একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর মূল সহযোগী দল জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছেন বিএনপিরই একজন সংসদ সদস্য।

সোমবার মানে ২২ জুন হঠাৎ করে বিএনপি’র এই সাংসদ কেন তাদের একসময়ের রাজনৈতিক পেয়ারের দোস্ত জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার দাবি তুললেন মহান জাতীয় সংসদেই?

অথচ এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি আসন নিয়ে সংসদে বিরোধী দলের অবস্থানটি দখল করেছে তারা।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে সেই জামায়াতকে কেন নিষিদ্ধের দাবি উঠলো? তাও আবার বিএনপি দলীয় সাংসদের পক্ষ থেকে!

বিএনপি নেতারা নানাসময়ে নানাভাবেই জামায়াতের সমালোচনা করেছেন, করছেন। তাই বলে একেবারে দল হিসেবেই নিষিদ্ধ করার দাবী? ব্যাপারটি কেমন কেমন মনে হচ্ছে না!

কি অভিযোগ তুলে বিএনপি দলীয় সাংসদ রফিকুল ইসলাম জামাল তা একটু দেখে আসি। পত্রিকায় যে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে সেটিই একটু চোখ বুলিয়ে নেই আমরা।

পত্রিকার ছাপা হয়েছে- “বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ চেয়েছেন ঝালকাঠি-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল।

সোমবার তিনি সংসদে বাজেট আলোচনায় জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, এই দলটি ১৯৭১ সালে এদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। যে দলটি বাংলাদেশের সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিল; মহান সংসদে দাবি করব, তারা বাংলাদেশের রাজনীতি করতে পারবে না, তাদের রাজনীতিও ফ্যাসিস্টদের মত নিষিদ্ধ করা হোক।

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রচারের সমালোচনা করে রফিকুল ইসলাম জামাল আরো বলেন, নামের পরে ইসলাম থাকলেই ইসলাম হয় না।

যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করেন, গত নির্বাচনে ভোটের বিনিময়ে মানুষকে বেহেশত দিয়েছেন, আমরা দেখেছি, বিড়ির সুখ টানের মধ্য দিয়েও, তারা বলেছিল ‘সকল পাপ মওকুফ হওয়া যাবে’।

এইভাবে একের পর এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে যারা ইসলামের নামে রাজনীতি করছে, এই দলটি ১৯৭১ সালে এদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল।

নির্বাচনী প্রচারে ঝালকাঠি-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ফয়জুল হক বলেছিলেন—বিড়িতে সুখ টানের মধ্যেও দাঁড়িপাল্লার দাওয়াত দিলে আল্লাহ মাফ করে দিতে পারে—এ মন্তব্যের কারণে জামায়াত তাকে কারণ দর্শানো নোটিস দিয়েছিল।

কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ রেজা আহমেদ বলেন, মসজিদের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। মসজিদ আল্লাহর ঘর। মসজিদে নামাজ পড়বে, কোরআন শরিফ পড়বে।

কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল মসজিদে যায়, রাজনীতি করে। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, আইন করতে, যাতে কোনো মসজিদ-মাদ্রাসায় রাজনৈতিক মিটিং করা না যায়।

জামায়াতের প্রতি ইঙ্গিত করে রেজা আহমেদ বলেন, আমরা যেমন প্রকাশ্যে মাঠে, স্কুলে বা কোনো হলরুমে কর্মীসভা করি, জনসভা করি। তাদেরও সেই ব্যবস্থা করতে হবে। তারা মসজিদে মিটিং করতে পারবে না। আমার সঙ্গে সবাই একমত কিনা জানি না”।

একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা যদ্ধের সময় খুনী-ধর্ষক, রাজাকার-আলবদর-আলসামশ এর দল জামায়াতে ইসলামীকে তার ঘৃণ্য কাজের জন্য এমন ঘৃণা ও শাস্তি চাওয়াটাইতো স্বাভাবিক।

এই বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা সাবেক সেনাশাসক ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানই কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে একাত্তরে যুদ্ধাপরাধীর দল জামায়াতকে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন।

অথচ আজকের এই নতুন প্রেক্ষাপটে সেই বিএনপিরই সাহসী সাংসদ রেজা আহমেদ খোদ জাতীয় সংসদেই দাবি জানালেন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার।

বিএনপি দলীয় সাংসদ জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তুললেও, দল হিসেবে বিএনপি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সরাসরি কোনো অবস্থান নেয়নি।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে নানা ইস্যুতে বড় ধরনের দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই কিন্তু জামায়াতে ইসলামী নানা ফন্দি-ফিকির করতে থাকে কোন না কোনভাবে তারা আবার এ দেশের রাজনীতিতে প্রবেশের।

আর এজন্য তারা পাকিস্তান, আমেরিকা, চীনসহ মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামী দেশগুলোর কাছে নানাভাবে ধর্না দিচ্ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার পরই এই জামায়াতে ইসলামী তার খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসে।

১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অখণ্ডতা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নেয় এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সশস্ত্র বিরোধিতা করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি।

পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তা করতে তারা শান্তি কমিটি, রাজাকার, আল-বদর এবং আল-শামস-এর মতো আধা-সামরিক বাহিনী গঠনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

মুক্তিযুদ্ধের শেষলগ্নে বাঙালি জাতিকে মেধাLength করার উদ্দেশ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও চিকিৎসকদের (বুদ্ধিজীবী) পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডে আল-বদর বাহিনীর সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (ICT) প্রমাণিত হয়েছে এবং এর ফলশ্রুতিতে দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে ফাঁসি ও আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

আরো কয়েকজনের রায় ও মৃত্যুদন্ড বাস্তবায়ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত চব্বিশের ৫ আগষ্ট কথিত গণঅভ্যুত্থানের পর এসব খুনীরা সহাস্যে বের হয়ে এসে নতুন করে আস্ফালন শুরু করেছে।

আর তাদের ভাবসাব দেখলে মনে হয় তারাই ক্ষমতায়, বিএনপি নয়। কারণ ইতিমধ্যে সেই ৫ আগষ্টের পর থেকেই তারা সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের বিভিন্ন পদে তাদের লোকজনকে ক্ষমতায়ন করেছে পাকাপোক্তভাবে।

ফলে বলতে গেলে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ ভার বা স্টিয়ারিং অনেকটাই জামায়াতের হাতে।
ফলে বিএনপি সংসদে দুই তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে ব্রুট মেজরিটির দল হলেও সেই সরকারকে চোখ রাঙানি দিতে একটুও ভয় পায়না জামায়াত।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো সশস্র বাহিনীর ভেতরে ইতিমধ্যে জামায়াত পাকাপোক্তভাবে তাদের ঘাঁটি গেড়ে বসেছে।

বিশেষ করে সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান যেখানে জামায়াতকে প্রশ্রয় দিয়ে জামায়াতেরই বশংবদ হয়ে গেছে।

অথচ দেশের মূলধারা ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলগুলো অনেকদিন থেকে অভিযোগ করে আসছে যে, জামায়াত স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সুযোগ নিয়ে আমাদের সংবিধানে মূলনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান দিকনির্দেশক সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে বার বার আঘাত করছে।

গত চব্বিশের আগষ্টে এই স্বাধীন বাংলাদেশে শ্লোগান উঠেছিল গোলাম আজমের বাংলায় শেখ মুজিবের ঠাঁই নাই, নিজামীর বাংলায় আওয়ামীলীগের ঠাঁই নাই, সাইদীর বাংলায় শেখ হাসিনার ঠাঁই নাই.. ইত্যাদি।

কি সেলুকাস! তাই না? এই বাংলা নাকি ঘাতক গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামী আর ভণ্ড ওয়াজ ব্যবসায়ী সাঈদীর? আর সেই বাংলায় নাকি মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ঠাঁই নাই?

আসলে জামায়াত তাদের ক্যাডারভিত্তিক ছাত্রসংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রশিবির’-এর মাধ্যমে তরুণদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে সংশয় তৈরী করতে সক্ষম হয়েছে।

আর সেক্ষেত্রে ভারত ও হিন্দু বিরোধী একটি ইসলামী বিপ্লবের স্বপ্নে তাদেরকে মোহগ্রস্ত করে ফেলেছে। তবে সংখ্যাটি একেবারে নেহায়েত কম নয়।

জামায়াত বাংলাদেশের সমাজ-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় একধরনের ক্যামোফ্লেজ তৈরী করার জন্য আপাতদৃষ্টিতে নিজেদের ‘উদারপন্থী ইসলামী গণতান্ত্রিক ‘ ও ‘দুর্নীতিমুক্ত’ দল হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করছে।

তবে তাদের মূল লক্ষ্য কিন্তু বাংলাদেশে শরিয়াহ-ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা, যা দেশের বিদ্যমান আইনি ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতিকে পুরোটাই ধ্বংস করে দিতে পারে।

কিন্তু আপাতত তারা অত্যন্ত কৌশলে সেই শরীয়া আইনের বিষয়টি তেমন জোরালোভাবে তুলছেনা। তবে তারা ব্যাংকিং সেক্টরেতো শরীয়া অর্থনীতির একটি গোঁজামিলের সুবিধানীতি চালু করতে সক্ষম হয়েছে এই মুসলিমপ্রধান দেশে।

যদিও গত ১২ ফেব্রুয়ারি ইলেকশনের আগে জামায়াতের আমীর যিনি সাদা শকুন হিসেবেই অধিক পরিচিত সেই ডা. শফিকুর রহমান খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর বলেছিলেন যে, তারা দেশের প্রচলিত গনতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যেই থাকতে চান, শরীয়া আইন প্রণয়নের চিন্তা তারা করছেন না। এটি মূলত ছেলে ভুলানো মোয়া’র মত।

কিন্তু জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মতিউর রহমান আকন্দের মতে-“ জামায়াতে ইসলাম যদি ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে জনগণের মতামত, ইচ্ছা এবং অপিনিয়নের ভিত্তিতেই আইন প্রণয়ন এবং কোনো পরিবর্তন করতে হলে জনগণের মতামতের ভিত্তিতেই পরিবর্তন করা হবে। এখানে আমরা শরিয়াহ আইন প্রণয়ন করবো না এই ধরনের কোনো বক্তব্য আমাদের পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি”।

তার মানে হলো ‘শরীয়ত ভিত্তি শাসন’- ই চালু করবে তারা ক্ষমতায় যেতে পারলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অতীতে যেকোনো দলই ভোট টানার জন্য নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তা পালন করেননি।

ফলে জামায়াতও তাই করবে এটাই স্বাভাবিক। কারণ দলটি নিয়ে মানুষের যে পারসেপশন আছে, তা কাটাতেই হয়তো তারা এসব কথাবার্তা বলছে”। যা আসলে আই ওয়াশ।

এরই মধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো রাজনৈতিক নেতাও মন্তব্য করেছেন যে জামায়াত একটি কঠোরভাবে রেজিমেন্টেড দল এবং তারা প্রকৃত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাস করে না।

দেশের ধর্মনিরপেক্ষ অংশ এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বড় অংশের মধ্যে জামায়াতের রাজনৈতিক উত্থান ও ইসলামপন্থী দলগুলোর সাথে জোট গঠন নিয়ে নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বাধীনতার বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মওদুদীর পরিকল্পিত শরিয়া-ভিত্তিক সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্রে , গণতন্ত্র, স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য এবং জনগণের জন্য সমান অধিকারের কোনো অস্তিত্ব থাকার কোন কারন নেই। পাশাপাশি সমস্ত অমুসলিমরা ধিম্মি হিসাবে “নিকৃষ্ট” অধিকার ভোগ করবে এবং জিজিয়া দিতে বাধ্য থাকবে ।

গত ২০২৪ এর ৫ আগষ্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনোকে বাংলাদেশ সশস্র বাহিনী তাদের বিমানযোগে ভারতের দিল্লীতে সসম্মানে পৌঁছে দেয়ার পর সে বছরই ২৮ আগষ্ট জামায়াতে ইসলামীর ওপর যে নিষেধাজ্ঞা ছিল তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।

২০২৫ এর ১ জুন সুপ্রীম কোর্টের আপিলেট ডিভিশনের এক আদেশের পর দলটি আবার নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন লাভ করে। আসলে তখনতো এই জামায়াতে ইসলামীরই যুগ শুরু হয়ে যায়। তারা যা বলবে তখন তাই শুনতে হয়েছে বা শুনেছে উচ্চতর আদালতও।

অথচ এই ঘাতকের দল জামায়াতের বিরুদ্ধে ধর্মের অপব্যবহার এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থে খাটিয়ে জাতির সাথে প্রতারণার নানা দীর্ঘমেয়াদী অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশের সেক্যুলার ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল, সাধারণ ওলামা সমাজ এবং গবেষকদের বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক আলোচনা ও প্রকাশনায় এই প্রতারণা ও বিভ্রান্তিগুলোর স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার আন্দোলনকে ‘ইসলাম রক্ষার জিহাদ’ বলে প্রচার করেছিল।

এই জামায়াতই একাত্তরে শান্তিকমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনী গঠন করে বাঙ্গালিদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের মতো অপরাধকে ধর্মীয় আড়ালে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে ধর্মীয় স্লোগানের অপব্যবহার করেছে ও করছে।

বিভিন্ন নির্বাচনে জামায়াতের কর্মীরা তাদের নির্বাচনী প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’-কে আল্লাহর ইনসাফের প্রতীক কিংবা রাসুলের দাঁড়িপাল্লা হিসেবে প্রচার করে বিভ্রান্তি তৈরি করত।

এমনকি তাদের ভোট না দিলে ‘ইসলাম ধ্বংস হয়ে যাবে’ বা তাদের ভোট দিলে ‘জান্নাত নিশ্চিত’—এমন চরম বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালানোর অভিযোগ রয়েছে। বিএনপির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও কিন্তু জামায়াতের এসব বিষয় উল্লেখ করে প্রচণ্ড সমালোচনা করেছেন।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে এই জামায়াতে ইসলামী বিভিন্ন সময়ে। নিজেদের রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল করতে বা যুদ্ধাপরাধের বিচারের সময় ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ভাঙচুর এবং বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করেছে, যা ইসলামের মূল শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলেই জানিয়েছেন এদেশের আলেম ওলামাগণ।

জামায়াতের মূল আদর্শিক প্রতিষ্ঠাতা আবুল আলা মওদুদীর তত্ত্ব অনুযায়ী নারী নেতৃত্ব হারাম বা ইসলাম পরিপন্থী। অথচ নিজেদের ক্ষমতার স্বার্থে তারা ১৯৯১ ও ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে জোট সরকার গঠন করে এবং নারী নেতৃত্বকে মেনে নেয়।

একসময়ে এই জামায়াতে ইসলামী পশ্চিমা গণতন্ত্রকে ‘কুফর’ বা ‘ইসলাম বিরোধী’ বললেও, বাস্তব রাজনীতিতে তারা শতভাগ পশ্চিমা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং নির্বাচন কমিশন থেকে দলের নিবন্ধন পাওয়ার জন্য আইনি লড়াইও করেছে।

পাশাপাশি নিজেদেরকে একমাত্র ‘প্রকৃত ইসলামী দল’ এবং বাকি মুসলিম বা আলেমদের বিভ্রান্ত বলে মনে করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আলেম সমাজের মতে, জামায়াতে ইসলামী মূলত একটি রাজনৈতিক দল যা ইসলামকে লক্ষ্য হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার বা ‘পলিটিক্যাল টুল’ হিসেবে ব্যবহার করে জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা করেছে।

#ইশরাত জাহান: লেখিকা, প্রাবন্ধিক ও নারী অধিকার সংগঠক।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *