বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। রপ্তানী আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে এই একটিমাত্র খাত থেকে। কিন্তু যে সোনার ডিম পাড়া হাঁসটিকে কেন্দ্র করে দেশের অর্থনীতির এত আস্ফালন, তার ভেতরে জমে আছে এক নীরব কিন্তু তীব্র দীর্ঘশ্বাস।
একদিকে বিশ্ব বাজারে কোটি কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির গৌরব, অন্যদিকে সেই পোশাক তৈরির পেছনে থাকা লাখো শ্রমিকের বঞ্চনা, নিপীড়ন ও অনিশ্চয়তা।
মালিকপক্ষের সীমাহীন বিত্ত-বৈভব বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং খাতের একচেটিয়া সুবিধা ভোগের বিপরীতে শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায়ের সংগ্রাম ও তার ওপর নেমে আসা রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক দমন-পীড়ন আজ দেশের অন্যতম বড় এক আর্থ-সামাজিক ক্ষত।
বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে থাকা বাংলাদেশী বা প্রবাসীরা রেকর্ড পরিমাণ মানে ৩৫.৫৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বর্তমান বিনিময় হার (প্রতি ডলার প্রায় ১২৩ টাকা হিসাবে) এটি বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ৪,৩৭,৭৫৭ কোটি টাকা।
দেশে এক অস্থিরতা থাকার পরও অপরদিকে একই অর্থবছরে পোশাক খাত থেকে মোট রপ্তানি আয় হয়েছে ৩৮.৯৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৪,৭৯,৩৩১ কোটি টাকা।
কিন্তু যে খাত থেকে এত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আসে এবং এতগুলো মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন সেই তৈরী পোশাক খাতকে মালিকপক্ষ, সরকার কখনোই সঠিকভাবে চালাতে চায়নি।
যে শ্রমিকরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দিনরাত পরিশ্রম করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথকে সুগম করে দিচ্ছেন, মালিকরা টাকার কুমীর হয়ে উঠছেন সেই শ্রমিকদের কোন মূল্য নেই কারো কাছে! ন্যায্য মজুরী চাইতে গেলে তাদের ওপর নেমে আসে খড়্গহস্ত। ছাঁটাই, নিপীড়ন। আর রাজপথে আন্দোলন করতে গেলে যে কি অবস্থা হয় তাতো গত কয়েকদিন ধরে দেশবাসী দেখতেই পাচ্ছেন।

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে, মানে তাদের বেতন ভাতা বাড়িয়ে সরকার তাদেরকে পক্ষে রাখতে চাইছে। কিন্তু যারা দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে সচল রাখছে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা যোগোচ্ছেন অনেকটা তাদের জন্য রয়েছে কেবল বঞ্চনা আর হামলা-নিপিড়ন। এ কেমন দেশ আমাদের?
এসব লাখ লাখ পোশাক শ্রমিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদেরকেতো বেঁচে থাকতে হবে , নাকি? তাদের সেই জীবনযাত্রা যখন সংকটের সম্মুখীন তখন তারা কি তাদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর জন্য কোন কথা বলতে পারবেনা?
মালিকপক্ষতো কথা শোনেনা শ্রমিকদের। বাধ্য হয়ে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে এসে আন্দোলন সংগ্রাম করছে। কিন্তু সেখানেও হামলা-পুলিশী অত্যাচার। রাষ্ট্রযন্ত্র যেনো দানব হয়ে উঠেছে শ্রমিকদের জন্য।
গত কয়েকদিন ধরে শ্রমিকরা যখন আন্দোলনে রাজপথে তখন আমাদের দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ (শিলং সালাউদ্দিন নামেই সমধিক পরিচিত), প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ (কষা জাহেদ) অভিযোগ তুলেছেন যে, সীমান্তের ওপাড় থেকে নাকি এই আন্দোলনে ইন্ধন যোগানো হচ্ছে।
গত ইউনুস সরকার ও তারই ধারাবাহিকতায় ক্ষমতাসীন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার নিজেরা পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলেই ভারত জুজু খুঁজতে থাকে।
গত কয়েকদিন একটু খোঁজ খবর নিয়ে বরং যা তথ্য পাওয়া গেছে তাহলো- সীমান্তের ওপাড় থেকে নয় বরং জামায়াতে ইসলামী ভেতর থেকে সরকারকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলেতে চাইছে। এসব করে তারা সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা তুলে দিয়ে নিজেদেরকে সেই ক্ষমতার অংশীদারি করতে নীলনকশা করছে। কারণ সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে তাদের বেশ বড় একটি অংশ রয়েছে।

সরকার সেদিকে খোঁজ না নিয়ে উল্টো ভারত জুজু’র ভয় দেখাচ্ছে জাতিকে। এ ধরনের দোষারোপ করে নিজেরা টিকে থাকার অপকৌশল আর কতদিন কাজে লাগাবে বিএনপি?
পোশাক শিল্পে বারবার অস্থিরতা ও শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে কোনো সাময়িক বা বাহ্যিক উস্কানি নয়, বরং রয়েছে কাঠামোগত দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনা। বছরের পর বছর ধরে শ্রমিকরা যে মজুরি পান, তা বর্তমান লাগামহীন মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় একেবারেই নগণ্য। সাধারণ চাল, ডাল, তেল আর বাড়ি ভাড়ার বাজারে যখন আগুন, তখন শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি দিয়ে টিকে থাকা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
এই চরম সংকটের বিপরীতে যখনই শ্রমিকরা তাদের ন্যূনতম বেঁচে থাকার দাবি কিংবা বেতন বৃদ্ধির দাবি নিয়ে রাস্তায় নামেন, তখনই মালিকপক্ষ, পুলিশ প্রশাসন এবং শাসকগোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে একে দমন করার পথ বেছে নেয়।
কোন সরকারের আমলেই এই শাসন ও শোষণের মূল ধারার কোনো পরিবর্তন হয়নি। আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, মামলা-হামলা এমনকি গুলি চালিয়ে হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও এ খাতের ইতিহাসে বিরল নয়।

মালিকপক্ষ প্রায়শই শ্রমিকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনকে “বহিরাগতদের উস্কানি” বা “রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র” বলে উড়িয়ে দিতে চায়, যা প্রকারান্তরে প্রকৃত সমস্যাকে আড়াল করার একটি হাতিয়ার মাত্র।
পোশাক শিল্পের এক বড় সমালোচনা হলো মালিক ও শ্রমিকের মধ্যকার আকাশচুম্বী জীবনযাত্রার পার্থক্য। দেশের ব্যাংক খাত থেকে বিশেষ প্রনোদনা, শত শত ও হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ এবং বিভিন্ন কর মওকুফের সুবিধা ভোগ করেন এই পোশাক কারখানার মালিকরা। অথচ এই ঋণের বড় অংশই খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার নজির রয়েছে, এবং অভিযোগ রয়েছে যে এই অর্থের এক বিশাল অংশ বিদেশে পাচার কিংবা মালিকদের ব্যক্তিগত বিত্ত-বৈভব বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হয়।
অথচ যে শ্রমিকের হাতের ছোঁয়ায় এই কোটি কোটি ডলারের সম্পদ তৈরি হচ্ছে, মাস শেষে তার হাতে নিয়মিত বেতন ও ওভারটাইমের টাকাটুকুও পৌঁছায় না।
কারখানায় মাস পার হলেও বকেয়া বেতনের জন্য শ্রমিককে অনাহারে দিন কাটাতে হয়। নিজের ন্যায্য ঘামের দাম চাইতে গেলে চাকরি হারানোর ভয় এবং কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার আশঙ্কা মাথার ওপর ঝুলে থাকে। পুঁজিবাদের এই নগ্ন রূপ পোশাক খাতকে এক দাসপ্রথার আধুনিক সংস্করণে রূপান্তর করেছে।

আন্তর্জাতিক বাজার মন্দা, দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং সবচেয়ে বড় সমস্যা—তীব্র জ্বালানি (গ্যাস ও বিদ্যুৎ) সংকটের কারণে গত কয়েক বছরে পোশাক খাতে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ -এর আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত গত তিন বছরে দেশে মোট ৪০২টি তৈরি পোশাক কারখানা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
এর মধ্যে পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সদস্যভুক্ত ২৮২টি এবং নিটওয়্যার খাতের সংগঠন বিকেএমইএ-এর ১২০টি কারখানা রয়েছে।
বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমল জুড়ে তীব্র গ্যাস সংকট এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাট তৈরি পোশাক খাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে। গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দৈনিক চাহিদার তুলনায় প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকায় টেক্সটাইল ও ডাইং মিলগুলোর উৎপাদন গড়ে ৩৮ থেকে ৫১ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় বয়লার ও জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না, যার ফলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করা যাচ্ছে না এবং প্রায় ৫৫শতাংশ কারখানার অর্ডার বাতিল বা কমে গেছে।
এই ধারাবাহিক কারখানা বন্ধের ফলে বিগত তিন বছরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন বা লে-অফের শিকার হয়েছেন।
শুধু চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সাময়িক বন্ধের ধাক্কাতেই প্রায় ১০ লাখের কাছাকাছি শ্রমিকের কর্মজীবন নিয়মিত অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
একদিকে সাধারণ উৎপাদনশীল খাতের শ্রমিক যখন ১২,৫০০ টাকা ন্যূনতম মজুরি নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করছেন, ঠিক তখনই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো ঘোষণা করা হয়েছে। রাষ্ট্রের এই দ্বিচারিতা অত্যন্ত প্রকট।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে যেখানে ঘুষ, দুর্নীতি ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্যের বিস্তর অভিযোগ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে, সেখানে তাদের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা ঢালছে।
অথচ যে পোশাক শ্রমিক রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে, দিন-রাত ওভারটাইম করে, গায়ের ঘাম রক্তে রূপান্তর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সচল রাখছেন, তার বেলায় রাষ্ট্রের চরম উদাসীনতা দেখা যায়।
একজন সরকারি কর্মচারী চাকরি ও পেনশনের শতভাগ নিরাপত্তা পান, আর একজন পোশাক শ্রমিকের আজ চাকরি থাকলে আগামীকাল কারখানা লে-অফ বা বন্ধের নোটিশে রাস্তায় বসার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না। শ্রমিকের এই নিরাপত্তাহীনতা ও বেতন বৈষম্য দেশের সামগ্রিক বিচারব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক সুশাসনের অভাবকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
এনজিও এবং রাজনৈতিক সংগঠক ফেরদৌস আরা রুমী ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, “গার্মেন্টস সেক্টরে আগুন সব সময় লাগিয়ে রাখে মালিক আর শ্রমিক নেতারা উভয় মিলে। কি রকম সেটা, যারা শ্রমিকদের অধিকার, মজুরি, বঞ্চনা, নিরাপত্তা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করেন তারা আমার চাইতে ভাল জানেন। শ্রমিকনেতাদের একেক পক্ষ দুইদিন আন্দোলনে থেকে হঠাৎ করে সুর পালটে মালিকদের পক্ষ নিয়ে নেন। তারপর আমতা আমতা করে বলতে থাকেন, আপনারা ধৈর্য্য ধরেন, আমরা পাশে আছি, মজুরি রিভাইস করা হবে, ষড়যন্ত্রে পা দেবেন না, হেন তেন। তো, এখন কথা হলো গিয়ে, তারা শ্রমিকরা রাস্তায় নামার আগেই কেন তাদের মনে হয় না যে, শ্রমিকরা দিনের পর দিন মজুরি বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন!
ষড়যন্ত্রকারীদের তাইলে সেই সুযোগ নেয়ার সুযোগ তৈরি হতো না। আপনারা শ্রমিকনেতা হইছেন কি শুধু নিজেদের আখের গুছানোর জন্য? দেশ- বিদেশ ঘুরবেন, নিজেদের পকেট ভারি করবেন, সভা-সেমিনারে গলাবাজি করবেন, নিজেদের এক্সপোজার বাড়াবেন শ্রমিকের অধিকারের নামে, এই মশকরা আর কয়দিন করবেন?

প্রাবন্ধিক সাংবাদিক মনজুরুল হক পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের ওপর এ ধরনের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দেখে বলছেন—“আপনাদের কি পাকিস্তানের জাস্টিস কায়ানির কথা মনে আছে? তিনি বলেছিলেন; ‘আমরা এমন একটা বাহিনী পুষি যারা কোনও যুদ্ধে জেতেনি, অথচ তিন বার নিজের দেশ দখল করেছে।’
বাংলাদেশের পুলিশও তাই। হেড অব স্টেটকে রক্ষা করতে পারে না, ক্ষমতাবানের ছেলে গাড়িচাপায় ফুটপাথবাসীকে মেরে ফেললেও তাকে খুঁজে পায় না। অথচ দুর্বল গার্মেন্ট শ্রমিকের ওপর বীরত্ব ফলায়। এদেশে সরকারি লোক ক্রিমিনাল অফেন্স করাটাকে ‘রেগুলেশন’ ধরে নিয়েছে”।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় বসার পর পরই নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন করেছে। এই নতুন স্কেলে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বনিম্ন ২০,০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ১,৫৬,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এতে সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা, যা আগের ৮,২৫০ টাকা থেকে প্রায় ১৪২ শতাংশ বৃদ্ধি। সর্বোচ্চ বেতন (১ম গ্রেড) আগের ৭৮,০০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১,৫৬,০০০ টাকা করা হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের বেতন ১,৭২,০০০ টাকা এবং সিনিয়র সচিবদের বেতন ১,৬৪,০০০ টাকা করা হয়েছে।
প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ এবং ১২তম থেকে ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ১১৫ শতাংশ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। নতুন এই পে-স্কেলটি ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে।
এই বাড়তি বেতন দেওয়ার জন্য সরকারের চামচারা দুটো যুক্তি হাজির করেছেন। এক. দীর্ঘ ১০ বছর ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পে-স্কেল হয়নি।
দুই. মুদ্রাস্ফীতির কারণে জীবন-যাপন ব্যয় মেটাতে বেতন বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই।
অথচ এই একই চামচারা গার্মেন্ট শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকার দাবিতে শ্রমিকরা রাজপথে নামতেই তাদের ওপর পুলিশ লেলিয়ে রক্তাক্ত করেছে, ছত্রভঙ্গ করেছে, শেষে ২৫ থেকে ৪০টির মত গার্মেন্ট কারখানা বাধ্যতামূলক বন্ধ করিয়েছে।
এদের বেলায় মুদ্রাস্ফীতির কারণে জীবন-যাপন ব্যয় বেড়ে যাওয়া ম্যাটার করে না! তাই গার্মেন্ট শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দরকার নেই। আল্লাহ মুখ দিয়েছেন, তিনিই আহারের ব্যবস্থা করবেন!
ওই মজুরি কমিশন নামক ‘শ্বেতহস্তি’ ২২/২৩ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বাড়তি বেতন মেটাতে ব্যাংকসমূহ থেকে লোন করছে। অথচ ২২/২৩ লাখ গার্মেন্ট শ্রমিককে বেকার বানানোর জন্য এক পয়সা লোন নিতে হয়নি। স্রেফ একটা আদেশ দিয়েই ২২/২৩ লাখ মানুষ ও তাদের পরিবারকে পথে বসিয়ে দিয়েছে।
এই নিপীড়িত শ্রমিকদের মজুরী নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবদ্দশায় বহুবার মেহনতি মানুষ ও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। যেমন ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “আপনি চাকরি করেন আপনার মায়না দেয় ওই গরিব কৃষক, আপনার মায়না দেয় ওই গরিব শ্রমিক… ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ওরাই মালিক।”
পরিশেষে বলি -শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি– হয় দ্রব্যমূল্য কমিয়ে আনুন নয়তো বেতন বৃদ্ধি করুন। শ্রমিকরা কোনো অপরাধী নয়, তারা এই দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে, রাতের পর রাত পরিশ্রম করে তারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে। একবার ভাবুন, যে হাত দিয়ে শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতি গড়ে, সেই হাতেই আজ নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবি! শ্রমিকের দাবি শুনুন, শ্রমিকের কষ্ট বুঝুন।

লাঠিচার্জ নয়, গুলির ভয় নয়—শ্রমিক চায় ন্যায্য মজুরি, সম্মান আর সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার। মনে রাখবেন, শ্রমিক বাঁচলে শিল্প বাঁচবে, আর শিল্প বাঁচলেই দেশ এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শুধু কতগুলো ইট-পাথরের দেয়াল আর লোহার মেশিনের সমষ্টি নয়; এটি দাঁড়িয়ে আছে ৪০ লাখ মানুষের জীবন, জীবিকা ও স্বপ্নের ওপর, যাদের সিংহভাগই নারী।
সস্তা শ্রমের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার যে কৌশল মালিকপক্ষ ও রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিয়ে আসছে, তা কেবল অমানবিকই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আত্মঘাতী। শ্রমিকের পেটে ক্ষুধা রেখে, তাদের ওপর লাঠি-বুলেট চালিয়ে শিল্পকে শান্ত রাখা অসম্ভব।
একই সাথে সরকারকে অবিলম্বে গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করে কারখানাগুলোকে সচল রাখার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং শিল্পের স্থায়িত্ব একে অপরের পরিপূরক; শ্রমিক বাঁচলে তবেই বাঁচবে দেশের অর্থনীতি।
# রাকীব হুসেইন : লেখক, প্রাবন্ধিক।
