নানা কারণেই বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সড়ক, স্থাপনার নামকরণ হয়েছে। সেগুলোর সঙ্গে ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি বা কারো অবদান জড়িত রয়েছে।
কিন্তু আবার অনেক ক্ষেত্রে এত বেশি নামের আধিক্য হয়েছে যে তা অনেক ক্ষেত্রেই দৃষ্টিকটূ -শ্রুতিকটু ও অনেক সময় তা প্রচণ্ড রকমের আতিশয্য ঠেকেছে নাগরিকদের কাছে।
দেশ-সমাজ-রাষ্ট্র ইত্যাদির ক্ষেত্রে অবদানের জন্য অনেক ব্যক্তিনামে নামকরণ সারা পৃথিবীতেই রেওয়াজ আছে। কিন্তু আমাদের এই বঙ্গীয় দেশে রাজনীতি-ক্ষমতা ও ধর্মীয় কারণেও নামকরণের হিড়িক দেখা যায়। যা অনেক সময় প্রচণ্ড রকমের সমালোচিত হয়েছে।
বিগত আওয়ামীলীগ আমলে আমরা দেখেছি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে যত্রতত্র নামকরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের সৃষ্টি, একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বা দেশটিই হয়তো সৃষ্টি হতোনা যদিনা তাঁর মতো একজন প্রতিবাদী দৃঢ়চেতা বাঙ্গালীর জন্ম না হতো।
কিন্তু তাই বলে তাঁর নামের যথেচ্ছ ব্যবহার নয় অপব্যবহার করতে হবে? শুধু কি তাই? তাঁর পরিবারের অন্য সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের নামেও বিভিন্ন কিছুর নামকরণকে দেশবাসী ভালোভাবে নেয়নি। এমনকি আওয়ামীলীগের মধ্যেও এ নিয়ে অনেক মত ভিন্নতা ছিল। কিন্তু তোষামোদকারিদের যন্ত্রণায় তা আর থামানো যায়নি।
তেমনি আমরা বিগত বিএনপি আমলেও দেখেছি। আর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ও গত চব্বিশের ‘ ইসলামী জঙ্গী-সামরিক ক্যু ’এর পরবর্তী সময়েও দেখেছি। আর ২০২৬ এর ১২ ফেব্রুয়ারি কথিত ইলেকশনের নামে সিলেকশনের পরেও তা অব্যাহত রয়েছে।
কোথাকার কোন জঙ্গী সাঈদ-হাদিসহ আরো কিছু জঙ্গীর নামেও যত্রতত্র নামকরণ হচ্ছে। যেই হাদি তার অশ্রাব্য ভাষা ও বক্তব্যের জন্য ঘৃণিত একটি ব্যক্তি তার নামে নাকি নানা স্থাপনা হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকেও নাকি তার জীবনী অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে বা হবে- এমনটিইতো শুনছি।

তার মানে কি দাঁড়ালো? আমাদের যে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তারা এক অশ্রাব্য-অশ্লীল গালিগালাজকারি জঙ্গীকে অনুসরণ ও অনুকরণ করবে? এমনটাই শিক্ষা দেয়া হবে বা হচ্ছে?
জ্ঞান-বিজ্ঞান-শিল্প-সাহিত্য-দেশ সৃষ্টির পেছনে যাদের আত্মত্যাগ-অবদান রয়েছে তাদের পরিবর্তে এসব ঘৃণ্য জঙ্গীদের আত্মজীবনী পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম? আর সেই শিক্ষা নামক কু-শিক্ষায় বড় হয়ে উঠবে একটি জাতি? এমন দুর্ভাগ্য এ জাতির?
অতি সম্প্রতি শিবগঞ্জ এলাকার নাম পরিবর্তন নিয়ে জেলা প্রশাসনের একটি কথিত দাবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
সরকারিভাবে যুক্তি দেখানো হচ্ছে যেহেতু এই শিবগঞ্জ নামে দেশের আরেকটি স্থানের নাম রয়েছে তাই সে বিভ্রান্তি দূর করতেই এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
কিন্তু ভেতরের যে তথ্য তা হলো—যেহেতু এটি হিন্দু দেবতা ‘শিব’-এর নামে, তাই এই নাম নিলে নাকি চরম গুনাহ বা পাপ হবে, তাই এটিকে পরিবর্তন করতে উঠেপড়ে লেগেছে একটি মহল।
একজন নাগরিক হিসেবে এই সংকীর্ণ মানসিকতা আমাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। আসুন একটু ঠান্ডা মাথায় দার্শনিক ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টা তলিয়ে দেখি। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই- ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে সামরিক শক্তির জোরে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির নদীয়া দখলের মধ্য দিয়ে বাংলায় মুসলমানদের রাজনৈতিক আধিপত্যের সূচনা ঘটে। এর আগে দীর্ঘকাল এই অঞ্চলে গুপ্ত, পাল ও সেন বংশের মতো হিন্দু ও বৌদ্ধ রাজবংশগুলো শাসন করেছে।
স্বাভাবিকভাবেই, তৎকালীন বাংলার অধিকাংশ অঞ্চলের নাম গড়ে উঠেছিল সনাতন ধর্মীয় সংস্কৃতি, দেব-দেবী বা স্থানীয় রাজাদের নামানুসারে।
সময়ের আবর্তনে অনেক নাম বদলেছে (যেমন জাহাঙ্গীরনগর থেকে ঢাকা, কিংবা প্রাচীন রামচন্দ্রপুরের কিছু অংশ)। কিন্তু “শিবগঞ্জ”-এর মতো অসংখ্য নাম শত শত বছর ধরে ধর্মীয় পরিচয় ছাপিয়ে আমাদের ভৌগোলিক ও মিশ্র সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু কোন যৌক্তিক কারণ ছাড়া নাম পরিবর্তন কি আসলেই কোনো ভালো কাজ?স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে, স্রেফ ধর্মীয় প্ররোচনা বা সংকীর্ণতার বশে কোনো প্রাচীন অঞ্চলের নাম বদলে ফেলা কখনোই একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজের লক্ষণ হতে পারে না।
অবশ্য আমাদের এখনকার যে সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা তাতে আমরা একটি প্রগতিশীল সমাজ চাই কিনা সেটি আগে ভেবে দেখতে হবে।
সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যদি দেখার চেষ্টা করি তাহলে দেখবো একটি নাম পরিবর্তনের অর্থ হলো সেই অঞ্চলের মানুষের পূর্বপুরুষদের স্মৃতি এবং একটি সুনির্দিষ্ট কালখণ্ডের ইতিহাসকে জোরপূর্বক মুছে ফেলার চেষ্টা।
এর পাশাপাশি অন্য ধর্মকে অবমাননা করা হয়। “অন্য ধর্মের দেবতার নাম মুখে নিলে পাপ হবে”—এমন যুক্তি একটি বহুত্ববাদী (Pluralistic) সমাজে চরম সাম্প্রদায়িকতার প্রকাশ ঘটায়।
এটা প্রকারান্তরে অন্য ধর্মের প্রতি অবমাননা। যদিও জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিজে ও তার মন্ত্রী-নেতারা বলে বেড়াচ্ছেন তারা একটি রংধনু রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান।
মানে সেখানে নানা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার শান্তিতে ও গণতান্ত্রিকভাবে সমান অধিকার নিয়ে বসবাস নিশ্চিত করা হবে। সরকার সেই লক্ষ্যেই নাকি কাজ করছে।
কিন্তু আমরা সেই ‘রংধনু’ সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার নমুনা দেখতে পাচ্ছি কি এখন দেশে?
তবে ভৌগোলিক পরিচয়ে সাধারণ মানুষ যখন ‘শিবগঞ্জ’ বলে, তখন তারা কোনো ধর্মীয় আচার পালন করে না, বরং একটি স্থানকে নির্দেশ করে। বিষয়টিকে গুনাহ বা ছোয়াবের বা পাপ-পুণ্যের দাঁড়িপাল্লায় মাপা চরম মূর্খতা।
আমার যতটুকু মনে হয় এক্ষেত্রে আমাদের দেশের প্রশাসনের দায়িত্ব রয়েছে নিশ্চয়ই। একটি আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে প্রশাসনের কাজ হলো ইতিহাসের ঐতিহ্যকে রক্ষা করা, বিভেদ তৈরি করা নয়। জোর করে নাম বদলে দিলেই মাটি বা মানুষের স্মৃতি থেকে ইতিহাস মুছে ফেলা যায় না।
এই ধরনের সিদ্ধান্ত সমাজে কেবল পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং দূরত্বেরই জন্ম দেয়।
অবশ্য এখনকার যে বাংলাদেশ ও সমাজব্যবস্থা তাকে আধুনিক ও অসাম্প্রদায়িক বলার অবশ্য কোন যুক্তি দেখিনা। কেউ দেখেন বলেও মনে হয়না। কারণ আধুনিকতা ও অসাম্প্রদায়িকতা এগুলো শুধুমাত্র বইয়ে আর রাজনৈতিক নেতাদের কথার ফুলঝুরিতেই থাকবে। বাস্তবে নয়।
তাই যদি হতো তাহলে যে গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি নিয়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যুদ্ধ হয়েছিল তা এখানে ভূলুন্ঠিত করা হতোনা।
আসলে একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেইতো একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত অপশক্তি বার বারই চেয়েছে দেশটিকে আবার সেই ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক কুপমন্ডুকতার মধ্যে ঠেলে দিতে।
অবশ্য এ দেশের অধিকাংশ নাগরিক যেহেতু মুসলিম বা ইসলাম ধর্মাবলম্বী তাই এঁদের মনোজগত থেকে সেই ধর্মীয় আবেগকে পূঁজি করে ধর্মান্ধতা-সাম্প্রদায়িকতা ঢুকিয়ে দেয়া কঠিন কিছু ছিলনা। সেটি তারা নানাভাবেই বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। আর সেজন্য এই ইসলামী গোষ্ঠীগুলো প্রথম থেকেই বেছে নিয়েছে শিক্ষাকে।
একটু খেয়াল করলেই দেখবেন- আমাদের দেশের অধিকাংশ মুসলিম পরিবারের শিশুরা স্কুলে যাওয়ার আগেই বা স্কুলে পড়ুয়াদের জন্য ঘরে আবার একজন হুজুর টাইপের লোক এসে ধর্মীয় শিক্ষার নামে একটি বিজাতীয় ভাষা (আরবি) শিক্ষা দিয়ে যায়।
শুধু তাই নয়, ওই শিশুতোষ নরম মনে সেসব হুজুররা কিন্তু মুসলিম ছাড়া অন্য ধর্মের কারো সাথে না মেশার জন্য, তাদের সাথে বন্ধুত্ব না করার কু মন্ত্রণাটিও অত্যন্ত সযতনে দিয়ে যাচ্ছেন দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। অর্থাৎ এ প্রক্রিয়াটি চলে আসছে অনেকদিন-অনেক বছর ধরেই।
আমাদের পরিবারগুলো সেটিকে অত্যন্ত ছোয়াবের বা পুণ্যের কাজ বলে মনে করছে। আবার অনেকে আরো বেশি ছোয়াব কামাই করতে মাদ্রাসায় পাঠিয়ে দেন বাচ্চাদের। কি শেখে সেখানে?
ধর্মীয় শিক্ষার নামে সেখানে অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ, জেহাদ, কতল এসবই শেখানো হয়। এ ধরনের শিক্ষা যে শুধু মাদ্রাসাতেই দেয়া হচ্ছে তা কিন্তু নয়, সেই যে ঘরে প্রথম ধর্মীয় শিক্ষক বা হুজুর আসছেন তিনিইতো প্রথমে একটি ‘বিষবৃক্ষের বীজ’ বপন করে দিয়ে যান। সেই বীজ থেকে শুধু অংকুরোদগমই হয়না।

মনোজগতের সেই অঙ্কুর থেকে সেই ধর্মীয় অন্ধত্ব-কুসংস্কার-কুপমণ্ডুকতা-জেহাদের বৃক্ষ হয়ে ওঠে দিন দিন।
বাংলাদেশের অনেক জায়গার, স্থাপনা, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অনেক কিছুরই নাম বদলে দেয়া হয়েছে অত্যন্ত কৌশলে। এই দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে সনাতনী বা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জমিতে বা তাদের দানে।
সে অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে হয়তো তাদের নামে সেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে সেগুলো বদলে ফেলা হয়েছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পুরোপুরি মুছে ফেলা না হলে সেক্ষেত্রে পুরা নামটি না বলে সংক্ষেপে বলার অপচেষ্টা হয়েছে ও হচ্ছে।
যেমন বরিশালের ব্রজমোহন দত্ত কলেজকে সংক্ষিপ্ত করে বি এম কলেজ বলা হয়।বরিশালের ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজমোহন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা হলেন প্রখ্যাত সমাজসেবক, শিক্ষানুরাগী ও রাজনীতিবিদ অশ্বিনীকুমার দত্ত। তিনি তাঁর বাবা ব্রজমোহন দত্তের নামানুসারে ১৮৮৯ সালের ১৪ জুন কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন।
তেমনি সিলেটের মুরারিচাঁদ কলেজ ১৮৯২ সালে তৎকালীন সিলেটের প্রখ্যাত শিক্ষানুরাগী রাজা গিরিশচন্দ্র রায়ের (১৮৪৫-১৯০৮) অনুদানে প্রতিষ্ঠিত হয়।
কলেজটির নামকরণ করা হয় তাঁর প্রমাতামহ মুরারিচাঁদের নামে। কিন্তু পুরো নাম মুরারিচাঁদ কলেজ না বলে শুধু বলা হয় এমসি কলেজ।
যেমন ধরুন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কলেজ এর নাম কেউ যদি ‘শ রা জি র কলেজ’ বলেন তা নিশ্চয়ই শ্রুতিমধুরতো নয়ই বরং তাঁর প্রতি চরম অসম্মান দেখানো হবে। নিশ্চয়ই বাংলাদেশে এমন ক্ষুদ্র মনমানসিকতা কেউ দেখাবেন না বা দেখানোর সাহস করবেন না।
আসলে এতসব প্রসঙ্গ এসেছে সাম্প্রতিককালে বিএনপি সরকারের অত্যন্ত ‘প্রভাবশালী-ক্ষমতাবান ‘ স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের কিছু কর্মকান্ডে। একজন প্রতিমন্ত্রীকে অত্যন্ত আমিই শুধু বলছিনা।
গত ১৩ জুন সম্ভবত কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রী তারেক জিয়ার উপস্থিতিতেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এই প্রতিমন্ত্রীকে ‘অত্যন্ত ক্ষমতাবান’ ক্ষমতাবান হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সেটি কি হাস্যরস না ব্যঙ্গাত্মক ছিল তা ঠিক বুঝতে পারিনি। তবে তিনি যে অত্যন্ত ক্ষমতাবান তা বুঝতে পারছি তার নানা কাজেকর্মে।
গত ১১ জুন বগুড়ার জেলা প্রশাসকের সই করা প্রজ্ঞাপনে শিবগঞ্জ ও নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠনের কথা জানানো হয়। এতে চারটি নতুন ইউনিয়ন গঠন করা হয়।
শিবগঞ্জ উপজেলায় নতুন ইউনিয়নের নাম দেওয়া হয় ‘মীরবাড়ী’। অন্যদিকে নবগঠিত মোকামতলা উপজেলায় গঠন করা তিনটি ইউনিয়নের নাম রাখা হয় ‘সীমান্ত’, ‘দিগন্ত’ ও ‘স্বর্ণগ্রাম’। চারটি নতুন ইউনিয়নের মধ্যে মীরবাড়ী, সীমান্ত ও দিগন্ত—এই তিনটির নাম নিয়ে মূলত বিতর্ক তৈরি হয়।

অভিযোগ ওঠে, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পৈতৃক বাড়ির নাম ‘মীরবাড়ী’। তাঁর বড় ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্ত এবং ছোট ছেলে মীর সাকলাইন আলম দিগন্তের নামের সঙ্গে নবগঠিত সীমান্ত ও দিগন্ত ইউনিয়নের নামকরণ করা হয়েছে।
তবে ১৯ জুন প্রথম আলো পত্রিকার অনলাইন মাধ্যমের খবর অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিল রেখে নামকরণ করা বগুড়ার দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের ব্যবস্থা নিতে নাকি নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শুক্রবার সন্ধ্যায় পত্রিকাটিকে এ বিষয়ে নিশ্চিত করেছেন বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মৌখিকভাবে নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন, যদিও এ বিষয়ে এখনো লিখিত নির্দেশনা জেলা প্রশাসনের কাছে পৌঁছায়নি।
তবে মনে হচ্ছে এটি একটি ভালো দিক যে প্রধানমন্ত্রীর নজরে এসেছে বিষয়টি এবং তিনি জনমতের প্রতি সম্মান দেয়ার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু এই অত্যন্ত ক্ষমতাবান প্রতিমন্ত্রী শুধু দুই পুত্রের নামে ইউনিয়ন বা নিজের বংশের নামে ইউনিয়ন করেই ক্ষান্ত হতে রাজী নন। এবার নিজের নামে একটি স্কুলের নামকরণ করার কাজটিও সেরে ফেলেছেন প্রায়। শুধু সরকারি গেজেট হওয়া বাকী।
বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের নামে একটি বিদ্যালয়ের নামকরণের প্রস্তাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। প্রস্তাব অনুযায়ী, শিবগঞ্জ পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের নতুন নাম রাখা হতে পারে ‘শিবগঞ্জ মীর শাহে আলম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’।
অথচ আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চেয়েছিলাম বা চাই এখনো যেখানে প্রতিটি ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা নিয়ে বাঁচবে। ইতিহাসকে মুছে দিয়ে নয়, বরং ইতিহাসকে বুকে ধারণ করেই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। নাম পরিবর্তনের এই মানসিকতা কি আমাদের সমাজকে এগিয়ে নেবে, নাকি পিছিয়ে দেবে?
এসব দেখে সেই নব্বইয়ের দশকে জনপ্রিয় সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার সত্য সাহার একটি গানের কথা মনে পড়ে গেলো। যদিও এটি মূলত বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও কালজয়ী শিশুতোষ ছড়া গান।
কিন্তু এটি অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে যেসব ব্যক্তি ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নামের বড়াই করতে ভালোবাসেন তাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য মনে হচ্ছে।
এ ছড়াগানটি হলো-
নামের বড়াই
নামের বড়াই করো নাকো নাম দিয়ে কী হয়
নামের মাঝে পাবে না তো সবার পরিচয় ॥
মতিঝিলে মতি নেই নেই কোন ঝিল
সোনারগাঁয়ে সোনা নেই আছে শুধু বিল
ঢাকার শহর খোলা থাকে ঢাকা নাহি রয় ॥
রাজা নেই শাহী নেই রাজশাহী নাম
হাতি ঘোড়া কিছু নেই আছে শুধু আম
সিংহ নেই তবু সে কি ময়মনসিংহ নয়॥
কর্ণফুলির কানের ফুল দেখে না তো কেউ
বুড়িগঙ্গায় বুড়ি নেই আছে শুধু ঢেউ
পদ্ম ছাড়া নদীর নাম পদ্মা কেনো কয়॥
# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।
