বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় দেশে প্রচণ্ড বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছিল দেশ। তখন বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর কোন বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বেগম জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার বিদ্যুতের সরবরাহ লাইন বাড়ানোর জন্য বিদ্যুতের পিলার (স্থানীয় ভাষায় খাম্বা) বসানোর প্রজেক্ট নিয়েছিল।
আর সেই খাম্বা বসানোর কাজটি প্রকারান্তরে বাগিয়ে নিয়েছিলেন তখনকার ‘যুবরাজ’ হিসেবে খ্যাতি পাওয়া তারেক রহমান। তবে বেনামে।

তার বন্ধু গিয়াস আল মামুনের নামেই চলতো সব ব্যবসা। আর কোটি কোটি টাকার সেই ব্যবসা করে টাকার পাহাড় গড়ে তুলেছিলেন এই মামুন ও তার বন্ধু তারেক রহমান। তখনকার ‘হাওয়া ভবন’ ছিল সরকারের আরেকটি সমান্তরাল সরকারের কেন্দ্রবিন্দু।
সেই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় যেমনভাবে দেশে চরম বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছিল এবারও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় দেশে সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
তখনতো বিদ্যুতের সংকট ছিল অন্যতম। আর এখন জ্বালানী তেল-গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে দিশেহারা সরকার। বিএনপি সরকারের ৬ মাস পার হলো, কিন্তু এসব সেক্টরে উন্নতিতো দূরের কথা প্রতিনিয়ত দূরাবস্থার শিকার হচ্ছেন শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ।
অনেক গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিসহ অন্য অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্পপতিরা আর কত লোকসান গুণবেন?
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কোন জবাবদিহিতা নেই এজন্য। হিমশিম খাচ্ছেন মধ্যবিত্তসহ নিম্নআয়ের মানুষ।
কিন্তু সরকারের সেদিকে কোন খেয়াল আছে বলে মনে হয়না। তারা দেশের মানুষের সংকট কাটাতে কোন পদক্ষেপতো নিচ্ছেনইনা বরং নির্লজ্জের মত বলছে, আগামী দুই বছরেও দেশের বিদ্যুৎ-জ্বালানী সেক্টরে সংকট কাটবেনা।
বিদ্যুৎ-জ্বালানী তেল ও গ্যাসের যখন প্রচণ্ড সংকট, নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম বাড়াতে সাধারনের যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা তখন দেশের সামরিক শক্তি বাড়াতে সরকার মরিয়া হয়ে উঠেছে।

এরই মধ্যে চীন থেকে প্রায় ২.৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে জে-১০সিই (J-10CE) যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আর সেই ২০২৪ এর কথিত জুলাই না “ঝুলাই আন্দোলন’র সময় থেকে যে তীব্র ভারত ও হিন্দু বিরোধীতা শুরু হয়েছিল তা এখনো চলমানই নয়। বরং তা আরো তীব্র হয়েছে ও হচ্ছে।
সরকারই কৌশলে টোকাই রাজনৈতিক দল এনসিপি, হেফাজতসহ অন্য ইসলামী দলগুলোকে দিয়ে এ বিরোধকে নানাভাবে উস্কে দিচ্ছে। কিন্তু দেশে কাঁচা মরিচের দাম যখন ৪০০ টাকা কেজি হলো তখন বাধ্য হয়ে সেই ভারত থেকেই কাঁচামরিচ আমদানী করতে বাধ্য হলো।
জ্বালানী তেল যখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারনে আনতে প্রচন্ড বেগ পেতে হচ্ছিল তখনই ভারতের হাতে পায়ে ধরেছে। সেইতো ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার আমলে করা পাইপ লাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে জ্বালানী তেল এনে দেশের সংকটের কিছুটা হলেও মেটাতে হচ্ছে। অথচ প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হয়েছিল এই পাইপলাইনের মাধ্যম ভারতে পাচার করছিল তেল শেখ হাসিনার সরকার।
রেলের ইঞ্জিন ও যাত্রীবাহী কোচও আমদানী করতে হচ্ছে সেই কথিত হিন্দুরাষ্ট্র ও একমাত্র শত্রুরাষ্ট্র ভারত থেকেই। ন্যুনতম লজ্জাবোধও বোধ হয় নেই। কেন এসবের জন্য পেয়ারের পাকিস্তান, তুরষ্ক বা চীন এগিয়ে আসেনি?

চব্বিশের আগষ্টের কথিত গণঅভ্যুত্থানের পর যখন ভারতের সঙ্গে তিক্ততা প্রচণ্ড রকমের তখন ভারতে যাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে চিকিৎসা ও শিক্ষার জন্য প্রচন্ড সমস্যায় পড়তে হয়েছে বাংলাদেশিদেরকে।
তো এই সরকার মানে বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার মিঃ ত্রিবেদী আসার পর তিনি বন্ধ হয়ে থাকা পর্যটক ভিসা চালুর ঘোষণা দিলেন।

যেই না ঘোষণা দিলেন তারপর দিনই শত্রুরাষ্ট্র ভারতে যাওয়ার জন্য দেড়লাখ ভিসার আবেদন পড়লো। তার মধ্যে অধিকাংশই হলো দাঁড়ি-টুপি আর হিজাবওয়ালী। তো বাপু বন্ধুরাষ্ট্র চীন ও ‘বড়ভাই পাকিস্তানে’ চিকিৎসা ও ভ্রমণের জন্য না গিয়ে হিন্দু ও শত্রুরাষ্ট্র ভারতে যেতে হচ্ছে কেন ? এ কেমন আজব বাত?!
২০০১-২০০৬ সালের বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে দেশজুড়ে তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট ছিল ঐতিহাসিক বাস্তবতা। তখন উৎপাদন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে রাজধানী থেকে শুরু করে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
বিদ্যুতের দাবিতে সাধারণ মানুষের বিক্ষোভের ওপর গুলি চালানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে। সেই সময়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনা ও নতুন গ্যাস কূপ অনুসন্ধানের অভাব খাতের ভিতকে দুর্বল করে রেখেছিল।
তো এখন আবার ২০২৬ সালেও বিএনপি ক্ষমতায়। তো সেই একই সংকট আবারো শুরু হয়েছে। দেশি শিল্পায়ন নেই, বিদেশী বিনিয়োগ নেই। তার ওপর গ্যাস-বিদ্যুৎ-জ্বালানী-রাজনৈতিক অস্থিরতা-নিরাপত্তাহীনতা সবকিছু মিলিয়ে বিনিয়োগকারিদের প্রচণ্ড অনীহা।
বিদেশী বিনিয়োগকারিদের ডেলিগেশন আসে, মিটিং করে, ইটিং হয়, সিটিং হয়, কিন্তু বিনিয়োগের বেলায় ঠনঠনাঠন। এমনকি আশ্বাসও নেই। তারা বলে- পরবর্তী ফেব্রয়ারিরে পরে তারা চিন্তাভাবনা করবেন। তার মানে কি? বাংলাদেশকে আর বিনিয়োগের উপযুক্ত দেশই মনে করছেন না তারা।
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পরও এই খাতের আমূল কোনো পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি, বরং সংকট বর্তমানে চরমে পৌঁছেছে। বর্তমান দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩,০০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
মার্কিন ডলারের তীব্র সংকট এবং বৈশ্বিক সরবরাহ লাইনে ব্যাঘাত ঘটার কারণে বিদেশ থেকে চাহিদা অনুযায়ী এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানি করা যাচ্ছে না। এর ফলে সারা দেশে দৈনিক ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে, যা দেশের শিল্প ও গৃহস্থালি জীবনকে সম্পূর্ণ অচল করে তুলেছে।
জ্বালানির এই তীব্র অভাবের সরাসরি আঘাত এসেছে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি—তৈরি পোশাক শিল্প মানে গার্মেন্টস সেক্টরে ও সামগ্রিক ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের ওপর।
সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর মতো প্রধান প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্য পিএসআই (psi)-তে নেমে এসেছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের অভাবে ডায়িং ও স্পিনিং মিলগুলোর উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে এবং শত শত কারখানা সাময়িকভাবে বা আংশিকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান শিল্পাঞ্চলগুলোতে মোট ৪৫৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে প্রধান রপ্তানি খাত তথা তৈরি পোশাক ও বস্ত্র (Garment & Textile) খাতের কারখানার সংখ্যা ১৫১টি। বাকি ২৮৬টি প্রতিষ্ঠান তৈরি পোশাক খাতের বাইরে বিভিন্ন উৎপাদনমুখী ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ভারী শিল্প ইউনিটের অন্তর্ভুক্ত।
ব্যবসায়ী সংগঠন (BGMEA, BKMEA, BTMA) এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থার (যেমন CPD) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই বিপুলসংখ্যক কারখানা বন্ধ হওয়ার পেছনে তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের বাইরেও গভীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চরম অনিশ্চয়তা কাজ করছে।
সময়মতো বিদেশি ক্রেতাদের কাছে অর্ডার সরবরাহ করতে না পারায় ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
জ্বালানি তেলের চড়া দাম এবং লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়েছে। এর সরাসরি খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ নাগরিককদেরকে।
বাজারে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেলসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের আয়ের তুলনায় আকাশচুম্বী।
মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো আজ দিশেহারা। আয়ের সুযোগ কমে যাওয়া ও ব্যয়ের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন সমাজে এক তীব্র অসন্তোষ ও নীরব হাহাকার তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘ভারত বিরোধিতা’ একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং সহজ কৌশল। দেশীয় রাজনীতিতে ভারতকে প্রতিনিয়ত দোষারোপ করা এবং তীব্র বিরোধিতা করা এক ধরনের “জাতীয় রোগে” পরিণত হলেও, বর্তমান সংকটে বাংলাদেশ সরকারকে বারবার ভারতের কাছেই বিদ্যুতের জন্য দ্বারস্থ হতে হচ্ছে।
বর্তমানে দেশের মোট চাহিদার ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ বিদ্যুৎ সরাসরি ভারত থেকে আমদানি করা হয় (গড়ে ১,৭৮০ মেগাওয়াট থেকে ২,৬৫৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত)।
২০২৬ সালের আগস্টের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি সচল রাখতে এবং গ্রিড অপারেশনের জন্য নতুন সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি (SNA) চার্জ পরিশোধের নতুন চুক্তির দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিভাগ।
রাজনৈতিক ফায়দা লুটার জন্য ভারতকে অনবরত দোষারোপ করা হলেও, দেশের চাকা সচল রাখতে ভারতের বিদ্যুৎ ও ডিজেলের পাইপলাইনের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। এই চরম বৈপরীত্য প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা আবেগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
২০২৬ সালের বর্তমান বাংলাদেশে এই দুটি মৌল উপাদানের মধ্যে একটি তীব্র বৈপরীত্য ও ভারসাম্যহীনতা চরমভাবে দৃশ্যমান। একদিকে দেশজুড়ে চলছে তীব্র গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের হাহাকার।
অন্যদিকে এই তীব্র ডলার ও রিজার্ভ সংকটের চরম মুহূর্তেও চীন থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত চূড়ান্তকরণের দিকে এগোচ্ছে বিএনপি সরকার।
এই পরিস্থিতি কেবল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেই দুর্বিষহ করে তোলেনি, বরং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক দ্বিমুখী নীতি এবং দূরদর্শিতাকে এক বিশাল কাঠামোগত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
চীন থেকে যুদ্ধবিমান কিনে কার সঙ্গে যুদ্ধে নামবে বাংলাদেশ? ভারতের সঙ্গে? এই সামরিক ক্রয়ের আনুমানিক বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ২.৩০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা)।
যদিও এই অর্থ আগামী ১০ অর্থবছরে কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রয়েছে, তবুও বর্তমান ভঙ্গুর সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
একটি যুদ্ধবিমানের মূল দাম ছাড়াও এর রক্ষণাবেক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং লজিস্টিক সাপোর্টের পেছনে আরও বিপুল পরিমাণ ডলারের প্রয়োজন হবে।
যেখানে ১ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি বকেয়া শোধ করতে সরকারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে, সেখানে ২.৩ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা কোনোভাবেই জাতীয় স্বার্থের প্রথম অগ্রাধিকার হতে পারে না। ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আওতায় সামরিক আধুনিকীকরণ দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রয়োজনের অংশ হতে পারে, কিন্তু বর্তমান অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থার (Economic Emergency) মধ্যে এই ক্রয়ের সময়জ্ঞান (Timing) বড় ধরনের নীতিগত দেউলিয়াত্বকে নির্দেশ করে।
গ্যাস-বিদ্যুতের স্থায়ী সংকট যদি আগামী কয়েক মাস ধরে চলে, তাহলে বহু ক্ষুদ্র ও মাঝারি গার্মেন্টস কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে তৈরি পোশাক খাতের লাখ লাখ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বেন।
কর্মসংস্থানের এই আকস্মিক পতন দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ফেলবে। গ্যাস সংকটে ৯০০টিরও বেশি টেক্সটাইল মিল উৎপাদন সাময়িক বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে।
অন্যদিকে তৈরি পোশাক, ইস্পাত, কাগজ ও সিরামিক কারখানাগুলো সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে।

একদিকে শিল্পের উৎপাদন ও রপ্তানি কমছে, অন্যদিকে মেগা প্রতিরক্ষা ক্রয়ের কিস্তি এবং আমদানিকৃত ব্যয়বহুল কয়লা ও এলএনজির বকেয়া বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই দ্বিমুখী চাপে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তলানিতে ঠেকতে পারে।
মুখে ভারতের তীব্র বিরোধিতা করা এবং প্রতিরক্ষার জন্য চীনের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়া (যেমন ২.৩ বিলিয়ন ডলারের জে-১০সিই বিমান কেনা) বাংলাদেশকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির এক বিপজ্জনক খেলায় ফেলে দেবে।
এতে একদিকে ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে—যার ফলে ভারত যদি বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তবে দেশের বড় অংশ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে। অন্যদিকে চীনের ঋণের ফাঁদ ও কৌশলগত চাপ দেশের সার্বভৌমত্বকে দুর্বল করতে পারে।
একটি দেশের প্রকৃত সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় নিরাপত্তা কেবল তার আকাশসীমায় যুদ্ধবিমানের গর্জন কিংবা সমরাস্ত্রের প্রদর্শনী দিয়ে নিশ্চিত হয় না।
প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় দেশের অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা, জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সুরক্ষার মাধ্যমে। ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার চেষ্টা কখনোই টেকসই হয় না।
এদিকে বিগত আওয়ামীলীগের “ফ্যাসিবাদী” সরকারের সময় নির্মিত বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের পক্ষে ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য এবার প্রায় ৩২ লাখ মার্কিন ডলার ছাড়ের অনুমতি দিতে বাধ্য হয়েছে সরকার। কারণ বিদ্যুৎতো নেই। তাই কোনভাবে গণরোষ থেকে বাঁচার জন্য হলেও এ কাজটি করতে হচ্ছে।
তাছাড়া এই প্রকল্পে চীনেরও বিনিয়োগ রয়েছে। গত ১৯ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে গণ্ডামারা এলাকায় এস আলম গ্রুপ ও চীনের দুটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি নির্মিত হয়েছে।
প্রকল্পটিতে এস আলম গ্রুপের ৭০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে এবং বাকি ৩০ শতাংশের মালিক চীনের সেপকো থ্রি ও এইচটিজি ডেভেলপমেন্ট গ্রুপ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ৬৬০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিটের মাধ্যমে কেন্দ্রটি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে।
# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার কর্মী।
