একাত্তরেরর মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান –পাহাড়ি ও সমতলের আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওপর যত খুশী অত্যাচার-নিপীড়ন-খুন-ধর্ষণের মত ঘৃণ্য মানবতাবিরোধী অপকর্ম করা যাবে।

এটি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র-সমাজ ও মুসলিম মানসে একবারে জায়েজ। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র-সমাজ হলেও কোন সমস্যা নেই, বরং তাতে এ দেশের কথিত সু-শীল সমাজও খুশী।

কিন্তু প্রতিবেশি দেশ ভারতে নিয়ম মেনে কোরবানী দেয়া, মসজিদে আজানের সময় মাইকের শব্দ আদালত ও দেশের আইন অনুয়ায়ী নির্দিষ্ট মাত্রায় রাখার কথা বললেই এবং আইন মানার কথা বললেই সে ভারত রাষ্ট্রটি হয়ে যায় মুসলিম নির্যাতনকারী!?

অথচ একথা অস্বীকার করার কোন উপায় আছে যে একাত্তরে ভারত বাংলাদেশের পাশে না থাকলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আমরা কবে পেতাম তা ছিল প্রচণ্ড রকমের অনিশ্চিত।

যেখানে আমেরিকা-চীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চরম বিপক্ষে ছিল। শুধু কি তাই? এই দুটি রাষ্ট্রতো বাংলাদেশের নিরীহ জনগণের ওপর হামলাকারী-হত্যাকারী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে অস্ত্র-গোলাবারুদসহ সবকিছু দিয়ে সাহায্য করেছে।

এমনকি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। বাংলাদেশ যাতে স্বাধীন হতে না পারে সেজন্য যে মার্কিনীরা তাদের অত্যাধুনিক সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল পাকিস্তানের পক্ষে তা এই দেশের নাগরিকরা ভুলে গেছে।

এই দেশের জঙ্গীবাদী মুসলিমরা আবার সেই পাকিস্তান-আমেরিকার কাছেই নতজানু হয়ে নানা ষড়যন্ত্র করে দেশটির অগ্রযাত্রা ও সামাজিক-রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সবকিছুই ধ্বংস করে দিলো।

তো এই বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলিমদেরকে (আলবদর-লালবদরদের কথা বলছি) সত্যিকার অর্থে বিশ্বাস করাটাইতো কষ্টকর হয়ে গেছে। আজকে শত্রু-মিত্র চেনা খুব বেশি প্রয়োজন। সেটি বার বার ভুল করা যাবেনা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেও লাখ লাখ হিন্দু জনগোষ্ঠীর জায়গা জমি কেড়ে নেয়া হয়েছে স্রেফ গায়ের জোরে। খুন করা হয়েছে হিন্দুদের। হিন্দু শিশু থেকে শুরু করে ৭০ বছরের বৃদ্ধা নারীকেও যে ধর্ষণের মত মানবতাবিরোধী জঘন্য অত্যাচার করা হয়েছে; যা এখনো বিদ্যমান।

হিন্দুদের জায়গা সম্পত্তি মানে স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অবলীলায় কেড়ে নেয়া হয়েছে, হচ্ছে এবং এটি যে চলমান প্রক্রিয়া সে ব্যাপারে আমাদের রাজনৈতিক দল-সমাজ মানে ওই সু-শীল সমাজ, রাষ্ট্র একেবারেই নীরব। অস্বাভাবিকভাবে নিরপক্ষে ভূমিকা পালন করছে এরা- দেখে কি তাই মনে হয়না আপনাদের?!

মুক্তিযুদ্ধ পূর্বাপর তৎকালীন পূর্ববঙ্গ বা পূর্বপাকিস্তান থেকে কত সংখ্যক হিন্দু জনগোষ্ঠী বিতাড়িত হয়ে দেশত্যাগ করেছে তার পরিসংখ্যানে ভারাক্রান্ত আর নাই বা করলাম।

কিন্তু এটি যে একটি চলমান অমানবিক প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস সেটি অস্বীকার করতে পারবে রাষ্ট্র? অথচ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে এদেশের প্রতিটি নাগরিকের সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করা।

সেক্ষেত্রে শুধু দৈহিক নিরাপত্তা নয়। নাগরিকের মৌলিক যেসব অধিকার রয়েছে- অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান, তার গণতান্ত্রিক অধিকার, কথা বলার স্বাধীনতা, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করা।

পাশাপাশি নির্বিঘ্নে ও যোগ্যতা অনুযায়ী সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সমান সুযোগ পাওয়াও সেই অধিকারের মধ্যে পড়ে।

কিন্তু সেটি আদৌ হচ্ছে আমাদের এই দেশে?

এই যে গত চব্বিশের ৫ আগষ্টের পর উড়ে এসে জুড়ে বসা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের “নটের পুতুল ড. ইউনুস” সরকারের শেয়ালবুদ্ধি সম্পন্ন আইন উপদেষ্টা মানে আসিফ ষাড় বলেছিলেন- বাংলাদেশে ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক রয়েছে।

কিন্তু এই সিকি লক্ষাধিক ভারতীয় নাগরিকের কোন হদিস তিনি বা তার সরকার দিতে পারেননি। তারা কি ভোঁজবাজির মত হাওয়া হয়ে গেলো? নাকি ইউনুসীয় সরকার তাদেরকে গোপনে ভারতে পাঠিয়ে দিয়েছেন তাদের সেই আমলে লোকচক্ষুর অন্তরালে ?

গোপনে পাঠিয়ে দিয়ে থাকলে তা তো মহা অন্যায় ও রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ করেছেন তারা। আর যদি না পাঠিয়ে থাকেন তাহলে এই বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে কোন আইনে রয়েছে তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে সরকারকে।

বাংলাদেশে থাকা ২৬ লাখ ভারতীয়ের হদিস পাওয়া না গেলেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, বিহার, মুম্বাই, দিল্লী, উড়িষ্যাসহ বিভিন্ন প্রদেশে যে হাজার হাজার বাংলাদেশী মুসলিম নাগরিক রয়েছে তার প্রমাণতো দেখছি আমরা।

শুধু ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি, ডয়েচে ভেলেসহ বিভিন্ন মিডিয়াতে একেবারে সচিত্র ও সবাক প্রতিবেদন প্রচারিত হচ্ছে।

আর ভারত সরকার কিছুদিন ধরেই এসব অবৈধ-অনুপ্রবেশকারি বাংলাদেশী নাগরিকদেরকে ( যাদের কোন পাসপোর্ট-ভিসা) নেই তাদের চিহ্নিত করে নির্দিষ্ট জায়গায় জড়ো করছে। তারপর সেখান থেকে নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে।

আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী এই আইনি প্রক্রিয়াকে “ভারতে মুসলিম অত্যাচার” হিসেবে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে নানা প্রক্রিয়ায়-নানা অপকৌশলে।

এমনকি অতি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে একটি অবাধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার বদলের বিষয়টিকেও বাংলাদেশী মুসলমান সমাজ সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হিসেবে দেখছে।

শুধু তাই নয় এ নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করছে এবং বাংলাদেশের হিন্দুদেরকে মেরে ফেলা-কেটে ফেলা-মন্দির গুড়িয়ে দেয়ার মত প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য ও আচার-আচরণ শুরু করেছে।

কিন্তু আমাদের গণতান্ত্রিক সদাশয় বিএনপি সরকার এ ব্যাপারে একেবারেই নিশ্চুপ। এমন কোন কথা যদি বাংলাদেশের কোন হিন্দু বলতো তাহলে তো তাকে কতলই শুধু নয় হিন্দু সমাজের ওপর যে ধ্বংসলীলা শুরু হতো তা কল্পনা করতেও শিউরে উঠতে হয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত বিজেপি সরকার ২০২৬ সালের ১৩ মে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে বলা হয়, উন্মুক্ত জনপরিসরে কোনো প্রাণী জবাই করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকবে।

কলকাতা হাইকোর্ট গরু কোরবানী দেয়া ঈদুল আজহা উৎসবের অংশ নয় এবং ইসলামের বিধানে তা বাধ্যতামূলকও নয় বলে মন্তব্য করে।

আদালত পাশাপাশি উন্মুক্ত বা জনপরিসরে গবাদিপশু জবাইয়ের উপর জারি করা নিষেধাজ্ঞাও বহাল রাখে। ঈদুল আজহার আগে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পশু জবাই নিয়ন্ত্রণের আদেশের উপর স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ২০ মে হাইকোর্ট এই রায় দেয়।

শুধু তাই নয় পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলিম ধর্মাবলম্বী নাগরিক ‘প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০’-এর ১২ ধারার অধীনে ছাড় চেয়ে আদালতে পিটিশন করেছিলেন । কিন্তু আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে রায়ে বলেন, ‘কয়েকজন পিটিশনকারীর চাওয়া এই ছাড়ের বিষয়ে ১৯৫০ সালের আইনের ১২ ধারার আওতায় রাজ্য সরকারকে একটি সিদ্ধান্ত নেয়ার নির্দেশ দেয়া হলো।’

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নিয়ম হলো-

কর্তৃপক্ষের দেয়া ‘ফিটনেস সার্টিফিকেট’ বা সুস্থতার ছাড়পত্র ছাড়া কোনো প্রাণী জবাই করা যাবে না।

এই নির্দেশনা অমান্য করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ারও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।

সরকার বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানায় যে, উন্মুক্ত জনপরিসরে কোনো প্রাণী জবাই করা ‘কঠোরভাবে নিষিদ্ধ’ থাকবে।

এটিতেই ক্ষেপে যায় আমাদের গরু ভক্ষণকারি ইসলাম রক্ষকেরা। কারণ তাদের কাছে গরুর গোস্ত না খেলে সে আবার মুসলমান নাকি?!

কিন্তু তাদেরকে কেউ প্রমাণ করছেনা যে ইসলাম ধর্মের কোথায় লেখা রয়েছে – গরুর মাংস খেলেই সে ইসলাম ধর্মের অনুসারি। মুসলিম ছাড়াও অন্য অনেক ধর্মের মানুষ গরুর গোস্ত খায়। তাহলে তারা কি মুসলিম বা ইসলাম ধর্মের অনুসারি?

তাছাড়া বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান ছাড়া বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর কোথায় প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে যত্রতত্র পশু কোরবানী দেয়ার বিধান রয়েছে? সেসব দেশেতো কোন মুসলমান উচ্চবাচ্য করার সাহস পাননা।

সাধারণ যুক্তিতেও যদি দেখি আমরা তাহলে দেখবো- বাংলাদেশেও পশু জবাই বা কোরবানী আগে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সেই সনদ নিতে হয়। সেই সনদ নেয়ার পরই পশু জবাই বা কোরবানীর বিধান রয়েছে। শুধু তাই নয় নির্দিষ্ট কসাইখানাতেই স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পশু জবাই বা কোরবানী করার আইন রয়েছে।

কিন্তু এই ইসলামি বাংলাদেশে আইন অমান্য করাটাই যেন বাহাদুরী। এখানে যত্রতত্র পশু জবাই-কোরবানী দেয়া, রক্ত ও পশুর নাড়িভুড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখাই যেন “পবিত্র ইসলামসম্মত”!!

এটিই আমাদের মুসলিম সমাজের মানস গঠন। এরা অবৈধ উপায়ে পাওয়া বা ঘুষের টাকা দিয়ে হালাল গোস্ত কিনে আল্লাহর রহমত পেতে চান। এসব নিয়ে কোন প্রশ্ন করলে কিন্তু গর্দান যাবে।

ঘুষের টাকায়-চোরাকারবারিরর টাকায় বিশাল সুরম্য, সেন্ট্রাল এসি মসজিদ, মাদ্রাসা করা যাবে। তাতে নিশ্চয়ই আমাদের এসব মুসলিম ভাইদের পরম ছওয়াব হয়। বেহেশতে যাওয়ার পথ সুগম হয়। এই যে বিশাল বিশাল গরু কেনা হয় লাখ লাখ টাকা দিয়ে, সেই টাকার উৎস কোথায় এবং তা সৎভাবে আয় করা হয়েছে কিনা তা আর কেউ জিজ্ঞেস বা আত্মজিজ্ঞাসা থাকেনা আমাদের। যদি তা থাকতো তাহলে বোঝা যেত প্রকৃত অবস্থা।

কিন্তু এবার যখন পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের আদালতের নিয়ম-কানুন ও সরকারি নির্দেশ মেনে পশু জবাই বা কোরবানী করার ব্যাপারে একটু কড়াকড়ি করা হয়েছে তখনই দেখা দিয়েছে সমস্যা। ওখান মুসলিমদের একটি উগ্র অংশ তাতে অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন।

তবে তারচেয়ে বেশি অসন্তুষ্ট ও প্রচন্ড বিক্ষুব্ধ হয়েছেন আমাদের বাংলাদেশের মুসলিমরাই। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেতো রীতিমতো সাম্প্রদায়িক উস্কানির ঝড় বয়ে যাচ্ছে।এমনকি কিছু কিছু সংবাদমাধ্যও এ নিয়ে প্রচারণায় নেমে পড়েছে। এদের একটাই সুর।

তাহলো- পশ্চিমবঙ্গে এমনকি সারা ভারতে মুসলমানেরা ঈদের নামাজ পড়তে পারছেননা, কোরবানী দিতে পারছেন না, মুসলিমদেরকে নানাভাবে হয়রানী-নির্যাতন করা হচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিন্তু আমি বিবিসি, ডয়চেভেলেসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম ও ভারতের বিভিন্ন মুসলিম ও বামধারার সংস্কৃতিসেবী-রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছি।

তাদের বক্তব্যে যা পেলাম তা হলো- ভারতে নিয়ম মেনে মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মাইক বা সাউন্ডবক্স ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে। তা সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নির্দিষ্ট ডেসিবেলের বাইরে কোন সাউন্ড ব্যবহার নিষিদ্ধ সেখানে।

এটিতো জনস্বার্থেই করা হয়েছে। অনেক রোগী থাকে, অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, পরীক্ষা থাকে, নাগরিকদের বিশ্রামের বিষয় রয়েছে। তাছাড়া অনেকক্ষণ ধরে যদি কোন এলাকায় উচ্চস্বরে শব্দদূষণ করা হয় তা কি কারো পক্ষেই সুখকর কোন ব্যাপার হয় ? এটিতো সাধারণ বিষয়।

যতদূর জানি ভারতে শুধু মসজিদের মাইক নয় হিন্দুদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাইক বা সাউন্ড বক্সের সাউন্ডও সেই নির্দিষ্ট ডেসিবেলের বাইরে বাজানো নিষেধ। তাহলে হঠাৎ করে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে কোথায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলো?

এবার পশ্চিমবঙ্গে কলকাতায় সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত হয়েছে ব্রিগেড ময়দানে। এবং সেখানে অনেক মুসল্লি নির্বিঘ্নে ঈদের নামাজ আদায় করতে পেরেছেন। এর আগে যা হতো রেড রোডে। সেই রেড রোডের ঈদের নামাজও ছিল বিকল্প জায়গা। তো জনগণের চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে নামাজ আদায় করা কতটুকু বাস্তবসম্মত সেটাই একটু ভেবে দেখতে বলি মুসলিম সমাজকে।

একইভাবে পূজা বা অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সড়ক বন্ধ করে, জনগণের অসুবিধা তৈরী করে অনুষ্ঠানের আয়োজন করাটাও কতটুকু বাস্তবসম্মত বা মানবিক বিষয় সেটিও সবাইকে ভেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশেও আমরা প্রতি শুক্রবার ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট-ময়মনসিংহ-রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলা এমনকি উপজেলাতেও জুমার নামাজের সময় মসজিদ সংলগ্ন সড়ক বন্ধ করে নামাজ আদায় করতে দেখি।

সে সড়ক দিয়ে তখন যদি কোন রোগী বহনকারি অ্যাম্বুলেন্স বা গাড়ি যেতে চায় তাওতো বাধাগ্রস্ত হয়। সাধারণ জনগণেরও চলাচলে বাধার সৃষ্টি হয়। তেমনি করে হিন্দুরাও যদি সড়ক অবরোধ করে কোন অনুষ্ঠান করে তাতেও একইভাবে সমস্যার সৃষ্টি হয়।

আবার মিলাদ মাহফিলের নামে আমাদের এই সমাজে যা হয়, কয়েকদিন ধরে উচ্চস্বরে মাইক বাজানো, সড়ক অবরোধ করা- এসবতো আছেই। তো সৃষ্টিকর্তাকে ডাকার জন্য যদি তার সৃষ্ট সেরা জীব আশরাফুল মাকলুকাত মানে “সৃষ্টির সেরা জীব ” এর  জীবনযাত্রায় ব্যাঘাত ঘটানো হয় তাতে কি সৃষ্টিকর্তা বা মহান আল্লাহতালা খুশী হবেন ?

এ ব্যাপারে ইসলামী আলেমদের বক্তব্য জানা খুব প্রয়োজন। অথচ এসব মিলাদ মাহফিল ও জুম্মার নামাজেতো ইসলামী আলেমরাই তাদের জ্ঞানী বয়ান দিয়ে থাকেন।

প্রায় মাসখানেক আগে পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভার নির্বাচনকে ঘিরে দেখলাম এদেশের নাগরিকদের মধ্যে চরম উৎকন্ঠা-উদ্বেগ-কৌতুহল বিরাজ করছিল। কারণ এখানকার মুসলমানদের কাছে ইসলামী-জঙ্গী তোষণকারি মমতা ব্যানার্জী ও তাঁর দল তৃণমূল হচ্ছে অত্যন্ত কাছের।

অপরদিকে বিজেপি হচ্ছে চরম শত্রু। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকরা বিজেপিকেই ভোট দিয়েছে। আর মমতার দল তৃণমূলকে একেবারে পেছনে ফেলে দিয়েছে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে।

বাংলাদেশের কতিপয় রাজনীতিবিদ ও কথিত রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এটিকে সাম্প্রদায়িক শক্তির চরম উত্থান বলে আখ্যায়িত করছেন।

কিন্তু নিজদেশ বাংলাদেশে যে গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের দল-খুনীর দল-নারী ধর্ষণকারী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ইসলামী জোটকে ভোট দিয়ে ৭৭ সীটে জয়ী করেছে।

আর তাদের প্রাপ্ত ভোট হচ্ছে ২ কোটি ৭০ লাখ ভোট যা মোট ভোটের সাড়ে ৩৮ শতাংশ। এই যে মুক্তিযুদ্ধ-স্বাধীনতাবিরোধী জোট এতগুলো ভোট পেলো তাতো এদেশেরই জঙ্গী ইসলামী মনোভাবাপন্ন নাগরিকরা দিয়েছেন।

যদিও অনেকে এই ১২ ফেব্রুয়ারির ইলেকশনকে ‘ইলেকশন নামের সিলেকশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

তো এখানে যে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তির চরম উত্থান হয়েছে তা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা নেই ! এখানে কি চরম সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান হয়নি? নাকি এই জামায়াত ও তাদের সহযোগী দলগুলো চরম অসাম্প্রদায়িক ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নেতৃত্বদানকারি দল ?

অপরদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি কেন জিতলো সেটা নিয়েই নানা ধনের উষ্মা। আরে ভাই, সেখানকার জনগনতো বিজেপিকে গণতান্ত্রিকভাবে বিপুল পরিমাণ ভোটে জয়ী করেছে। সেখানে ইসলামী জঙ্গী জেহাদী মুসলিম ও তৃণমূলের সমর্থক হিন্দুদের ভোটওতো কম পায়নি মমতা ব্যানার্জীর দল।

তো বিজেপির বিজয়ে যদি পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত সাম্প্রদায়িক দেশ হিসেবে পরিচিতি পায় তাহলে বাংলাদেশে ইসলামী জঙ্গী জেহাদীদের বিপুল ভোট পাওয়া কি সাম্প্রদায়িক নয়?

এখানকার লোকজনের বিষয় হলো- ভারতকে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হতে হবে, কিন্তু বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র থাকবে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে গেলে ইসলামী বাংলাদেশ হলেও কোন আপত্তি নেই, কিন্তু হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারত হতে পারবেনা। মানে হিন্দুদেরকে অসাম্প্রদায়িক-ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে।

কিন্তু মুসলমানরা ইসলামী সমাজব্যবস্থা-রাষ্ট্রব্যবস্থা নিয়ে অহংকার করবে। তাতে কোন দোষ নেই। ইসলামী রাষ্ট্র-ইসলামী পৃথিবী হতে পারবে।

কিন্তু কোন হিন্দু আধিক্য সমাজ বা রাষ্ট্র হতে পারবেনা- এটাই আমাদের মুসলিম সম্প্রদায়ের মনমানসিকতা। এ মানসিকতা কথিত প্রগতিশীল মুসলিম নাগরিকদেরও।

যদি তা না হয়ে থাকে তাহলে তো তারা গত চব্বিশের কথিত ছাত্র গণআন্দোলনে এভাবে মার্কিন ডলারের পেছনে ঘুরে এই দেশটিকে শেষ করতেন না। এই জাতিটি যে চোর-বাটপার-লুটপাটকারির-ধর্ষকের জাতি তা যদি কেউ বলে তা কি অত্যুক্তি হবে ?

# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *