একটি অনলাইন পোর্টালে নিউজটি দেখলাম দু’দিন আগে। হেডলাইনটি এমন ছিল-“৫ অগাস্টের পর হামলার শিকার বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য ফের ভাঙা হচ্ছে।”
গত ১৭ জুলাইয়ের বাংলানিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম এ প্রকাশিত নিউজটি প্রকাশিত হয়। হয়তো আরো সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে ছবিসহ।
কষ্ট পেলেও অবাক হইনি। কারণ এটিই এখনকার বাংলাদেশের বাস্তবতা। খুব খারাপ সময়ের বাস্তবতা। লাখো শহীদের পবিত্র রক্তের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সৃষ্টি হওয়া এই স্বাধীন দেশে এমনটিইতো হওয়ার ছিল।
কেন সে বিষয়ে একটু পরে আসছি। তার আগে একটু দেখে নেই ঝিনাইদহ প্রতিনিধির বরাত দিয়ে কি লিখেছে বিডিনিউজ।
নিউজটি ছিল- ঝিনাইদহ শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় ২০২৪ সালের সরকার পতনের পর হামলার শিকার বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের অসমাপ্ত ভাস্কর্যটি আবার ভাঙা হচ্ছে।
তবে কারা বা কোন কর্তৃপক্ষ সেটি ভাঙছে, সে বিষয়ে কেউ কথা বলছেন না। পৌরসভাও এর দায়িত্ব নিচ্ছে না।
মুক্তিযুদ্ধে জীবন উৎসর্গকারী ঝিনাইদহের সন্তান হামিদুর রহমানের স্মরণে শহরের প্রবেশ পথে একটি বেদীতে এই ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ শুরু হলেও তা আর শেষ হয়নি।
২০১২ সালে ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. সাইদুল করিম মিন্টু পৌরসভার মেয়র থাকাকালে মাগুরা সড়কের চার রাস্তা মোড়ে ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩২ লাখ টাকা।
তবে কাজ শুরু হয় অনেক দিন পর। ২০১৬ সালে কিছু কাজ করার পর সেটি অসমাপ্ত থাকে। ভাস্কর্যটি আর উদ্বোধন হয়নি। সেভাবেই পড়ে ছিল।
শুক্রবার দুপুরে দেখা যায়, কয়েকজন শ্রমিক চত্বরের বেদীর অংশ ভাঙছেন। সেই ভাঙা টুকরো একটি পিকআপ ভ্যানে রাখা হচ্ছে। তবে বেদীর উপরের অংশটি এখনও অক্ষত রয়েছে।

জানতে চাইলে ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালক রথীন্দ্র নাথ রায় বলেন, ২০২৪ সালে সরকার পতনের পর ‘কিছু জনতা’ এ ভাস্কর্য ভাঙচুর করে।
কিন্তু এখন কারা এটি ভেঙে নিচ্ছে, সেটি ‘জানা নেই’ এবং এ প্রকল্প সংক্রান্ত কোনো ফাইলও দেখেননি বলে তার ভাষ্য।
ঝিনাইদহ পৌরসভার একজন কর্মকর্তা শুক্রবার রাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তখন প্রকল্পটিতে ১১ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়েছিল। তারপরেই সেটি বন্ধ হয়ে যায়।”
তবে কী কারণে সেটি বন্ধ হয়েছিল এবং এখন কারা এটি ভাঙছে এ নিয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন পৌরসভার ওই কর্মকর্তা।
যে সময় ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ নির্মাণের প্রকল্প চলছিল, তখন পৌরসভার কাউন্সিলর ছিলেন মো. মহিউদ্দিন। শুক্রবার বিকালে এ ব্যাপারে কথা বলতে চাইলে অসুস্থতার কথা বলে তিনি এড়িয়ে যান।
ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন বলেন, কারা এটি ভাঙছে তা তিনি জানেন না।
তবে তিনি বলেন, “জেলায় দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন কমিটির সভায় সদস্যদের মাঝ থেকে ভাঙাচোরা ভাস্কর্যের পরিত্যক্ত অংশ অপসারণ করার দাবি ওঠে। একটি ভালো জায়গা দেখে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।”
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ঝিনাইদহ জেলার সাবেক কমান্ডার কামালুজ্জামান বলেন, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। এ ব্যাপারে মুক্তিযোদ্ধারা বৈঠক করবেন। তারপর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রথম ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহী ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তঘাঁটি দখলের লড়াইয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি শহীদ হন।
মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের স্বীকৃতিতে তাকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
শুধু ঝিনাইদহে কেন? সারা বাংলাদেশেইতো সেই ২০২৪ এর কথিত ছাত্রগণআন্দোলনের সময় থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে।
এখন সেগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে মাত্র। চব্বিশের সেই ‘ইসলামী জঙ্গী-সেনা ক্যু’ এর পর বাংলাদেশে মানে পরিবর্তিত ‘বাংলাস্তান’ এ এমন ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চলবে এটাইতো স্বাভাবিক।
এতে সত্যিকার অর্থেই অবাক হওয়ার কিছু দেখিনা। সারাদেশে হেন কোন জায়গা আছে যেখানে মুক্তিযুদ্ধের ভাষ্কর্য, মুর্যাল , জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান , বাঙ্গালী সংস্কৃতিসহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্থাপনার ওপর হামলা চালানো হয়নি?

যারা হামলা-ভাংচুর-অগ্নিসংযোগ করেছিল ও করছে এখনো তারা তো বাংলাদেশের স্বাধীনতাতেই বিশ্বাস করেনা। তারা একাত্তরকে স্বীকার করেনা। তাদের কাছে ১৯৪৭ ই মুখ্য।
আর তারা সেই ’৪৭ এর পর মাঝখানে আর কোন কিছু দেখেনা, মানে তাদের ক্যালেন্ডারে নেই। তারা স্পেসশীপে করে ‘১৯৪৭ থেকে ২০২৪ এ এসে পৌঁছে গেছে। অবশ্য সেই স্পেসশীপটি তাদের কাছে সেই ‘ মেরাজ’ এর মতোই। এ বিষয়ে আর বিস্তারিত ব্যাখ্যায় গেলামনা। কারণ তাহলে আবার কি এক অবমাননায় পড়তে হতে পারে।

ঝিনাইদহের যে এলাকায় এই মহান পবিত্র (!!) কাজটি করছেন মহান দেশপ্রেমিকেরা সেই এলাকাটি আসলে কাদের নিয়ন্ত্রণে? সে খবরও একটু নিতে হয় আমাদেরকে।
ঝিনাইদহ জেলায় মোট ৪টি সংসদীয় আসন রয়েছে। বর্তমানে এই আসনগুলোর সাংসদরা হলেন: ঝিনাইদহ-১: মো. আসাদুজ্জামান (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপি), ঝিনাইদহ-২: আলী আজম মো. আবু বকর (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী), ঝিনাইদহ-৩: মো. মতিয়ার রহমান (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী), ঝিনাইদহ-৪: মো. আবু তালিব (বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী) ।
ঝিনাইদহের এই বাস টার্মিনালটির অবস্থান হচ্ছে ঝিনাইদহ-২ সংসদীয় আসনের মধ্যে। সেখানকার সাংসদ হলেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতা আলী আজম মো. আবু বকর।
এবারের ইলেকশনে নামক সিলেকশনে ঝিনাইদহের ৪ টি সংসদীয় আসনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের একটি সেক্টর কমান্ডার প্রধান সাবেক সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়ার বিএনপি পেয়েছে মাত্র একটি সীট।
বাকী ৩ টি বিএনপি’র খালাতো ভাই জামায়াতে ইসলামীর দখলে। তো সেখানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান না অন্য কোন শ্রেষ্ঠ থাকলেও তাঁর পরিনতি এমনটাই হতো-হচ্ছে ও হবে। এটির নাম- ‘নতুন বন্দোবস্তের বাংলাদেশ’।
আমরা যদি ঝিনাইদহ-২ সংসদীয় আসনে চার দশকের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি এবং বিভিন্ন শক্তির রাজনৈতিক উত্থান-পতনের বিশ্লেষণ করি তাহলে বুঝতে পারবো কেন সেখানে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য বার বার হামলার শিকার হচ্ছে।
ঝিনাইদহ সদর (আংশিক) এবং হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-২ আসনটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনৈতিক মানচিত্রে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত একটি নির্বাচনী এলাকা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝিনাইদহের সাধারণ মানুষ ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ অবদান ঐতিহাসিক।
তবে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে, বিশেষ করে আশির দশক থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই আসনের সংসদীয় নির্বাচনে ভোটারদের ম্যান্ডেট ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক শক্তির ব্যাপক পরিবর্তন ও আদর্শিক মেরুকরণ লক্ষ্য করা গেছে।
এই সংসদীয় এলাকার রাজনৈতিক পরিবর্তনকে মূলত চারটি প্রধান অধ্যায়ে ভাগ করে বিশ্লেষণ করা যায়। সেই আশির দশকে সামরিক শাসন ও ডানপন্থী শক্তির সূচনা (১৯৮৬–১৯৮৮) ঘটে।

এরশাদ সরকারের আমলে ১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে যথাক্রমে আনোয়ার জাহিদ ও আশরাফুল আবেদিন জাতীয় পার্টির টিকিটে সংসদ সদস্য হন।
এই সময়কালে কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতায় এই অঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের বাইরে একটি বিকল্প ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী ধারার ভিত্তি তৈরি হয়।
এরপর নব্বইয়ের দশক থেকে ২০০০ সাল সাল অব্দি বিএনপির দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য (১৯৯১–২০০১)ছিল।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে শুরু করে ২০০১ সাল পর্যন্ত এই আসনে টানা চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মসিউর রহমান।
এই দেড় দশকে ঝিনাইদহ-২ আসনে বিএনপি নিজেদের একটি শক্তিশালী এবং দুর্ভেদ্য রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। স্থানীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ বিরোধী ভোটব্যাংক এককভাবে বিএনপির পক্ষে একীভূত হয়, যা এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় দলটিকে ক্ষমতার কেন্দ্রে ধরে রাখতে সাহায্য করে।
কিন্তু ২০০৮ থেকে ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র ধারার রাজণৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। আমরা দেখতে পাই- ২০০৮ সালের নির্বাচনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের শফিকুল ইসলাম অপু আসনটি পুনরুদ্ধার করেন।
পরবর্তীতে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থন ও টিকিটে তাহজীব আলম সিদ্দিকী এবং ২০২৪ সালে নাসের শাহরিয়ার জাহেদী মহুল নির্বাচিত হন।
এই ১৬ বছরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অনুকূলে এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক প্রসারের ফলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ জোরালো হয়।
তবে এই সময়ে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা এবং স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ২০২৪ সালের দিকে এসে দলীয় প্রার্থীর বাইরে স্বতন্ত্র ধারার প্রার্থীরাও জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেন।
এখানে জামায়াতের উত্থান ঘটতে থাকে বেশ ধীরে। ২০২৪ সালের পরবর্তী জাতীয় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং ডানপন্থী ভোটারদের মেরুকরণের ফলে জামায়াতে ইসলামী এই আসনে তাদের দীর্ঘদিনের সুপ্ত ও সুসংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক শক্তিকে ভোটে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়।
বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার ভোট বিভাজন এবং সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতাই এই প্রথম এই আসনে ডানপন্থী ইসলামি ভাবধারার শক্তির প্রকাশ্য সংসদীয় বিজয় নিশ্চিত করেছে।
ঝিনাইদহ-২ আসনে ঐতিহাসিকভাবেই একটি বড় অংশ আওয়ামী লীগ বিরোধী বা ডানপন্থী মনোভাবাপন্ন ভোটার। নব্বইয়ের দশকে এই ভোটব্যাংক বিএনপির পক্ষে থাকলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনে তা জামায়াতের বাক্সে স্থানান্তরিত হয়েছে।
২০২৪ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব শূন্য ও মাঠপর্যায়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ায়, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনৈতিক ধারার শক্তি সাময়িকভাবে জনসমর্থন বা ভোট গণনায় পিছিয়ে পড়ে।
এরই মধ্যে রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলাম সামাজিক প্রভাব বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয় নানা কূটকৌশলে। বিগত বছরগুলোতে হরিণাকুণ্ডু ও ঝিনাইদহ সদরের গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর চ্যারিটি বা সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সাধারণ ভোটারদের একটি অংশের মাঝে নিজেদের ভিত্তি শক্ত করেছিল, যা ২০২৬ সালের উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচনে ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
ঝিনাইদহ-২ আসনের দীর্ঘ চার দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এই আসনের ভোটাররা পরিস্থিতি ও সময়ের নিরিখে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।
২০২৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে এই আসনে যে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটেছে, তা ঝিনাইদহের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির পুনরুত্থান নির্ভর করবে স্থানীয় দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কার, নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি এবং সাধারণ জনগণের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের ওপর।
তো এই যখন ঝিনাইদহের পরিস্থিতি তো সেখানে এমনটাই হবে এবং সেখানে তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার কিছুই করবেনা। যদিও জনাব তারেক নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক (!?) এর সন্তান হিসেবে দাবি করেন।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার যে বাড়িটি সেই বাড়িটিকে বার বার হামলা, ভাংচুর, লুটপাট, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া কারা করেছে? করেছেতো সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতাকারিদের প্রেতাত্মারা।
এর মধ্যে ইসলামী জঙ্গী রাজনৈতিক, ‘বে-রাজনৈতিক’ সংগঠনও যেমন রয়েছে তেমনি রয়েছে বিএনপি ও তার অংগ সংগঠনসমুহের ক্যাডারদের সক্রিয় আক্রোশ। কেন এই আক্রোশ তা আর বুঝতে কষ্ট হয়না দেশবাসীর। কারণ এই একাত্তরের অপশক্তি ও চব্বিশের অপশক্তি একই সূত্রে গাঁথা।
মুক্তিযুদ্ধে পরাজয়ের প্রতিশোধ নানাভাবেই নানাসময়ে নিতে চেয়েছে সেই অপশক্তি। এরা সেই আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও জামায়াতে ইসলামী ও তাদের দোসর অপশক্তি।
বাংলাদেশটিকে আমেরিকা তাদের মতো করে যেমন খুশি তেমন করে চালাতে না পারার অনেকদিনের দুঃখ-ক্ষোভ থেকে বাঙ্গালীর ইতিহাস-ঐতিহ্য-মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন সব ধ্বংস করতে উদ্ধত হয়েছে। সেটি তারা চব্বিশের “ক্যু” এর মধ্য দিয়ে করছে।
বিগত আওয়ামীলীগ আমলেই ঢাকায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙ্গে ফেলার প্রকাশ্য হুমকি দিয়েছিল সেই কওমী মাদ্রাসা বাণিজ্যের অন্ধকারের জীব কথিত মাওলানা মামুনুল হক।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস-এর আমীর ও হেফাজতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব এই মামুনুল হক যে কিনা অপরের স্ত্রীকে নিয়ে কোন এক রেষ্টহাউসে ধরা পড়েছিল্।
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকার একটি মাহফিলে ভাস্কর্য বিরোধী বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এই হুমকি প্রদান করেন।
তার ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর সৈয়দ ফয়জুল করীমের এই ধরণের বক্তব্যের জেরে ওই বছরের ডিসেম্বরে কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এই ভাস্কর্য বিরোধী উসকানিমূলক বক্তব্যের কারণে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগও আনা হয়েছিল।

কিন্তু সে সময়কার আওয়ামীলীগ সরকার এই অন্ধকারের জীব মামুনুল হক ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর সৈয়দ ফয়জুল করীমের মত অপশক্তির বিরুদ্ধে কেশাগ্র স্পর্শের সাহসটুকুও করতে পারেনি।
আর বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারাদেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করে দিয়েছেন ‘ইসলাম’ প্রসারের জন্য। যার প্রতিটি মসজিদের জন্য খরচ হয়েছে ২১ কোটি টাকা করে।
মানে ১১ হাজার ৭৬০ কেটি টাকা এ খাতেই খরচ করা হয়েছে। কিন্তু মাননীয় শেখ হাসিনা আপনাকে কিন্তু এই ‘ইসলামপন্থীরাই ক্ষমতা থেকে টেনে হিঁচড়ে নামিয়েছে। সেটি একটু মনে রাখবেন কষ্ট করে।
কওমীদের মাদ্রাসাকে আপনি শেখ হাসিনা সরকারি স্বীকৃতি দিয়েছেন, ‘কওমী মাতা’ উপাধি পেয়েছেন। মনে করেছিলেন আপনাকে তারা ভোট দেবে, রক্ষা করবে আপনাকে। তো কি দেখলেন আপনি? এবারও কি শিক্ষা হবেনা আপনার বা আপনার দল আওয়ামী লীগের?
# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।
