বাংলাদেশে ধর্ষণ এবং এরপর সে অপরাধ গোপনে নৃশংসভাবে হত্যা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি খুব দ্রুতই একটি ভয়ংকর সামাজিক মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। তিন-চার বছরের শিশু থেকে বৃদ্ধা—কেউই নিরাপদ নয়।

প্রতিদিন কোনো না কোনো নারী বা শিশুর আর্তনাদ ভেসে আসে,আবার কখনো সেই আর্তনাদ ভেসে আসার মত পরিস্থিতিও নিশ্চিহ্ন করে দেয় এসব মানসিক বিকৃত অপরাধীরা।

কিন্তু আমাদের এই রাষ্ট্রের, এই সমাজের প্রতিক্রিয়া যেন সেই একই পুরোনো চিত্রনাট্য—শোক, বিবৃতি, আশ্বাস, তারপর নীরবতা।

সামাজিক ও মানবাধিকার-নারী ও শিশু অধিকার সংগঠনগুলোও বিবৃতি, মানব বন্ধন, বড়জোর বিক্ষোভ মিছিল করেই যেন মহান দায়িত্ব পালন করছে।

রাজধানী ঢাকায় সাত বছরের শিশু রামিসার মতো কত নিষ্পাপ প্রাণ এই বর্বরতার শিকার হয়েছে, তার সঠিক হিসাব হয়তো রাষ্ট্রের কাছেও নেই।

কিন্তু মানুষ জানে—বিচারহীনতার দীর্ঘ ইতিহাসই এসব ধর্ষকদের সাহস জুগিয়েছে ; তাদের বিকৃত মানসিকতা আরো পৈশাচিক কায়দায় থাবা দিচ্ছে আমাদেরকে।

এ যে পুরো সমাজের জন্য কতটা কলঙ্কজনক তা ভেবে দেখারও বোধ হয় ফুসরত নেই আমাদের। কতটা নিস্পৃহ আর স্বার্থপর হলে এমনটা ঘটছে সে বিবেকবোধও জাগেনি আমাদের ।

বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, শাসকের মুখ বদলেছে, কিন্তু বদলায়নি ধর্ষণের মত ঘৃণ্য অপরাধের চরিত্র। বদলায়নি বিচারহীনতা। অনেক ক্ষেত্রেতো মামলাও হয়না সমাজে মান সম্মান যাওয়ার ভয়ে।

যাওবা প্রকাশ পায় বা মামলা হয় তার প্রতিটি অসমাপ্ত মামলা, প্রতিটি বিলম্বিত বিচার, প্রভাবশালী (মানে যারা টাকা ও ক্ষমতার বলয়ের লোক বা সরকারি ক্ষমতা নিয়ন্ত্রন করার মতো শক্তি রাখে) , প্রতিটি রাজনৈতিক প্রভাব অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করেছে। যেন এই দেশে নারীর জীবন ও শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, ধর্ষণের ঘটনার পর সমাজের একাংশ এখনো ভুক্তভোগীকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। অপরাধীর বদলে প্রশ্ন তোলা হয় নারীর পোশাক, চলাফেরা কিংবা পরিবার
নিয়ে।

এই মানসিকতা শুধু অপরাধকেই প্রশ্রয় দেয় না, বরং একটি অসুস্থ-বেপরোয়া সমাজব্যবস্থাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করছে।

আর আইনের ফাঁক-ফোকর এমন – ধর্ষিতাতেই প্রমাণ করতে হবে আদালতে যে সে ধর্ষিত হয়েছে। কি জঘন্য পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এই বিচারকাজ চলে তা ভেবেছেন কেউ? এই ফাঁকে সেই নরপশু দাঁত কেলিয়ে হাসে।

শিশু-নারী ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, কঠোর ও দ্রুত বিচার ছাড়া এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। কারণ অপরাধী যখন দেখে বছরের পর বছর পার হয়ে যায়, তবু বিচার শেষ হয় না, তখন তার ভেতর ভয় নয়—জন্ম নেয় আরও দম্ভ।

কারণ প্রমাণ করতে হবে ধর্ষিতাকে যে সে সত্যিই ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ভরা আদালতে আসামী পক্ষের আইনজীবী যখন জেরা করেন ক্ষতিগ্রস্ত শিশু বা নারীকে তখন তাদের ভাষা এত অশ্রাব্য হয় যে যে কোন সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে। আর ক্ষতিগ্রস্ত শিশু-মহিলা যে চরম মানসিক অত্যাচারের শিকার হয় তা কি ভেবে দেখেছেন কেউ?

আদালতে বিচার চলাকালে আরো একবার নয় আমার কাছে মনে হয় বার বারই ধর্ষণের শিকার হচ্ছে বিচার চাইতে আসা আমার কন্যা-বোন বা মা।

ধর্ষণ শুধু একটি শিশু-কিশোরী-তরুণী বা নারীর ওপর আক্রমণ নয়; এটি পুরো সমাজের মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত। আমি বলি এটি মানবতাকেই ধর্ষণ করা হচ্ছে। একটি শিশু যখন নিরাপত্তাহীনতায় বড় হয়, তখন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। রাষ্ট্রও হয়ে পড়ে নিরাপত্তাহীন।

যে সমাজের উচিত রাষ্ট্রকে বাধ্য করা এসব অপরাধকে বন্ধ করার জন্য সেই সমাজের বিবেকবোধ সম্পন্ন মানুষগুলো বোধ হয় জেগে জেগে ঘুমোচ্ছে।

এক্ষেত্রে শিশু রামিসা একটি প্রতীক মাত্র। এমন অনেক রামিসার করুণ কাহিনী রয়েছে আমাদের এই পচাগলা সমাজে। রাষ্ট্রে। যেসব পাশবিক ধর্ষণের-যৌন নিপীড়নের অপরাধীদের কোন বিচার হয়নি।

তাই রামিসা হত্যার ঘটনায় দেশের বিচার ব্যবস্থার ওপর গভীর হতাশা ও অনাস্থা প্রকাশ করতে দেখা গেছে শিশুটির বাবা আবদুল হান্নান মোল্লাকে।

সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের মাধ্যমে এই সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে মেয়ের হত্যার বিচারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বিচার চাই না, কারণ আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আমার মেয়েও আর ফিরে আসবে না। আপনাদের বিচারের কোনো উদাহরণ নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে, আবার কোনো ঘটনা ঘটবে। এরপর এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে।’

একই আক্ষেপ আয়েশা খাতুনের। তিনি ২০১৫ সালের ৫ মার্চ রাতে মাগুরায় ধর্ষণ-হত্যার শিকার ৮ বছরের আছিয়ার মা। মেয়ে হত্যা মামলার রায় ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও তা কার্যকর না হওয়ায় আয়েশা খাতুনের এই আক্ষেপ।

আছিয়ার মৃত্যুর পর উত্তাল হয়ে ওঠে দেশ। তখন তোপের মুখে নারী নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন এনে দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তখনকার আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এই আসিফ নজরুল আসলে একটি চরম টাউট ।

বিচারিক আদালতে দ্রুতগতিতে প্রধান আসামি হিল্টু শেখকে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। তাও প্রায় বছরখানেক হয়ে গেছে। কিন্তু তা হাইকোর্টে আপিলের ঘেরাপাকে বন্দী হয়ে আছে। ঘোরপ্যাঁচ খাচ্ছে বিচারের বাণী। থমকে আছে গতি।

সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত খবর অনুযায়ী আছিয়ার মা বলেন, ‘মেয়েডা মারা গেছে এক বছরের বেশি হইছে। বিচারে আসামির ফাঁসির রায় হইছে তাও এক বছর হলো। এখনো অপেক্ষায় আছি, কবে আমার আছিয়ার খুনিদের ফাঁসি হবে। এদিকে আমার স্বামী মানসিক ভারসাম্যহীন। তারে সামলাব, নাকি রায় কার্যকর করার জন্য আদালতের বারান্দায় ঘুরবো’?

জানা যায়, হিল্টু শেখের পক্ষে উচ্চ আদালতে আপিল করা হয়েছে। আপিলের কার্যক্রম এখন মূলত ঢাকায় চলছে। সর্বশেষ শুনানি হয়েছে গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর।

দেশে সম্প্রতি শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আসক বলছে, পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারের হত্যাকাণ্ডসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাদের শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতাকে আবারো সামনে এনেছে। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে ওই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

আসক মনে করে, এসব ঘটনা কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং সামাজিক জবাবদিহির সংকটের প্রতিফলন।

আসকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত কমপক্ষে ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ধর্ষণের চেষ্টার শিকার হয়েছে কমপক্ষে ৪৬ শিশু। এছাড়া ধর্ষণ পরবর্তী এবং ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে কমপক্ষে ১৭ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮ ও ৩২ অনুচ্ছেদে শিশুদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় শিশু নীতি ২০১১ শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ, সুরক্ষা ও বৈষম্যহীন বিকাশকে রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার হিসেবে নির্ধারণ করেছে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র হিসেবে শিশুদের প্রতি সব ধরনের সহিংসতা, যৌন নির্যাতন ও শোষণ প্রতিরোধে বাধ্যবাধকতার মধ্যে রয়েছে।

বাস্তবতা হলো, বিদ্যমান আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত শিশুদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো একদিকে যেমন গভীর শোক ও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, অন্যদিকে ন্যায়বিচার পাওয়ার আস্থাও অনেক সময় প্রশ্ন তুলতে পারে।

আসক মনে করে, শিশু নির্যাতন ও হত্যার প্রতিটি ঘটনায় বিচার প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ স্বাধীন, স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি, যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ ন্যায়বিচারকে বাধাগ্রস্ত করতে না পারে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসস্থান এবং ডিজিটাল পরিসরে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও সুরক্ষাব্যবস্থা কার্যকরভাবে জোরদার করতে হবে।

পাশাপাশি বিদ্যমান শিশু সুরক্ষা আইনকে কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

শিশুদের সুরক্ষা কোনো নীতিগত অঙ্গীকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, মানবাধিকারের মৌলিক শর্ত এবং সভ্য সমাজের ন্যূনতম মানদণ্ড। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা শুধু আইনগত ব্যর্থতাই নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ও মানবিক অবস্থানকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

এই যে আইন ও শালিস কেন্দ্র বলছে-‘ সভ্য সমাজের ন্যূনতম মানদণ্ড’। প্রশ্নটি সেখানেই যে আমরা কি কোনভাবেই সভ্য সমাজের অংশ হতে পেরেছি ? না সেই চেষ্টা আছে ?

এদিকে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- দেশে গত ১৬ মাসে অন্তত এক হাজার ৮৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ৪৮৩ জন শিশু নিহত ও এক হাজার ৪০৭ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এছাড়া এসব শিশুর মধ্যে ৫৮০ জন ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের ধারাবাহিক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা প্রকাশ করছে সংস্থাটি। পাশাপাশি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এসব নৃশংস ঘটনায় জড়িতের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে দাবি জানানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ৭ বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।

শরীর ছিল প্রতিবেশীর ঘরে খাটের তলায় এবং মাথাটা ছিল বাথরুমে। এমনকি অভিযুক্ত বিকৃত যৌনাচারে আসক্ত স্বামীকে বাঁচাতে সহযোগিতা করেছিলেন স্ত্রী।

গত ১৬ মে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার বালুচর ইউনিয়নের চান্দের চর গ্রামের মদিনাপাড়ায় আছিয়া আক্তার নামে ১০ বছরে বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

নিহতের গলায় শ্বাসরোধের চিহ্ন ও ধর্ষণের প্রাথমিক আলামতের ভিত্তিতে বাড়িতে অবস্থানরত ও অভিযুক্ত রাজা মিয়াকে (৪৫)-কে আটক করেছে পুলিশ।

গত ১৪ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল উপজেলায় ধর্ষণের পর লামিয়া আক্তার নামে এক চার বছরের শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার একদিন পর এলাকার একটি ভুট্টাক্ষেত থেকে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

গত ৬ মে সকালে সিলেটের সদর উপজেলার জালালাবাদে ৪ বছরের শিশু ফাহিমা আক্তারকে ধর্ষণ চেষ্টার পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। এমনকি খোটের নিচে লাশ লুকিয়ে রেখে স্বজনদের সাথে খুঁজতে যান আসামী জাকির হোসেন।

এছাড়া প্রতিনিয়ত সারাদেশের বিভিন্ন স্থানে এমন ধরণের অসংখ্য শিশু হত্যা, ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত সারাদেশে অন্তত ১৮৯০ জন শিশু ও কিশোরী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এর মধ্যে ৪৮৩ জন শিশু নিহত ও ১৪০৭ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এছাড়া এসব শিশু ও কিশোরীদের মধ্যে ৫৮০ জন ধর্ষণ এবং ৩১৮ জন যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, শিশু হত্যা, ধর্ষণ ও নির্যাতনের মতো সহিংসতা প্রতিরোধ করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব।

কিন্তু একের পর এক শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করে যে শিশু সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। এছাড়া বিচাহীনতার সংস্কৃতি, দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ও দুর্বল আইন প্রয়োগ শিশু নির্যাতনের মতো পাশবিক সহিংসতা বৃদ্ধি ও আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র প্রকাশ করছে। নিষ্পাপ শিশুদের ওপর এমন পাশবিক সহিংসতা শুধু মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের বহিঃপ্রকাশ।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, শিশু-নারী অধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নোনা পরিসংখ্যান দিচ্ছে এসব অপরাধের। দাবিও জানাচ্ছে নারী-শিশুদের নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু সেক্ষেত্রেই আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েই চরমভাবে ব্যর্থ।

আসলে ব্যর্থ বলবো নাকি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন বলবো সেটা বুঝতে পারছিনা। কারন একটি কথা বলতে চাই- প্রশাসন, মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিগ্রস্থদের বাসায় গিয়ে সান্ত্বনা দিলেই হলোনা। আইন-প্রশাসন ও বিচারাঙ্গনকে যদি সঠিকভাবে সচল করা না যায় তাহলে এর সবকিছুই হবে লোকদেখানো।

পরিশেষে বলি- রাষ্ট্রকে মনে রাখতে হবে, একটি শিশুর ছিন্নভিন্ন শৈশব শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়; এটি পুরো জাতির ব্যর্থতা। আর যে রাষ্ট্র তার নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না, ইতিহাস একদিন সেই রাষ্ট্রকেও কঠোরভাবে প্রশ্ন করবে। অবশ্য এমনিতেই রাষ্ট্রটি ব্যর্থ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

সবকিছু দেখে মনে হচ্ছে- এই সমাজটিই ধর্ষকদের সমাজ। রাষ্ট্রটিও তাদের। এ থেকে মুক্তি পেতে চাই দ্রুত সঠিক বিচার। কঠোর শাস্তি। আর সেইসাথে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যকে সুস্থ রাখা। কোন মানবিক জাগরন ছাড়া যা কোনভাবেই সম্ভব নয়।

# ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *