। কিন্তু ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে আজ আবার সেই পুরনো দমন-পীড়নের চাকা সচল করা হয়েছে।
পুলক চ্যাটার্জি, মানিক সাহা কিংবা গৌতম দাসের মতো সাংবাদিকদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আজ যে সাংবাদিকতার সৌধ নির্মিত হয়েছে, তা দিনে দিনে ভেঙে পড়ছে বিচারহীনতা আর নির্মম দলীয়করণের থাবায়। বাংলাদেশের সিব সংবাদমাধ্যম এখন জামায়াত-বিএনপি’র দখলে। সেখানে অপসাংবাদিকেরা ছড়ি ঘুরাচ্ছেন।
যে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে তাতে এ দেশে অচিরেই স্বাধীন সাংবাদিকতার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেওয়া হবে। সাংবাদিকদের ওপর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা গণমামলা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার না করলে একটি জংলী রাষ্ট্রব্যবস্থাই কায়েম হবে।
গ্রেপ্তারকৃতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং সংবাদকর্মীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানে রাষ্ট্রকেই কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। অন্যথায়, একটি অন্ধ ও মূক জাতির উত্থান কেউ ঠেকাতে পারবে না।
# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।
