এটি কোন দেশের জাতীয় সংসদ যেখানে মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধাদের কথা বলার সময় কতগুলো মানুষ নামের কীট খ্যাঁ খ্যাঁ করে ওঠে। এটি কোন সংসদ যেখানে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তানীদের সহযোগী মানে খয়ের খাঁ রাজাকার-আলবদর-আলসামশসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের নিয়ে কথা বলা যাবেনা?
এটি কি সেই সংসদ যেখানে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ যারা একাত্তরে বাঙ্গালী নিধন করেছিল তাদের বিরুদ্ধে কথা বলা যাবেনা?
এই ঘৃণ্য কীট ও তাদের জঘন্য-মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের দাবি তোলা যাবেনা? এটি কোন দেশের আইনকক্ষ যেখানে আমাদের ৩০ লক্ষ শহীদ ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর বিচারের কথা বলা যাবেনা?
এটি জাতির সংসদ যেখানে সেই একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধীতাকারি গোষ্ঠীর মূল গোদা জামায়াতে ইসলামীর বিচার চাওয়া যাবেনা?
হ্যাঁ সেটি ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই বাংলাদেশ। আসলে এজন্যই কি এদেশের মুক্তিযোদ্ধাসহ অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষ অকাতরে প্রাণ দিয়েছিল?
আমাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, মানবমুক্তির পক্ষে কাজ করছিলেন, সেসব বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করলো ওই আলবদর বাহিনী ও পাকিস্তানী সেনারা।
আর এই যে আলবদর বাহিনী তারাতো তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতা-কর্মী ছিল। বাংলাদেশে যা রূপান্তরিত হয়ে ইসলামী ছাত্র শিবির নাম ধারণ করেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে এই ছাত্র শিবির রগকাটা বাহিনী ও পেছন থেকে পিঠে ছুরি মারা বাহিনী হিসেবে কুখ্যাত।
এতসব কথা কেন বলছি বা প্রশ্ন তুলেছি তা নিশ্চয়ই পাঠক বুঝতে পারবেন। গত ২৮ এপ্রিলে এই বাংলাদেশেরই জাতীয় সংসদে বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার-আলবদর-একাত্তরের কুখ্যাত খুনী-খুনীর দল এবং কথিত জুলাই আন্দোলন- এবং সেসময় অসংখ্য পুলিশ হত্যার বিচারের কথা বলতে গিয়ে নানান বিরোধীতার স্বীকার হয়েছেন।
অথচ এখনকার জাতীয় সংসদে স্পীকার শুধু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাই নন তিনি বীর প্রতীক উপাধিপ্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ উদ্দিন।
জাতি অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করলো সেই মুক্তিযোদ্ধা স্পীকার মেজর হাফিজও কিন্তু তেমন কোন ভূমিকা নিলেন না মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধা-একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামে অকাতরে প্রাণ দেয়া শহীদদের সম্মান রক্ষার্থে।
বুঝলাম তিনি স্পীকার, তাকে রেফারির ভূমিকা পালন করতে হয় সংসদে। কিন্তু তাই বলে তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতাকারি দলের আক্রমণ থেকে একজন প্রতিবাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে রক্ষা করবেন না?!
অথচ স্পীকার হাফিজ যেন চরম নিরপক্ষতার পরিচয় দিতে আগ্রহী ছিলেন। অবশ্য তিনি তা করবেন, এটাই স্বাভাবিক। কারণ যত কিছুই হোক তিনিতো বিএনপির টিকিটে সংসদ সদস্য হয়েছেন।
আর সেই বিএনপিতো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” টাইপের দল। শুধু তাই নয়, এরা সেই ঘৃণ্য জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে আঁতাত করে এর আগে ক্ষমতায় ছিল।

জামায়াতের কুখ্যাত খুনী-মানবতাবিরোধী অপরাধে দন্ডিত ও ফাঁসির আদেশ কার্যকর হওয়া আলী আহসান মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামীকে মন্ত্রী করেছিল।
এমনকি বিএনপি দলীয় কুখ্যাত খুনী সাকা চৌধুরী ( সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী) কে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সংসদ বিষয়ক উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন।
সুতরাং তাদের কাছ থেকে এর চেয়ে খুব বেশি কিছু আশা করাটাও বোধ হয় বোকামিই শুধু না হয়তো অন্যায় হবে আমাদের। অবশ্য আমরা এই যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলার চেষ্টা করি বা সেই চেতনা লালন করি তাদের আবেগ একটু বেশি।
তবে এটি ঠিক যে, সেই আবেগ যদি না থাকতো তাহলে আর মুক্তিযুদ্ধ হতোনা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে এই দেশটি স্বাধীন করতো না এই বঙ্গীয় দেশের প্রতিবাদী আপামর (কিছু কুলাঙ্গার রাজাকার-আলবদরসহ তাদের দোসর ছাড়া) জনগণ।
এখনকার সংসদে কতজন মুক্তিযোদ্ধা আছেন তা এখনো ঠিকভাবে যাচাই করে দেখিনি। আপাতত অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ও স্পীকার মেজর(অব:) হাফিজ ছাড়া মনে করতে পারছিনা।
কিন্তু একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানই বোধ হয় শরীর-মনে সুস্থ থাকলে সংসদে কাঁপন ধরিয়ে দিতে পারবেন। যদিনা তাঁর ওপর কোন বিএনপি দলীয় “এম্বার্গো” না আসে।
কারণ দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে তাঁর পক্ষে কিছু বলা সম্ভব নয়। কারণ বাংলাদেশের সংসদের যে রুলস রেগুলেশন আছে তাতে সংসদে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যেমন কিছু বলা যায়না, করাও যায়না।
পাঠক ইতিমধ্যেই নিশ্চয়ই জেনে গেছেন সংসদে কি হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্য নিয়ে গত ২৮ এপ্রিল। তারপরও কিছুটা তথ্য প্রমাণ রাখা দরকার ভবিষ্যতের জন্য। কারণ বক্তব্যের অনেক কিছুই এক্সপাঞ্জ হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
কারণ স্পীকারের বক্তব্যেই তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তিনি সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর পালের গোদা সাদা শকুন হিসেবেই যিনি সমধিক পরিচিত সেই শফিকুর রহমানের অসংসদীয় বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার কথা বলেছেন।
একজন মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকেই যত ভয় জামায়াত-এনসিপি’র।
গত চব্বিশের কথিত কোটা আন্দোলনসহ তার পরে নানা ইসলামী রাজনৈতিক ও সামরিক জঙ্গীবাদের উত্থান-পতনসহ নানা ক্যারিকেচার দেখেছি আমরা বাংলাদেশের রাজনীতিতে।
এসময় মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তিযোদ্ধা-বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ-বাঙ্গালী সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ নানা মুক্তিমনা মানুষ, বুদ্ধিজীবী-শিক্ষকদের যে অপমান করা হয়েছে তা নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যাননি। অবশ্য আমরা জাতি হিসেবে বড় অকৃতজ্ঞ। বড়ই ভুলে যাওয়া জাতি।
যেই টোকাই জঙ্গীরা (এনসিপি-শিবির-হিযবুত তাহরীর-কওমী ছাত্ররা) কথায় কথায় পুরো বাংলাদেশকেই পাকিস্তান বানিয়ে ফেলেছে, জঙ্গী রাষ্ট্র ও সমাজে পরিণত করেছে তাদেরকে আমাদের অনেকেই হুজুর হুজুর করেন। এ লজ্জা রাখি কোথায়?
জামায়াতীদের নতুন প্ল্যাটফরম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’র মাধ্যমে সেই বেয়াদপ হাদী ও তার সাঙ্গপাঙ্গোদের দিয়ে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ-মুক্তমনা সংক্রান্ত যা কিছু রয়েছে তার বিরুদ্ধে নানা কুৎসা রটানো হয়েছে।
পদে পদে অপমান করানো হয়েছে। মোট কথা জামায়াত ও তাদের দোসর এবং অবশ্যই সেই ‘মেটিকুলাস ডিজাইন’র কা-কু নোবেল কিনে নেওয়া ড. মুহাম্মদ ইউনুস এদেরকে প্রেট্রোনাইজ করেছে চরমভাবে।
সেইসাথে ক্ষমতা থেকে ‘জঙ্গী-সামরিক ক্যু’র মাধ্যমে উৎখাত করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার –উজ-জামানসহ সশস্ত্র বাহিনীর ইসলামী জঙ্গী অংশটি চরমভাবে সক্রিয় থেকে এদেরকে সহায়তা করেছে।
কেউ কেউ হয়তো বলবেন- এখন এই দুঃসময়ে আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আত্মীয় ওয়াকারকে (জাতীয় মীরজাফর ও বেইমান) কেন টেনে আনা হলো?
কেন ওয়াকারের কথা বলছি সে প্রসঙ্গে যদি বলতেই হয়, তাহলে বলতে হয়- এই ওয়াকার ছাত্রাবস্তায় ইসলামী ছাত্র শিবিরের অনুরক্ত ছিল, পরে জামায়াতের সাথে তার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ছিল ও আছে।
যতদূর জানি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বার বার নানাদিক থেকে এই বদমায়েশ ওয়াকারকে সেনা প্রধান না করার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি কারো কথা না শুনে আত্মীয়কে বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন।
সাবেক সেনাপ্রধান মুস্তাফিজুর রহমানের মেয়ের জামাই এই ওয়াকার যে চরম বেঈমানী ও মীরজাফুর করলো বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে তারপরও যদি তাঁর ( শেখ হাসিনা) শিক্ষা না হয় তাহলে এ জাতির কপালে খারাপি আছে।
শুধু কি ওয়াকার? শেখ হাসিনার আশে পাশে এবং মন্ত্রী-সাংসদ-মেয়রসহ নানা উচ্চপদের নেতৃত্বে কমকরে হলেও ৬৫ থেকেজ ৭০ জন ছিল যারা শুধুমাত্র আত্মীয় হওয়ার কারণে বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে প্রচন্ড তাফালিং করেছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বানিয়েছে এরা।
কিন্তু যখন শেখ হাসিনার চরম বিপদ তখন এদের কাউকেই আর দেখা পাওয়া যায়না। এদের কেউ আওয়ামীলীগের অসহায়-দেশছাড়া-পলাতক নেতা-কর্মী ও তাদের পরিবারের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছেন? যতদূর জানি তেমন উদাহরণ পাইনি।
কারণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও আমার কিছু ব্যক্তিগত যোগাযোগে যা জানি তাতে এমন কোন তথ্য পাইনি।
সেই ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত গাওয়ার মত অবস্থা হয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু প্রাসঙ্গিকভাবেই যেন এসব বিষয় হাজির হচ্ছে। আবার আমরা একটু মুক্তিযোদ্ধা প্রতিবাদী ফজলুর রহমানের বিষয়েই ফিরে যাই।
নানা সংবাদ মাধ্যমে যে খবর দেখলাম তাতে কিছুটা আশান্বিত হলাম এই ভেবে যে, অন্তত একজন শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধা অন্তত আছেন এই দেশে যিনি রাজাকারকে রাজাকার, খুনীকে খুনী, যুদ্ধাপরাধীকে যুদ্ধাপরাধী ও কথিত জুলাই যোদ্ধাদের অপমানের বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছেন নানা সময়ে।
যিনি সংসদে দাঁড়িয়ে দৃপ্তকন্ঠে থানা-পুলিশ ফাঁড়িতে আগুন দেয়া অসংখ্য পুলিশ হত্যার বিচার চেয়েছেন , এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছেন। কিন্তু সেই পুলিশ হত্যার বিচার যাতে না হতে পারে সেজন্য এই কথিত জাতীয় সংসদে ‘ ইনডেমনিটি বিল’ পাশ হয়!! এর চেয়ে ন্যাক্কারজনক আর কি হতে পারে?
এই পুলিশ সদস্যদের পরিবারের সদস্যদের কি তাদের স্বজন হত্যার বিচার চাওয়ার অধিকার নেই? তারা কি বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সেই দাবি করতে পারবে না? এ কেমন সংসদ? এ কেমন আইন প্রণেতা আমাদের জাতীয় সংসদে ? যে সংসদ মানবাধিকার, গণতন্ত্র সমুন্নত রাখার আইন পাশ করবে ও তা যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা তা মনিটরিং করবেন সংসদ সদস্যগন তারা কি করলেন এই ইনডেমনিটি পাশ করে? সময় কারো সমান যায়না হে মাননীয় সাংসদগণ। ইতিহাসের চাকা ঘুরতে খুব বেশি সময় লাগেনা। শুধু অপেক্ষা করুন।
## মূলত বিএনপির সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এক বক্তব্যে গত ২৮ এপ্রিল উত্তেজনা ছড়াল সংসদে, প্রায় ১০ মিনিট অচল থাকল আইনসভার কার্যক্রম।
কোনো মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াতে ইসলামী করতে পারে না, কোনো শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতেই পারে না, করলে এটা ডাবল অপরাধ—ফজলুর রহমানের এই বক্তব্য ঘিরে দেখা দেয় উত্তেজনা।

বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে সরকারি দলের কিছু সদস্যরাও প্রতিবাদ জানান। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ কাউকে নিবৃত্ত করতে পারছিলেন না। একপর্যায়ে তিনি দাঁড়িয়ে যান।
পরিস্থিতি শান্ত হলে স্পিকার সরকারি ও বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘সারা জাতি দেখছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সংসদ যদি বিধি মোতাবেক না চলে, তাহলে এই সংসদ আর থাকবে না।’ সদস্যদের কর্মকাণ্ডে শিশুরাও লজ্জা পাবে বলে মন্তব্য করেন স্পিকার।
তিনি বলেন, ‘যাঁরা অলরেডি দাদা হয়ে গিয়েছেন, তাঁদের নাতিরা হয়তো এখানে গ্যালারিতে বসে দেখছে। তারা কী ভাববে এটা সম্পর্কে?’
ফজলুর রহমান রাষ্ট্রপতির ভাষণে ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জুলাই অভ্যুত্থানের তুলনার বিরোধিতা করে ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি বলব, এই কথাটা বলাই অন্যায়। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ৫ আগস্টের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে কুয়ার তুলনা করা।’
ফজলুর রহমান বিরোধী দলের উদ্দেশে বলেন, ‘তারা বলেছিল, কোনো মুক্তিযুদ্ধ হয় নাই। সেই দিন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমি বলেছিলাম, এই আলবদরের বাচ্চারা, এখনো কিন্তু ফজলুর রহমান জীবিত আছে।
মুক্তিযুদ্ধ হইছে, মুক্তিযুদ্ধই সত্য। ৩০ লক্ষ মানুষ জীবন দিয়েছে, এটাও সত্য। আমরা সেদিন তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলাম।’
ফজলুর রহমান বলেন, ‘অনেক চক্রান্তের মধ্য দিয়ে ইলেকশন হইছে। সেই ইলেকশনে তারা কী করেছে? আজকে যারা আমার ডান দিকে (বিরোধী দল) বসে আছে, তারা কী করেছে? তারা যা করেছে, সেটা কল্পনা করার মতো না। সেই চক্রান্তের ভেতর দিয়ে যখন তারা প্রচার করতে শুরু করল, দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পেয়ে তারা পাস করবে।
আমি ফজলুর রহমান বলেছিলাম, জামায়াত জোট যদি দুই-তৃতীয়াংশ পায়, তাহলে আমি বিষ খাব। তারা কখনো যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারে না, রাজনৈতিক যুদ্ধে। তাদের পূর্বপুরুষ বাংলাদেশ চায় নাই। যত দিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার বেঁচে থাকবে, তত দিন মুক্তিযোদ্ধা জিতবে, রাজাকার কোনোদিন জয়লাভ করতে পারবে না।’
এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা হইচই শুরু করলে ফজলুর রহমান স্পিকারের কাছে আরও পাঁচ মিনিট সময় চান। স্পিকার তিন মিনিট সময় বাড়িয়ে দেন।
ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমার বক্তব্যের পর বলবে, আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই? যেমন বিরোধী দলের নেতা বলেন, উনাকে আমি অসম্মান করি না, সব সময় মাননীয় বলে কথা বলি। কিন্তু উনার দলের লোকজন এখানে বসে আছে, তারা আমাকে “ফজা পাগলা” বলে কথা বলে। তারা নাকি সভ্য, তারা ইসলাম…।’
ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম, বিরোধী দলের নেতা বলেছেন, উনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক এবং উনি শহীদ পরিবারের লোক এবং উনি জামায়াতে ইসলাম করেন। এটা ডাবল অপরাধ। মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না।’
এ সময় ব্যাপক হইচই শুরু করেন বিরোধী দলের সদস্যরা। স্পিকার তখন সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।
এরপর ফজলুর রহমান বলেন, ‘আমি আবারও বলে রাখলাম, শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করতেই পারে না। আর জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ করছেন।’এ বক্তব্যের পর বিরোধী দলের সদস্যরা দাঁড়িয়ে একযোগে হইচই ও প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
এ পর্যায়ে ফজলুর রহমান বক্তব্য চালিয়ে যেতে চাইলে বিরোধী দলের সদস্যরা তাঁদের কণ্ঠ আরও চড়া করে প্রতিবাদ জানাতে থাকেন।
ফজলুর রহমান তখন বলেন, ‘আমি ওনাদের কিন্তু খারাপ কিছু বলি নাই।’ফজলুর রহমানের বক্তব্যের সময় জামায়াত এবং তাদের মোর্চার শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিসের এমপিদের দাঁড়িয়ে হইচই করতে দেখা যায়।
এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা, জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে কিছু বলতে চাইলে স্পিকার তাঁকে বলেন, ‘মাননীয় বিরোধীদলীয় নেতা, বসুন। আমি বললে তারপর আপনি বলুন।’পরে স্পিকার ফজলুর রহমানকে তিন মিনিট সময়ের মধ্যে বক্তব্য শেষ করার অনুরোধ করেন।
তবে বিরোধীরা হইচই করতে থাকলে স্পিকার বলেন, ‘মাননীয় সংসদ সদস্যবৃন্দ, সারা জাতি দেখছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সবাই আপনারা নির্বাচিত সদস্য, এখানে সবাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত সদস্য। আমি প্রতিদিনই বলি যে রুলস অব প্রসিডিউর বইটা একটু পড়েন।
এই সংসদ যদি বিধি মোতাবেক পরিচালিত না হয়, এটি আর জাতীয় সংসদ থাকবে না।’সংসদের অভিভাবকের প্রতি যদি সম্মান আপনাদের না থাকে, তাহলে জাতীয় সংসদের প্রতি মানুষের কোনো রেসপেক্ট থাকবে না আগামী দিনে।’
এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, ‘১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বরকে পালন করা হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। সেই মুনীর চৌধুরী, আব্দুল আলীম চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার থেকে ধরে শত শত বুদ্ধিজীবীকে যারা হত্যা করেছিল, তাদের বলা হয় আলবদর। সেই আলবদর বাহিনী কারা ছিল, আপনারা জানেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্য, প্রথম দিন কিন্তু এইখানে (সংসদে) কোনো বাতি ছিল না, আমি কিছু শুনতে পারি নাই। এই হাউসে প্রস্তাব হইছে তাদের ব্যাপারেও। তাদের ব্যাপারেও শোকপ্রস্তাব হইছে, আমি একা হইলেও এটার প্রতিবাদ করতাম। কিন্তু যেহেতু আমার দল এটা করছে, আমি চুপ কইরা ছিলাম। কথাটা খুব ক্লিয়ার। কিন্তু এই সংসদ সম্পর্কে আজকে না হলেও কালকে, কালকে না হলে পরশু, না হলে ইতিহাসে ভুল বার্তা যাবে, যদি আমরা যুদ্ধাপরাধের ব্যাপারে শোকপ্রস্তাব করি।’
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় পুলিশ হত্যার বিচারের পক্ষেও মত দিয়ে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘আমি মুক্তিযোদ্ধা কামান্ডার ছিলাম, ১৬ ডিসেম্বরের পর শত শত রাজাকার আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। আমি কাউকে হত্যা করি নাই, সবাইকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছি।
৫ আগস্টের পরে এত থানা লুট হয়েছে, পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে, তখন তো পুলিশ যুদ্ধ করে নাই, তারা তো নিরপরাধ। এত অস্ত্র গেল কোথায়? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমার নেতা। ৫ আগস্টের পরে এত ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো কোনো আইনে দায়মুক্তি হওয়ার কথা নয়।
৫ আগস্টের পরে পুলিশ হত্যা হয়ে থাকে, থানা লুট হয়ে থাকে, সেটার জন্য তদন্ত হওয়া উচিত, দোষীদের বিচার হওয়া উচিত।’ফজলুর রহমানের এমন বক্তব্যের সময় সরকারি দলের একাধিক সংসদ সদস্যকে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়।
সংসদের কিছু পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রমান হিসেবে রাখতে চাইলাম মাত্র। এজন্যই বীর এই জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধ-গণতন্ত্র-বঙ্গবন্ধু কি নিষিদ্ধ ?
এই সংসদ কি চেয়েছিলাম আমরা? তবে আপাতত ফজলুর রহমানের মত একজন প্রতিবাদী মুক্তিযোদ্ধা আছেন। যিনি অন্তত কিছু কথা বলতে পারবেন। স্যালুট বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান।
# নুরুল ইসলাম আনসারি: লেখক, প্রাবন্ধিক।
