বাংলাদেশে কথিত ধর্মীয় অবমাননার আইন শুধু মাত্র হিন্দু-বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীদের জন্য! কোনভাবেই তা ইসলাম ধর্মাবলম্বী বা মুসলিমদের জন্য নয়।
এটিই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য। অবাক হচ্ছেন আপনারা! এতে অবাক হওয়ার কোন কারণ কী আছে আদৌ?
কারণ একটি উদাহরণ কেউ দেখাতে পারবেন যে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া, তাদেরকে খুন করা, অত্যাচার-নিপীড়ন-ভয় ভীতি দেখিয়ে তাদেরকে ঘরবাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য কোন মুসলিমের শাস্তি হয়েছে? না হয়নি। তাহলে আমরা কি বুঝবো?
কেউ কেউ হয়তো বলবেন, কেন সংবিধানতো সবার জন্য সমান, রাষ্ট্রে সবার সমান অধিকার। সেখানে আবার হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ভাগ করছেন কেন?
ওই যে সংবিধানের কথা বলছেন তাতো শুধু লিখিত একটি কিতাব বা বই মাত্র। যাতে শুধু লেখা থাকে, তার প্রয়োগ অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য প্রয়োগ হতে দেখেছেন কেউ? তাহলে কেন ওসব রংমাখানো-ছেলেভুলানো কথা বলছেন আপনারা?
আমাদের দেশের রাষ্ট্রপ্রধান-সরকারপ্রধান-মন্ত্রী-এমপিরাও বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বেশ জোর গলায় বলে থাকেন –আমরা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। এখানে সবার সমান অধিকার। এখানে আবার সংখ্যালঘু-সংখ্যাগুরু দিয়ে বিভেদ সৃষ্টি কেন? কিন্তু সেসবতো কথার কথা?
কিন্তু প্রকৃত সত্য ও নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে – বাংলাদেশ নামক দেশটিতে বসবাস করতে গেলে ইসলাম ধর্মাবলম্বী ছাড়া অন্য ধর্মাবলম্বীদেরকে সংখ্যাগুরু মুসলিমদের আজ্ঞাবহ হয়েই থাকতে হয়েছে । তাদের করুণার পাত্র হয়েই থাকতে হচ্ছে।
কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সনাতনদের এক মন্দির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন- “আমরা একটি সহনশীল, সংবেদনশীল, স্থিতিশীল ও মানবিক রাষ্ট্র গড়তে চাই। আমাদের সংবিধানে সবার অধিকার সমান তাই সংখ্যালঘু সহ সকল শব্দ আমি ব্যবহার করতে চাই না”।

তিনি আরও বলেন, “রংধনু জাতিগঠন আমাদের দর্শন। সকলে আমরা বাংলাদেশি, ভিন্নতা ছাড়া কোনো দেশ হতে পারে। ঐক্য থাকতে হবে, তবে ভিন্নতা থাকবে”।

আসলেই কি তাই ? তার কোন প্রমাণ তো আমরা দেখতে পাইনি বা পাচ্ছিনা। মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া বাংলাদেশের যে সংবিধান তৈরি হয়েছিল তাতে জাতীয় চার মূলনীতির একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু তা কি আর আছে আমাদের সংবিধানে ? নেই। তাকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হয়েছে অনেক আগেই। বরং সংবিধানকে পদদলিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির ‘ মুসলমানি’ বা ‘খতনা’ করানো হয়েছে। রাষ্ট্রধর্ম হয়ে গেলো- ইসলাম। তাহলে যে রাষ্ট্রটিই ইসলামী রাষ্ট্র সেখানে অন্য সম্প্রদায় বা ধর্মাবলম্বীদের জায়গা কোথায়?
তো এক ইসলামী রাষ্ট্রে তো ইসলামী শাষনই চলবে, এটাই স্বাভাবিক। যদিও সংবিধানে বা সরকারিভাবে এখনো দেশটিকে বলা হয় পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ বা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ। এটি আসলে গালভরা একটি বুলি মাত্র।
বাংলাদেশের ছোট বড় সব রাজনৈতিক দলগুলোই এই রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে মেনে নিয়েছেন সাদরে। নাহলে তারা তা বাতিল করতেন অনেক আগেই। কেউই তা করেনি। এমনকি এমন কোন অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেছে এমনটিও কেউ শোনেনি।
এখন যে ক্ষমতাসীন বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল রয়েছে তারাতো করবেই না। কারণ তাদের দলের স্রষ্টা জেনারেল জিয়াউর রহমানইতো সংবিধানের কাটাছেড়া শুরু করলেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে।
তিনি সংবিধানে ‘ বিছমিল্লাহির রাহমানির রহিম’ বসালেন। আর জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর আরেক সামরিক ক্যু এর খলনায়ক জেনারেল এরশাদ ১৯৮৮ সালে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম সাংবিধানিকভাবে ঘোষনা দিলেন অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে।
এরপরে তো মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারি আওয়ামীলীগও জনগণের নিরঙ্কুশ ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠন করেছিল।
তাদের দুই তৃতীয়াংশের বেশি সংসদ সদস্য ছিল। কিন্তু যে দলটি নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করে এসেছে এতদিন সে দলটিও তো রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে বাদ দেয়নি সংবিধান থেকে। এর কারণ জানতে চেয়ে আওয়ামীলীগের বেশ কিছু নেতার সাথে আলাপ হয়েছে আমার নানা সময়ে।
তাদের বক্তব্য ছিল এমন- “ আরে ভাই, সংখ্যাগরিষ্ট মানুষ হচ্ছে ইসলাম ধর্মাবলম্বী, সেখানে এই ইসলামকে বাদ দেয়া যায় , বলেন?! ভোটেরওতো একটা ব্যাপার-স্যাপার আছে, সেটাতো একটু বুঝতে হবে নাকি !”
এই যখন অবস্থা তখন আর আশা কোথায় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য? সে আশায় গুড়েবালি।
এতসব কথা বলছিলাম এ কারণে যে- এই বাংলাদেশ নামক দেশটিতে কখনো ধর্মীয় অবমাননার বিষয়ে একমাত্র ইসলাম ধর্মাবলম্বী বা মুসলিমদের জন্যই থাকবে। এর মানে হলো- অবমাননা শুধু ইসলাম বা মুসলমানের হয়। অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোন ধর্মীয় অবমাননা হয় না।
কারণ বাংলাদেশেরই ইতিহাসে ধর্মীয় অবমাননার বিষয়ে যত খুন-হামলা-অগ্নিসংযোগ-লুটপাট , চাকরিচ্যুতি, গলায় জুতার মালা পড়িয়ে চরমভাবে অপমান করে ঘোরানো হয়েছে প্রকাশ্যে তার সবই সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের। অল্প কয়েকটি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের। যেমন কক্সবাজার জেলার রামুর ঘটনা।
আসলে এই বাংলাদেশের মানুষের মননে এখনো সেই ইষ্ট পাকিস্তান বা মুসলিম রাষ্ট্রের আহাজারি রয়ে গেছে মূলত সেই ‘ইষ্ট পাকিস্তান’ রয়ে গেছে ভেতরে ভেতরে। যার ফলে আমরা দেখেছি গত ২০২৪ এর আগষ্টে জঙ্গী-সামরিক ক্যু এর সময় ও এর পরে বাংলাদেশে পাকিস্তানী পতাকা উড়তে এবং পাক প্রেমে ভেসে গেছে দেশ।
এখন বিএনপি আমলের শিক্ষামন্ত্রীতো বললেন- নলেজ আহরণের জন্য পাকিস্তান অন্যতম শ্রেষ্ট দেশ। মেয়ের পাকি স্কলারশীপ প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ এক মহিলাতো প্রকাশ্যে তার পাকি প্রেম দেখাতে ভুলেননি। মুক্তিযুদ্ধ তার কাছে ‘কিছু একটা’ ব্যাপার মাত্র।
তার কাছে মুক্তিযুদ্ধের বিষয়টি ভাইয়ে ভাইয়ে বিরোধ ছাড়া আর কিছুই নয়। তো এই যখন এখানকার মানুষের মানসিক অবস্থা তখন আর কিই বা বলার আছে!
সম্প্রতি সাতক্ষীরায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে জেলার বল্লী মুজিবুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকারকে মারধরের পর পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে উত্তেজিত তৌহিদী জনতা। পরে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেয়।

মঙ্গলবার (১৯ মে) বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশ্ন হলো- ওই শিক্ষক গৌরাঙ্গ কী বলে ইসলাম অবমাননা করেছেন? তার কোন প্রমাণ কি আছে কারো কাছে? না তা কিন্তু নেই। তবে কিছু নাটক সাজানো হয়েছে এ নিয়ে।
কয়েকজন ছাত্রকে নানাভাবে শিখিয়ে দেয়া হয়েছে গৌরাঙ্গ সরকারের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কটাক্ষ করে মন্তব্য করেছেন এমনটি বলার জন্য।
কিন্তু স্রেফ অভিযোগের ভিত্তিতে একজন শিক্ষককে স্কুল থেকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারে না। যে সব ছেলেগুলির কথায় অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদেরকে শিবিরের মনে হলো।
প্রাইমারি পড়ে আবার মুখে জামাতি দাড়ি। মূলত পুরো সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতে ইসলামীর দখলে। সুতরাং সেখানকার হিন্দুরা যে কেমন আছে তাতো বোঝাই যাচ্ছে।
আদালত চত্বরে অভিযুক্ত শিক্ষক গৌরাঙ্গ সরকার সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, “আমি পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের কোরবানি বন্ধের সমালোচনা করেছিলাম। কিন্তু আমার বক্তব্য ঘুরিয়ে ছড়ানো হয়েছে। শিক্ষকদের দলাদলির বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে আমাকে।”
মূলত ইসলাম ধর্মের নামে মানুষদেরকে বিপদে ফেলতে ত্বকিয়াবাজির আশ্রয় নেওয়া হয়। সারাবিশ্বের মানুষদের মতোই বাংলাদেশের নন-মুসলিমদের ইসলামভীতি আছে, থাকাটা বাস্তবসম্মত। ইসলামের নামে সারা বিশ্বে যা হচ্ছে, তাতে ইসলাম নিয়ে ভীতি না থাকাটা অবাস্তব।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের সনাতনী কেউ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইসলাম নিয়ে কথা বলবে না। ফলে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ শতভাগ ত্বকিয়া।
ইসলাম ধর্ম অবমাননার উসিলায় ভিন্ন ধর্মীদের মান-সম্মান, সম্পদ, বাড়িঘরে আগুন দেওয়া সহ সকল ধরনের ক্রিমিনাল কর্মকাণ্ড করা হয়।
বাংলাদেশের কারাগারগুলিতে ধর্ম অবমাননার মিথ্যে মামলার ৯৫% হিন্দু ধর্মাবলম্বী। অথচ বাংলাদেশে থেকেই হিন্দু দেবদেবীদের নিয়ে অসভ্যরা কী পরিমাণ ধর্ম অবমাননা করছে।
এখানে রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ হয় ধর্ম দেখে। না হলে মিজান, আহম্মদএল্লা, গন্ডার রাজ্জাকের মত কালপ্রিটগুলি জেলে থাকত। কোন আলেম পাওয়া যেতো না ওয়াজের নামে জংগলী বয়ান দেওয়ার।
বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ২৯৫ থেকে ২৯৮ ধারায় ধর্ম অবমাননা শাস্তিযোগ্য অপরাধ, যেখানে ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান আছে।
পরবর্তীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও একই অপরাধে পাঁচ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের ধারা যুক্ত হয়েছিল।
১৯৯২ সালে জামায়াতে ইসলামী নেতা মতিউর রহমান নিজামী ( পরে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তার মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়) সংসদে একটি “ব্লা’স’ফেমি বিল” প্রস্তাব করেছিলেন।
সেখানে কুরআন অবমাননার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং নবী করিম সাঃ-এর প্রতি অবমাননার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অন্তরায় আখ্যা দিয়ে বিলটি আর পাশ করা হয়নি। তৎকালীন সরকার (বিএনপি নেতৃত্বাধীন) প্রস্তাবটি আলোচনার জন্য গ্রহণ করেনি।
বাংলাদেশে সুনির্দিষ্ট কোনো “ব্লাসফেমি” বা ধর্ম অবমাননা আইন নেই। তবে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ২৯৫-২৯৮ ধারা এবং সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্ট (পূর্বে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন) অনুযায়ী যেকোনো ধর্মের অবমাননা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই আইন সকল ধর্মের অনুসারী নির্বিশেষে সকলের জন্যই প্রযোজ্য।
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসরত সকল নাগরিক ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ যেকোনো ধর্মের ব্যক্তি যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অন্য কোনো ধর্মের ঈশ্বর, নবী, অবতার, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বা উপাসনালয় নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য বা কাজ করেন, তবে তিনি আইনের আওতায় আসবেন।
কিন্তু ওই যে কথায় বলেনা-কাজীর গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই। মানে তা শুধু আইন আছে। বাস্তবে নেই। কারণ রাষ্ট্রইতো ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য। অন্য ধর্মাবলম্বীদের জন্য ধর্মের অবমাননা আইন আসলে প্রযোজ্য নয়।
ছোট্ট একটি পরিসংখ্যান দেই গতবছরের। ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (এইচআরসিবিএম) নামে একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে- ২০২৫ এর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ঘিরে সংঘটিত ৭৩টি ঘটনার শিকার হয়েছে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষেরা।
রাজধানী ঢাকায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনে (ক্র্যাব) এক সংবাদ সম্মেলনে এইচআরসিবিএম এই তথ্য তুলে ধরে।
ধর্ম অবমাননার নামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভুক্তভোগী করার ঘটনাকে ‘গভীর সংকট’ হিসেবে উল্লেখ করেছে এইচআরসিবিএম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে তারা ৭৩টি ধর্ম অবমাননার অভিযোগভিত্তিক ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে মামলা হয়েছে ৪০টি ঘটনায়। পাঁচটি ঘটনায় মামলা হয়নি।
ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাঁচজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বাকি ২৩টি ঘটনার তথ্য বিস্তারিতভাবে সংগ্রহের কাজ করে যাচ্ছেন তাঁরা।
প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি ধর্ম অবমাননার ঘটনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভুক্তভোগী হওয়ার বিস্তারিত উল্লেখ করেছে এইচআরসিবিএম।
এর মধ্যে একটি ঘটনা ব্যাখ্যা করে এইচআরসিবিএম বলেছে, গত ২৩ অক্টোবর খুলনার দাকোপ থানার পূর্বায়ন মণ্ডলকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
কিন্তু এইচআরসিবিএমের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে, প্রকৃতপক্ষে সনাতন ধর্মের ‘দেবী কালী’কে নিয়ে ফেসবুকে কটূক্তি করেছিলেন আবদুর রহমান নামের এক ব্যক্তি।
আবদুর রহমানের সেই মন্তব্যের জবাব দেন পূর্বায়ন মণ্ডল। পূর্বায়ন এখনো কারাগারে থাকলেও আবদুর রহমান ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ধর্ম অবমাননার অপব্যবহার বন্ধের জন্য আইন সংস্কারের দাবি জানিয়েছে এইচআরসিবিএম। আইনজীবী লাকী বাছাড় বলেন, ধর্ম অবমাননার নামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভুক্তভোগী করার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
তাঁরা শুধু ভুক্তভোগীদের সরাসরি অভিযোগ এবং তাঁদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যে তথ্য পেয়েছেন, সেসবই উল্লেখ করেছেন প্রতিবেদনে।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলার ভালুকায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী একজন পোশাক শ্রমিককে ধর্ম নিয়ে কটুক্তির অভিযোগ তুলে দলবদ্ধ হয়ে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে।
কিন্তু এ ঘটনায় ‘ধর্ম অবমাননার’ কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে তখন জানিয়েছিল র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের অফিসাররা।
কিন্তু এই ইসলামী বাংলাদেশে সেই চাঞ্চল্যকর দীপু হত্যা মামলার আসামী উচ্চতর আদালত থেকে জামিন পেয়েছে। এ হত্যার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা আদালতে বিচারকের কাছে স্বীকার করার পরও খুনের মামলার আসামী মো. মাসুম উচ্চ আদালত থেকে এক বছরের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছে। এটাই বাংলাদেশ থুড়ি ‘ইষ্ট পাকিস্তান’।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ- গত ১৩ এপ্রিল) ময়মনসিংহের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে জামিননামা বের হয়। ৬ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের একটি দ্বৈত বেঞ্চ এ জামিন আদেশ প্রদান করেন।
চাঞ্চল্যকর এ হত্যা মামলার আসামি দ্রুত জামিন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদালত সূত্রে জানা যায়, হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ এবং বিচারপতি সৈয়দ হাসান জোবায়ের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে এ জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৮ ধারায় আবেদনের প্রেক্ষিতে মাসুমকে এক বছরের জন্য জামিন মঞ্জুর করেন। মামলার নথিপত্র অনুযায়ী, মাসুম খালাসী মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার বাহাদুরপুর গ্রামের মো. চাঁন মিয়া খালাসীর ছেলে।
হাইকোর্টের আদেশের প্রেক্ষিতে ১৩ এপ্রিল ময়মনসিংহের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দুই হাজার টাকার মুচলেকায় জামিননামা গ্রহণ করে তার মুক্তির (ছাড়পত্র) আদেশ দেন।
এর আগে, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর ভালুকা মডেল থানায় দায়েরকৃত দিপু দাস হত্যা মামলায় প্রেক্ষিতে তিনি কারাগারে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৭/১৪৯/৩০২/২০১/২৯৭/৩৪ ধারায় অভিযোগ রয়েছে। এসব ধারার মধ্যে হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের মতো অপরাধের ধারা অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমানে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডটি তদন্ত করছে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, মাসুমসহ মোট ২৬ আসামিকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
মাসুম নিজেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছিলেন।
অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই মামলায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়া একজন আসামি এত দ্রুত জামিন পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তাদের মতে, ‘পুলিশের মাসের পর মাস অভিযানের পর আসামিদের গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন যদি অতি সহজে আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে আসামিরা বেরিয়ে যায়, তবে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে এবং অন্যান্য আসামিরাও একই রেফারেন্স ব্যবহার করে জামিন পাওয়ার সুযোগ খুঁজবে।’
নিহত দিপু দাসের ভাই অপু রবি দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ এ আসামি ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে খুনের কথা স্বীকার করেছে।
কিন্তু মাত্র কয়েকদিন যেতে না যেতেই যদি খুনিরা এভাবে জামিন পেয়ে বীরদর্পে বের হয়ে আসে, তবে আমরা সাধারণ মানুষ কার কাছে বিচার চাইব?
আসলে এসবের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে অন্য ধর্মাবলম্বীমুক্ত একটি পুরোপুরি ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজ গড়তে রাজনৈতিক দল-প্রশাসন-বিচারাঙ্গনও ঐক্যবদ্ধ ও মনে হচ্ছে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ।
## রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।
