বাংলাদেশের এক চৌকশ পুলিশ অফিসার রোহিঙ্গা ইসলামী জঙ্গীদের আস্তানা বের করে ফেলেছিলেন। গ্রেপ্তার করেছিলেন বেশ ভয়ংকর জঙ্গী। উদ্ধার করেছিলেন বেশ কিছু অস্ত্র গোলাবারুদ।
সেই সাথে উদ্ধার করেন তাদের নানা অপকৌশল সম্বলিত ছবি ও ষড়যন্ত্রের নীলনকশা। কিন্তু সেটি সহ্য হয়নি বাংলাদেশের বিএনপি –জামায়াত জোট সরকারের কর্তাব্যক্তি ও নীতি নির্ধারকদের।
ফলে সেই দেশপ্রেমিক পুলিশ অফিসার নিরঞ্জন পালিতকে করা হয়েছে তিরস্কার। অথচ তাঁর পদোন্নতিসহ পুরষ্কার পাওয়ার কথা ছিল নিয়মানুযায়ী। উল্টো তাঁকে জেলের ঘানি খাটতে হয়েছে।
কারণ তিনি ছিলেন হিন্দু বা সনাতন ধর্মাবলম্বী। এটিও তাঁর একটি বড় দোষ ! পাশাপাশি তাঁর আরো একটি বড় দোষ ছিল- তা হলো তিনি ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। ফলে এই ইসলামিক বাংলাদেশে একজন হিন্দু ও একজন মুক্তিযোদ্ধা দেশপ্রেমিক পুলিশ অফিসারের ভাগ্যে তিরষ্কার-জেল-চাকুরিচ্যুতি-নির্যাতন জুটবে এটাই স্বাভাবিক।
নানাকৌশলেই কাজ করছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তি জামায়াতে ইসলামী মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইসলামী জঙ্গী সংগঠনগুলোর সঙ্গে।

রোহিঙ্গা মুসলিমরা মিয়ানমারের সামরিক জান্তার কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য অনেকবছর ধরেই রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামের পাশাপাশি ও সশস্ত্র আন্দোলন-সংগ্রাম করছে নানাভাবে।
অবশ্য এই আন্দোলনকে মিয়ানমার সরকার বরাবরই বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন বলে অভিহিত করে আসছে। আর রোহিঙ্গা মুসলিমদের এই আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী অনেকদিন থেকেই ওতোপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে।
রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে এক সময়ে যুক্ত ছিল এমন কয়েকজনের সঙ্গে আলাপকালে ও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে গ্রেপ্তার হওয়া রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠনের নেতাদের কাছ থেকে নানা তথ্য পাওয়া গেছে।
তাদের দেয়া তথ্যমতে আশির দশক থেকেই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর অত্যাচারে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলো বাংলাদেশের কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া, বান্দরবান এমনকি চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকা ও বেশ কিছু কওমি মাদ্রাসায় আস্তানা গড়ে তোলে।
আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন), আরিফ (আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামী ফ্রন্ট), এআরএনও (আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন)-সহ কয়েকটি রোহিঙ্গা ইসলামী জঙ্গি সংগঠন বৃহত্তর দক্ষিণ চট্টগ্রামের একটি অংশ এবং মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশ নিয়ে একটি ‘স্বাধীন ইসলামী আরাকান রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ও সশস্ত্র সংগ্রাম করে যাচ্ছে মিয়ানমারের সরকারের বিরুদ্ধে।

২০০০ সালের শেষ দিকে কক্সবাজারের উখিয়ায় সে সময়ের সহকারী পুলিশ (কয়েক বছর আগে মারা যান) নিরঞ্জন পালিত ( এন পালিত) রোহিঙ্গাদের একটি প্রশিক্ষণ শিবিরে অভিযান চালিয়ে প্রায় ৪১ জন রোহিঙ্গা জঙ্গিকে আটক করেছিলেন অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ।
এরা তখন স্বীকার করেছিল, তারা হরকাতুল জেহাদ আরাকানের সদস্য। এর পরপরই ২০০১ সালের ২২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীর চান্দগাঁও আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে ওই পুলিশ কর্মকর্তা গ্রেপ্তার করেন এআরএনওর চিফ অব আর্মি স্টাফ মো. সেলিম উল্লাহকে।
সেই মো. সেলিম উল্লাহর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল বেশ কিছু সশস্ত্র প্রশিক্ষণের ছবি। আরো ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাদের সঙ্গে রোহিঙ্গা জঙ্গি নেতাদের নানা বৈঠক ও আন্তর্জাতিক ইসলামি জঙ্গি নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ও প্রশিক্ষণের ছবি।
তখন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার জিজ্ঞাসাবাদে মো. সেলিম উল্লাহ তাদের সেই ‘স্বাধীন ইসলামি আরাকান রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও জানিয়েছিলেন।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানিয়েছিলেন, মূলত বাংলাদেশের জামায়াত-শিবিরের ঊর্ধ্বতন নেতাদের সুপারিশ ছাড়া মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর এনজিওগুলো রোহিঙ্গাদের জন্য টাকা ছাড় দিতে চায় না।
এ-সংক্রান্ত বেশ কিছু দলিলপত্রও উদ্ধার করা হয়েছিল তখন। কিন্তু সেই পুলিশ কর্মকর্তাকে ২০০২ সালে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার মিথ্যা রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দিয়ে চাকরিচ্যুত করে।
শুধু তাই নয়, তাকে বেশ কয়েক বছর কারাগারে রেখে চরম নির্যাতনও করা হয়েছিল।
আজ থেকে ১২ বছর আগে ২০১৪ সালে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের সে দেশের আদমশুমারি থেকে বাদ দেয়ার ঘোষণায় রোহিঙ্গাদের জঙ্গি সংগঠনগুলো আবারো নতুন করে তাদের তৎপরতা শুরু করে।
বিগত সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ সরকারের সময়কালে বেশ কয়েকবছর যাবৎ বাংলাদেশে এসব রোহিঙ্গা জঙ্গি সংগঠনগুলো প্রকাশ্যে তাদের অস্ত্রসহ নানা ধরনের প্রশিক্ষণ দিতে পারেনি সদ্য।
কিন্তু প্রকাশ্যে না পারলেও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় অত্যন্ত কৌশলে তারা তা চালিয়ে যাচ্ছিল। তবে তারা নতুন কৌশল খুঁজছে কীভাবে আবারো মিয়ানমারের আরাকান প্রদেশে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এলাকায় একটি গণ্ডগোল সৃষ্টি করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হওয়া যায়।
এরই অংশ হিসেবে বিভিন্ন সময়ে এই জঙ্গীগোষ্ঠি মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী সেনাদের ওপর তারা অতর্কিত হামলা চালায়।
যেমন কয়েকবছর আগে রোহিঙ্গা ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী ‘আরসা’ একই কায়দায় মিয়ানমারের আরাকানে সেনা ও পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালায় একযোগে ৩০টিতে।

আর এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালাতে শুরু করে। বাধ্য হয়ে নিরীহ রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে বাংলাদেশে পাড়ি জমাতে থাকে নানাভাবে।
আর এ অমানবিক দেশত্যাগের বিষয়টি নানাভাবেই বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হতে থাকে প্রতিনিয়ত। এতে কিছুটা হলেও বেকায়দায় পড়ে মিয়ানমার সরকার।
আর এসব রোহিঙ্গা নারী-শিশুর মানবিক চিত্র ও সংবাদকে পুঁজি করে তৎপর হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক কিছু সংস্থা।
এরই ফাঁকে রোহিঙ্গাদের জঙ্গি সংগঠনগুলো বিভিন্ন ইসলামি রাষ্ট্র ও ইসলামি এনজিওর কাছে তাদের কথিত স্বাধীনতার আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরার চেষ্টা করছে নানাভাবে।
বিশেষ করে এই রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে বিভিন্ন এনজিও মানবিক সাহায্যের অন্তরালে কোনো ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে যা সত্যিকারভাবেই তদারকি করার কেউ নেই। কারণ বাংলাদেশে ২০২৪ এর জুলাই-আগষ্টের পর থেকে অদ্যাবধি এই রোহিঙ্গা ইসলামী জঙ্গী সংগঠন ও তাদের সাহায্য সহযোগিতা করার সরকারই ক্ষমতায় রয়েছে।
জামায়াত-শিবিরসহ আন্তর্জাতিক ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রোহিঙ্গা জঙ্গিদের সঙ্গে
‘ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল রোহিঙ্গা’ নামে একটি সংগঠনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভেতরে বসেই বেশ কৌশলে কাজ করছে রোহিঙ্গাদের একটি সংগঠন।
আর এ সংগঠনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের। এ সংগঠনের সভাপতি হাফেজ সালাউল এবং সেক্রেটারি সালামত উল্লাহসহ ১৮ সদস্যের একটি শূরা কমিটি রয়েছে যার অধিকাংশই জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে।
‘ইত্তেহাদুল জামিয়াতুল রোহিঙ্গা’র সার্বিক তত্ত্বাবধান করছেন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা তোফায়েল।
উখিয়া থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সংগঠনটিকে পরিচিতি করার কাজ করছেন মুহাম্মদ জুবায়ের, যিনি ভারতভিত্তিক সংগঠন বায়তুল মাল ইন্ডিয়ার নেতা।
আর সামরিক শাখার কমান্ডারের দায়িত্বে আছেন মাস্টার আইয়ুব; যিনি আফগান, সিরিয়া ও ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।
রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের (আরএসও) মুখপাত্র ‘আলতাদামুন’ ১৯৯১ সালের আগস্ট সংখ্যায় দেখা গেছে, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ফেডারেশন স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন (আইআইএফএসও)-এর আয়োজনে কক্সবাজারে ১৯৮৯ সালের ১৩ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় ইসলামী ছাত্র শিবিরের সে সময়ের সভাপতি আবদুল্লাহ মো. তাহের (জামায়াতের নেতা ও সাংসদ ), শিবিরের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি আমিনুল ইসলাম মুকুলের সঙ্গে একই সঙ্গে বৈঠক করছেন আরএসও-এর প্রতিষ্ঠাতা আমির ড. নুরুল ইসলাম।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার ছাড়াও ফিলিপাইন, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে রয়েছে এর নেটওয়ার্ক।
আরএসও সংগঠনে রয়েছে আফগান যুদ্ধফেরত প্রশিক্ষিত গেরিলা থেকে শুরু করে আত্মঘাতী বোমা হামলার জন্য প্রস্তুত জঙ্গি সদস্য। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের বান্দরবান-কক্সবাজার সীমান্তে সক্রিয় ডজনখানেক বিদেশি উগ্রপন্থী।
এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আরএসও-ই সবচেয়ে শক্তিশালী। লন্ডন প্রবাসী জঙ্গি নেতা নুরুল ইসলাম গ্রুপটির অর্থ সংগ্রহের মূল কাজটি করেন।

২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আরএসওর সাধারণ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, একই বছর ৩০ জুলাই গ্রুপের নতুন কমিটি গঠিত হয়।
কক্সবাজার শহরের কলাতলীর একটি অভিজাত হোটেলে একটি ইসলামিক সংস্থার সেমিনারের নামে আয়োজিত সম্মেলনে গ্রুপের শীর্ষনেতা লন্ডন প্রবাসী নুরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ ইউনুছ উপস্থিত ছিলেন।
ওই দিন গঠিত আরএসওর ১৫ সদস্যবিশিষ্ট কার্যকরী কমিটিতে প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনীত হন যথাক্রমে জঙ্গি নেতা ড. মোহাম্মদ ইউনুস, হাজি মোহাম্মদ জাবের ও রাশেদ আহমদ।
কমিটির অন্যরা হলেন- ইউনুস আবাদী, আবু আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, মৌলভী আবুল ফয়েজ, নুর মোহাম্মদ মনসুর, আবদুল রশিদ, মোহাম্মদ সায়েদ, আবু কাদের, আবু ইয়াহিয়া মীর আহমদ, হামিদ, রুহুল আমিন ও আবদুল্লাহ মোহাম্মদ।
এ কমিটির মধ্য দিয়ে টানা ২০ বছরের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নূরুল ইসলাম অবসর নেন। তাকে সংগঠনের মূল দায়িত্বের বাইরে রেখে এনজিও বিভাগ, সামরিক বিভাগ ও বহির্বিশ্বের যোগাযোগের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়।
আরএসওর শীর্ষ জঙ্গিদের মধ্যে রয়েছেন মৌলভী সেলিম, হাফেজ আইয়ুব, শাকিল জেহাদী, হাফেজ রশিদসহ অনেকে। বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে তারা এখন আবারো তৎপর হয়ে উঠেছেন।
# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
