প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ‘মাদকবিরোধী অভিযান’ নিয়ে বিতর্কের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফার ঘোষণা দিয়েছেন ইশরাক হোসেন।

তবে এক্ষেত্রেও তিনি সংবাদমাধ্যমকে দোষ দিতে দেরি করেননি। তার মূল অভিযোগের তীর কিন্তু মিডিয়া ও সাংবাদিকেদের দিকে। তবে পদত্যাগের ঘোষণা দিতে গিয়ে বলেছেন, তার দল বিএনপি যাতে বিব্রত না হয়, সেজন্যই তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সব দোষ নন্দঘোষ ! মানে ওই মিডিয়ার।

তারমানে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মিডিয়াতে যদি তার অস্ত্র উঁচানো ছবিটি প্রকাশ না হতো তাহলে তার কিচ্ছুটি .. ছেঁড়া যেতোনা !

কিন্তু তরুণ প্রতিমন্ত্রী ড্যাশিং এই নেতার কি আগে খেয়াল ছিলনা যে, এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে হামলা করতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই তিনি সমালোচনার মুখে পড়বেন? নাকি তিনি তার পিতা বীর মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক ঐতিহ্য -সুনামটি ভুলে গেছেন।

আসলে ক্ষমতার দাপট এমনই এক জিনিস যে, তাতে অনেকেরই অনেক কিছু চিন্তাভাবনাকে কেড়ে নেয় বোধ হয়।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুরে কয়েকশ নেতাকর্মীকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এই ঘোষণা দেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের শেষ মেয়র সাদেক হোসেন খোকার বড় ছেলে ইশরাক।

তিনি বলেন, তিনি একজন জনপ্রতিনিধি হিসেবে মাদকবিরোধী অভিযান সমন্বয় করতে গিয়েছিলেন, আর তার হাতে লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র ছিল নিজের নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু সেই ছবি দিয়ে মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো ‘নানা ধরনের ন্যারেটিভ’ তৈরি করে ‘বিভিন্ন ধরনের খবর’ প্রকাশ করতে শুরু করে। “গণমাধ্যমের ভূমিকায় আমি হতাশ হয়েছি, কেন আমাকে এভাবে টার্গেট করা হল,” বলেন পদত্যাগী প্রতিমন্ত্রী।

এই ইশরাক হোসেনের বিষয়টি নিয়ে আগেই লিখবো ভেবেছিলাম, কিন্তু তাঁর পদত্যাগের অপেক্ষা করছিলাম। ১৯ অক্টোবর বেলা দুইটায় তিনি তাঁর পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন সাংবাদিকদের প্রতি তীব্র অভিযোগ নিয়ে। সব নষ্টের গোড়া সাংবাদিক-মিডিয়া !?

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনীতিতে বিতর্ক এবং বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) কতিপয় নেতার অবিবেচনাপ্রসূত এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড দলটিকে এক চরম অস্বস্তিকর ও সমালোচনার মুখে দাঁড় করিয়েছে।

বিশেষ করে, বিএনপির সাবেক নেতা ও অবিভক্ত ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার পুত্র ইশরাক হোসেনের কর্মকাণ্ড বারবার সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে। অতি সাম্প্রতিক সময়ে এবং বিগত বছরগুলোতে তার নেওয়া কিছু পদক্ষেপ কেবল দলকেই বিব্রত করেনি, বরং দেশের রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও আইনগত এক্তিয়ার নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝিতে ইশরাক হোসেনকে ঘিরে এক নতুন রাজনৈতিক নাটকের জন্ম হয়েছে।

রাজধানীর গেণ্ডারিয়া এলাকায় “মাদকবিরোধী অভিযান” চালাতে গিয়ে তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে লোকজনকে তাড়া করেন, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার ঝড় ওঠে।

একজন প্রতিমন্ত্রীর (মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়) এই রূপ আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন করা দেশের প্রচলিত আগ্নেয়াস্ত্র নীতিমালার পরিপন্থী। আইনজ্ঞদের মতে, আত্মরক্ষার স্বার্থে লাইসেন্সকৃত অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও এভাবে ভীতি প্রদর্শনের কোনো আইনি বৈধতা নেই।

এই ঘটনার জেরে বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ক্ষুব্ধ হয়ে ইশরাক হোসেনকে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। যদিও প্রথমদিকে ইশরাকের পক্ষ থেকে এটিকে “গুজব” বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং তাঁর প্রেস অফিস থেকে গণমাধ্যমে প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে ১৯ অক্টোবর সকালে ইশরাক নিজেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুপুরের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেন।

তিনি জানান যে, মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, বরং একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করে যাবেন।

সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার্থে ইশরাককে যেভাবে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে, তা স্পষ্ট করে যে দল তার এই সাম্প্রতিক কাজে চরম অসন্তুষ্ট ছিল।

ইশরাক হোসেনের কারণে বিএনপি এই প্রথম বড় কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে তা নয়। এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির নয়াপল্টন কার্যালয়ে এক নজিরবিহীন ও হাস্যকর নাটকের অবতারণা হয়েছিল।

সেদিন ইশরাক হোসেন এবং সাবেক সেনা কর্মকর্তা চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দীর উপস্থিতিতে মিয়া জাহিদুল ইসলাম আরেফী নামের এক ব্যক্তিকে “যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উপদেষ্টা” হিসেবে গণমাধ্যমের সামনে হাজির করা হয়।

সেখানে বসে আরেফী দাবি করেন যে তিনি জো বাইডেনের সাথে দিনে ১০-১৫ বার মেসেজ আদান-প্রদান করেন এবং বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের জন্য মার্কিন প্রশাসনের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

পরবর্তীতে মার্কিন দূতাবাস থেকে দ্রুত বিবৃতি দিয়ে জানানো হয় যে এই ব্যক্তি মার্কিন সরকারের কেউ নন। এরপর আরেফী এবং হাসান সারওয়ার্দীকে গ্রেফতার করা হলে গোয়েন্দা পুলিশের জেরার মুখে আরেফী স্বীকার করেন যে বিএনপি কার্যালয়ে তাকে কী বলতে হবে তা শিখিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

এই ঘটনার পর বিএনপি চরম আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে পড়ে এবং বলতে বাধ্য হয় যে এই বিষয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে দল কিছুই জানত না। ইশরাক হোসেনও পরবর্তীতে পিছু হটে দাবি করেন, তিনি ওই ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না, হাসান সারওয়ার্দীই তাঁর সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

এই ঘটনাটি রাজনৈতিক মহলে বিএনপির অপরিপক্বতা এবং সস্তা প্রচারণামুখী রাজনীতির এক বড় উদাহরণ হিসেবে থেকে গেছে।

এই ইশরাক প্রতিমন্ত্রী হয়ে যাওয়ার পর চন্দ্রিমা উদ্যানে জিয়াউর রহমানের কবর প্রাঙ্গণে ধাক্কাধাক্কি থেকে শুরু করে, সামরিক বাহিনির সদস্যের স্যালুটের সময়ে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে স্যালুট প্রদানের মতো শিশুতোষ অনেক কাজ করে ফেলেছেন তিনি।

আর সর্বশেষ যা করলেন, সেটা কেবল শিশুতোষ নয়, রীতিমতো অপরাধ।
তবে শুধু ইশরাক হোসেন নয় বিএনপি’র মন্ত্রীসভায় এমন আরো সদস্য রয়েছেন যারা ইতিমধ্যেই নানা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও তাঁকে নানাভাবে ‘মুদ্রা’র যোগানদাতা হিসেবে পরিচিত বিএনপির সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (সিলেটের অধিবাসী হুমায়ুন কবির)-কে নিয়েও সম্প্রতি দল ও সরকারের ভেতরে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

২০২৬ এর ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের মাজার জিয়ারতকালে সাংবাদিকদের ওপর হেনস্থা ও হামলার ঘটনাটি ঘটেছিল।

জুমার নামাজ শেষে তিনি মাজার জিয়ারত করতে গেলে নেতাকর্মীদের ভিড় ও ধাক্ধাক্কির কারণে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ নষ্ট হয় এবং পরবর্তীতে মাজারের বাইরে একদল লোক সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন।

এই ঘটনার প্রতিবাদে সিলেটের স্থানীয় সাংবাদিকরা প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় বিএনপির সকল কর্মসূচি বর্জনের ঘোষণা দেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতির মতো সংবেদনশীল মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তির সফরের সময় গণমাধ্যমের ওপর এমন আচরণ দলের গণতান্ত্রিক ও সহনশীল ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

শুধু কি তাই? সাংবাদিকগণ তাঁকে মন্ত্রণালয়ে বা অন্য কোন অনুষ্ঠানে যেসব প্রমাণ করেন তিনি তার সঠিক কোন জবাবতো দিতেই পারেন না , উল্টো ছ্যাবলামি করেন। এদিক-ওদিক তাকিয়ে ছোবলামির হাসি দিতে থাকেন। এটি কোন দায়িত্বশীল পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর আচরণ হতে পারেনা।

এখানে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, বিএনপি কেন এমন বিতর্কিত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে বসাচ্ছে ?

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, দলে ত্যাগী, অভিজ্ঞ এবং দূরদর্শী নেতার অভাব না থাকলেও অনেক সময় পারিবারিক ঐতিহ্য, আর্থিক প্রতিপত্তি কিংবা অতি-উৎসাহী তরুণ নেতৃত্বকে দ্রুত তুষ্ট করার প্রয়াস এই ধরণের ভুলের জন্ম দেয়।

সাদেক হোসেন খোকার পুত্র হিসেবে ইশরাক হোসেনকে বড় ধরনের রাজনৈতিক ছাড় ও দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু বারবার তার অবিবেচনাপ্রসূত আচরণ, কখনো ভুয়া উপদেষ্টা মঞ্চে বসানো, আবার কখনো নিজেই আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করা প্রমাণ করে যে, নেতৃত্বের উপযুক্ততা যাচাই না করে কেবল বংশমর্যাদা বা মাঠের প্রভাবকে মূল্যায়ন করলে দলকে এর খেসারত দিতেই হয়।

রাজনীতিতে ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়াটাই টিকে থাকার একমাত্র পথ। ইশরাক হোসেনের সাম্প্রতিক এই কর্মকাণ্ডের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে কড়া অবস্থান নিয়েছেন এবং তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন, তা সরকারের শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এই ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি বারবার তৈরি হওয়া এটাই নির্দেশ করে যে, দলের অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযান এবং দায়িত্বশীলদের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখা এখন বিএনপির জন্য সময়ের দাবি।

অন্যথায়, কতিপয় নেতার ব্যক্তিগত হঠকারিতা ও সস্তা জনপ্রিয়তার লোভ পুরো দলের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অর্জন ও জনসমর্থনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।

কিন্তু সত্যিই কি একসময়ের মি: টেন পারসেন্ট ও বিকল্প সরকার ‘হাওয়া ভবন’ এর গডফাদার এখনকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের মন ও দলের মধ্যে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে শুদ্ধ হতে পারবেন? এটি আসলে বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন।

# রাকীব হুসেইন: লেখক, প্রাবন্ধিক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *